২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপের নকআউট পর্ব যত এগোচ্ছে, ততই বাড়ছে উত্তেজনা। রাউন্ড অব ৩২-এর ২১তম দিনের তিনটি ম্যাচ যেন ফুটবলের তিনটি ভিন্ন গল্প একটিতে অভিজ্ঞতার জয়, অন্যটিতে অবিশ্বাস্য প্রত্যাবর্তন, আর শেষটিতে প্রতিকূল পরিস্থিতির বিরুদ্ধে অদম্য লড়াই। দিন শেষে শেষ ষোলোর টিকিট নিশ্চিত করেছে ইংল্যান্ড, বেলজিয়াম এবং স্বাগতিক যুক্তরাষ্ট্র। তিনটি ম্যাচেই ছিল নাটকীয় মুহূর্ত, কৌশলগত লড়াই এবং মানসিক দৃঢ়তার অসাধারণ প্রদর্শন।
ইংল্যান্ড ২-১ ডিআর কঙ্গো
কেনের নেতৃত্বে কঠিন পরীক্ষা পেরিয়ে ইংল্যান্ড
ম্যাচের শুরুতেই বড় ধাক্কা খায় ইংল্যান্ড। মাত্র সপ্তম মিনিটে ব্রায়ান সিপেঙ্গার গোলে এগিয়ে যায় ডিআর কঙ্গো। প্রথমার্ধে ইংলিশ আক্রমণভাগ একাধিক সুযোগ তৈরি করলেও শেষ পর্যন্ত গোলের দেখা পায়নি। দ্বিতীয়ার্ধে কোচ থমাস টুখেলের কৌশলগত পরিবর্তন ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। ৭৫ মিনিটে অ্যান্থনি গর্ডনের নিখুঁত ক্রস থেকে অধিনায়ক হ্যারি কেন হেডে সমতা ফেরান। এরপর ৮৬ মিনিটে আবারও গোল করে দলের জয় নিশ্চিত করেন তিনি। ইংল্যান্ড পুরো ম্যাচে বলের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখলেও ডিআর কঙ্গোর দ্রুত পাল্টা আক্রমণ তাদের রক্ষণভাগকে বেশ কয়েকবার বিপদে ফেলেছিল।
বিশেষজ্ঞদের বিশ্লেষণ
বিশ্লেষকদের মতে, হ্যারি কেন আবারও প্রমাণ করেছেন বড় ম্যাচে কেন তিনি বিশ্বের অন্যতম নির্ভরযোগ্য স্ট্রাইকার। তবে ইংল্যান্ডের ডিফেন্স নিয়ে উদ্বেগ থেকেই যাচ্ছে। বিশেষ করে দ্রুতগতির কাউন্টার অ্যাটাক সামলাতে তাদের দুর্বলতা স্পষ্ট হয়েছে। অন্যদিকে বদলি খেলোয়াড়দের ইতিবাচক প্রভাব ইংল্যান্ডের অন্যতম শক্তি হিসেবে উঠে এসেছে।
ম্যাচ পরিসংখ্যান
| পরিসংখ্যান | ইংল্যান্ড | ডিআর কঙ্গো |
|---|---|---|
| বল দখল | ৬২% | ৩৮% |
| মোট শট | ১৪ | ৮ |
| টার্গেটে শট | ৫ | ৩ |
| পাসের নির্ভুলতা | ৮৭% | ৭৪% |
| মোট পাস | ৫৯০ | ৩১৫ |
| ফাউল | ১১ | ১৪ |
| অফসাইড | ২ | ১ |
| কর্নার | ৭ | ৩ |
| হলুদ কার্ড | ১ | ২ |
বেলজিয়াম ৩-২ সেনেগাল (অতিরিক্ত সময়ে)
দুই গোলে পিছিয়ে থেকেও রূপকথার প্রত্যাবর্তন
দিনের সবচেয়ে নাটকীয় ম্যাচটি উপহার দেয় বেলজিয়াম ও সেনেগাল। হাবিব দিয়ারা এবং ইসমাইলা সারের গোলে ২-০ ব্যবধানে এগিয়ে গিয়েছিল সেনেগাল। নির্ধারিত সময়ের শেষ দিকে ম্যাচ প্রায় তাদের হাতেই ছিল। কিন্তু শেষ কয়েক মিনিটে বদলে যায় পুরো দৃশ্যপট।৮৬ মিনিটে রোমেলু লুকাকু ব্যবধান কমান। তিন মিনিট পর ইউরি তিলেমান্স সমতা ফেরান। অতিরিক্ত সময়ে দুই দলই একাধিক সুযোগ তৈরি করলেও ম্যাচের শেষ মুহূর্তে ভিএআরের সহায়তায় পেনাল্টি পায় বেলজিয়াম। ১২৫ মিনিটে তিলেমান্স সেই সুযোগ কাজে লাগিয়ে অবিশ্বাস্য জয় এনে দেন। ফুটবল বিশ্লেষকদের মতে, ইউরি তিলেমান্স ছিলেন ম্যাচের সেরা খেলোয়াড়। মাঝমাঠে তার নিয়ন্ত্রণ এবং চাপের মুহূর্তে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা ম্যাচের পার্থক্য গড়ে দেয়। অন্যদিকে সেনেগালের শেষ দশ মিনিটের রক্ষণাত্মক কৌশল তাদের জন্য কাল হয়ে দাঁড়ায়। আক্রমণাত্মক ফুটবল ছেড়ে পিছিয়ে যাওয়ার সুযোগই বেলজিয়াম কাজে লাগিয়েছে।
