Site icon Jist Feed

কারচুপির সমস্ত রাস্তা বন্ধ করছে কমিশন ; শেষে স্ট্রংরুমে মুখ্যমন্ত্রীর ‘অবস্থান’, জেলায় জেলায় অশান্তির বার্তা পৌঁছনোর চেষ্টা ? — শান্তি বজায় রাখতে কড়া সতর্কতা

Strong Room Tension

যে তাসগুলো ফেলে এতদিন নির্বাচন জিতেছে, সেগুলো এবারে আর কাজ করলো না। এগারো নির্বাচনে ছিল নো ভোট ফর সিপিএম, বিকল্প হিসাবে তৃণমূল জয়ী হয়। এটা শুধু মমতার জয় ছিল না। এটা সকলের জয় ছিল। কিন্তু মমতা ছিল কেন্দ্রবিন্দুতে । তারপর থেকে যতগুলো ভোট হয়েছে, পঞ্চায়েত, মিউনিসিপ্যালিটি, লোকসভা বা বিধানসভা, একটা ভোটও পশ্চিমবঙ্গে ওই আগের সিপিএম কায়দায় যেভাবে হতো, তার বাইরে হয়নি। সিপিএমের ছিল ‘সায়েন্টিফিক রিগিং’, এদের হল ‘মডেল’। নির্বাচন ব্যবস্থা কে পঙ্গু করে যতরকম ভাবে চুরি করা যায় তার ব্যবহার করে ভোটে জেতা।এবার সেটা হয় নি।
বিগত কয়েকটি নির্বাচন কে আপাদমস্তক নিরীক্ষণ করে, এবারের প্রতিরোধ ব্যবস্থা তৈরি করেছে নির্বাচন কমিশন। এক শ্রেণীর দুর্নীতিগ্রস্থ আধিকারিকের সঙ্গে আঁতাতে নির্বাচন ব্যবস্থা কে এতদিন কার্যত প্রহসনে পরিণত করা হয়েছিল। দুর্নীতির একটা পরাম্পরা তৈরি হয়ে গিয়েছিল। যেখানে মানুষের জনমতের প্রতিফলন ভোটের ফলাফলে দেখা যেতনা। মানুষের বিশ্বাস আস্থা ভরসা তলানিতে এসে ঠেকেছিল।

