ধনিয়াখালী, হুগলী: ধনিয়াখালী বিডিও অফিসের সহযোগিতায় এবং স্থানীয় চারটি সংগঠনের যৌথ উদ্যোগে বুধবার সকালে ধনিয়াখালীর চারাবাগান (বোসো) ফুটবল মাঠে অনুষ্ঠিত হল জনকল্যাণমূলক ৫ কিলোমিটার দৌড় প্রতিযোগিতা ‘রান ফর হিউম্যানিটি’। আয়োজক সংগঠনগুলি হল হুগলী এক্স-মিলিটারি ফোরাম (ধনিয়াখালী), ভারত বিকাশ পরিষদ (হুগলী শাখা), লায়ন্স ক্লাব (ধনিয়াখালী) ও বোসো বঙ্গবাসী সংঘ।
দৌড়ের সূচনা ও রুট
সকাল ৬টা ৪৫ নাগাদ চারাবাগান ফুটবল মাঠ থেকে ফ্ল্যাগ অফ করে প্রতিযোগিতার সূচনা করেন জয়েন্ট বিডিও স্বপন হালদার। দৌড়ের পথ ছিল চারাবাগান মাঠ থেকে ধনিয়াখালী হল্ট স্টেশন পর্যন্ত গিয়ে সেখান থেকে ফের মাঠে ফেরা, মোট ৫ কিলোমিটার।
কোন বিভাগে কারা, কী পুরস্কার
পুরুষদের জন্য তিনটি বিভাগ ছিল: ১৫–২৫ বছর, ২৫–৩৫ বছর এবং ৩৫ বছরের ঊর্ধ্বে। মহিলাদের জন্য ছিল ১৫–৩০ বছর বয়সিদের বিভাগ, যেখানে দৌড়ের দূরত্ব ছিল ৩ কিলোমিটার। প্রতিটি বিভাগের প্রথম তিনজনকে বিশেষ পুরস্কার ও সার্টিফিকেট দেওয়া হয়। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে দৌড় শেষ করা সকল প্রতিযোগীর জন্যও ছিল সার্টিফিকেট ও বিশেষ পুরস্কার। সফল প্রতিযোগীদের হাতে তুলে দেওয়া হয় টি-শার্ট, আর অংশগ্রহণকারী সকলের জন্য ছিল টিফিনের ব্যবস্থা।
বিজয়ীদের তালিকা
| বিভাগ | প্রথম | দ্বিতীয় | তৃতীয় |
|---|---|---|---|
| পুরুষ (১৫–২৫ বছর) | সহেত ঘোষ | কৌশিক সাঁতরা | পবন হাজরা |
| পুরুষ (২৫–৩৫ বছর) | শিব শংকর সরেন | আকাশ রায় | শুভজিৎ সাহা |
| পুরুষ (৩৫ বছরের ঊর্ধ্বে) | রূপ নারায়ণ মুখার্জী | বারিন্দ্র নাথ ঘোষ | কৌশিক দাস |
| মহিলা (১৫–৩০ বছর, ৩ কিমি) | বর্ষা মণ্ডল | রিংকি ব্যানার্জী | বৃষ্টি মান্ডি |
১৫–২৫ বছর বিভাগের বিজয়ী মাত্র ১৮ মিনিট ২৫ সেকেন্ডে ৫ কিলোমিটার পথ পেরিয়ে চারাবাগান মাঠের এই প্রতিযোগিতায় নজরকাড়া সময়ের নজির গড়েছেন।
অতিথিদের উপস্থিতি
ব্লক প্রশাসনের পক্ষে প্রধান অতিথি ছিলেন জয়েন্ট বিডিও। ধনিয়াখালী থানার তরফে উপস্থিত ছিলেন এসআই কৌশিকবাবু এবং ধনিয়াখালী গ্রামীণ হাসপাতালের তরফে ডাঃ মাসুদ। বিশেষ অতিথিদের মধ্যে ছিলেন ভারত বিকাশ পরিষদ, হুগলী শাখার সভাপতি সোমা পাল ও সম্পাদক শৈবাল মণ্ডল; হুগলী এক্স-মিলিটারি ফোরাম, ধনিয়াখালীর সভাপতি মহব্বত মল্লিক ও সম্পাদক কুন্তল সাধু; এবং লায়ন্স ক্লাব, ধনিয়াখালীর সোমনাথ চক্রবর্তী ও শুভাশিস মুখার্জি।
