পাঁচশো বছরের পুরনো মার্কেটর মানচিত্রকে সরিয়ে ‘ইকুয়াল আর্থ’ মানচিত্রকে সমর্থনের প্রস্তাব পাশ হল ১৬৪-১ ভোটে; আফ্রিকা মহাদেশ যে গ্রিনল্যান্ডের চেয়ে প্রায় ১৪ গুণ বড়, স্বীকৃতি মিলল আনুষ্ঠানিক ভাবে
আন্তর্জাতিক ডেস্ক: পৃথিবীর মানচিত্র নিয়ে তর্ক-বিতর্ক নতুন নয়। কিন্তু গত শুক্রবার রাষ্ট্রপুঞ্জের সাধারণ সভায় যা ঘটে গেল, তাকে ঐতিহাসিক বললে ভুল বলা হবে না। ১৬৪-১ ভোটে পাশ হয়ে গেল একটি প্রস্তাব, যাতে বিশ্বের সব দেশ, স্কুল ও প্রযুক্তি সংস্থাকে অনুরোধ জানানো হয়েছে, পাঁচশো বছরের পুরনো ‘মার্কেটর’ মানচিত্রের বদলে যেন ব্যবহার করা হয় ‘ইকুয়াল আর্থ’ মানচিত্র, যেখানে আফ্রিকা, লাতিন আমেরিকা বা দক্ষিণ এশিয়ার মতো ভূখণ্ডগুলিকে দেখানো হয়েছে তাদের প্রকৃত আয়তনে। টোগোর নেতৃত্বে আফ্রিকার দেশগুলির দীর্ঘ দিনের প্রচারের ফসল এই প্রস্তাব। ভোটাভুটিতে একমাত্র আমেরিকাই গিয়েছে বিপক্ষে, ভোটদানে বিরত থেকেছে ছ’টি দেশ।
এক নজরে
- রাষ্ট্রপুঞ্জের সাধারণ সভায় ১৬৪-১ ভোটে পাশ হল ‘ইকুয়াল আর্থ’ মানচিত্র সমর্থনের প্রস্তাব
- একমাত্র আমেরিকা ভোট দিয়েছে বিপক্ষে, বিরত থেকেছে ৬টি দেশ
- বাস্তবে আফ্রিকা মহাদেশ গ্রিনল্যান্ডের চেয়ে প্রায় ১৪ গুণ বড়, যদিও মার্কেটর মানচিত্রে তা প্রায় সমান দেখায়
- প্রস্তাব আইনত বাধ্যতামূলক নয়, বিশ্বজুড়ে বদল আসতে সময় লাগবে কয়েক বছর
কেন তৈরি হয়েছিল মার্কেটর মানচিত্র
গোল পৃথিবীকে সমতল কাগজে হুবহু এঁকে ফেলা মোটেই সহজ কাজ নয়। ষোড়শ শতাব্দীতে এই সমস্যারই একটা ব্যবহারিক সমাধান বার করেছিলেন ফ্লেমিশ মানচিত্রকার জেরার্ডাস মার্কেটর। ১৫৬৯ সালে প্রকাশিত তাঁর মানচিত্র মূলত তৈরি হয়েছিল ইউরোপীয় নাবিকদের সমুদ্রপথে দিকনির্ণয়ে সাহায্য করার জন্য। এই প্রক্ষেপণে (projection) কোণ ও দিক অবিকৃত থাকে বলে জাহাজ চালাতে সুবিধা হয়, কিন্তু তার বিনিময়ে একটা বড় আপস করতে হয়েছিল। নিরক্ষরেখার কাছাকাছি অঞ্চলগুলি প্রায় ঠিক আয়তনে দেখানো গেলেও, নিরক্ষরেখা থেকে যত দূরে যাওয়া যায়, ভূখণ্ডের আয়তন মানচিত্রে তত বেশি বড় দেখাতে শুরু করে। ফলে ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকার মতো উত্তর গোলার্ধের দেশগুলি বাস্তবের তুলনায় মানচিত্রে ঢের বড় দেখায়, আর আফ্রিকা-দক্ষিণ আমেরিকার মতো নিরক্ষরেখা-ঘেঁষা মহাদেশ দেখতে লাগে ছোট।