প্রথম পদক্ষেপেই সন্দেহভাজন অফিসারদের অপসারণ করে নির্বাচন কমিশন। যারা এতদিন কমিশনের অন্দরের খবর পৌঁছে দিত শাসক দলের কাছে। নির্বাচন কমিশনে করা জনগণের বা বিরোধীদের অভিযোগকে ঠান্ডা ঘরে পাঠিয়ে দিত। কোনো পদক্ষেপে নেওয়া হতনা, চোখ বুজে থাকতো নির্বাচন কমিশন। এক্সিট পোলএর হিসাব নিকাশ ও ফেল করে যেত, গণনা কেন্দ্রের কারচুপির কাছে। সারা দেশের মিডিয়া, রাজনৈতিক দল এমন কি জাতীয় নিবর্বাচন কমিশনের কাছেও হয়তো এই ব্যাপক পর্যায়ের কারচুপির কোনো ধারণা ছিল না।
কিন্তু ২০২১ সালের ভোটের ব্যাপক হিংসা সারা দেশের চোখ খুলে দেয়। পশ্চিমবঙ্গের ব্যাপারে চর্চা শুরু হয়। জাতীয় নির্বাচন কমিশনও সজাগ হয়। সারাদেশের মধ্যে পশ্চিমবঙ্গই একমাত্র রাজ্য, যেখানে ভোটের জন্যে হিংসা অবশিষ্ট থাকে। কারচুপির দৃষ্টান্তে পরিণত হয় পশ্চিমবাংলা ; নির্বাচন প্রক্রিয়ার এমন কোনো পর্যায় নেই যেখানে কারচুপি করা হয় না। ভোটার লিস্ট এ ভুয়ো নাম ঢোকানো, বিরোধী সমর্থকদের নাম ভুল করে দেওয়া। এবারে SIR এর কারণে এখানে কারচুপির রাস্তা বন্ধ।
বিরোধীদের প্রচারে বাধা দেওয়া, একশ্রেণীর দলদাস পুলিশকে দিয়ে বিরোধীদের ওপর অত্যাচার করা। এলাকা দখল দেওয়াল দখল, বিরোধী দের পোস্টার ব্যানার ছিঁড়ে দেওয়া, বাড়ি বাড়ি গিয়ে ভোটেরদের ওপর চাপ সৃষ্টি করা এসব যথারীতি চালিয়ে গেলেও সাধারণ মানুষ এতে কোনো পাত্তা দেয়নি।
নির্বাচনের দিন ঘোষণার দিন থেকে একেবারে শেষ পর্যন্ত প্রশাসনের সর্বচ্চ স্তর থেকে থানার আইসি, বিডিও, এসডিও লেভেল পর্যন্ত দলদাস দের ব্যাপক বদল করে একটা মাস্টারস্ট্রোক দেওয়া হয়। দীর্ঘদিন ধরে এই সব অফিসারদের গতিবিধি নজরে রাখে কমিশন, তারপর সঠিক সময় অপসারণ করে। বাংলা মিডিয়ার একাংশ বার বার বলে এসেছে, ‘পুলিশ যদি সঙ্গে না থাকে তাহলে তৃণমূল কংগ্রেসের সংগঠনের কিছুমাত্র অবশিষ্ট থাকবে না’।আমরা দেখেছি থানা থেকে আইসি ঠিক করে দেয় তৃণমূলের টিকিট টা কে পাবে। বিরোধীদের সরাসরি হুমকি,গাঞ্জা কেস দেওয়া , প্রার্থী পদ প্রত্যাহারের জন্যে ভয়দেখানো ইত্যাদি একশ্রেণীর পুলিশকে করতে। এই শ্রেণীটাকে অপসারিত করে তৃণমূলএর দুর্নীতির ইকোসিস্টেম নষ্ট করে দেওয়া হয়।
নির্বাচন ও বুথ ম্যানেজমেন্ট এ অভাবনীয় সংস্কার ও প্রযুক্তির ব্যবহার, অভাবনীয় সাফল্য এনে দেয়। অতীতে সিসি ক্যামেরা ব্যবহার করলেও পরবর্তীকালে কোর্ট এর তদন্তের সময় ফুটেজে ঠিক মতো পাওয়া যায়নি, ক্যামেরা ভেঙে দেওয়া হয়, ফোকাস উল্টোদিকে ঘুরিয়ে দেওয়া হয়। এবারে কমিশন অভূতপূর্ব ভাবে কন্ট্রোল রুম থেকে লাইভ মনিটরিং এর ব্যবস্থা করে। রেকর্ডিং পাঁচ মিনিটের জন্যে বন্ধ হলে পুনর্নির্বাচনের সতর্কতা দেওয়া হয় । ২৫০০ এর কাছাকাছি ক্রিমিনালকে আটক করা হয় শুধুমাত্র দ্বিতীয় দফার নির্বাচনের আগে। সর্বোপরি আইপ্যাকের মতো দুর্নীতিগ্রস্থ সংস্থার বিরুদ্ধে পদক্ষেপে নেওয়া হয়। জম্মুকাশ্মীর থেকে সাঁজোয়া গাড়ি এনে চরম সুরক্ষা বলয়ের প্রস্তুতি নেওয়া হয়। ভোটের দিন কমিশনে আসা সমস্ত অভিযোগ খতিয়ে দেখে দ্রুত অবস্থা নেওয়া হয়। CAPF এর DG নিজে মাঠে নেমে বাহিনী পরিচালনা করেন। ভোটারদের মধ্যে আস্থা ফিরে আসে, দলে দলে মানুষ বেরিয়ে আসে ভোট দিতে। প্রবাসী বাঙালিরা দলে দলে ফিরে আসে পালাবদলের ভোট দিতে। প্রতিটা কেন্দ্রে গড়ে ১০০০০ বেশি ভোট পড়ে। ফলে মমতার কাছে ভোটের দিনে কারচুপির রাস্তা বন্ধ হয়।

