Site icon Jist Feed

“বাংলা যত এগোবে, তার প্রভাব অসমেও পড়বে, ওড়িশাতেও পড়বে। বাংলার ভবিষ্যতের সঙ্গে আমাদের ভবিষ্যতও জড়িত ” — হিমন্ত বিশ্বশর্মা

Bengal Assam Odissa
পূর্ব ও উত্তর-পূর্ব ভারতের অন্যান্য রাজ্যের উন্নয়ন ও নিরাপত্তা কেন বাংলার ওপর নির্ভরশীল—তা ব্যাখ্যা করেছেন আসামের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্বশর্মা। সোজা কথা সোজাসুজি বলার জন্যে তিনি জনপ্রিয়। ইতিমধ্যেই তিনি সারা বাংলায় ৪৫টির বেশি নির্বাচনী জনসভা করেছেন। সেই অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে তিনি নিজের মতামত ও অনুমান জানিয়েছেন। তার বক্তব্যে উঠে এসেছে, কেন ভারতীয় জনতা পার্টি পশ্চিমবঙ্গকে জাতীয় রাজনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হিসেবে দেখছে। আজকের সাংবাদিক সম্মেলনে তার প্রায় প্রতিটি বক্তব্যই ছিল গুরুত্বপূর্ণ। সেই কারণে তার বক্তব্য অপরিবর্তিত আকারে তুলে ধরা হলো।

আমার ভাই ও বোনেরা, আমাদের শ্রদ্ধেয় বন্ধুগণ, আমি সবাইকে সর্বপ্রথম অনেক অনেক ধন্যবাদ জানাতে চাই। পশ্চিমবঙ্গের জন্য আজ খুবই সুখবর এসেছে। আজ অশোক লাহিড়ীজিকে ভারত সরকার নীতি আয়োগের ভাইস চেয়ারম্যান পদে নিয়োগ করেছে। দলিত সমাজ থেকে আসা শ্রী গোবর্ধন দাসজিকেও নীতি আয়োগের সদস্য হিসেবে মনোনীত করা হয়েছে। আমি এই দুই মহান ব্যক্তিত্বকে আন্তরিক অভিনন্দন জানাই—এটি বাংলার গর্ব, দেশেরও গর্ব।

বর্তমান নির্বাচন প্রচারের অভিজ্ঞতা

সাংবাদিক বন্ধুগণ, প্রথম পর্যায়ের নির্বাচন সম্পন্ন হয়েছে এবং আমরা পূর্ণ আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে বলতে পারি যে প্রথম পর্যায়েই বিজেপি প্রায় ১১০টি আসনে জয়লাভ করেছে—এটাই আমাদের অনুমান। এটি আমার ব্যক্তিগত মত, আমি প্রতিটি সভায় এই কথা বলেছি। এইবার অসমে আমরা ১০০টি আসন পাব এবং পশ্চিমবঙ্গে ২০০টি আসন জিতব। অসমে সেঞ্চুরি, বাংলায় ডাবল সেঞ্চুরি। আগে হয়তো আমার মনে হয়েছিল আমি একটু বেশি বলে ফেলেছি, কিন্তু এখন যখন আমি ৪৫টিরও বেশি নির্বাচনী সভা করে ফেলেছি, তখন আমি দৃঢ়ভাবে বলতে পারি—একটি বড় ঢেউ এসেছে, এক ধরনের সুনামি। আমার মনে হয় ২০০-র বেশি হলেও সেটি কোনও আশ্চর্যের বিষয় হবে না।
আমি ২০১৬ এবং ২০১৯ সালের প্রতিটি নির্বাচনে পশ্চিমবঙ্গে এসেছি, কিন্তু এইবার মানুষের মধ্যে যে উৎসাহ এবং বিজেপির প্রতি যে বিশাল আত্মবিশ্বাস দেখা যাচ্ছে, তা আমরা আগে কখনও দেখিনি। প্রথম পর্যায়ে নির্বাচন কমিশন যখন সম্পূর্ণ সুষ্ঠু ও নিরাপদ নির্বাচন পরিচালনা করেছে, তার বড় প্রভাব দ্বিতীয় পর্যায়ে পড়েছে। এখন মানুষ খোলাখুলিভাবে বিজেপির পক্ষে কথা বলতে শুরু করেছে।
আগে অনেকেই বিজেপিকে ভোট দিতে চাইতেন, কিন্তু প্রকাশ্যে বলতে দ্বিধা বোধ করতেন—একটি চাপের পরিবেশ ছিল। কিন্তু প্রথম পর্যায়ের ভোটের পর পুরো পরিবেশ বদলে গেছে। মানুষের মধ্যে আত্মবিশ্বাস বেড়েছে যে বিজেপি জিতবে। এখন মানুষ প্রকাশ্যে সামনে আসছে। আগে আমরা যাকে “ওয়েভ” বলতাম, তা এখন “সুনামি”-তে পরিণত হয়েছে—এটাই আমাদের ধারণা।

