কলকাতা, ১০ জুলাই: মাটির প্রায় কুড়ি মিটার নীচে, ঘণ্টার পর ঘণ্টা ধরে যে যন্ত্রটি নিঃশব্দে মাটি কেটে এগিয়ে চলেছিল, আজ সে থামল একটি দেওয়ালের সামনে। তারপর একটাই ধাক্কা আর দেওয়াল ভেঙে আলো এসে পড়ল সুড়ঙ্গের মুখে। খিদিরপুর থেকে যাত্রা শুরু করা টানেল বোরিং মেশিন “দুর্গা” (S-1410A) আজ আনুষ্ঠানিকভাবে ঢুকে পড়ল নির্মীয়মাণ ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল স্টেশনের গর্ভে। কলকাতা মেট্রোর পার্পল লাইন তথা লাইন ৩-এর ইতিহাসে এটি একটি উল্লেখযোগ্য দিন। এক বছর আগে, ঠিক এই দিনেই, খিদিরপুরের সেন্ট টমাস বয়েজ স্কুলের ভিতরে তৈরি লঞ্চিং শ্যাফট থেকে যাত্রা শুরু করেছিল দুর্গা। আজ সেই যাত্রার প্রথম ধাপ সম্পূর্ণ ১.৭ কিলোমিটার দীর্ঘ প্রথম পর্বের সুড়ঙ্গ খনন শেষ করে যন্ত্রটি পৌঁছে গেল লক্ষ্যে।
প্রকল্পের সংক্ষিপ্ত পরিচয়
রেল বিকাশ নিগম লিমিটেড (আরভিএনএল)-এর তত্ত্বাবধানে এবং লারসেন অ্যান্ড টুব্রো (এল অ্যান্ড টি)-র হাত ধরে তৈরি হচ্ছে এই ভূগর্ভস্থ অংশ, যার নাম ইউজি১ প্যাকেজ। মোমিনপুর থেকে এসপ্ল্যানেড পর্যন্ত ৫.০৫ কিলোমিটার দীর্ঘ এই অংশের নির্মাণ ব্যয় প্রায় ২,৪৪৭ কোটি টাকা। জোকা থেকে এসপ্ল্যানেড পর্যন্ত সম্পূর্ণ পার্পল লাইনের মধ্যে এই অংশটিই সবচেয়ে জটিল, কারণ এখানেই উড়ালপথ ছেড়ে লাইন নামছে শহরের মাটির গভীরে।
দুর্গার বাইরের ব্যাস ৬.৬৩ মিটার, দৈর্ঘ্য প্রায় ৯৫ থেকে ১০০ মিটার, আর ওজন প্রায় ৬০০ টন। জার্মানির হেরেনক্নেশট সংস্থার প্রযুক্তিতে তৈরি এই যন্ত্রের যন্ত্রাংশ তামিলনাড়ুর কারখানায় জোড়া হয়েছে “মেক ইন ইন্ডিয়া”-র একটি জ্বলন্ত উদাহরণ হিসেবে। খনি শ্রমিকদের রক্ষাকর্ত্রী হিসেবে ঐতিহ্য মেনে টিবিএমের নাম রাখা হয় নারীবাচক শব্দে। কলকাতা যেহেতু মা দুর্গার শহর, তাই এই যন্ত্রের নাম “দুর্গা”। তার জোড়া যন্ত্র, যেটি সমান্তরাল ডাউন লাইনের সুড়ঙ্গ খুঁড়ছে, তার নাম “দিব্যা”।
কলকাতার মাটি নরম, জলস্তর উঁচু তাই এই দুই যন্ত্রই আর্থ প্রেশার ব্যালান্সিং (ইপিবি) প্রযুক্তির, যা মাটির চাপের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ধীরে ধীরে এগোয়, উপরের স্তরে ধস নামার ঝুঁকি কমায়।
এক বছরের যাত্রাপথ