হুগলী ছাড়িয়ে বর্ধমান থেকেও প্রতিযোগী
হুগলীর বিভিন্ন প্রান্তের পাশাপাশি প্রতিবেশী বর্ধমান জেলা ও সংলগ্ন এলাকা থেকেও মোট প্রায় ১৪৫ জন এই দৌড়ে নামেন। এর মধ্যে ১৫–২৫ বছর বয়সি পুরুষদের বিভাগেই ছিলেন প্রায় ৯০ জন, যা চোখে পড়ার মতো।
সিনিয়র মোস্ট ও জুনিয়র মোস্ট
৫৮ বছরের বেশি বয়সি প্রবীণ প্রতিযোগী তাপস দত্ত কচিকাঁচাদের সঙ্গে সমান তালে দৌড়ে পথ শেষ করে সকলের প্রশংসা কুড়িয়েছেন। তাঁকে ‘সিনিয়র মোস্ট’ হিসেবে বিশেষ সম্মান জানানো হয়। একইভাবে ‘জুনিয়র মোস্ট’ প্রতিযোগী চয়ন ঘোষকেও সংবর্ধনা দেওয়া হয়।
আগের রাত থেকেই অপেক্ষা
ভোরের দৌড়ে সময়মতো পৌঁছতে দূরের বহু প্রতিযোগী আগের রাতেই ধনিয়াখালীতে চলে আসেন। কেউ রাত কাটান স্টেশন প্ল্যাটফর্মে, কেউ মাঠের আশপাশে। পরদিন সকালে সেখান থেকেই তাঁরা দৌড়ে অংশ নেন। তাঁদের এই উৎসাহ ও খেলাধুলার প্রতি ভালবাসা অনুষ্ঠানের অন্যতম আকর্ষণ হয়ে ওঠে।
সুশৃঙ্খল আয়োজন
পুলিশ প্রশাসন, স্থানীয় বাসিন্দা, বোসো বঙ্গবাসী ক্লাব, চারাবাগান মনসা ক্লাবের সদস্য এবং ব্লক প্রশাসনের সহযোগিতায় গোটা অনুষ্ঠান সুষ্ঠু ও শৃঙ্খলার সঙ্গে সম্পন্ন হয়। যৌথ ম্যারাথন কমিটির পক্ষে কৌশিক সরকার, দেবাশীষ রায়, কুন্তল সাধু, জ্যোতি চক্রবর্তী ও আবু জাফর সক্রিয় ভূমিকা নিয়ে পুরো আয়োজন সামলান।
আয়োজকদের বার্তা
আয়োজকরা জানিয়েছেন, ‘রান ফর হিউম্যানিটি’ শুধু একটি দৌড় প্রতিযোগিতা নয়। যুবসমাজকে সুস্থ জীবনযাপন, খেলাধুলা, শৃঙ্খলা, মানবিকতা এবং সমাজের প্রতি দায়বদ্ধতার বার্তা দেওয়াই এই উদ্যোগের মূল লক্ষ্য। এলাকায় এই মিনি ম্যারাথনকে ঘিরে ব্যাপক উৎসাহ দেখা গিয়েছে। বিশেষ করে তরুণ-তরুণী ও কিশোর-কিশোরীদের মধ্যে খেলাধুলা নিয়ে নতুন আগ্রহ তৈরি হয়েছে বলে জানান আয়োজকরা।
অনুষ্ঠান শেষে সকল প্রতিযোগী, অতিথি, প্রশাসন, পুলিশ, চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মী, স্বেচ্ছাসেবক, ক্লাব সদস্য, সংবাদমাধ্যম এবং স্থানীয় বাসিন্দাদের আন্তরিক সহযোগিতার জন্য ধন্যবাদ জানান আয়োজকরা।