দেশের পূর্বাঞ্চল এবং উত্তর-পূর্বাঞ্চলের ভবিষ্যৎ এইবার পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত

ভাই ও বোনেরা, বন্ধুগণ, অসম, ত্রিপুরা, পশ্চিমবঙ্গ এবং পুরো দেশের জন্য এই নির্বাচন কেন এত গুরুত্বপূর্ণ ? মানুষ প্রশ্ন করতে পারে—আপনি তো অসমের মুখ্যমন্ত্রী, তাহলে এত সময় পশ্চিমবঙ্গে কেন দিচ্ছেন? বাইরে থেকে মানুষ এখানে কেন আসছে?
অনেক প্রশ্ন তৃণমূল কংগ্রেসের (টিএমসি) পক্ষ থেকে তোলা হয়। ভাই ও বোনেরা, আমাদের সবচেয়ে বড় উদ্বেগ জনসংখ্যার পরিবর্তন। এই যে জনসংখ্যার গঠন পরিবর্তিত হচ্ছে, আমরা সবাই এতে উদ্বিগ্ন। আপনারা জানেন, ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে যে সীমান্ত রয়েছে, তা ভারতের পাঁচটি রাজ্যের সঙ্গে যুক্ত। এর মধ্যে পশ্চিমবঙ্গ একাই প্রায় ৫৪ শতাংশ সীমান্ত ভাগ করে, ত্রিপুরা প্রায় ২১ শতাংশ, মেঘালয় ১১ শতাংশ, মিজোরাম ৮ শতাংশ এবং অসম প্রায় ৬ শতাংশ সীমান্ত ভাগ করে। এর অর্থ হলো, যে জনসংখ্যাগত পরিবর্তন হচ্ছে, সেটিকে আমরা শুধুমাত্র পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনের বিচ্ছিন্ন প্রসঙ্গ হিসেবে দেখতে পারি না—অসম, ত্রিপুরা, মেঘালয় এবং মিজোরামের সঙ্গে এটি সরাসরি যুক্ত। আজ যদি সীমান্তের কোনও অংশ খোলা থাকে, তার প্রভাব অন্য রাজ্যগুলিতেও পড়বে। যদি মালদা বা মুর্শিদাবাদ থেকে মানুষ অন্যত্র যায়, তার প্রভাব শুধুমাত্র পশ্চিমবঙ্গে সীমাবদ্ধ থাকবে না—বিহার, ঝাড়খণ্ড এবং সমগ্র উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোও এতে প্রভাবিত হবে।
আমাদের জনসংখ্যাগত পরিবর্তন খুব দ্রুত ঘটছে। যদি আপনারা লক্ষ্য করেন, অসমে বর্তমানে প্রায় ৪০ শতাংশ মুসলিম জনসংখ্যা এবং ৬০ শতাংশ হিন্দু জনসংখ্যা রয়েছে। পশ্চিমবঙ্গেও মুসলিম জনসংখ্যা ৩০ শতাংশের সীমা অতিক্রম করছে।
বর্তমানে যে জনগণনা চলছে, যদি শুধুমাত্র পরিসংখ্যানগত বিশ্লেষণ করা হয়—বিস্তারিত আলোচনায় না গিয়েও বলা যায় যে ভবিষ্যতে এই সংখ্যা আরও বাড়বে। পশ্চিমবঙ্গে হিন্দু-মুসলিম অনুপাত ৩০ শতাংশের সীমা অতিক্রম করবে।
অর্থাৎ, আগামী দুই দশকের মধ্যে পশ্চিমবঙ্গ এবং অসম—এই দুই রাজ্যে হিন্দুরা তাদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারাতে পারে। প্রথমে অসমে এই পরিবর্তন দেখা যাবে, তারপর পশ্চিমবঙ্গে। ত্রিপুরা, মেঘালয়তে কঠোর ট্রাইবাল আইন রয়েছে, জমি পাওয়া কঠিন। কিন্তু এর সরাসরি প্রভাব পড়ে অসম এবং পশ্চিমবঙ্গে, এবং অসম ও পশ্চিমবঙ্গ থেকে আবার এটি ভাগ হয়ে ঝাড়খণ্ড ও বিহারের দিকে যায়। তাই এবারের পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচন বা নির্বাচনকে ঘিরে সারা দেশের নজর রয়েছে। দেশের পূর্বাঞ্চল এবং উত্তর-পূর্বাঞ্চলের ভবিষ্যৎ এইবার পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত।
