Site icon Jist Feed

কেন “একশত আট” সংখ্যা ভারতীয়দের কাছে এত পবিত্র ?

Importance of number 108

ভারতীয় আধ্যাত্মিক দর্শন, ধর্মীয় আচার এবং প্রাচীন জ্ঞানচর্চার ইতিহাসে কিছু সংখ্যা কেবল গণনার উপকরণ নয়, বরং গভীর প্রতীকী তাৎপর্যের বাহক। সেইসব সংখ্যার মধ্যে ১০৮ বা একশত আট বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। বৈদিক সাহিত্য, উপনিষদ, জ্যোতিষশাস্ত্র, তন্ত্র, যোগ, আয়ুর্বেদ, নাট্যশাস্ত্র থেকে শুরু করে দৈনন্দিন উপাসনা-পদ্ধতি সর্বত্র এই সংখ্যার পুনরাবৃত্তি কৌতূহলের জন্ম দেয়। কেন এই সংখ্যা এত পবিত্র বলে বিবেচিত ? এর পেছনে কি কেবল ধর্মীয় বিশ্বাস, নাকি রয়েছে জ্যোতির্বিজ্ঞান, দর্শন এবং প্রতীকতত্ত্বেরও এক সুদীর্ঘ ঐতিহ্য ? ভারতীয় মনীষীদের উপলব্ধি, শাস্ত্রীয় ব্যাখ্যা এবং সাংস্কৃতিক অনুশীলনের আলোকে ‘একশত আট’ সংখ্যার বহুমাত্রিক তাৎপর্য নিয়েই এই আলোচনা।

“একং সদ্বিপ্রা বহুধা বদন্তি।”
সত্য এক। পণ্ডিতগণ তাকে বিভিন্ন বলেন।

ভারতীয় জ্ঞান-বিজ্ঞান, ধর্ম-দর্শন, শিল্পকলা, সাহিত্য-সংস্কৃতি – সবই এই মহামন্ত্রের প্রতিধ্বনিমাত্র। পরম সত্য হল এই যে, বিশ্বজগৎ ঈশ্বর থেকে সৃষ্ট, ঈশ্বরে স্থিত এবং ঈশ্বরেই লয়প্রাপ্ত হয়ে থাকে।

সমগ্র বিশ্ব অর্থাৎ স্বর্গ-মর্ত্য-পাতাল, নীহারিকা, গ্রহ-নক্ষত্র, জীবজগৎ সেই দিব্যবিধি থেকেই সঞ্জাত, তাতেই অবস্থিত এবং তাতেই লীন হয়ে যায়। তার একটি বিশেষ ছন্দ ও বিশেষ শৃঙ্খলা আছে। এই মহাবিশ্ব সেই ছন্দের তালে বন্দী; সেই শৃঙ্খলায় আবদ্ধ। প্রাচীন ভারতীয় ঋষি-মুনিরা এই তত্ত্বটি উপলব্ধি করেছিলেন এবং ১০৮ সংখ্যার দ্বারা তাকে প্রতীকায়িত করেছিলেন। নিগূঢ় অর্থবহ, রহস্যময় এই ১০৮ সংখ্যাটি ভারতীয়দের কাছে এতই পবিত্র যে, সমস্ত আধ্যাত্মিক কর্মে সংখ্যাটি অতিশয় গুরুত্ব লাভ করে। যেমন –

(ক) আমাদের জপমালায় ১০৮টি গুটি থাকে।
(খ) আমরা কমপক্ষে ১০৮ বার ইষ্টমন্ত্র জপ করি।
(গ) আমাদের অধিকাংশ দেবদেবীর ১০৮টি নাম আছে।
(ঘ) আমরা দেবতাকে ১০৮টি পুষ্প দিয়ে পূজা করি।

জপমালায় ১০৮টি গুটির ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে, জীবাত্মা ১০৮ পদক্ষেপ ফেলে পরমাত্মায় মিলিত হয়। অর্থাৎ জীবাত্মা ও পরমাত্মার মধ্যে ১০৮টি ছেদবিন্দু রয়েছে। সকল ভারতীয় হিন্দু, বৌদ্ধ, জৈন, শিখ, তাওবাদী বিশ্বাস করেন যে, ১০৮ সংখ্যাটি ঈশ্বর ও বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের মধ্যে ঐক্য রক্ষায় যথেষ্ট সাহায্য করে।

জ্যোতির্বিদ্যায় বৈদিক ঋষিরা গণনা করে দেখেছেন যে –

(ক) পৃথিবী ও চন্দ্রের মধ্যে দূরত্ব হলো চন্দ্রের ব্যাসের ১০৮ গুণ।
(খ) পৃথিবী ও সূর্যের মধ্যে দূরত্ব হলো সূর্যের ব্যাসের ১০৮ গুণ।
(গ) সূর্যের ব্যাস পৃথিবীর ব্যাসের ১০৮ গুণ।