আসল সমস্যাটা কোথায়
সমস্যাটা একটা উদাহরণেই স্পষ্ট হয়ে যায়। মার্কেটর মানচিত্রে গ্রিনল্যান্ড আর আফ্রিকা মহাদেশ দেখতে প্রায় সমান আকারের মনে হয়। অথচ বাস্তবে আফ্রিকা মহাদেশের আয়তন গ্রিনল্যান্ডের প্রায় ১৪ গুণ। ছোটবেলা থেকে স্কুলের দেওয়ালে বা পাঠ্যবইয়ে এই মানচিত্র দেখে বড় হওয়া একটি ছেলে বা মেয়ে, নিজে থেকে আগ্রহ করে না খুঁজলে, সারা জীবন এই ভুল ধারণা নিয়েই থেকে যেতে পারে।
| বৈশিষ্ট্য | মার্কেটর মানচিত্র | ইকুয়াল আর্থ মানচিত্র |
|---|---|---|
| তৈরি | ১৫৬৯ সাল, জেরার্ডাস মার্কেটর | ২০১৮ সাল, মানচিত্রবিদদের একটি দল (বোয়ান স্যাভরিচ প্রমুখ) |
| মূল লক্ষ্য | সমুদ্রপথে দিকনির্ণয়ে সহায়তা | মহাদেশগুলির প্রকৃত আয়তনের অনুপাত বজায় রাখা |
| আফ্রিকা বনাম গ্রিনল্যান্ড | আয়তনে প্রায় সমান দেখায় | আফ্রিকাকে গ্রিনল্যান্ডের প্রকৃত ১৪ গুণ আয়তনে দেখায় |
| আফ্রিকার আনুমানিক প্রকৃত আয়তন | প্রায় ৩ কোটি বর্গ কিমি | প্রায় ৩ কোটি বর্গ কিমি |
| গ্রিনল্যান্ডের আনুমানিক প্রকৃত আয়তন | প্রায় ২১ লক্ষ বর্গ কিমি | প্রায় ২১ লক্ষ বর্গ কিমি |
| মূল শক্তি | কোণ-দিক অবিকৃত, নৌ-চলাচলে উপযোগী | আয়তনের অনুপাত বাস্তবসম্মত |
| মূল সীমাবদ্ধতা | নিরক্ষরেখা থেকে দূরের অঞ্চল অতিরিক্ত বড় দেখায় | আয়তন-নির্ভুল হলেও আকৃতিতে সামান্য হেরফের থাকে |
৪ সেপ্টেম্বর, রাষ্ট্রপুঞ্জে যা ঘটল
আফ্রিকার দেশগুলির দীর্ঘদিনের প্রচার-অভিযান ‘কারেক্ট দ্য ম্যাপ’-এর হাত ধরেই রাষ্ট্রপুঞ্জে পৌঁছয় এই প্রস্তাব। প্রস্তাবটি উত্থাপন করে টোগো, সমর্থন জানায় আফ্রিকান ইউনিয়নভুক্ত দেশগুলি। ভোটাভুটির ফল দাঁড়ায় এই রকম
| ফলাফল | সংখ্যা | দেশ |
|---|---|---|
| পক্ষে | ১৬৪ | ভারত-সহ অধিকাংশ সদস্য রাষ্ট্র |
| বিপক্ষে | ১ | আমেরিকা |
| ভোটদানে বিরত | ৬ | সার্বিয়া, এস্তোনিয়া, জর্জিয়া, লিথুয়ানিয়া, মলদোভা, ইউক্রেন |
টোগোর বিদেশমন্ত্রী রবার্ট দুসে ভোটের আগে বলেন, মানচিত্র আসলে মানুষের বিশ্ব বোঝার ধরনটাই গড়ে দেয়, শিক্ষাকে পথ দেখায় এবং সমষ্টিগত ধারণাকে প্রভাবিত করে। প্রস্তাবটি অবশ্য আইনত কাউকে বাধ্য করছে না, মার্কেটর মানচিত্র নিষিদ্ধও করা হয়নি, শুধু ইকুয়াল আর্থ মানচিত্রের ব্যবহার বাড়ানোর অনুরোধ জানানো হয়েছে।
কেন জরুরি এই বদল: উপলব্ধি ও ইতিহাসের প্রশ্ন