এটা কেন হচ্ছে, এর মূল কারণ কী—এর পেছনে প্রধান কারণ হলো সীমান্তে বেড়া (বর্ডার ফেন্সিং)। আজ যদি আপনি দেখেন, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, সম্মাননীয়া মুখ্যমন্ত্রী পশ্চিমবঙ্গের—আপনি কেন্দ্রীয় সরকারের সঙ্গে সব বিষয়ে লড়াই করতে পারেন, কিন্তু যখন সীমান্তের মতো দেশের বিষয় আসে, তখন আপনি দেশ হিতের পক্ষে কাজ করেননি। আজ আপনারা পরিসংখ্যানগতভাবে দেখতে পারেন, পশ্চিমবঙ্গে ৪৫৬ কিলোমিটার সীমান্তে বেড়া দেওয়ার কথা ভারত সরকার নির্ধারণ করেছে। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গ সরকার এখন পর্যন্ত মাত্র ৭৭ কিলোমিটার জমিই ভারত সরকারকে হস্তান্তর করেছে। আপনি ভাবতে পারেন—৪৫৬ কিলোমিটারের মধ্যে মাত্র ৭৭ কিলোমিটার জমি দেওয়া হয়েছে।
অন্যদিকে অসমে প্রায় ১০০% সীমান্তে বেড়া দেওয়া সম্পন্ন হয়েছে, ত্রিপুরায় দ্রুতগতিতে কাজ চলছে। কিন্তু একমাত্র রাজ্য যা এই কাজে সহযোগিতা করছে না, সেটি হলো পশ্চিমবঙ্গ সরকার।
আপনাদের জেনে অবাক লাগবে যে কলকাতা হাইকোর্ট এই বিষয়টি পর্যবেক্ষণ করছে। ২৭।০১।২০২৬ এপ্রিলের আদেশে বলা হয়েছিল কীভাবে বিএসএফকে জমি দেওয়া হবে। ২৫ তারিখ শুনানিতে আদালত অসন্তোষ প্রকাশ করে এবং পশ্চিমবঙ্গ সরকারকে ২৫ হাজার টাকা জরিমানা করে। এতে বোঝা যায় যে শুধু সাধারণ মানুষ নয়, বিচারব্যবস্থা থেকেও নীতিগত স্তর পর্যন্ত অসন্তোষ রয়েছে।
বাংলাদেশে বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং অনুপ্রবেশকারীদের সমস্যা মোকাবিলা করার জন্য পশ্চিমবঙ্গ সরকার কেন্দ্রকে সহযোগিতা করেনি এবং একপ্রকার দেশবিরোধী কাজ করেছে। ভারতবর্ষকে আমরা বাংলাদেশী অনুপ্রবেশকারীদের হাতে তুলে দিতে পারিনা।
বাংলাদেশি মুসলমান অনুপ্রবেশকারীরা পশ্চিমবঙ্গ হয়ে প্রবেশ করছে, এবং এটি শুধু পশ্চিমবঙ্গেই সীমাবদ্ধ নয়—এটি একটি করিডর হয়ে গেছে, যার মাধ্যমে তারা দেশের মূলভূখণ্ডে প্রবেশ করছে। তারা পশ্চিমবঙ্গ হয়ে অসম পর্যন্ত পৌঁছে যায়; অসম থেকে তাদের তাড়ানো হলে তারা আবার পশ্চিমবঙ্গে ফিরে আসে।
আমি আপনাকে আরও একটি ইঙ্গিত দেব—উত্তর দিনাজপুর জেলায় ভোটারের সংখ্যা বৃদ্ধি হয়েছে ১০৫%, মালদায় ৯৪.৫৮%, মুর্শিদাবাদে ৮৭.৬৫%, দক্ষিণ ২৪ পরগনায় ৮৩.৩০%, জলপাইগুড়িতে ৮২%, কোচবিহারে ৭৬%, উত্তর ২৪ পরগনায় ৭২%, নদিয়ায় ৭১%, দক্ষিণ দিনাজপুরে ৭০%। এই ১০টি জেলার একটি সাধারণ বৈশিষ্ট্য হলো—সবগুলোই ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী এলাকা, এবং সেখানে জনসংখ্যাগত পরিবর্তন ও জনসংখ্যা বৃদ্ধি লক্ষ্য করা যাচ্ছে।