খিদিরপুরের শ্যাফট থেকে যাত্রা শুরুর পর দুর্গাকে পেরোতে হয়েছে শহরের সবচেয়ে স্পর্শকাতর অংশ রয়্যাল ক্যালকাটা টার্ফ ক্লাবের ঐতিহ্যবাহী রেসকোর্স চত্বর। জানুয়ারি মাসে সেই ধাপ পার হওয়ার সময় ক্লাবের প্রাচীন স্ট্যান্ডগুলির উপর বসানো ছিল অত্যাধুনিক টিল্ট সেন্সর, যাতে সামান্যতম কম্পনও ধরা পড়ে। মাইদানের নীচ দিয়ে এগিয়ে আসার পর আজ সে পৌঁছল ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল স্টেশনের সীমানায়।
| ধাপ | সময়কাল | বিবরণ |
|---|---|---|
| যাত্রা শুরু | ১০ জুলাই, ২০২৫ | খিদিরপুর শ্যাফট থেকে খনন শুরু |
| আরসিটিসি অতিক্রম | জানুয়ারি, ২০২৬ | রয়্যাল ক্যালকাটা টার্ফ ক্লাবের নীচ দিয়ে নিরাপদে পারাপার |
| প্রথম পর্ব সমাপ্তি | ১০ জুলাই, ২০২৬ | ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল স্টেশনে প্রবেশ |
| দ্বিতীয় পর্ব (প্রস্তাবিত) | ২০২৬-এর শেষ | ভিক্টোরিয়া থেকে পার্ক স্ট্রিট, প্রায় ৯০০ মিটার |
যেহেতু ভিক্টোরিয়া স্টেশনের বাক্স-কাঠামো এখনও নির্মীয়মাণ, তাই দুর্গাকে এখান থেকে সরিয়ে নতুন করে বসানো হবে দ্বিতীয় পর্বের খননের জন্য। এই পর্বে তাকে পাড়ি দিতে হবে পার্ক স্ট্রিট পর্যন্ত।
যমজ যন্ত্র দিব্যার অগ্রগতি
দুর্গার প্রায় এক মাস পরে একই শ্যাফট থেকে যাত্রা শুরু করেছিল তার যমজ যন্ত্র “দিব্যা” (S-1411A), যে খুঁড়ছে সমান্তরাল ডাউন লাইনের সুড়ঙ্গ। রয়্যাল ক্যালকাটা টার্ফ ক্লাবের ধাপ সে ইতিমধ্যেই নিরাপদে পার করেছে। ইঞ্জিনিয়ারদের হিসেব বলছে, দিব্যা ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়ালের সীমানায় পৌঁছবে আগস্টের শেষ নাগাদ।
ঐতিহ্য বাঁচিয়ে খনন
ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়ালের মতো দেড়শো বছরের পুরনো স্থাপত্যের নীচ দিয়ে সুড়ঙ্গ কাটা মুখের কথা নয়। ইঞ্জিনিয়াররা এখানে বেছে নিয়েছেন একগুচ্ছ সতর্কতা
- কাটার হেডে বিশেষ ফোম আর পলিমার মিশিয়ে মাটির চাপ নিয়ন্ত্রণে রাখা হয়, যাতে উপরের স্তর বসে না যায়।
- ঐতিহ্যবাহী ভবনগুলির গায়ে বসানো টোটাল স্টেশন আর থ্রিডি টিল্ট সেন্সর সার্বক্ষণিক নজর রাখে; সামান্য নড়াচড়াতেই সতর্কবার্তা বেজে ওঠে কন্ট্রোল রুমে।
- স্পর্শকাতর অংশের নীচে যন্ত্রের গতি কমিয়ে আনা হয় দিনে মাত্র কয়েক মিটারে, যাতে কম্পনের প্রভাব কমে।
