নয়াদিল্লি, ১৪ সেপ্টেম্বর: গত ১২ ও ১৩ সেপ্টেম্বর নয়াদিল্লির ভারত মণ্ডপমে বসেছিল অষ্টাদশ ব্রিকস (BRICS) শীর্ষ সম্মেলন। ব্রাজিল, রাশিয়া, চিন, দক্ষিণ আফ্রিকা, মিশর, ইথিওপিয়া, ইরান, সংযুক্ত আরব আমিরশাহি, ইন্দোনেশিয়া-সহ ১১টি সদস্য দেশের রাষ্ট্রপ্রধানেরা একজোট হয়ে সর্বসম্মতিক্রমে গ্রহণ করলেন ১৪০ দফার ‘নয়াদিল্লি ঘোষণাপত্র’। পহেলগাঁও সন্ত্রাসী হামলার নিন্দা থেকে রাষ্ট্রসঙ্ঘ সংস্কার, ইরান-আমিরশাহি সংঘাত থেকে বাংলাদেশের আচমকা গরহাজিরা, একের পর এক জটিল বিষয়ে ঐকমত্য তৈরি করে ভারত এই সম্মেলনে বড়সড় কূটনৈতিক সাফল্য দেখিয়েছে বলেই মত কূটনৈতিক মহলের। একই সঙ্গে, চিনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের নয়াদিল্লি সফর নিয়ে সমাজমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে একটি চাঞ্চল্যকর ‘বডি ল্যাঙ্গুয়েজ বিশ্লেষণ’, যেখানে দাবি করা হয়েছে, ভারতীয় গোয়েন্দা কর্তারা নাকি শি-র চালচলন খুঁটিয়ে দেখে তাঁর স্বাস্থ্য ও মনস্তত্ব সম্পর্কে সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন। ঘোষণাপত্রের আসল বিষয়বস্তু এবং সেই ভাইরাল দাবির পিছনের বাস্তবতা, দুটোই তথ্যসূত্র ধরে যাচাই করে দেখা হল এই প্রতিবেদনে।
একনজরে
- ১২-১৩ সেপ্টেম্বর, ভারত মণ্ডপম, নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিত হল অষ্টাদশ ব্রিকস সম্মেলন।
- সর্বসম্মতিক্রমে গৃহীত হল ১৪০ দফার ‘নয়াদিল্লি ঘোষণাপত্র’।
- পহেলগাঁও হামলার কড়া নিন্দা করল ব্রিকসের সব দেশ, যা মাস তিনেক আগে এসসিও-তে সম্ভব হয়নি।
- চিন ও রাশিয়া নাম করে ভারত ও ব্রাজিলের রাষ্ট্রসঙ্ঘে বৃহত্তর ভূমিকার দাবিকে সমর্থন জানাল।
- ভারতের উদ্যোগে ইরান ও সংযুক্ত আরব আমিরশাহির মধ্যে সংঘাতের প্রথম উচ্চপর্যায়ের বৈঠক হল দিল্লিতেই।
- নাবিকদের নিরাপত্তায় নয়া নেটওয়ার্কের প্রস্তাব দিলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী।
- আমন্ত্রণ নিয়ে বিতর্কে সম্মেলনে গরহাজির রইল বাংলাদেশ, পর্যালোচনার মুখে ১০০-রও বেশি দ্বিপাক্ষিক চুক্তি।
- শি জিনপিং সাত বছর পরে ভারতে এলেন, কিন্তু তাঁকে নিয়ে ছড়ানো ‘গোয়েন্দা বিশ্লেষণ’ আদতে যাচাইযোগ্য নয়।
ঘোষণাপত্র জিনিসটা আসলে কী, কেন এত কঠিন কাজ
