Site icon Jist Feed

১৬ বছর পর ফের বিশ্বসেরা স্পেন, তোরেসের অতিরিক্ত সময়ের গোলে খেতাব, চোখের জলে বিদায় নিলেন মেসি

Spain Vs Argentina

নিউ জার্সিতে ফাইনালে ১-০ গোলে আর্জেন্তিনাকে হারাল লা রোজা, ১০৬ মিনিটে জয়সূচক গোল সুপার-সাব ফেরান তোরেসের, লাল কার্ড দেখলেন এনজো ফের্নান্দেস

২০ জুলাই: ফুটবলে কখনও কখনও গোটা ম্যাচের ফয়সালা হয়ে যায় একটামাত্র মুহূর্তে। রবিবার রাতে মেটলাইফ স্টেডিয়ামে ঠিক সেটাই ঘটল। নব্বই মিনিটের গোলশূন্য লড়াই, তারপর অতিরিক্ত সময়ের প্রথমার্ধেই দশ জনে পরিণত হওয়া আর্জেন্তিনা, শেষ পর্যন্ত ভাঙল ১০৬ মিনিটে। বদলি নামা ফেরান তোরেসের ঠান্ডা মাথার ফিনিশে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হল স্পেন। ২০১০ সালের পর দ্বিতীয়বার বিশ্বকাপ ঘরে তুলল লুইস দে লা ফুয়েন্তের দল, আর তার কয়েক মাস আগেই জেতা ইউরো ২০২৪-এর সঙ্গে জুড়ে গেল আরও একটা মুকুট।

আর্জেন্তিনার কাছে রাতটা ছিল স্বপ্নভঙ্গের। ২০২২ কাতার বিশ্বকাপের রূপকথার পুনরাবৃত্তি হল না। লিয়োনেল স্কালোনির দল টানা তৃতীয় বড় আন্তর্জাতিক ট্রফির (কোপা আমেরিকা ২০২১, ২০২৪ ও বিশ্বকাপ ২০২২-এর পর) লক্ষ্যে নেমেছিল, কিন্তু থেমে গেল ফাইনালের চৌকাঠে। আর সবচেয়ে বড় প্রশ্নচিহ্ন উঠে গেল লিয়োনেল মেসির আন্তর্জাতিক কেরিয়ারের ভবিষ্যৎ নিয়ে। মাঠ ছাড়ার সময় চোখে জল নিয়ে হাঁটা মেসিকে দেখে অনেকেই ধরে নিচ্ছেন, এটাই ছিল তাঁর শেষ বিশ্বকাপ।

ম্যাচের পরিসংখ্যান এক নজরে

বিষয়স্পেনআর্জেন্তিনা
ফলাফলজয়ী (১-০, অতিরিক্ত সময়ে)পরাজিত
গোল করেছেনফেরান তোরেস (১০৬′)
বল দখল৬০%৩২%
মোট শট২০
লক্ষ্যে শট১২
এমিলিয়ানো মার্তিনেসের সেভ১১ (ফাইনালের রেকর্ড)
লাল কার্ডএনজো ফের্নান্দেস (অতিরিক্ত সময়ের শুরুতে)
মেসির লক্ষ্যে শট

কৌশলের লড়াইয়ে জিতল স্পেনের পজেশন-ফুটবল

সংখ্যাতেই স্পষ্ট, পুরো ম্যাচটা ছিল একপেশে। মাঠের প্রায় পুরোটা সময় বল পায়ে রেখে আর্জেন্তিনাকে নিজেদের অর্ধেই আটকে রাখল স্পেন। প্রতিপক্ষের রক্ষণ ভাঙার বদলে আর্জেন্তিনা যেন গোড়া থেকেই ঠিক করে রেখেছিল, রক্ষণ জমাট রেখে খেলাটা টেনে নিয়ে যাবে যতদূর সম্ভব, আর সুযোগ বুঝে পাল্টা আঘাত হানবে। কিন্তু নব্বই মিনিটে সেই পরিকল্পনা কাজে লাগলেও, অতিরিক্ত সময়ে গিয়ে এনজো ফের্নান্দেসের হঠকারী ট্যাকল আর তার জেরে লাল কার্ড পুরো ছকটাই ভেঙে দেয়। দশ জনে নেমে আসা আর্জেন্তিনার আর কোনও জবাব ছিল না।

খেলার একটা বড় অংশ জুড়ে গোলের নীচে অবিশ্বাস্য পারফরম্যান্স দেখিয়েছেন এমিলিয়ানো মার্তিনেস। বিশ্বকাপ ফাইনালে সর্বোচ্চ সেভের রেকর্ড গড়েছেন তিনি ১১টি সেভ। বহুবার একার হাতে দলকে ম্যাচে ধরে রেখেছেন, বিশেষ করে ফ্রি-কিক বাঁচানোর সময়ে তাঁর সিদ্ধান্ত ছিল অসাধারণ, বল ঠেকাতে তিনি একটুও নড়েননি নিজের পোস্ট থেকে, উলটোদিকে ঝাঁপ দেওয়ার ঝুঁকি নেননি। কিন্তু ১০৬ মিনিটে নিকো উইলিয়ামসের নিখুঁত কাটব্যাক থেকে তোরেসের ফিনিশ ঠেকানোর সুযোগ তাঁর ছিল না।

