নিজস্ব চিত্র
শুভজিৎ বসু : তারকেশ্বরকে “শৈল তীর্থ” বলা হয়, এখানে ভগবান শিব পাথররূপে স্বয়ম্ভূভাবে বিরাজমান। এখানে পূজিত বাবা তারকনাথের শিবলিঙ্গটি প্রাকৃতিকভাবে শিলা থেকেই উদ্ভূত —এই কারণেই “শৈল” শব্দটি প্রযোজ্য। শৈব ধর্মে ভগবান শিবের সঙ্গে পাহাড়ের গভীর সম্পর্ক রয়েছে, বিশেষ করে কৈলাস পর্বত। তাই শিবের সঙ্গে যুক্ত তীর্থস্থানগুলিকে অনেক সময় “শৈল তীর্থ” বলা হয়।
হুগলির তারকেশ্বর বাংলার এমনি এক পবিত্র শৈল তীর্থ, যেখানে চৈত্র মাস জুড়ে অনুষ্ঠিত হয় শিবের গাজন ও সন্ন্যাস মেলা। এই উৎসব শুধুমাত্র ধর্মীয় নয়, এটি বাংলার এক প্রাচীন ও ঐতিহ্যবাহী ধর্মীয়-লোকউৎসব, যা ভক্তি, তপস্যা ও গ্রামীণ সংস্কৃতির এক অনন্য সংমিশ্রণ।
পৌরাণিক পটভূমি
পৌরাণিক কাহিনী অনুসারে, সতী দেবী পিতা দক্ষের যজ্ঞে বিনা নিমন্ত্রণে উপস্থিত হন, শিবের যজ্ঞভাগ নিশ্চিত করার উদ্দেশ্যে। সেই যজ্ঞে সকল দেবতার উপস্থিতি থাকলেও দেবাদিদেব মহাদেবকে আমন্ত্রণ জানানো হয়নি। সতীর উপস্থিতিতে মহাদেবকে অপমান করা হলে, পতি নিন্দা সহ্য করতে না পেরে সতী স্বইচ্ছায় দেহত্যাগ করেন।
প্রিয় পত্নীর মৃত্যুসংবাদে মহাদেব তাণ্ডব লীলা শুরু করেন। তাঁকে শান্ত করতে ভগবান নারায়ণ সতীর দেহকে ৫১ খণ্ডে বিভক্ত করেন, যা পরবর্তীকালে ৫১টি সতীপীঠে পরিণত হয়। সতীকে হারিয়ে মহাদেব গভীর তপস্যায় লীন হন।
এদিকে তারকাসুর নামক অসুর দেবতাদের স্বর্গচ্যুত করে অরাজকতা সৃষ্টি করে। ব্রহ্মার বর অনুযায়ী, শুধুমাত্র শিবপুত্রই তারকাসুরকে বধ করতে পারবে। কিন্তু মহাদেব তপস্যায় নিমগ্ন, আর সতী পুনর্জন্ম নিয়েছেন পার্বতী রূপে—যিনি আবার শিবকে স্বামীরূপে লাভের জন্য কঠোর তপস্যা করছেন।
গাজন উৎসবের সূচনা
এই প্রেক্ষাপটে ভক্তরা মহাদেবকে সন্তুষ্ট করার উদ্দেশ্যে কঠোর সন্ন্যাস ও তপস্যার পথ অবলম্বন করেন । সমগ্র সৃষ্টিকে রক্ষা করার জন্য তারা সন্ন্যাস গ্রহণ করে মহাদেবের আরাধনা শুরু করেন। সেই থেকেই চৈত্র মাসে তারকেশ্বরে গাজন উৎসবের প্রচলন।

চৈত্র মাসের প্রথম দিন থেকে প্রস্তুতি শুরু হয়ে সংক্রান্তি পর্যন্ত উৎসব চলে। হাজার হাজার ভক্ত গেরুয়া বসন পরিধান করে, গলায় উত্তরীয় নিয়ে দুধপুকুরে স্নান করে বাবা তারকনাথের মাথায় জল ঢালেন ও শিবের আরাধনা করেন, গ্রামে গ্রামে ঘুরে ভিক্ষা সংগ্রহ করেন, এবং দিনের শেষে আহার করেন। এই কঠোর জীবনযাপন ভক্তিরই এক প্রকাশ। এই সময়ে তারকেশ্বরে রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ভক্তদের ঢল নামে। ঢাক, ডুগডুগি ও “জয় বাবা তারকনাথ” ধ্বনিতে মুখরিত হয়ে ওঠে এলাকা । সাংস্কৃতিক এটি মূলত গ্রামীণ সংস্কৃতির সাথে মিশে থাকা একটি উৎসব, যা বাংলার কৃষি ও লোকজীবনের সাথে গভীরভাবে জড়িত চৈত্র সংক্রান্তির দিন সন্ন্যাসীরা ফল দান এবং অন্যান্য রীতি পালনের মাধ্যমে সন্ন্যাস ব্রত ত্যাগ করেন। এর মধ্য দিয়েই সমাপ্তি ঘটে এক মাসব্যাপী উৎসবের ।
About The Author
Discover more from Jist Feed
Subscribe to get the latest posts sent to your email.
