Site icon Jist Feed

‘নিয়ম তৈরি করব, মেনে চলব না’: ব্রিকস নিয়ে ভারতীয় মঞ্চে পশ্চিমকে তুলোধোনা রুশ রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম RT-র

BRICS_Media

পাল্কি শর্মার সংবাদমাধ্যম ‘ইন্ডিয়া গ্লোবাল রিভিউ’ (IGR)-তে সাক্ষাৎকারে মোদী-পুতিন সম্পর্ক, ব্রিকসের ঐক্য ও পশ্চিমি সংবাদমাধ্যম নিয়ে মস্কোর সুর স্পষ্ট করলেন RT-র উপস্থাপক রোরি সুশে

নয়াদিল্লি, ১২ সেপ্টেম্বর: ব্রিকস সম্মেলন ঘিরে যখন নয়াদিল্লি সরগরম, ঠিক তখনই সাংবাদিক পাল্কি শর্মার সংবাদ-মঞ্চ ‘ইন্ডিয়া গ্লোবাল রিভিউ’ (IGR)-তে হাজির হলেন রাশিয়ার রাষ্ট্র-নিয়ন্ত্রিত আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম আরটি (RT)-র পরিচিত মুখ রোরি সুশে। “মস্কো থেকে দৃষ্টিভঙ্গি ঠিক কেমন ?”, পাল্কির এই প্রশ্নের উত্তরে খোলাখুলি নিজের ও রাশিয়ার অবস্থান তুলে ধরেন তিনি। ব্রিকস সম্মেলনের আন্তর্জাতিক গুরুত্ব বুঝতে যেমন সরকারি বিবৃতি বা কূটনৈতিক নথি জরুরি, তেমনই জরুরি রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম আসলে এই মঞ্চ নিয়ে কী বার্তা ছড়িয়ে দিতে চাইছে, তা-ও বোঝা, আর ঠিক সেই কারণেই এই সাক্ষাৎকারটি উল্লেখযোগ্য।

ডলারের ‘অস্ত্রীকরণ’ থেকে আত্মরক্ষার তাগিদ, আর মোদীর ‘নিয়ম-প্রণেতা’ হয়ে ওঠার বার্তা

সুশের মূল যুক্তি হল, আমেরিকা যখন ডলারকে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে, তখন অন্য দেশগুলি আত্মরক্ষার তাগিদেই ব্রিকস, আসিয়ান বা এসসিও-র মতো জোটে জড়ো হয়। তাঁর কথায়, সংখ্যায় শক্তি, আর পারস্পরিক সম্মান ও জবরদস্তিহীন বাণিজ্যের অভিন্ন আকাঙ্ক্ষাই এই জোটগুলোর ভিত্তি। তাঁর অভিযোগ, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প অতীতে ব্রিকসকে সরাসরি ‘শত্রু’ বলে অভিহিত করেছেন, আর ব্রিকসভুক্ত একাধিক দেশের উপর শুল্ক-যুদ্ধ চাপিয়ে বহুমেরু বিশ্বের অগ্রগতি রুখে ডলারের আধিপত্য টিকিয়ে রাখতে চাইছেন। প্রধানমন্ত্রী মোদী সম্মেলনে যে ক্ষমতার ‘পিরামিড’ নিয়ে কথা বলেছেন, যেখানে উপরে বসে থাকা কয়েকটি উন্নত দেশ সিদ্ধান্ত নেয়, আর নীচে থাকা উন্নয়নশীল দেশগুলিকে নিজেদের স্বার্থে সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার থেকে বঞ্চিত রাখা হয়, তার ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে সুশে বলেন, মোদী আসলে বোঝাতে চেয়েছেন, ব্রিকসভুক্ত দেশগুলি এখন নিয়ম মেনে চলা নয়, নিয়ম তৈরি করার পক্ষেই সরব হচ্ছে। তাঁর দাবি, ব্রিকসের কোনও সদস্য দেশ অন্য কোনও সদস্য দেশের উপর নিষেধাজ্ঞা চাপাতে পারে না, আর এটাই এই জোটের সবচেয়ে বড় শক্তি বলে মনে করেন তিনি।

পশ্চিমি সংবাদমাধ্যমকে ‘রাজনৈতিক যন্ত্র’ বলে কটাক্ষ

পশ্চিমি সংবাদমাধ্যম প্রসঙ্গে সুশে বিশেষ ভাবে আক্রমণাত্মক। তাঁর ভাষায়, পশ্চিমি সংবাদমাধ্যম ও রাজনৈতিক পরিমণ্ডল একটি “যন্ত্র” ছাড়া কিছু নয়, যারা মোদীর প্রশংসা করলেও ঘুরিয়ে প্রেসিডেন্ট পুতিন বা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংকে নিশানা করবে, আর ব্রিকসকে “নবিশদের দল” বলে দেগে দেওয়ার চেষ্টা করবে। তাঁর মতে, বিশ্ব এগিয়ে গিয়েছে অনেক দূর, কিন্তু জি-৭ তথা ইউরো-আটলান্টিক শিবির এখনও পুরনো ধ্যানধারণা আঁকড়ে বসে আছে, অনেকটা স্টেশনে দাঁড়িয়ে হাই-স্পিড ট্রেন ছেড়ে যাওয়া দেখার মতো। জার্মানি, ফ্রান্স ও ব্রিটেনের অর্থনীতি নিয়েও তীব্র সমালোচনা করেছেন তিনি, ইউরোপের ‘শিল্প-বিমুখ’ হয়ে পড়ার জন্য ইউক্রেন যুদ্ধ-পরবর্তী রুশ জ্বালানির উপর নিষেধাজ্ঞাকেই দায়ী করেছেন।