বাকি রইলো গণনা। ভোট শান্তিপূর্ণ ভাবে শেষ হলেও উদ্বেগ কাটেনি। রাজনৈতিক মহলের একাংশের মতে, খুব সহজে গণনা প্রক্রিয়া সম্পন্ন হবে—এমনটা ধরে নেওয়ার কোনো কারণ নেই। বিশেষ করে তৃণমূল কংগ্রেস কীভাবে আচরণ করবে, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে। ২০২১ সালের জনগণের রায়কে গণনা কেন্দ্রে কারচুপি করে কিভাবে উল্টে দেওয়া হয়েছিল তা সরকারি কর্মচারীদেরই এক অংশ বেক্তিগত পরিসরে প্রকাশ করে। সর্বস্তরে দুর্নীতি কে আশ্রয় করে মমতা আরো পাঁচ বছর টিকে থাকে। যেখানে বিরোধীদল কারচুপির বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছিল ছিল সেখানে তারা জয়লাভ করে। মুখ্যমন্ত্রী নিজে হেরে যায় নন্দীগ্রামে।
নির্বাচন কমিশন অবশ্য পরিস্থিতির গুরুত্ব বুঝে আগাম প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছে বলে জানা যাচ্ছে। যদিও ঠিক কী ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে, তা এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হয়নি। কেন্দ্রীয় সরকারি কর্মীরা গণনায় তদারকি করবেন কি না, সেই বিষয়েও আইনি জটিলতা তৈরি হয়েছে।
তবে পর্যবেক্ষকদের মতে, কেন্দ্রীয় কর্মীরা থাকুন বা না থাকুন, ভোটের দিনে রাজ্য সরকারি কর্মীরা যে শৃঙ্খলা ও দায়িত্বশীলতা দেখিয়েছেন, গণনার দিনও যদি একই ধারা বজায় থাকে, তাহলে বড় ধরনের বিশৃঙ্খলার আশঙ্কা কমে যেতে পারে।
একজন বিশ্লেষকের কথায়, “বর্তমান পরিস্থিতিতে কেউ সহজে নিয়ম ভাঙার সাহস পাবে না। সেটা ভয় থেকেই হোক বা দায়িত্ববোধ থেকেই হোক—শৃঙ্খলা বজায় থাকার সম্ভাবনাই বেশি।”
সরকারি কর্মচারীদের মনোভাবও এই ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পারে। তাদের অনেকেই মনে করছেন, কঠোর নজরদারি যেমন আছে, তেমনই নিজেদের ভবিষ্যৎ ও পরিবারের নিরাপত্তার বিষয়টিও তাদের আচরণে প্রভাব ফেলছে।
বিশেষ করে একটি সামাজিক বাস্তবতা সামনে আসছে—রাজ্যের বহু পরিবারের সন্তানই কর্মসংস্থানের জন্য বাইরে চলে যাচ্ছেন। এই অভিজ্ঞতা সরকারি কর্মচারীদের মধ্যেও সাধারণ। ফলে স্থিতিশীলতা ও স্বচ্ছতার প্রতি তাদের আগ্রহ বাড়ছে বলেই মনে করা হচ্ছে।
এর মধ্যেই আবার রাজনৈতিক মহলে জল্পনা বাড়ছে যে, কিছু ক্ষেত্রে শেষ মুহূর্তে পরিস্থিতি প্রভাবিত করার চেষ্টা হতে পারে। যদিও এই নিয়ে প্রকাশ্যে কেউ কিছু বলছেন না, কিন্তু নীরবে নানা কৌশল নিয়ে ভাবনা চলছে বলেই সূত্রের দাবি।
তবে সাধারণ মানুষের একাংশের মধ্যে নির্বাচন কমিশনের প্রতি আস্থা বেড়েছে। অনেকেই মনে করছেন, সম্ভাব্য সব পরিস্থিতির কথা মাথায় রেখে কমিশন ইতিমধ্যেই প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছে। কোথায় কীভাবে হস্তক্ষেপ করতে হবে, তার পরিকল্পনাও তৈরি।
একজন পর্যবেক্ষক জানান, “গণনার আগে পুরো চিত্র পরিষ্কার না হলেও, কমিশন যে প্রস্তুত—সেটা স্পষ্ট। পরিস্থিতি অনুযায়ী তারা পদক্ষেপ নেবে।” তাই এক্সিটপোল এর হিসাব একেবারে পাল্টে যাওয়ার সম্ভাবনা এবারে কম।

সতর্ক থাকার বার্তা
তবুও উদ্বেগ পুরোপুরি কাটেনি। মুখ্যমন্ত্রী নিজে স্ট্রংরুমের সামনে নিজে অবস্থান করে, নিজের কর্মীদের কাছে প্ররোচনা দিতে চাইছেন। অশান্তির বার্তা জেলায় জেলায় ছড়িয়ে দিতে চাইছেন।
তাই বিশ্লেষকদের মতে, এখনও বাংলার আকাশে অনিশ্চয়তার ছায়া রয়েছে। শুধু গণনার দিন নয়, তার পরবর্তী সময় নিয়েও সতর্ক থাকার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।

সব মিলিয়ে, গণনা ঘিরে একদিকে যেমন প্রস্তুতি, তেমনি অন্যদিকে শঙ্কাও রয়ে গেছে। আগামী কয়েকদিনেই পরিষ্কার হবে পরিস্থিতি কোন দিকে এগোয়। তবে এই মুহূর্তে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ—সতর্কতা এবং শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বজায় রাখা।

Exit mobile version