শুভজিৎ বসু, তারকেশ্বর : মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার পর প্রথমবার তারকেশ্বরে এলেন শুভেন্দু অধিকারী। মঙ্গলবার নবান্ন থেকে সড়কপথে সরাসরি তারকেশ্বর মন্দিরে পৌঁছন তিনি। সেখানে পৌঁছতেই তারকেশ্বরের বিধায়ক সন্তু পান উত্তরীয় পরিয়ে মুখ্যমন্ত্রীকে সংবর্ধনা জানান।
এরপর মুখ্যমন্ত্রী মন্দিরে প্রবেশ করে বাবা তারকনাথের পুজো দেন এবং মহাদেবের কাছে অঞ্জলি নিবেদন করেন। পুজো শেষে তিনি সরাসরি তারকেশ্বর নটরাজ গেস্ট হাউসে যান।
গেস্ট হাউসে পৌঁছতেই পুলিশ বাহিনীর পক্ষ থেকে মুখ্যমন্ত্রীকে গার্ড অব অনার প্রদান করা হয়। এরপর তিনি প্রশাসনিক বৈঠকে যোগ দেন। বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন রাজ্যের দুই প্রতিমন্ত্রী তথা হুগলির দুই বিধায়ক ভাস্কর ভট্টাচার্য ও সুমনা সরকার। এছাড়াও হুগলি জেলার বাকি ১৪ জন বিজেপি বিধায়ক বৈঠকে অংশ নেন।
বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন হুগলির জেলাশাসক খুরশিদ আলি কাদরি, চন্দননগর পুলিশ কমিশনারেটের কমিশনার সুনীল কুমার যাদব, হুগলি গ্রামীণ পুলিশের সুপার কুমার সানি রাজ-সহ পুলিশ ও প্রশাসনের একাধিক উচ্চপদস্থ আধিকারিক।
প্রশাসনিক বৈঠক শেষে মুখ্যমন্ত্রী কলকাতার উদ্দেশে রওনা দেন।
বিরোধী দলনেতা থাকাকালীনও একাধিকবার এসেছেন তারকেশ্বরে
বিরোধী দলনেতা থাকাকালীন ২০২২ সালের ৮ সেপ্টেম্বর নবান্ন অভিযানের সমর্থনে তারকেশ্বর শহরে একটি মিছিল অনুষ্ঠিত হয়েছিল। সেই মিছিলে শুভেন্দু অধিকারীকে লক্ষ্য করে কালো পতাকা দেখানো এবং পাথর ছোড়ার অভিযোগ উঠেছিল তৃণমূল কংগ্রেসের বিরুদ্ধে।
এরপর ২০২৩ সালের পঞ্চায়েত নির্বাচনের আগে তারকেশ্বরে একটি জনসভা করেছিলেন শুভেন্দু অধিকারী। আবার অযোধ্যায় রামমন্দির প্রতিষ্ঠার আগে রামের মূর্তি মাথায় নিয়ে গোটা তারকেশ্বর শহর পরিক্রমাও করেছিলেন তিনি। তবে মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার পর এই প্রথম তারকেশ্বরে এলেন শুভেন্দু অধিকারী।
টিডিএ ভেঙে প্রশাসক নিয়োগের ঘোষণা
প্রশাসনিক বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে মুখ্যমন্ত্রী ঘোষণা করেন, তারকেশ্বর উন্নয়ন পরিষদ বা টিডিএ ভেঙে দিয়ে সেখানে প্রশাসক নিয়োগ করা হবে।
তারকেশ্বরের ঐতিহাসিক গুরুত্বের প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, “তারকেশ্বর একটি ঐতিহাসিক স্থান। ১৯৪৭ সালের ২০ জুন পশ্চিমবঙ্গের ভারতভুক্তি নিয়ে সরকারি ভোটাভুটির প্রায় দু’মাস আগে ড. শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত হিন্দু মহাসভার ঐতিহাসিক তারকেশ্বর সম্মেলনে প্রথম আনুষ্ঠানিকভাবে প্রস্তাব গৃহীত হয়েছিল যে, যদি ভারত ভাগ করে পাকিস্তান গঠন করা হয়, তাহলে অবিভক্ত বাংলার হিন্দুপ্রধান অঞ্চলগুলোকে পৃথক করে পশ্চিমবঙ্গ প্রদেশ গঠন করতে হবে এবং সেটিকে ভারতের অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।”
তিনি আরও বলেন, “সামনেই ২০ জুন। তারকেশ্বরকে ঘিরে আমাদের কিছু পরিকল্পনা রয়েছে। তবে বুধবার মন্ত্রিসভার বৈঠক রয়েছে। তার আগে আমার পক্ষে কোনও ঘোষণা করা ঠিক হবে না। মন্ত্রিসভার বৈঠকের পর নবান্নে সব জানাব।”