মোদী-পুতিন সম্পর্ক, ইউক্রেন-প্রসঙ্গ এবং নাবিক-মৃত্যুর প্রশ্ন

সাক্ষাৎকারে পাল্কি শর্মা প্রশ্ন তোলেন, দুই সপ্তাহেরও কম সময়ের মধ্যে মোদী-পুতিনের দ্বিতীয় বৈঠক নিয়ে মস্কোর ধারণা কী। সুশের জবাব, এই ধরনের উষ্ণ সাক্ষাৎ এখন আর অবাক করার মতো কিছু নয়, দুই নেতার পারস্পরিক আস্থার এটাই দৃষ্টান্ত। মোদী যে পুতিনকে সরাসরি বলেছেন, ইউক্রেন সংঘাতের অবসান হওয়া দরকার, সে কথাও স্বীকার করে নেন সুশে, তবে তাঁর দাবি, পুতিন এই মন্তব্যকে পূর্ণ সম্মানের সঙ্গেই গ্রহণ করেছেন। ট্রাম্প-পুতিনের আলাস্কা বৈঠক-পরবর্তী শান্তি-প্রচেষ্টার কথা তুলে সুশে অভিযোগ করেন, ইউরোপই কিয়েভে অর্থ ও অস্ত্র পাঠিয়ে সংঘাত দীর্ঘায়িত করছে।

পাল্কি শর্মা যখন রুশ হামলায় নিহত ভারতীয় নাবিকদের প্রসঙ্গ তোলেন, সুশে তখন কথা ঘুরিয়ে নিয়ে যান পারস্য উপসাগরে আমেরিকার হামলায় ভারতীয় নাবিকদের মৃত্যুর প্রসঙ্গে। এই অংশটি নিয়ে সামান্য বিভ্রান্তির অবকাশ থেকে যাচ্ছে, নীচের ছকে তা স্পষ্ট করার চেষ্টা করা হল।

RT-র ভাষ্য বনাম ভারতীয় বিদেশ মন্ত্রকের বিবৃতি : একনজরে

সাক্ষাৎকারে যা বলা হয়েছেস্বাধীন সূত্রে যা জানা যাচ্ছে
ভারতীয় নাবিকদের মৃত্যুর প্রসঙ্গ পারস্য উপসাগরে আমেরিকার হামলার দিকে ঘুরিয়ে দেওয়া হয়েছেভারতীয় বিদেশ মন্ত্রকের বিবৃতি অনুযায়ী, অন্তত পাঁচ জন ভারতীয় নাবিকের মৃত্যু হয়েছে কৃষ্ণসাগরে বাণিজ্যিক জাহাজে হামলায়, যেখানে রুশ ও ইউক্রেনীয়, উভয় পক্ষের হামলাই দায়ী বলে চিহ্নিত হয়েছে; নয়াদিল্লি দু’পক্ষের কাছেই আপত্তি জানিয়েছে
ইউরোপ শান্তি-প্রক্রিয়ায় আগ্রহী নয় বলে দাবি করা হয়েছে২০২৫-এর আলাস্কা সম্মেলন সত্যিই হয়েছিল, তবে শান্তি আলোচনা থমকে থাকার পিছনে ইউক্রেনের ভূখণ্ড, নিরাপত্তা-নিশ্চয়তা-সহ একাধিক জটিল ও বহুপাক্ষিক কারণ রয়েছে বলেই আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের রিপোর্ট বলছে, বিষয়টি একতরফা নয়
ব্রিকস সরাসরি পশ্চিমবিরোধী জোট হিসেবে তুলে ধরা হয়েছেপ্রধানমন্ত্রী মোদী নিজে বারবার স্পষ্ট করেছেন, ব্রিকস যেন বিশ্ব প্রতিষ্ঠানের ‘বিকল্প’ না হয়ে ওঠে এবং পশ্চিমবিরোধী তকমা এড়িয়ে চলে

ভারত-চিন সম্পর্ক ও ব্রিকসের ভবিষ্যৎ নিয়ে পর্যবেক্ষণ

জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে ভারতের স্থায়ী আসনের দাবির প্রসঙ্গ তুলে পাল্কি শর্মা জানতে চান, এই দাবিতে চিনের দীর্ঘদিনের আপত্তি নিয়ে মস্কোর অবস্থান কী। সুশে জানান, ভারত ও চিনের মধ্যে সম্পর্কে স্পষ্ট ‘উষ্ণতা’ লক্ষ করা যাচ্ছে, যদিও সীমান্ত সংক্রান্ত পুরনো টানাপড়েন যে ব্রিকসের অন্দরে এখনও একটি স্পর্শকাতর জায়গা, তা-ও অস্বীকার করেননি তিনি। ব্রিকসের ভবিষ্যৎ নিয়ে তাঁর মূল্যায়ন, ব্রাজিল-রাশিয়া-ভারত-চিন এই মূল অক্ষ মজবুত থাকলে গোটা জোট এগিয়ে যাবে; না হলে পূর্ণ সম্ভাবনার প্রয়োগ কঠিন হবে। তাঁর ভাষায়, ব্রিকস কোনও ‘কর্মহীন পরিবার’ নয়, বরং ‘বহু-কার্যকর পরিবার’, বিভিন্ন আকারের অর্থনীতি নিয়েও একযোগে এগিয়ে চলার সামর্থ্য রাখে এই জোট।

তথ্যসূত্র: IGR-এ প্রচারিত সাক্ষাৎকার, এবং যাচাইয়ের জন্য ব্যবহৃত আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা ও সরকারি বিবৃতির রিপোর্ট।

Exit mobile version