এক নজরে: ‘রান ফর হিউম্যানিটি’ ২০২৬
| বিষয় | তথ্য |
|---|---|
| তারিখ ও সময় | ৭ অক্টোবর (বুধবার), সকাল ৬টা ৪৫ |
| স্থান | চারাবাগান (বোসো) ফুটবল মাঠ, ধনিয়াখালী |
| রুট | চারাবাগান মাঠ → ধনিয়াখালী হল্ট স্টেশন → চারাবাগান মাঠ |
| দূরত্ব | পুরুষ ৫ কিমি; মহিলা ৩ কিমি |
| মোট প্রতিযোগী | প্রায় ১৪৫ জন |
| সবচেয়ে বড় বিভাগ | পুরুষ ১৫–২৫ বছর (প্রায় ৯০ জন) |
| দ্রুততম সময় | ১৮ মিনিট ২৫ সেকেন্ড (পুরুষ ১৫–২৫ বছর বিভাগের বিজয়ী) |
| সিনিয়র মোস্ট | তাপস দত্ত (৫৮ বছরের ঊর্ধ্বে) |
| জুনিয়র মোস্ট | চয়ন ঘোষ |
বিশ্লেষণ: গ্রামীণ এলাকায় কমিউনিটি দৌড়ের গুরুত্ব
অংশগ্রহণের ধরন। ১৪৫ জনের মধ্যে প্রায় ৯০ জন, অর্থাৎ ছয় ভাগের মোটামুটি পাঁচ ভাগের কাছাকাছি, ছিলেন ১৫–২৫ বছরের পুরুষ। ধনিয়াখালীর মতো ব্লক-স্তরের আয়োজনে কিশোর ও তরুণদের এই ভিড় ইঙ্গিত দেয়, স্থানীয় স্তরে খেলার সুযোগ ও মঞ্চের চাহিদা রয়েছে। বিপরীতে মহিলাদের জন্য একটিমাত্র বিভাগ রাখা হয়েছিল এবং তাঁদের দূরত্বও ছিল কম। ভবিষ্যতের আয়োজনে মহিলাদের জন্য আরও বিভাগ ও সমান দূরত্বের সুযোগ রাখা গেলে অংশগ্রহণের পরিসর বাড়তে পারে।
প্রশাসন ও সংগঠনের মেলবন্ধন। ব্লক প্রশাসন, থানা, গ্রামীণ হাসপাতাল এবং চারটি সংগঠনের একসঙ্গে কাজ করাই এই আয়োজনের সাফল্যের ভিত্তি। রুটে নিরাপত্তা ও চিকিৎসা-সহায়তার উপস্থিতি এমন প্রতিযোগিতায় বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ, বিশেষ করে যেখানে সব বয়সের মানুষ নামেন।
কোন সময়কে ভাল ধরা হয়। ৫ কিলোমিটারে ১৮ মিনিট ২৫ সেকেন্ড মানে গড়ে প্রতি কিলোমিটারে প্রায় ৩ মিনিট ৪১ সেকেন্ড, যা শখের দৌড়বিদদের মধ্যে যথেষ্ট দ্রুত গতি। তবে এই সময়ের সঙ্গে রুটের মাপ ও পথের ধরন যাচাই করে নেওয়া ভাল, কারণ আয়োজকরা পেশাদার সময়-পরিমাপ ব্যবস্থা ব্যবহার করেছিলেন কি না, প্রাপ্ত তথ্যে তার উল্লেখ নেই।
সমাজে বার্তা। আয়োজকদের ঘোষিত লক্ষ্য, অর্থাৎ যুবসমাজকে সুস্থ জীবন ও দায়বদ্ধতার পথে আনা, এমন কমিউনিটি দৌড়ের মূল শক্তি। স্টেশন বা মাঠে রাত কাটিয়ে দৌড়ে নামার ঘটনা দেখায়, উপযুক্ত মঞ্চ পেলে গ্রামীণ প্রতিভা ও উৎসাহ কতটা সাড়া দেয়।