কেন পশ্চিমবঙ্গ সরকার সহযোগিতা করছে না ?

প্রথমত, তারা ভোট বাড়ানোর জন্য সহযোগিতা করছে না, যাতে তাদের ভোটব্যাঙ্ক বাড়ে এবং তৃণমূল কংগ্রেসের একটি শক্তিশালী ভোটব্যাঙ্ক তৈরি হয়—এটা তাদের একটি উদ্দেশ্য।

দ্বিতীয়ত, আর্থিক উদ্দেশ্য এরমধ্যে জড়িয়ে আছে। ভারত সরকারের তথ্য এবং অনেকের মতে—সবচেয়ে বেশি চোরাচালান পশ্চিমবঙ্গ থেকেই হয়। মাদক, জাল নোট এবং অন্যান্য অবৈধ কার্যকলাপ—এসব পশ্চিমবঙ্গের সীমান্ত দিয়েই চলছে। এখানে এক ধরনের “নিরাপদ করিডোর” তৈরি হয়েছে—ভোটের জন্য, চোরাচালানের জন্য, মাদক এবং জাল নোটের জন্য। তাই আমি সরাসরি বলতে চাই—জমি না দেওয়ার পেছনে তৃণমূল কংগ্রেসের রাজনৈতিক প্রভাব, ভোটব্যাঙ্কের হিসাব এবং আর্থিক স্বার্থ (সিন্ডিকেট ইত্যাদি) জড়িত।