- সুড়ঙ্গের পিছনে তৈরি হওয়া ফাঁকা জায়গায় সঙ্গে সঙ্গে উচ্চচাপে সিমেন্ট-গ্রাউট ঢেলে দেওয়া হয়, যাতে কংক্রিটের রিং মাটির সঙ্গে শক্ত করে বসে যায়।
এসপ্ল্যানেডে তিন লাইনের মিলনস্থল
এই সুড়ঙ্গপথ শেষ পর্যন্ত গিয়ে মিশবে এসপ্ল্যানেড স্টেশনে, যা তৈরি হচ্ছে শহরের সবচেয়ে বড় ইন্টারচেঞ্জ হাব হিসেবে। ব্লু লাইন, গ্রিন লাইন আর পার্পল লাইন তিনটি লাইনই এখানে একসঙ্গে মিলবে, চার-স্তরীয় ভূগর্ভস্থ কাঠামোয়। বিসি রায় মার্কেটের একাংশ সরিয়ে জায়গা করে নিতে হয়েছে এই বিশাল স্টেশন-বাক্সের জন্য। যাত্রীরা টিকিটের গণ্ডি না পেরিয়েই এক লাইন থেকে অন্য লাইনে যেতে পারবেন এমনই পরিকল্পনা ইঞ্জিনিয়ারদের।
ভবিষ্যতের সময়সূচি
জোকা থেকে মাঝেরহাট পর্যন্ত উড়ালপথ ইতিমধ্যেই যাত্রী পরিষেবায় চালু। মাঝেরহাট থেকে এসপ্ল্যানেড পর্যন্ত ভূগর্ভস্থ অংশের খনন-কাজ চলছে এখন, লক্ষ্য ২০২৬-এর শেষের মধ্যে খিদিরপুর-ভিক্টোরিয়া-পার্ক স্ট্রিট অংশের খনন সম্পূর্ণ করা। পার্ক স্ট্রিট থেকে এসপ্ল্যানেড পর্যন্ত বাকি অংশ তৈরি হবে কাট অ্যান্ড কভার পদ্ধতিতে, যার কাজ শেষ হওয়ার কথা ২০২৭-এর শেষ নাগাদ। এরপর জোকা থেকে এসপ্ল্যানেড পর্যন্ত গোটা করিডর পূর্ণাঙ্গ পরিষেবায় আসবে ২০২৮-২৯ নাগাদ। পাশাপাশি আইআইএম কলকাতা আর ডায়মন্ড পার্ক পর্যন্ত সম্প্রসারণের জন্য জমি অধিগ্রহণের কাজও এগিয়ে চলেছে।
শহরের জন্য কী পাওয়া যাবে
এই প্রকল্প সম্পূর্ণ হলে দক্ষিণ কলকাতা থেকে শহরের প্রাণকেন্দ্র পর্যন্ত যাতায়াত অনেকটাই সহজ হয়ে যাবে। রাস্তায় গাড়ির চাপ কমবে, দূষণ কমবে, আর এসপ্ল্যানেডের মতো ব্যস্ত এলাকায় তিন লাইনের সংযোগ মানুষের যাতায়াতের সময় অনেকটাই কমিয়ে দেবে। আলিপুর, বেহালা, গার্ডেনরিচের মতো এলাকায় ইতিমধ্যেই সম্পত্তির চাহিদা বাড়তে শুরু করেছে, যা প্রমাণ করে শহরবাসী এই প্রকল্পের উপর কতটা ভরসা রাখছেন। তবে যন্ত্রের ভাষায় নয়, বরং প্রতীকী অর্থেই বলা যায় মাটির নীচে যে দুর্গা আজ একটি দেওয়াল ভেঙেছেন, তিনি আসলে ভেঙেছেন শহরের যাতায়াতের এক পুরনো সীমারেখা। বাকি পথ এখনও দীর্ঘ, কিন্তু আজকের এই ব্রেকথ্রু কলকাতাকে আরেকটু কাছে এনে দিল তার পরবর্তী মেট্রো-যুগের।
(তথ্যসূত্র: রেল বিকাশ নিগম লিমিটেড, লারসেন অ্যান্ড টুব্রো, টাইমস অফ ইন্ডিয়া, মেট্রো রেল নিউজ)

