বিশ্বকাপের সপ্তম দিনে গোল, নাটক এবং কৌশলের অসাধারণ লড়াই
১৭ জুন ২০২৬, বুধবার। বিশ্বকাপের সপ্তম দিনটি ফুটবলপ্রেমীদের উপহার দিল চারটি ভিন্ন স্বাদের ম্যাচ। কোথাও ছিল ছয় গোলের রুদ্ধশ্বাস লড়াই, কোথাও ছিল রক্ষণাত্মক শৃঙ্খলার অসাধারণ প্রদর্শন, আবার কোথাও দেখা গেল অভিজ্ঞতা বনাম আত্মপ্রকাশের দ্বন্দ্ব।
দিনের সবচেয়ে আলোচিত ম্যাচে থমাস টুখেলের ইংল্যান্ড ৪-২ গোলে হারায় ক্রোয়েশিয়াকে। অন্যদিকে পর্তুগালকে ১-১ গোলে আটকে দিয়ে ইতিহাস গড়ে ডিআর কঙ্গো। কলম্বিয়া শক্তিশালী পারফরম্যান্সে উজবেকিস্তানকে হারায়, আর ঘানা শেষ মুহূর্তের নাটকে জয় ছিনিয়ে নেয় পানামার বিপক্ষে। অন্যদিকে, কলম্বিয়া ও ঘানা গুরুত্বপূর্ণ জয় তুলে নিয়েছে।
ইংল্যান্ড ৪-২ ক্রোয়েশিয়া
ডালাস স্টেডিয়াম
নতুন কোচ টমাস টুখেলের অধীনে ইংল্যান্ড ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন এক দল। শুরু থেকেই আক্রমণাত্মক ফুটবল খেলে তারা ক্রোয়েশিয়াকে চাপে রাখে। থমাস টুখেলের বিশ্বকাপ অভিষেক ছিল এক কথায় নাটকীয়। ছয় গোলের এই ম্যাচে ইংল্যান্ড আক্রমণে ছিল বিধ্বংসী, যদিও রক্ষণে বেশ কিছু দুর্বলতা ধরা পড়ে। অধিনায়ক হ্যারি কেন দুটি গোল করে আবারও নিজের গুরুত্ব প্রমাণ করেন। প্রথম গোলটি আসে পেনাল্টি থেকে, আর দ্বিতীয়টি ছিল দুর্দান্ত এক হেড।
ম্যাচের শুরুতেই ননি মাদুয়েকের আদায় করা পেনাল্টি থেকে গোল করেন হ্যারি কেন। পেনাল্টিটি পুনরায় নেওয়ার পরও কেন ছিলেন নির্ভুল। তবে ক্রোয়েশিয়া দ্রুত ঘুরে দাঁড়ায়। মার্টিন বাতুরিনা এবং পেতার মুসার গোল ইংল্যান্ডের রক্ষণভাগের বিশৃঙ্খল অবস্থা সামনে নিয়ে আসে।
ম্যাচের টার্নিং পয়েন্ট
প্রথমার্ধ শেষে ইংল্যান্ডের কোচিং স্টাফ স্পষ্টতই অসন্তুষ্ট ছিলেন। মাঝমাঠের প্রেসিং এবং রক্ষণাত্মক ট্রানজিশনে পরিবর্তন আনা হয় বিরতির সময়। ফল আসে মাত্র দুই মিনিটের মধ্যেই।
দ্বিতীয়ার্ধের শুরুতে জুড বেলিংহ্যাম গভীর পাস থেকে সুযোগ কাজে লাগিয়ে ইংল্যান্ডকে আবার এগিয়ে দেন। ম্যাচের শেষদিকে একাধিক পরিবর্তনের পর মার্কাস র্যাশফোর্ড গোল করে জয় নিশ্চিত করেন।
হ্যারি কেনের মাইলফলক
দুই গোল করে হ্যারি কেন ইংল্যান্ডের হয়ে বিশ্বকাপে গ্যারি লিনেকারের ১০ গোলের রেকর্ড স্পর্শ করেন। একইসঙ্গে আন্তর্জাতিক ফুটবলে তার নেতৃত্ব আবারও ইংল্যান্ডকে এগিয়ে নিয়ে যায়।
ইংল্যান্ড বনাম ক্রোয়েশিয়া: পরিসংখ্যান
| পরিসংখ্যান | ইংল্যান্ড | ক্রোয়েশিয়া |
|---|---|---|
| বল দখল | ৫৪% | ৪৬% |
| মোট শট | ১৬ | ১১ |
| লক্ষ্যে শট | ১২ | ৬ |
| Expected Goals (xG) | ২.৪৫ | ১.৬৮ |
| কর্নার | ৬ | ৪ |
| ফাউল | ১১ | ১৪ |
| পাসিং সাফল্য | ৮৮% | ৮৪% |
বিশেষজ্ঞ বিশ্লেষণ