যদি দেশকে বাঁচাতে হয়, দেশের জনসংখ্যাগত ভারসাম্য রক্ষা করতে হয়, তাহলে এইবার বিজেপিকে সরকারে আনতে হবে — না হলে, আগামী ২০ বছরে পূর্ব ভারত বাংলাদেশের মুসলমানের নিয়ন্ত্রণে চলে যাবে এবং চিরকালের জন্যে বাংলার ও অসমের জনসংখ্যাগত পরিবর্তন এমন হবে যা আর ফিরিয়ে আনা সম্ভব হবে না। সরকার বারবার পরিবর্তন হতে পারে, কিন্তু একবার যদি বাংলাদেশী মুসলিম জনসংখ্যা ৫০ শতাংশের বেশি হয়ে যায়— তা হলে আর আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনা সম্ভব হবেনা।
তাই যারা দ্বিতীয় দফায় ভোট দিতে যাচ্ছেন, তাদের কাছে একটি প্রশ্ন—আপনার এলাকায় ২০ বছর আগে কত মুসলিম মানুষ ছিল এবং এখন কত বেড়েছে—এটা নিজেরাই বিবেচনা করুন।
একজন বাঙালি মহিলার বিশ্লেষণ দেখছিলাম —তিনি এখন আর পশ্চিমবঙ্গে থাকেন না, কিন্তু তিনি বলেন যে ২০ বছর আগে তার কলোনিতে এক-দুজন মুসলিম মহিলা ছিলেন, কিন্তু এখন তা প্রায় ২৫ শতাংশ হয়েছে।
ভারতের মুসলিম জনসংখ্যা সাধারণত একটি নির্দিষ্ট হারে বাড়ে, কিন্তু পশ্চিমবঙ্গের কিছু এলাকা—যেমন মুর্শিদাবাদ,দিনাজপুর,মালদা—সেখানে গেলে মনে হয় যেন বাংলাদেশে চলে এসেছেন।
একবার যদি জনসংখ্যার ভারসাম্য বদলে যায়, তাহলে অর্থনৈতিক উন্নয়ন যতই হোক, তা কিছুতেই সঠিকভাবে কাজ করবে না ।
আমি সরাসরি এর ভুক্তভোগী। পশ্চিমবঙ্গ দিয়ে যারা বাংলাদেশ থেকে প্রবেশ করে, তারা শুধু পশ্চিমবঙ্গে থাকে না—অসম, বিহার, ঝাড়খণ্ডসহ দেশের অন্যান্য অংশে চলে যায়। ফলে পুরো দেশই এর প্রভাব অনুভব করে।
এই প্রেক্ষিতে আহ্বান জানানো হচ্ছে—দেশের জনসংখ্যাগত ভারসাম্য রক্ষার জন্য বিজেপিকে ভোট দেওয়ার।

রাজনৈতিক অসহিষ্ণুতা

আমরা যখন পশ্চিমবঙ্গে আসি। দিদি আপত্তি করে। কিন্তু যখন বাইরে থেকে সাংবাদিক, নেতা বা অন্য কেউ পশ্চিমবঙ্গে আসেন, তখন ওনার ওপর চাপ তৈরি হয়। প্রশ্ন ওঠে—কেন সীমান্তে বেড়া দেওয়ার জন্য জমি দেওয়া হচ্ছে না? উনি পশ্চিমবঙ্গে এমন বাতাবরণ তৈরি করতে চান, যাতে বাইরের মানুষ এসে বাস্তব পরিস্থিতি দেখতে না পারে—কলকাতায় এসে খাওয়াদাওয়া করে চলে যান, কিন্তু রাজ্যের অন্যান্য জায়গায় যাতে কেউ না যান। টিএমসি র লোক আসামে গিয়ে নির্বাচন এ প্রচার করতে পারেন। কিন্তু আমরা যদি আসাম থেকে পশ্চিমবঙ্গে আসি,পশ্চিমবঙ্গে অন্য রাজ্যের মানুষ এলে আপত্তি করা হয। উনি প্রচার করতে আসাম ,মেঘালয়, ত্রিপুরা পর্যন্ত পৌঁছতে পারেন, স্থানীয় ভাষা না জানা সত্বেও। অথচ অন্যের ক্ষেত্রে বাংলা ভাষা না জানলে উনি কটাক্ষও করেন। আপনি যখন খাসি ও গারো ভাষার বিন্দু বিসর্গ নাজেনে মেঘালয়ে যেতে পারেন তাহলে আমরা বাংলায় এলে কটাক্ষ কেন করেন—এটা এক ধরনের দ্বিচারিতা। কারণ তিনি কাউকে বাংলার প্রকৃত চেহারা দেখাতে চান না। মুর্শিদাবাদের গল্প, দিনাজপুরের গল্প, মালদার গল্প—তিনি কাউকেই দেখাতে চান না। তিনি এগুলো গোপন রাখতে চান। দিদি, এভাবে চলবে না। যদি এখান দিয়ে বাংলাদেশ থেকে মানুষ ভারতে আসে, তাহলে তা পশ্চিমবঙ্গের জনসংখ্যার গঠন পরিবর্তন করবে। শুধু পশ্চিমবঙ্গ নয়, পুরো দেশের জনসংখ্যার গঠন বদলে যাবে।