স্পেনের রক্ষণেও নজর কাড়লেন তরুণ পাউ কুবারসি। ১২০ মিনিট পুরো মাঠ জুড়ে সতর্ক পাসিং আর সময়োচিত ট্যাকলে বিপক্ষকে বারবার হতাশ করেছেন তিনি। উনাই সিমনের গোলের নীচে স্থিরতাও ছিল দেখার মতো, গোটা প্রতিযোগিতায় আটটি ম্যাচে মাত্র একটি গোল হজম করেছে স্পেন, যা এই বিশ্বকাপের সবচেয়ে বড় রক্ষণাত্মক কীর্তিগুলোর একটি।

ধারাভাষ্য মঞ্চে বিশেষজ্ঞদের ময়নাতদন্ত

ম্যাচ শেষে বিশেষজ্ঞ আলোচকদের বিশ্লেষণে বারবার উঠে এল একটাই কথা, মেসিকে বল থেকে বিচ্ছিন্ন করে রাখাই ছিল স্পেনের আসল অস্ত্র। রক্ষণ ও মাঝমাঠের মধ্যে দূরত্ব একেবারে ঠিকঠাক রেখে, পাসিং লাইন বন্ধ করে দিয়ে আর্জেন্তিনার আক্রমণের রসদ কেড়ে নেওয়াই ছিল কোচ দে লা ফুয়েন্তের ছক, আর সেটা প্রায় নিখুঁতভাবে কার্যকর হয়েছে। একজন সাবেক জার্মান আন্তর্জাতিক ফুটবলার এই প্রসঙ্গে মন্তব্য করেন, বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হওয়ার আগে যে স্পষ্ট দর্শন আর দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার প্রয়োজন হয়, স্পেন তারই এক আদর্শ উদাহরণ, আর বিশ্বের বাকি ফুটবল সংস্থাগুলোর কাছে এখান থেকে শেখার অনেক কিছু আছে।

তোরেসের গোল নিয়েও বিশ্লেষকদের মন্তব্য ছিল স্পষ্ট, ফিনিশিংয়ে যতটা সহজ দেখাচ্ছিল, আদতে ততটা সহজ ছিল না। জোরে না মেরে বলের ওপর সামান্য নিয়ন্ত্রণ রেখে গোলরক্ষকের মাথার ওপর দিয়ে বল জালে জড়ানোর সেই ফিনিশকে “ক্লাস” বলেই বর্ণনা করেছেন প্যানেলের সাবেক এক ইংলিশ ফুটবলার। উলটোদিকে জিয়োভানি সিমেয়নের সমতাসূচক গোলের সুযোগ নষ্ট হওয়াকেও তুলনা করা হয়েছে একই প্রসঙ্গে, বাড়তি জোরের কারণেই বল উড়ে যায় বারের ওপর দিয়ে, যা আরও একবার প্রমাণ করে ফাইনালের মতো মঞ্চে ভুলের কোনও জায়গা নেই।

১৯ বছর বয়সি লামিনে ইয়ামালকে নিয়েও আলোচনা কম হয়নি। গোল না পেলেও প্রতিটি ম্যাচেই প্রতিপক্ষ রক্ষণের রাতের ঘুম কেড়ে নিয়েছেন তিনি, আর প্যানেলের আলোচকদের মতে, তাঁর মধ্যে এখনও যে পরিণতমনস্কতা আর দলের প্রতি নিবেদন দেখা গিয়েছে, সেটাই তাঁকে আলাদা করে তুলেছে। একই সঙ্গে উয়েরা ২০ বছরের কম বয়সিদের মধ্যে সেরা হিসেবে নাম উঠে এসেছে পাউ কুবারসিরও, যাঁর খেলায় লা মাসিয়ার শৃঙ্খলা আর দলগত মানসিকতার স্পষ্ট ছাপ দেখেছেন বিশেষজ্ঞরা।

ইতিহাসের পাতায় নতুন সংযোজন

ভারতীয় ফুটবলের জন্য শিক্ষা

স্পেনের এই সাফল্যের গল্পটা আসলে একটামাত্র ম্যাচ বা এক প্রজন্মের নয়, এটা বছরের পর বছর ধরে তৈরি করা একটা দর্শনের ফসল। লা মাসিয়ার মতো একাডেমি থেকে উঠে আসা লামিনে ইয়ামাল বা পাউ কুবারসির মতো কিশোর-তরুণরা যেভাবে জাতীয় দলের জার্সি গায়ে তুলেও নিজেদের ক্লাব-শেখা পজিশনাল ফুটবলের ভাষাতেই কথা বলতে পারছেন, সেটাই স্পেনের আসল শক্তি। ভারতীয় ফুটবলের কাঠামোয়, রাজ্য অ্যাকাডেমি থেকে আইএসএল পর্যন্ত, ঠিক এই ধারাবাহিকতা আর স্পষ্ট খেলার দর্শনের বড়ই অভাব। একটা নির্দিষ্ট বয়সের পর প্রতিভাবান ফুটবলারদের হাতে ধরে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার মতো কাঠামো তৈরি করতে না পারলে, শুধু প্রতিভা থাকলেই যে বিশ্বমঞ্চে জায়গা করে নেওয়া যায় না, স্পেনের এই বিশ্বজয় যেন আরও একবার সেই পুরনো সত্যিটাই মনে করিয়ে দিল ভারতীয় ফুটবলকে।

Exit mobile version