যে কোনও আন্তর্জাতিক সম্মেলনের শেষে একটি যৌথ ঘোষণাপত্র তৈরি হয়, যাতে সদস্য দেশগুলির অভিন্ন অবস্থান লিপিবদ্ধ থাকে। ব্রিকসের ক্ষেত্রে এই ঘোষণাপত্রের নামকরণ হয় যে শহরে সম্মেলন হচ্ছে, তার নামে, যেমন ২০২৪ সালের কাজ়ান ঘোষণাপত্র, ২০২৫ সালের রিও দি জেনেইরো ঘোষণাপত্র, আর এ বার নয়াদিল্লি ঘোষণাপত্র। এই নথি তৈরি হওয়ার প্রক্রিয়া মোটেই সহজ নয়। প্রতিটি দেশের আমলারা খসড়া পড়ে নিজ নিজ সরকারের কাছে আপত্তির জায়গাগুলি তুলে ধরেন, তার পরে ফের আলোচনা, ফের সংশোধন, এই ভাবেই এগোয় খসড়া। ব্রিকসে কোনও গরিষ্ঠতার ভিত্তিতে ভোটাভুটি হয় না, লাগে পূর্ণ সর্বসম্মতি। একটি দেশও আপত্তি জানালে গোটা প্রক্রিয়া আটকে যেতে পারে।
ব্রিকস বিশ্বের প্রায় অর্ধেক জনসংখ্যা এবং বিশ্ব অর্থনীতির একটি বড় অংশের প্রতিনিধিত্ব করে। এত বিপুল সংখ্যক দেশ, যাদের নিজেদের মধ্যে বহু ক্ষেত্রে সম্পর্ক জটিল বা প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক, তাদের সবাইকে একটি অভিন্ন নথিতে সই করানো, এটাই আয়োজক দেশের আসল কূটনৈতিক পরীক্ষা। ভারতের ক্ষেত্রে সেই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার প্রমাণ মিলল সম্মেলনের শেষে, যখন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী নিজে ঘোষণা করেন যে, কোনও সদস্য দেশই আপত্তি তোলেনি।
এসসিও-তে ধাক্কা, ব্রিকসে জয়: পহেলগাঁও নিয়ে ভারতের অবস্থান
এই কূটনৈতিক সাফল্য বুঝতে গেলে ফিরে তাকাতে হবে কয়েক মাস পিছনে। ২০২৫ সালের ২২ এপ্রিল জম্মু-কাশ্মীরের পহেলগাঁওয়ে সন্ত্রাসী হামলায় প্রাণ যায় ২৬ জনের। লস্কর-ই-তইবার ছায়া সংগঠন টিআরএফ (দ্য রেজিস্ট্যান্স ফ্রন্ট) এই হামলার দায় স্বীকার করে, আর ভারত সরাসরি অভিযোগ তোলে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে। এই হামলারই জবাবে ভারত চালায় ‘অপারেশন সিঁদুর’। তার দু’মাস পরে, জুন মাসে চিনের চিংদাওয়ে অনুষ্ঠিত এসসিও (সাংহাই কোঅপারেশন অর্গানাইজেশন) প্রতিরক্ষামন্ত্রীদের বৈঠকে যে যৌথ বিবৃতির খসড়া তৈরি হয়, তাতে পহেলগাঁওয়ের কোনও উল্লেখ ছিল না, অথচ পাকিস্তানের বালুচিস্তানে জাফর এক্সপ্রেস অপহরণের প্রসঙ্গ ছিল। প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিংহ সেই খসড়ায় সই করতে অস্বীকার করেন, ফলে সেবার কোনও যৌথ বিবৃতিই প্রকাশ পায়নি।
তিন মাস পরে নয়াদিল্লিতে সম্পূর্ণ উল্টো ছবি। ব্রিকসের ১৪০ দফা ঘোষণাপত্রে সরাসরি এবং কড়া ভাষায় পহেলগাঁও হামলার নিন্দা করা হয়েছে, নিহতের সংখ্যা-সহ। উল্লেখযোগ্য বিষয়, চিন নিজেও এই নিন্দায় সহমত হয়েছে। তবে একটি বিষয়ে স্পষ্টতা দরকার, ঘোষণাপত্রে পাকিস্তানের নাম সরাসরি নেওয়া হয়নি, সাধারণ ভাবে সন্ত্রাসবাদের নিন্দা করা হয়েছে। অর্থাৎ ভারতের এই কূটনৈতিক জয় হামলার প্রতি বিশ্বের সম্মিলিত নিন্দা আদায়ের জয়, পাকিস্তানকে প্রকাশ্যে দায়ী সাব্যস্ত করানোর জয় নয়।