না হলে , অসম ও পশ্চিমবঙ্গ—দুটোরই ভবিষ্যৎ খুব শীঘ্রই বিপদের মুখে পড়বে

পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনে প্রত্যেক ভারতীয়রই অংশীদারিত্ব রয়েছে। কারণ পশ্চিমবঙ্গে অনুপ্রবেশের রাজনীতির প্রভাব শুধু বাংলায় বা অসমেই নয়, ধীরে ধীরে পুরো দেশেই অনুভূত হবে। তাই আমি পশ্চিমবঙ্গের জনগণকে অনুরোধ করছি। বাংলাদেশে হিন্দুদের ওপর যে অত্যাচার হচ্ছে আমরা দেখছি। মুসলমান জনসংখ্যা যেখানেই ৫০% অতিক্রম করে সেখানে শরিয়ত-ভিত্তিক শাসনের দাবি ওঠে ।
ধর্মনিরপেক্ষতা তখনই সুরক্ষিত থাকে, যখন গণতন্ত্র বজায় থাকে।
দিদি বলেন, বিজেপি নাকি সাম্প্রদায়িকতা ছড়াচ্ছে। কিন্তু বিজেপি ভারতের কোনো রাজ্যে গীতা বা ভগবদ্ গীতার শাসন চালুর দাবি করছে না।যেখানে জনসংখ্যার গঠনে ৫০% এর বেশি পরিবর্তন ঘটে,সেখানে শরিয়ত শাসনের দাবিও তোলা হয়েছে। তারপর যখন সংখ্যা বাড়বে, তখন বাংলাদেশে হিন্দুদের ওপর যে অত্যাচার হয়েছে, বাঙালি হিন্দুদের ওপর যে নির্যাতন হয়েছে, সেই একই ধরনের অত্যাচার পশ্চিমবঙ্গ ও অসমেও দেখা যাবে।
তাই আমি অনুরোধ করছি—এই নির্বাচন, পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচন যদিও সরাসরি বাংলার, কিন্তু এর প্রভাব পুরো দেশের ওপর পড়বে। প্রথমে পূর্ব ভারত ও উত্তর-পূর্ব ভারতে, তারপর দেশের অন্যান্য অংশেও।
এই নির্বাচনে আমাদের এমনভাবে ভোট দিতে হবে যাতে ভারত-বাংলাদেশ সীমান্ত সুরক্ষিত হয়। কোনো প্রশ্ন ছাড়াই বিএসএফ-কে কাজ করতে দেওয়া হয়, নতুন সরকার এসে জমি দেওয়ার ক্ষেত্রে জিরো টলারেন্স নীতি নেওয়া হয়, অনুপ্রবেশকারীদের পুশব্যাক করা হয়, এবং এমন একটি সরকার গঠন করা হয় যার সাহস আছে এই সমস্যার মোকাবিলা করার। না হলে , অসম ও পশ্চিমবঙ্গ—দুটোরই ভবিষ্যৎ খুব শীঘ্রই বিপদের মুখে পড়বে। আমি এই কথা বলছি পরিসংখ্যানগত অনুমানের ভিত্তিতে—২০১১ সালের জনগণনার তথ্য অনুযায়ী। কিন্তু আমার নিজের অভিজ্ঞতায়, আমি বাংলার বিভিন্ন জায়গায় যেমন মালদা, মুর্শিদাবাদে ঘুরে দেখেছি যে জনসংখ্যার পরিবর্তন স্বভাবিক বৃদ্ধির থেকেও দ্রুত হচ্ছে। গত ১০ বছরে অসমে এটি কিছুটা নিয়ন্ত্রণে এসেছে, কিন্তু বাংলাকে একটি নিরাপদ করিডর হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে।