ম্যাচ পরিসংখ্যান
| পরিসংখ্যান | বেলজিয়াম | সেনেগাল |
| বল দখল | ৫৪% | ৪৬% |
| মোট শট | ১৯ | ১৫ |
| টার্গেটে শট | ৭ | ৬ |
| পাসের নির্ভুলতা | ৮৪% | ৮০% |
| মোট পাস | ৬১০ | ৪৯৫ |
| ফাউল | ১৫ | ১৮ |
| অফসাইড | ১ | ৩ |
| কর্নার | ৮ | ৫ |
| হলুদ কার্ড | ৩ | ৪ |
যুক্তরাষ্ট্র ২-০ বসনিয়া ও হার্জেগোভিনা
১০ জন নিয়েও দুর্দান্ত লড়াই, স্বাগতিকদের আত্মবিশ্বাসী জয়
স্বাগতিক যুক্তরাষ্ট্র শুরু থেকেই সংগঠিত ফুটবল খেলেছে। প্রথমার্ধের শেষ দিকে ফোলারিন ব্যালোগান গোল করে দলকে এগিয়ে দেন।তবে ৬৪ মিনিটে সরাসরি লাল কার্ড দেখে মাঠ ছাড়েন ব্যালোগান। এরপর প্রায় আধা ঘণ্টা একজন কম খেলোয়াড় নিয়ে খেলতে হয় যুক্তরাষ্ট্রকে। সংখ্যাগত সুবিধা পেয়েও বসনিয়া ম্যাচে ফিরতে পারেনি। বরং ৮২ মিনিটে মালিক তিলম্যানের দুর্দান্ত ফ্রি-কিক গোল যুক্তরাষ্ট্রের জয় নিশ্চিত করে। এই জয়ের মাধ্যমে বিশ্বকাপের তিন সহ-আয়োজক দেশের সবাই শেষ ষোলোর টিকিট নিশ্চিত করল।বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ম্যাচে যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল তাদের শৃঙ্খলাবদ্ধ রক্ষণভাগ। একজন খেলোয়াড় কম থাকার পরও তারা প্রতিপক্ষকে বড় কোনো সুযোগ তৈরি করতে দেয়নি। মালিক তিলম্যানের সেট-পিস দক্ষতা এবং দলের মানসিক দৃঢ়তা ভবিষ্যৎ নকআউট ম্যাচগুলোর জন্য বড় ইতিবাচক বার্তা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
ম্যাচ পরিসংখ্যান
| পরিসংখ্যান | যুক্তরাষ্ট্র | বসনিয়া ও হার্জেগোভিনা |
| বল দখল | ৪৮% | ৫২% |
| মোট শট | ৯ | ১১ |
| টার্গেটে শট | ৪ | ২ |
| পাসের নির্ভুলতা | ৭৮% | ৮২% |
| মোট পাস | ৪১০ | ৪৪৫ |
| ফাউল | ১২ | ১০ |
| অফসাইড | ৩ | ০ |
| কর্নার | ৪ | ৬ |
| লাল কার্ড | ১ | ০ |
| হলুদ কার্ড | ২ | ১ |
২১তম দিনের সারসংক্ষেপ
| ম্যাচ | ফলাফল | ম্যাচের নায়ক |
| ইংল্যান্ড বনাম ডিআর কঙ্গো | ইংল্যান্ড ২-১ | হ্যারি কেন (২ গোল) |
| বেলজিয়াম বনাম সেনেগাল | বেলজিয়াম ৩-২ (অতিরিক্ত সময়ে) | ইউরি তিলেমান্স (২ গোল, জয়সূচক পেনাল্টি) |
| যুক্তরাষ্ট্র বনাম বসনিয়া | যুক্তরাষ্ট্র ২-০ | মালিক তিলম্যান |
বিশ্বকাপের ২১তম দিন আবারও মনে করিয়ে দিল, নকআউট ফুটবলে পরিসংখ্যান নয়, শেষ বাঁশি বাজার আগ পর্যন্ত লড়াই চালিয়ে যাওয়ার মানসিকতাই সবচেয়ে বড় শক্তি। ইংল্যান্ডের অভিজ্ঞতা, বেলজিয়ামের অবিশ্বাস্য প্রত্যাবর্তন এবং যুক্তরাষ্ট্রের শৃঙ্খলাবদ্ধ লড়াই তিনটি দলই নিজেদের ভিন্ন ভিন্ন উপায়ে শেষ ষোলোর টিকিট নিশ্চিত করেছে। এখন সামনে আরও কঠিন পরীক্ষা। কারণ বিশ্বকাপের এই পর্যায়ে প্রতিটি ম্যাচই একটি ফাইনালের সমান।