ইংল্যান্ডের দ্বিতীয়ার্ধের প্রেসিং ম্যাচ ঘুরিয়ে দেয়। বেলিংহ্যাম এবং কেনের সমন্বয় দুর্দান্ত। র্যাশফোর্ডের গতি ক্রোয়েশিয়ার ক্লান্ত ডিফেন্সকে ভেঙে দেয়। ইংল্যান্ডের রক্ষণভাগ এখনও উদ্বেগের কারণ। ক্রোয়েশিয়ার মাঝমাঠ প্রথমবারের মতো নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছে।
পর্তুগাল ১-১ ডিআর কঙ্গো
এনআরজি স্টেডিয়াম, হিউস্টন
বিশ্বকাপের সপ্তম দিনের সবচেয়ে বড় চমক।
পর্তুগালকে সবাই সহজ জয়ের দাবিদার মনে করলেও ডিআর কঙ্গো অসাধারণ শৃঙ্খলাবদ্ধ ফুটবল খেলে ম্যাচ থেকে এক পয়েন্ট তুলে নেয়।
ষষ্ঠ মিনিটে জোয়াও নেভেসের অসাধারণ হেডারে এগিয়ে যায় পর্তুগাল। কিন্তু এরপর ধীরে ধীরে ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ হারাতে থাকে রবার্তো মার্তিনেজের দল। এরপর তারা আর ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ কাজে লাগাতে পারেনি। দীর্ঘ সময় বলের দখল ধরে রাখলেও আক্রমণে কার্যকর হতে ব্যর্থ হয়। রক্ষণভাগের ভুল এবং হেড থেকে গোল খাওয়ার প্রবণতা বিশেষভাবে উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রথমার্ধের অতিরিক্ত সময়ে কর্নার থেকে সম্পূর্ণ অরক্ষিত অবস্থায় ইয়োনে উইসা গোল করে সমতা ফেরান।
রোনালদোকে নিঃশেষ করে দিল কঙ্গোর পরিকল্পনা
বিশ্বকাপে নিজের ষষ্ঠ আসরে খেলতে নেমেছিলেন ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো। ৪০ বছর বয়সী ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো এখনও বুদ্ধিদীপ্ত মুভমেন্ট করছেন। তবে তাকে যথেষ্ট মানসম্মত পাস ও সুযোগ তৈরি করে দিতে পারেননি ব্রুনো ফার্নান্দেস, বার্নার্দো সিলভারা। কিন্তু ডিআর কঙ্গোর রক্ষণাত্মক কাঠামো তাকে পুরোপুরি নিষ্ক্রিয় করে দেয়। পুরো ম্যাচে রোনালদোর লক্ষ্যে একটি শটও ছিল না। দ্বিতীয়ার্ধে বরং কঙ্গোই বেশি বিপজ্জনক দেখায়। সেড্রিক বাকাম্বু একবার পোস্টে আঘাত করেন।
ঐতিহাসিক অর্জন
এই ড্রয়ের মাধ্যমে ডিআর কঙ্গো বিশ্বকাপ ইতিহাসে প্রথম গোল এবং প্রথম পয়েন্ট অর্জন করল।
পর্তুগাল বনাম ডিআর কঙ্গো: পরিসংখ্যান
| পরিসংখ্যান | পর্তুগাল | ডিআর কঙ্গো |
| বল দখল | ৭৫% | ২৫% |
| মোট শট | ১৪ | ৭ |
| লক্ষ্যে শট | ৩ | ৪ |
| xG | ১.১০ | ১.০৫ |
| কর্নার | ৯ | ২ |
| ফাউল | ৮ | ১৮ |
| পাসিং সাফল্য | ৯৪% | ৭১% |
বিশেষজ্ঞ বিশ্লেষণ
কঙ্গোর লো-ব্লক ডিফেন্স অসাধারণ। পর্তুগাল বল দখল করলেও কেন্দ্রীয় আক্রমণ তৈরি করতে পারেনি। রোনালদোর জন্য পর্যাপ্ত সাপোর্ট ছিল না।
উজবেকিস্তান ১-৩ কলম্বিয়া
মেক্সিকো সিটি স্টেডিয়াম
বিশ্বকাপে অভিষেক হওয়া উজবেকিস্তানের জন্য এটি ছিল কঠিন পরীক্ষা। কলম্বিয়া শুরু থেকেই আক্রমণাত্মক কাউন্টার-প্রেসিং ফুটবল খেলতে থাকে। বিরতির আগে লুইস দিয়াজ গোল করে দলকে এগিয়ে দেন। দ্বিতীয়ার্ধে এলদর শোমুরোদভ পেনাল্টি থেকে সমতা ফেরালেও ম্যাচের শেষভাগে কলম্বিয়ার শারীরিক সক্ষমতা এবং গতি পার্থক্য গড়ে দেয়। জ্যামিন্টন কাম্পাজ এবং জন আরিয়াস গোল করে ম্যাচ নিশ্চিত করেন।