বাংলার উন্নতি “বিকশিত ভারত”-এর স্বপ্নে বড় অবদান রাখতে পারে, বাংলাকে পিছিয়ে রাখলে আমাদের কোনো লাভ নেই

ভাই ও বোনেরা, আমি আরেকটি বিষয় তুলে ধরতে চাই—এই তুষ্টিকরণ নীতির পাশাপাশি পশ্চিমবঙ্গ, যা একসময় পূর্ব ভারতের অর্থনৈতিক কেন্দ্র ছিল, আজ সেই পরিচয় দ্রুত হারাচ্ছে।এবার যদি আপনি সব অর্থনৈতিক সূচক দেখেন, ওড়িশা ইতিমধ্যেই পশ্চিমবঙ্গকে পিছনে ফেলে দিয়েছে। আমি অহংকার করে বলছি না, কিন্তু যদি এই ধারা চলতে থাকে, তাহলে ২০২৭ সালের মধ্যে অসমের মাথাপিছু আয় পশ্চিমবঙ্গের থেকে বেশি হয়ে যেতে পারে। এই বছরই ওড়িশা পশ্চিমবঙ্গকে ছাড়িয়ে গেছে, এবং একইভাবে চলতে থাকলে আগামী দু-এক বছরের মধ্যে অসমও পশ্চিমবঙ্গকে ছাড়িয়ে যাবে। বর্তমানে ব্যবধান প্রায় ১২,০০০ টাকার মতো। অসম যেখানে বছরে ১৫–১৬% হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে, সেখানে পশ্চিমবঙ্গের বৃদ্ধি প্রায় ৯%।
অসমের মতো একটি উন্নত রাজ্যে প্রতিটি জেলায় একটি করে মেডিকেল কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় এবং ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ রয়েছে। কিন্তু আমি যখন বাংলার গ্রাম ঘুরেছি, সেখানে অনেক জায়গায় দারিদ্র্যের চিত্র দেখেছি।
অসমের গ্রামে গেলে এই ধরনের দারিদ্র্য তেমন দেখা যায় না। বাংলার জিডিপি মূলত কিছু নির্দিষ্ট শহরকেন্দ্রিক, উন্নয়নের ওপরে দাঁড়িয়ে আছে। আগে সিপিএম এই প্রবণতা বাড়িয়েছিল, এখন তৃণমূলও তা বাড়িয়েছে—এমন অভিযোগ রয়েছে, যেখানে ১,০০০ বা ১,৬০০ টাকার লক্ষ্মীর ভান্ডার প্রকল্পকেই বড় আশীর্বাদ বলে মনে করা হয়। সমাজকে এইভাবে গড়ে তোলা হয়েছে।
আসামের পরিসংখ্যান দেখলেই বুঝতে পারবেন — ২০১৬ সালে যখন অসমে বিজেপি সরকার আসে, তখন জিডিপি ছিল প্রায় ২ লাখ কোটি টাকা। এখন ২০২৬-২৭ সালে তা প্রায় ৯ লাখ কোটি টাকার কাছাকাছি পৌঁছেছে।
অন্যদিকে পশ্চিমবঙ্গ পিছিয়ে পড়ছে।
ঐতিহাসিকভাবে পশ্চিমবঙ্গ পূর্ব ভারতের একটি বড় অর্থনৈতিক শক্তি ছিল। কিন্তু বর্তমান সরকারের সময়ে প্রথমে ওড়িশা এবং পরে অসমও তাকে ছাড়িয়ে যাচ্ছে। আরও দুই বছর এই ধারা চললে অসমও পশ্চিমবঙ্গকে পিছনে ফেলে দেবে—কারণ ব্যবধান দ্রুত কমছে। কিন্তু আমরা তা চাই না।
শুরু থেকেই আমরা জানতাম যে পশ্চিমবঙ্গ একটি বিশাল রাজ্য, এর অনেক বড় সম্ভাবনা রয়েছে। এবং বাংলার উন্নতি “বিকশিত ভারত”-এর স্বপ্নে বড় অবদান রাখতে পারে। বাংলাকে পিছিয়ে রাখলে আমাদের কোনো লাভ নেই।
বাংলা যত এগোবে, তার প্রভাব অসমেও পড়বে, ওড়িশাতেও পড়বে। আমরা চাই বাংলা এগিয়ে যাক, বাংলা পিছিয়ে থাকলে, সমগ্র পূর্ব ও উত্তরপূর্ব ভারতে তার নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। বাংলার ভবিষ্যতের সঙ্গে আমাদের ভবিষ্যতও জড়িত।
তাই এই নির্বাচনে আমি বাংলার মানুষদের কাছে আবেদন করব—আপনারা দেখুন, দিদি অন্যায় করছেন, বাংলার মানুষের প্রতি বড় অন্যায় হচ্ছে। তাই আমাদের একবার বিজেপিকে সুযোগ দিতে হবে।