এই খবর নিছক মানচিত্রের প্রযুক্তিগত হিসেবনিকেশ নয়, এর পিছনে জড়িয়ে আছে ইতিহাস আর উপলব্ধির প্রশ্নও। আফ্রিকান ইউনিয়ন তাদের বিবৃতিতে জানিয়েছে, স্কুল, সংবাদমাধ্যম আর আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানে সমান-আয়তনের মানচিত্র ছড়িয়ে দিতে পারলে বিশ্ব মানচিত্রে আফ্রিকার প্রকৃত আয়তন, গুরুত্ব ও অবস্থান শেষ পর্যন্ত প্রতিফলিত হবে। এই প্রচার-অভিযানের অন্যতম মুখ, কেপ টাউন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক কার্লোস লোপেজ ভোটের পরে সমাজমাধ্যমে লেখেন, এই ফলাফল তাঁর কাছে ব্যক্তিগত ভাবেও একটা আবেগঘন মুহূর্ত।
সমর্থকদের যুক্তি হল, ছোটবেলা থেকে যে মানচিত্র দেখে একটা প্রজন্ম বড় হয়, তার একটা প্রচ্ছন্ন প্রভাব থেকে যায় মানুষের ধারণাতেও। নিরক্ষরেখার কাছাকাছি থাকা দেশগুলির মানুষ যদি বারবার নিজের ভূখণ্ডকে মানচিত্রে ছোট দেখতে থাকেন, দীর্ঘ মেয়াদে তা আত্মবিশ্বাসের উপরেও প্রচ্ছন্ন প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করছেন তাঁরা। ঔপনিবেশিক প্রতীক সরানোর প্রয়াস অবশ্য ভারতেও নতুন নয়, ২০২৪ সালে পোর্ট ব্লেয়ারের নাম বদলে শ্রীবিজয়পুরম রাখা হয়েছিল অনেকটা একই যুক্তিতে, ঔপনিবেশিক ছাপ মুছে ফেলার লক্ষ্যে।এর আগে একই ভাবে কলকাতা, চেন্নাই , মুম্বাই সহ একাধিক শহরের নামও পরিবর্তন করা হয়েছে। মানচিত্র বদলের এই দাবিকেও অনেকে সেই বৃহত্তর প্রবণতারই অংশ হিসেবে দেখছেন।
তবে সব দেশ এই যুক্তিতে সহমত নয়। আমেরিকা প্রস্তাবের বিরুদ্ধে ভোট দিয়ে একে ‘উগ্র আদর্শবাদী প্রকল্প’ (radical ideological project) বলে বর্ণনা করেছে। ওয়াশিংটনের বক্তব্য, এই উদ্যোগ নিছক ভৌগোলিক নির্ভুলতার বিষয় নয়, বরং একধরনের রাজনৈতিক অবস্থান চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা।
এর পর কী
প্রস্তাবটি ‘নন-বাইন্ডিং’, অর্থাৎ আইনত কাউকে বাধ্য করছে না। কোনও দেশ, স্কুল বা সংস্থাকে রাতারাতি মার্কেটর মানচিত্র বাতিল করে ইকুয়াল আর্থ চালু করতেই হবে, এমন কোনও বাধ্যবাধকতা নেই এতে। শুধু সদস্য রাষ্ট্র, স্কুল, আন্তর্জাতিক সংস্থা ও প্রযুক্তি সংস্থাগুলিকে অনুরোধ জানানো হয়েছে, আয়তনের প্রশ্ন যেখানে গুরুত্বপূর্ণ, সেখানে যেন ইকুয়াল আর্থ বা সমমানের মানচিত্র ব্যবহার করা হয়।