রাষ্ট্রসঙ্ঘ সংস্কার নিয়ে ঠিক কী বলা হয়েছে
সমাজমাধ্যমে ছড়ানো আলোচনায় প্রায়ই বলা হচ্ছে, চিন নাকি রাষ্ট্রসঙ্ঘ সংস্কারের পক্ষে সাধারণ সমর্থন জানালেও ভারতের নিরাপত্তা পরিষদে স্থায়ী আসনের দাবিকে নির্দিষ্ট ভাবে সমর্থন করেনি। ঘোষণাপত্রের প্রকৃত পাঠ কিন্তু তার চেয়ে খানিকটা স্পষ্ট। নথিতে সরাসরি লেখা হয়েছে, নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্য হিসেবে চিন ও রাশিয়া রাষ্ট্রসঙ্ঘে, বিশেষত নিরাপত্তা পরিষদে, বৃহত্তর ভূমিকা পালনের জন্য ভারত ও ব্রাজিলের আকাঙ্ক্ষাকে সমর্থন করার কথা পুনর্ব্যক্ত করেছে। অর্থাৎ ভারতের নাম নিয়েই সমর্থনের কথা লেখা আছে ঘোষণাপত্রে। তবে এখানেও বাস্তবতা মনে রাখা জরুরি, এই সমর্থন স্থায়ী, ভেটো-ক্ষমতাসম্পন্ন আসনের সুনির্দিষ্ট প্রতিশ্রুতি নয়, কোনও সময়সীমাও বেঁধে দেওয়া হয়নি। রাষ্ট্রসঙ্ঘ সংস্কারের প্রক্রিয়া বাস্তবে কী রূপ নেবে, তা এখনও অনেকটাই অনিশ্চিত।
ইরান-আমিরশাহি সমঝোতা এবং নাবিকদের নিরাপত্তার প্রস্তাব
সম্মেলনের অন্যতম কঠিন চ্যালেঞ্জ ছিল ইরান ও সংযুক্ত আরব আমিরশাহির মধ্যে সংঘাত। ২০২৬ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের উপরে আমেরিকা-ইজ়রায়েলের যৌথ হামলার পরে তেহরান পাল্টা আঘাত হানে উপসাগরীয় দেশগুলিতে থাকা মার্কিন ঘাঁটিতে, যার আঁচ পড়ে আমিরশাহিতেও। অগস্টে আল মিনহাদ বিমানঘাঁটিতে ইরানি হামলার পরে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে। এমন আবহে ১২ সেপ্টেম্বর নয়াদিল্লিতে ব্রিকস সম্মেলনের ফাঁকে ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের সঙ্গে বৈঠক করেন আমিরশাহির যুবরাজ শেখ খালেদ বিন মহম্মদ বিন জায়েদ আল নাহিয়ান, সংঘাত শুরুর পরে দুই দেশের মধ্যে এটাই সর্বোচ্চ পর্যায়ের যোগাযোগ। দুই পক্ষ সংযম বজায় রাখার আহ্বান জানিয়ে যৌথ বিবৃতিও দেয়। কূটনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, এই বৈঠক সম্ভব হয়েছে মূলত ভারতের পর্দার আড়ালের উদ্যোগেই।
সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী মোদী প্রস্তাব দেন ‘সিফেয়ারার্স এমার্জেন্সি সাপোর্ট নেটওয়ার্ক’ তৈরির, যার লক্ষ্য সংঘাতপ্রবণ এলাকায় আটকে পড়া বাণিজ্যিক জাহাজের নাবিকদের জরুরি সহায়তা দেওয়া, চিকিৎসা সহায়তা থেকে পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ, উদ্ধারকাজ পর্যন্ত। যে দিন এই প্রস্তাব দেওয়া হয়, সে দিনই ছিল রাষ্ট্রসঙ্ঘের আন্তর্জাতিক দক্ষিণ-দক্ষিণ সহযোগিতা দিবস।
বাংলাদেশের গরহাজিরা এবং সম্পর্কে জটিলতা