কলম্বিয়া বনাম উজবেকিস্তান: পরিসংখ্যান
| পরিসংখ্যান | কলম্বিয়া | উজবেকিস্তান |
| বল দখল | ৫৮% | ৪২% |
| মোট শট | ১৫ | ৯ |
| লক্ষ্যে শট | ৮ | ৩ |
| xG | ২.১৫ | ০.৯৫ |
| কর্নার | ৭ | ৩ |
| ফাউল | ১৩ | ১৫ |
| পাসিং সাফল্য | ৮৬% | ৭৯% |
বিশেষজ্ঞ বিশ্লেষণ
কলম্বিয়ার উইং আক্রমণ ছিল ম্যাচের মূল অস্ত্র। উজবেকিস্তান সাহসী ফুটবল খেলেছে। শেষ ২০ মিনিটে কলম্বিয়ার শারীরিক শক্তি পার্থক্য গড়ে দেয়।
ঘানা ১-০ পানামা
টরন্টো
পুরো ম্যাচজুড়ে ছিল কৌশলগত দাবার লড়াই। দুই দলই মাঝমাঠে সংগঠিত ব্লক তৈরি করে খেলছিল। ফলে গোলের সুযোগ তৈরি হচ্ছিল খুব কম। পানামা ড্র ধরে রাখার খুব কাছাকাছি পৌঁছে গিয়েছিল। কিন্তু ৯৫তম মিনিটে ট্রানজিশন পরিস্থিতিতে রক্ষণভাগের মনোযোগ হারানোর সুযোগ কাজে লাগান ক্যালেব ইয়ারেনকিই। দুর্দান্ত ফিনিশে তিনি ঘানাকে তিন পয়েন্ট এনে দেন।
ঘানা বনাম পানামা: পরিসংখ্যান
| পরিসংখ্যান | ঘানা | পানামা |
| বল দখল | ৪৯% | ৫১% |
| মোট শট | ১০ | ৬ |
| লক্ষ্যে শট | ৪ | ১ |
| xG | ১.০২ | ০.৪৪ |
| কর্নার | ৪ | ৫ |
| ফাউল | ১৬ | ১২ |
| পাসিং সাফল্য | ৮১% | ৮৩% |
বিশেষজ্ঞ বিশ্লেষণ
ঘানার ধৈর্য এবং ফিটনেস শেষ পর্যন্ত ফল দেয়। পানামা দীর্ঘ সময় রক্ষণে শৃঙ্খলাবদ্ধ ছিল। শেষ মুহূর্তের মনোযোগের ঘাটতি ম্যাচ হারায়।
গ্রুপ পরিস্থিতি
গ্রুপ K
| দল | ম্যাচ | পয়েন্ট |
| কলম্বিয়া | ১ | ৩ |
| পর্তুগাল | ১ | ১ |
| ডিআর কঙ্গো | ১ | ১ |
| উজবেকিস্তান | ১ | ০ |
কলম্বিয়া শুরুতেই শীর্ষে উঠে গেছে। পর্তুগালকে এখন পরবর্তী ম্যাচে জয় পেতেই হবে।
গ্রুপ L
| দল | ম্যাচ | পয়েন্ট |
| ইংল্যান্ড | ১ | ৩ |
| ঘানা | ১ | ৩ |
| ক্রোয়েশিয়া | ১ | ০ |
| পানামা | ১ | ০ |
ইংল্যান্ড গোল ব্যবধানে শীর্ষে। ঘানাও গুরুত্বপূর্ণ তিন পয়েন্ট তুলে নিয়েছে। ক্রোয়েশিয়া ও পানামার সামনে এখন কঠিন সমীকরণ।
দিনের সেরা খেলোয়াড়
হ্যারি কেন (ইংল্যান্ড)
- ২ গোল
- বিশ্বকাপে ইংল্যান্ডের হয়ে ১০ গোল
- ম্যাচসেরা নেতৃত্ব
- টুর্নামেন্টে শিরোপা দাবিদার
বিশ্বকাপের সপ্তম দিন দেখিয়ে দিল যে শুধু তারকার ঝলক নয়, কৌশল, শৃঙ্খলা এবং সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্তই বড় টুর্নামেন্টে পার্থক্য গড়ে দেয়। ইংল্যান্ড শিরোপা দৌড়ে নিজেদের অবস্থান আরও শক্ত করেছে। কলম্বিয়া আত্মবিশ্বাসী সূচনা করেছে। ডিআর কঙ্গো ইতিহাস লিখেছে। অন্যদিকে পর্তুগাল ও ক্রোয়েশিয়াকে দ্রুত নিজেদের দুর্বলতা কাটিয়ে উঠতে হবে, নইলে নকআউট পর্বের পথ কঠিন হয়ে উঠবে।