আয়ুর্বেদ মতে, আমাদের দেহে ১০৮টি ‘মর্ম’ স্থান আছে যেখানে আত্মা ও দেহের ছেদবিন্দু থাকায় জীবদেহে চৈতন্যের সঞ্চার হয়। আয়ুর্বেদ মতে, ১০৮টি মর্মস্থানের শৃঙ্খল হলো আমাদের এই দেহ, যেটি ১০৭টি সন্ধি দ্বারা যুক্ত। অনুরূপভাবে রহস্যময় শ্রীচক্র যন্ত্র ৫৪টি পুরুষ ও ৫৪টি স্ত্রী ছেদবিন্দু অর্থাৎ মোট ১০৮টি ছেদবিন্দু দ্বারা গঠিত।

বৈদিক জ্যোতিষ আকাশকে ২৭টি নক্ষত্রে বিভক্ত করেছে। এই ২৭টি নক্ষত্র আবার ৪টি করে পদে বিভক্ত হওয়ায় মোট ১০৮টি পদ সৃষ্টি হয়েছে। এই ১০৮টি পদ অনুযায়ী ১০৮টি মৌলিক মানবপ্রকৃতি সৃষ্টি হয়েছে। এই পদগুলি চন্দ্রের দ্বারা প্রভাবিত হওয়ায় জাতকের সুখ-দুঃখ, প্রকৃতি, উন্নতি-অবনতি, বংশ প্রভৃতি নির্ধারিত হয়।

ভারতীয় জ্যোতিষে দ্বাদশ রাশি ও নবগ্রহ আছে। এই দুই সংখ্যা গুণ করলে ১০৮ সংখ্যা হয়।

তন্ত্র মতে সাধারণ মানুষ স্বাভাবিক অবস্থায় দিনে ২১,৬০০ বার নিঃশ্বাস-প্রশ্বাস ফেলে। যার মধ্যে ১০,৮০০ সৌরশক্তি ও ১০,৮০০ চান্দ্রশক্তি সম্পন্ন। এই সংখ্যাটি লক্ষ্য করলে দেখা যায় যে, ১০৮ × ১০০ = ১০,৮০০ × ২ = ২১,৬০০ সংখ্যা দাঁড়ায়। এক্ষেত্রেও ১০৮ সংখ্যার ভূমিকা রয়েছে।

নাট্যশাস্ত্রে ভরত মুনি বলেছেন, নৃত্যের ১০৮টি করণ (ভঙ্গি, হস্তপদ সঞ্চালন) আছে। এখানেও ১০৮ সংখ্যার গুরুত্ব দেখা যায়।

উপনিষদের সংখ্যা ১০৮। বহু সাধু-সন্ন্যাসী তাঁদের নামের পূর্বে ১০৮ এই পবিত্র সংখ্যা লেখেন। তাঁদের মতে, এক ব্রহ্ম, শূন্য জগৎ (মায়া) এবং আট জীবের প্রতীক।(পঞ্চ ইন্দ্রিয়, মন, বুদ্ধি ও অহং)।

সংস্কৃত ভাষায় ৫৪টি বর্ণ আছে। প্রতিটি বর্ণ শিব (পুরুষ) এবং শক্তি (স্ত্রী) দুই ভাগে বিভক্ত হওয়ায় এগুলির সংখ্যা দাঁড়ায় ৫৪ × ২ = ১০৮। এখানেও একশত আট সংখ্যার গুরুত্ব রয়েছে।

প্রাচীন ভারতের কালগণনায় ব্রহ্মার একদিন হয় ৪৩,২০,০০০ মানব বৎসরে ; যার মধ্যে চারিটি যুগ (সত্য- ত্রেতা- দ্বাপর- কলি) নিহিত এবং যার উৎপাদক ১০৮ সংখ্যা।

সংখ্যাতত্ত্ব অনুযায়ী ১০৮ সংখ্যাটি ভাঙলে দাঁড়ায় ১ + ০ + ৮ = ৯। নয় সংখ্যাটি অতীন্দ্রিয় শক্তিসম্পন্ন সংখ্যা।

ভারতীয় সভ্যতার দীর্ঘ ইতিহাসে এই সংখ্যাটি কেবল একটি গাণিতিক মান নয়; এটি আধ্যাত্মিক সাধনা, সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য এবং দার্শনিক ভাবনার এক গুরুত্বপূর্ণ প্রতীক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত। যুগের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে ব্যাখ্যার ধরন পাল্টালেও জপমালা, পূজা-পার্বণ, যোগসাধনা কিংবা শাস্ত্রচর্চায় একশত আটের উপস্থিতি আজও সমানভাবে প্রাসঙ্গিক। সেই কারণেই ‘১০৮’ ভারতীয় সংস্কৃতির স্মৃতি, বিশ্বাস এবং সাধনার ধারাবাহিকতার এক অনন্য প্রতীক হয়ে আজও শ্রদ্ধার সঙ্গে উচ্চারিত হয়।

Exit mobile version