সম্মেলনে সবচেয়ে আলোচিত অনুপস্থিতি ছিল বাংলাদেশের। অগস্ট মাসে ভারত বিমসটেক, আসিয়ান, আফ্রিকান ইউনিয়ন, উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদ-সহ একাধিক আঞ্চলিক জোটের বর্তমান চেয়ারদের আমন্ত্রণ জানায়। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারিক রহমান তখন বিমসটেকের চেয়ার হিসেবে আমন্ত্রিত হন। কিন্তু ঢাকার তরফে দাবি করা হয়, তাঁকে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে পৃথক ভাবে আমন্ত্রণ জানানো হয়নি। পরিস্থিতি সামলাতে গিয়ে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবীর প্রকাশ্যে প্রশ্ন তোলেন, “আমরা কী ভাবে যাব? বাংলাদেশ সরকারের কাউকে কি আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে?” শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশ কোনও প্রতিনিধিই পাঠায়নি নয়াদিল্লিতে, অথচ রাশিয়ার পুতিন কিংবা মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমের মতো নেতারা ঠিকই যোগ দিয়েছেন। পাশাপাশি, ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের ১০০-রও বেশি দ্বিপাক্ষিক চুক্তি এখন পর্যালোচনার মুখে বলে জানিয়েছে ঢাকা।
তবে এই সিদ্ধান্ত নিয়ে বাংলাদেশের অন্দরেই প্রশ্ন উঠেছে। ঢাকার একটি সংবাদপত্রে প্রকাশিত রিপোর্ট অনুযায়ী, শি জিনপিং, পুতিন, মোদীর মতো একাধিক রাষ্ট্রনেতার উপস্থিতিতে যে কূটনৈতিক সুযোগ তৈরি হয়েছিল, প্রোটোকলের প্রশ্নে আটকে গিয়ে তা হাতছাড়া করাটা বাংলাদেশের কূটনৈতিক পরিপক্বতার অভাবকেই তুলে ধরে। বাণিজ্য, জ্বালানি নিরাপত্তা, প্রযুক্তি নিয়ে চিন ও রাশিয়ার সঙ্গে সরাসরি আলোচনার যে সুযোগ ছিল, তা-ও হাতছাড়া হয়েছে বলে মত সেই প্রতিবেদনের।
সম্মেলনের একনজরে তথ্যপঞ্জি
| বিষয় | তথ্য |
|---|---|
| সম্মেলন | অষ্টাদশ ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলন |
| স্থান ও সময় | ভারত মণ্ডপম, নয়াদিল্লি; ১২-১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬ |
| থিম | ‘বিল্ডিং ফর রেজ়িলিয়েন্স, ইনোভেশন, কোঅপারেশন অ্যান্ড সাসটেনেবিলিটি’ |
| সদস্য দেশ | ব্রাজিল, রাশিয়া, ভারত, চিন, দক্ষিণ আফ্রিকা, মিশর, ইথিওপিয়া, ইরান, সংযুক্ত আরব আমিরশাহি, ইন্দোনেশিয়া (মোট ১১) |
| ঘোষণাপত্র | ১৪০ দফার ‘নয়াদিল্লি ঘোষণাপত্র’, সর্বসম্মতিক্রমে গৃহীত |
| উল্লেখযোগ্য অতিথি | রাশিয়া, মালয়েশিয়া, কাজ়াখস্তান, ফিলিপিন্সের নেতারা-সহ প্রায় ৪০০টি বৈঠক, ৩০টি শহর জুড়ে |
| পরবর্তী আয়োজক | চিন (২০২৭) |