বদল যে শুরু হয়ে গিয়েছে, তার ইঙ্গিতও মিলেছে ভোটের দিনই। ভোটের কয়েক ঘণ্টা আগে ফ্রান্সের বিদেশমন্ত্রী জঁ-নোয়েল বারো জানিয়ে দেন, তাঁদের সরকারি মানচিত্রে প্যারিস মার্কেটর প্রক্ষেপণের ব্যবহার বন্ধ করার পরিকল্পনা করছে। পাঠ্যবই নতুন করে ছাপা হলে বা সরকারি ভবনে নতুন মানচিত্র টাঙানো হলে, ধীরে ধীরে গোটা বিশ্বে এই পরিবর্তন ছড়িয়ে পড়বে বলে মত পর্যবেক্ষকদের। আন্দাজ, গোটা প্রক্রিয়াটি পুরোপুরি সম্পূর্ণ হতে চার থেকে পাঁচ বছর সময় লেগে যেতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের চোখে
মানচিত্র-বিশেষজ্ঞরা অবশ্য মনে করিয়ে দিচ্ছেন, মার্কেটর মানচিত্র নিজে কোনও ‘ভুল’ মানচিত্র ছিল না। জাহাজে দিকনির্ণয়ের জন্য এই প্রক্ষেপণ আজও কার্যকর, কারণ এতে কোণ ও দিক অবিকৃত থাকে। আসল সমস্যাটা তৈরি হয়েছিল যখন নৌ-চলাচলের বিশেষ প্রয়োজনে তৈরি একটি মানচিত্রই হয়ে উঠল স্কুল, সংবাদমাধ্যম তথা সাধারণ ব্যবহারের ডিফল্ট মানচিত্র, যেখানে আয়তনের নির্ভুলতাই ছিল বেশি জরুরি, দিকনির্ণয় নয়। ইকুয়াল আর্থ প্রক্ষেপণের অন্যতম নির্মাতা বোয়ান স্যাভরিচের ব্যাখ্যা, এই মানচিত্র মহাদেশগুলির প্রকৃত আয়তনের অনুপাত যতটা সম্ভব অক্ষুণ্ণ রাখে, পাশাপাশি গ্লোবে যেমন দেখতে লাগে আকৃতির দিক থেকেও তার কাছাকাছি থাকার চেষ্টা করে। অর্থাৎ এটি নিছক রাজনৈতিক অবস্থান নয়, একটি প্রযুক্তিগত সমাধানও বটে। বিশ্লেষকদের একাংশ অবশ্য এটাও মনে করিয়ে দিচ্ছেন, শুধু মানচিত্র বদলে দিলেই বৈষম্য দূর হয়ে যাবে না। ফরাসি বিদেশমন্ত্রীর নিজের কথাতেই, মানচিত্র বদলালে বিশ্ব বদলে যায় না, কিন্তু বিকৃত একটা প্রতিনিধিত্বকে শুধরে নেওয়াটা নিজেই সত্যের প্রতি একধরনের দায়বদ্ধতা। অর্থাৎ, মানচিত্র বদল অনেকটা প্রতীকী হলেও তার একটা বৈজ্ঞানিক ভিত্তিও রয়েছে।
সব মিলিয়ে, ৪ সেপ্টেম্বরের এই ভোট নিছক মানচিত্র বদলের খবর নয়। ইতিহাস, ঔপনিবেশিকতার উত্তরাধিকার আর আজকের বিশ্ব-রাজনীতি একসঙ্গে জড়িয়ে গিয়েছে একটা সহজ প্রশ্নে, বিশ্বের মানচিত্রে কার কতটা জায়গা প্রাপ্য। স্কুলের দেওয়ালে, পাঠ্যবইয়ের পাতায় বা ডিজিটাল মানচিত্রে এই বদল কত দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে, সেটাই এখন দেখার বিষয়।
তথ্যসূত্র: এপি, রাষ্ট্রপুঞ্জের সংবাদ বিভাগ, এনপিআর, ওয়াশিংটন পোস্ট, আল জাজিরা সংস্থার প্রতিবেদন অবলম্বনে।