ট্রাস্টি বোর্ডের আর্থিক সহায়তা বন্ধ, এডিএম হচ্ছেন প্রশাসক
মুখ্যমন্ত্রী জানান, তারকেশ্বর ট্রাস্টি বোর্ডের আর্থিক সহায়তা বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে, অর্থাৎ বোর্ডকে ডিফান্ড করা হয়েছে।
তিনি বলেন, “আজই মন্ত্রী অগ্নিমিত্রা পাল এবং মুখ্যসচিবকে নির্দেশ দেব। এডিএম জেলা পরিষদ অনুজ প্রতাপ সিংকে আমরা প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ করছি।”
শ্রাবণী মেলাকে কেন্দ্র করে বড় পরিকল্পনা
সামনেই শ্রাবণী মেলা। সেই উপলক্ষে তারকেশ্বরে আগত লক্ষাধিক পুণ্যার্থীর জন্য বড়সড় উদ্যোগ নেওয়ার কথাও ঘোষণা করেন মুখ্যমন্ত্রী।
তিনি বলেন, “বাবা তারকনাথের পবিত্র ভূমি তারকেশ্বরে শ্রাবণ মাসে যে সমস্ত পুণ্যার্থী আসেন, তাঁদের জন্য সরকার বড় ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। তারকেশ্বর মন্দিরকে কেন্দ্র করে আমরা একাধিক উন্নয়নমূলক কাজ করব।”
দুধপুকুরের সৌন্দর্যায়ন নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করে তিনি বলেন, “প্রথমেই ওই পবিত্র দুধপুকুরের পাড়ে যে রং করা হয়েছে, তা পরিবর্তন করা দরকার। আধ্যাত্মিক পরিবেশ এবং আমাদের সংস্কৃতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ রং ব্যবহার করা উচিত।”
মমতার আন্দোলনকে কটাক্ষ
প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সাম্প্রতিক আন্দোলন নিয়েও কটাক্ষ করেন শুভেন্দু অধিকারী।
হাতে সংবিধান নিয়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের মিছিল প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “আমাকে একটি ছবি পাঠানো হয়েছিল। দেখলাম, দেড়শো জন লোকও আসেনি। সাংবাদিক ছিল প্রায় ২০০ জন। সাংবাদিক না থাকলে অবস্থা আরও খারাপ হতো। শুনলাম, লোকসভা ও রাজ্যসভার এত সাংসদের মধ্যে মাত্র তিনজন সাংসদ এবং ছয়জন বিধায়ক উপস্থিত ছিলেন। দলটার অবস্থা ফলতার মতো হয়ে গেছে।”
অভিষেককে নিয়েও কটাক্ষ
অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় বিজেপি বিধায়কদের বারবার ফোন করছেন বলে যে জল্পনা চলছে, সে প্রসঙ্গে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, “উনি তো অসুস্থ শুনেছিলাম। অসুস্থ হলে এত ফোন করা যায় নাকি? শুনলাম স্যালাইন-ট্যালাইন চলছিল।”
২০১৭ সালে গঠিত হয়েছিল টিডিএ
উল্লেখ্য, পূর্বতন রাজ্য সরকার ২০১৭ সালের ১ জুন তারকেশ্বর ডেভেলপমেন্ট অথরিটি (টিডিএ) গঠন করেছিল। সেই সময় সংস্থার চেয়ারম্যান করা হয়েছিল ফিরহাদ হাকিমকে। এই সিদ্ধান্ত নিয়ে তখন ব্যাপক সমালোচনা হয়েছিল।
গত প্রায় এক দশকে টিডিএ তারকেশ্বরে একাধিক উন্নয়নমূলক কাজ করলেও পরিকল্পনা অনুযায়ী অনেক প্রকল্পই সম্পূর্ণ করতে পারেনি। মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী জানিয়েছেন, তারকেশ্বরকে ঘিরে তাঁর সরকারের বিশেষ পরিকল্পনা রয়েছে। তবে সেই পরিকল্পনার বিস্তারিত ঘোষণা মন্ত্রিসভার বৈঠকের পর করা হবে।