অর্থনীতিতে দুর্নীতির প্রভাব

শেষে আমি একটি ব্যক্তিগত অভিযোগ বা বিষয় তুলে ধরতে চাই। যখন অসম ও বাংলার মধ্যে ট্রাক চলাচল করে—অসম থেকে ট্রাক বাংলায় আসে, আবার বাংলা থেকে অসমে যায়—তখন ট্রাক চালকদের সঙ্গে কথা বললে তারা বলে, দাম কেন বাড়ছে? তারা বলে, শিলিগুড়িতে আমাদের একটি “অভিষেক ট্যাক্স” দিতে হয়, প্রতি ট্রাক থেকে। এই “অভিষেক ট্যাক্স” কী, তা অনেকেই জানে না। কিন্তু যারা অসমে যায়, সেই সব ট্রাক চালকদের অভিজ্ঞতা—যাওয়ার সময়ও দিতে হয়, ফেরার সময়ও দিতে হয়। আমি একবার দিদির সঙ্গে এই বিষয়ে কথা বলার চেষ্টা করেছিলাম—দিদি, এটা কেমন ট্যাক্স? কিন্তু বিষয়টি সংবেদনশীল হয়ে যেতে পারে ভেবে আর কথা বাড়াইনি। তবে এবার বাংলায় আসার আরেকটি কারণ ছিল—এই “অভিষেক ট্যাক্স” আসলে কী, তা বোঝা। কারণ প্রতি ট্রাক মালিকের কাছ থেকে হাজার হাজার টাকা নেওয়া হচ্ছে—যাওয়ার সময়ও, আসার সময়ও।আগে শুধু কয়লার ক্ষেত্রে নেওয়া হত, এখন নাকি সব ট্রাকের ক্ষেত্রেই নেওয়া হচ্ছে—এমন অভিযোগ রয়েছে। তাই বিষয়টি প্রকাশ্যে আনা দরকার ছিল। আমার মনে হয়, নির্বাচনের পর দিদি নিজেই এই ট্যাক্স তুলে দেবেন। এতে শুধু অসম নয়, সারা ভারতেই পণ্যের দাম কিছুটা কমতে পারে।

Exit mobile version