আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জ সুন্দর, পরিষ্কার সমুদ্রতট, প্রবাল প্রাচীর এবং বিরল সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্যের জন্য বিখ্যাত। কিন্তু সম্প্রতি একটি উদ্বেগজনক সমস্যা দেখা যাচ্ছে। বিভিন্ন দ্বীপের তীরে বিপুল পরিমাণ বিদেশি প্লাস্টিক বর্জ্য ভেসে আসছে, যা এই সুন্দর সৈকতগুলোকে দূষিত করছে।
অনেক ভারতীয় সোশ্যাল মিডিয়া ইনফ্লুয়েন্সার এবং পরিবেশকর্মী ভিডিও ও রিপোর্টের মাধ্যমে এই সমস্যার কথা তুলে ধরেছেন। তবুও, এখনও প্রচুর পরিমাণে প্লাস্টিক বর্জ্য তীরে ভেসে আসছে, যা সমস্যার গভীরতা ও সমাধানের জরুরিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছে।
সম্প্রতি “Explorer Shibaji” নামে এক ইউটিউব চ্যানেলএ লিটল আন্দামানের সৈকতে প্লাস্টিক বোতল, প্যাকেট, মাছ ধরার জাল এবং গৃহস্থালির বর্জ্য দেখা গেছে। এগুলোর অনেকগুলিতে মিয়ানমার, থাইল্যান্ড এবং মালয়েশিয়ার লেবেল ছিল। এর অর্থ, এই বর্জ্য অন্য দেশ থেকে এসে ভারতের উপকূলে জমা হচ্ছে।
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হল, এই দূষণ শুধু শহরের সৈকতেই সীমাবদ্ধ নয়। বরং দূরবর্তী ও সংবেদনশীল দ্বীপগুলো, যেখানে বিরল প্রাণী ও প্রবাল বাস করে, সেগুলোই বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
সমুদ্র স্রোতের ভূমিকা
বঙ্গোপসাগরের শক্তিশালী স্রোত এই সমস্যার বড় কারণ। এই স্রোতগুলো যেন বিশাল কনভেয়ার বেল্টের মতো কাজ করে, যা দূরের দেশ থেকে প্লাস্টিক এনে আন্দামানে পৌঁছে দেয়।
প্রতিবছর বিশ্বজুড়ে প্রায় ১১ মিলিয়ন টন প্লাস্টিক সমুদ্রে যায়। এর বড় অংশ আসে এমন অঞ্চল থেকে যেখানে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা দুর্বল। বঙ্গোপসাগর এই প্লাস্টিক জমার একটি বড় এলাকা।
জাহাজ চলাচল ও বর্জ্য ফেলা
আন্দামানের কাছেই মালাক্কা প্রণালী, যা বিশ্বের অন্যতম ব্যস্ত সামুদ্রিক পথ। প্রতি বছর এখানে এক লক্ষেরও বেশি জাহাজ চলাচল করে।
অনেক সময় এই জাহাজ থেকে অবৈধভাবে প্লাস্টিক ও অন্যান্য বর্জ্য সমুদ্রে ফেলা হয়। এগুলো স্রোতের মাধ্যমে ভেসে এসে আন্দামানের তীরে জমা হয়। যদিও আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী এটি নিষিদ্ধ, কিন্তু সব জায়গায় সঠিকভাবে নিয়ন্ত্রণ হয় না।
মূলত দুই উৎস থেকে বর্জ্য আসছে:
১. দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলির স্থলভাগের বর্জ্য
২. জাহাজ থেকে সরাসরি ফেলা বর্জ্য
দুর্বল বর্জ্য ব্যবস্থাপনা
দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অনেক অঞ্চলে দ্রুত নগরায়নের ফলে প্লাস্টিক বর্জ্য বেড়েছে, কিন্তু সঠিক ব্যবস্থাপনা নেই। মেকং নদীর মতো বড় নদীগুলি প্রচুর প্লাস্টিক সমুদ্রে নিয়ে যায়। পরে সেগুলো স্রোতের মাধ্যমে আন্দামানে পৌঁছে যায়।
সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্যের ওপর প্রভাব
প্লাস্টিক দূষণ আন্দামানের পরিবেশের জন্য খুবই ক্ষতিকর। প্রবাল প্রাচীরের ওপর প্লাস্টিক জমে সূর্যের আলো ও অক্সিজেনের প্রবাহ কমিয়ে দেয়, ফলে প্রবাল নষ্ট হয়ে যায়।
ডুগং ও লেদারব্যাক কচ্ছপের মতো প্রাণীরা প্লাস্টিককে খাবার ভেবে খেয়ে ফেলে, যা তাদের মৃত্যুর কারণ হতে পারে। ফেলে দেওয়া জাল (ghost nets) অনেক মাছ ও সামুদ্রিক প্রাণীকে ফাঁদে ফেলে মেরে ফেলে।
মাইক্রোপ্লাস্টিক ও খাদ্য শৃঙ্খল
প্লাস্টিক ভেঙে ছোট ছোট মাইক্রোপ্লাস্টিকে পরিণত হয়। এগুলো মাছ ও সামুদ্রিক প্রাণীর শরীরে ঢুকে খাদ্য শৃঙ্খলের মাধ্যমে মানুষের শরীরেও পৌঁছায়। এটি মানুষের স্বাস্থ্যের জন্যও বিপজ্জনক।
অর্থনৈতিক ক্ষতি
আন্দামানের অর্থনীতি অনেকটাই পর্যটন ও মাছ ধরার ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু প্লাস্টিক দূষণের কারণে সৈকতের সৌন্দর্য নষ্ট হচ্ছে, পর্যটক কমছে এবং জেলেরা ক্ষতির মুখে পড়ছে।
পরিষ্কার অভিযান যথেষ্ট নয়
স্থানীয় প্রশাসন ও সংগঠনগুলো নিয়মিত পরিষ্কার অভিযান চালালেও এটি স্থায়ী সমাধান নয়। কারণ প্রতিনিয়ত নতুন বর্জ্য এসে জমা হচ্ছে।
আন্তর্জাতিক স্তরে উদ্যোগের প্রয়োজন
এই সমস্যা শুধুমাত্র পরিবেশগত নয়, এটি আন্তর্জাতিক সমস্যা। তাই ভারতকে জাতিসংঘ, আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক সংস্থা ইত্যাদি মঞ্চে এই বিষয়টি তুলতে হবে।
দোষী উৎস চিহ্নিত করতে বৈজ্ঞানিক গবেষণা ও নজরদারি বাড়ানো জরুরি।
জাতীয় অগ্রাধিকার হিসেবে দেখা দরকার
আন্দামান দ্বীপপুঞ্জ পরিবেশগত ও কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ। তাই এর সুরক্ষা জাতীয় অগ্রাধিকার হওয়া উচিত।
প্লাস্টিক দূষণ সীমান্ত মানে না। তাই এই সমস্যার সমাধানে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা খুবই জরুরি।