শি জিনপিংয়ের সফর: যা সত্যিই ঘটেছে
চিনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং ১২ সেপ্টেম্বর নয়াদিল্লি পৌঁছন, প্রায় সাত বছর পরে তাঁর প্রথম ভারত সফর, শেষ বার এসেছিলেন ২০১৯ সালের অক্টোবরে চেন্নাইয়ে (মহাবলীপুরম) অনানুষ্ঠানিক শীর্ষ বৈঠকে। বিমানবন্দরে লাল গালিচা আর ঐতিহ্যবাহী নাচের মধ্য দিয়ে তাঁকে স্বাগত জানানো হয়। শনিবার সন্ধ্যায় হয় মোদী-শি দ্বিপাক্ষিক বৈঠক, পরপর তৃতীয় বছর দুই নেতার সাক্ষাৎ, এর আগে কাজ়ান (২০২৪) ও তিয়েনচিনে এসসিও সম্মেলনে (২০২৫) দেখা হয়েছিল তাঁদের। আলোচনার মূল বিষয় ছিল সীমান্ত পরিস্থিতি, বাণিজ্য ও দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক, যদিও প্রকৃত সীমান্ত বিরোধ (২০২০ সালের গালওয়ান সংঘর্ষে ২০ জন ভারতীয় ও চার জন চিনা সেনার মৃত্যুর পর থেকে যা অমীমাংসিতই রয়ে গিয়েছে) এখনও মেটেনি। সংবাদমাধ্যমের রিপোর্ট অনুযায়ী, শি প্রধানমন্ত্রী মোদীর দেওয়া নৈশভোজ এড়িয়ে গিয়েছিলেন, এটি একটি প্রকাশিত তথ্য, তবে এর অর্থ নিয়ে জল্পনা না করাই বিচক্ষণতা, কারণ কূটনৈতিক সূচিতে এমন পরিবর্তন অস্বাভাবিক নয়। রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন পৌঁছন শি-র একদিন আগে, ১১ সেপ্টেম্বর, ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর (২০২২) পরে রাশিয়ার বাইরে এটিই তাঁর প্রথম সশরীর ব্রিকস সম্মেলনে যোগদান।
ভাইরাল ‘বডি ল্যাঙ্গুয়েজ বিশ্লেষণ’: দাবি বনাম বাস্তবতা
শি জিনপিংয়ের এই সফর ঘিরেই সমাজমাধ্যমে ছড়িয়েছে একটি ভিডিয়ো ভাষ্য, যেখানে দাবি করা হয়েছে— বিমান থেকে নামার সময় শি-র হাঁটাচলা, হাতের ভঙ্গি, হাসি, বসার ভঙ্গি বিশ্লেষণ করে ভারতীয় “গোয়েন্দা অপারেটিভরা” নাকি নির্ধারণ করেছেন যে তাঁর শারীরিক কোনও দুর্বলতা নেই, এবং তাঁর আচরণে ‘উষ্ণতা’র বদলে ছিল হিসেবি ‘কৌশলগত ধৈর্য’। ভিডিয়োটিতে পুতিনের তুলনায় শি-র ‘শীতল’ বডি ল্যাঙ্গুয়েজের কথাও বলা হয়েছে, এবং প্রসঙ্গক্রমে তোলা হয়েছে শি-র স্বাস্থ্য নিয়ে অতীতের জল্পনার কথাও।
এই ধরনের বিশ্লেষণ পড়ার আগে কয়েকটি বিষয় মাথায় রাখা দরকার। প্রথমত, ভারত সরকার বা কোনও দায়িত্বশীল সূত্র থেকে এমন কোনও মূল্যায়ন প্রকাশ্যে নিশ্চিত করা হয়নি, গোটা দাবিটির উৎস একটিই অনলাইন ভিডিয়ো, যেখানে গোয়েন্দা পরিভাষার মোড়কে ব্যক্তিগত ব্যাখ্যা পরিবেশন করা হয়েছে। দ্বিতীয়ত, কয়েক সেকেন্ডের ফুটেজ দেখে কারও স্বাস্থ্য বা মানসিক অবস্থা নির্ণয় করা কোনও স্বীকৃত সাংবাদিকতা বা কূটনৈতিক পদ্ধতি নয়, এ ধরনের ব্যাখ্যা সম্পূর্ণত বিষয়ীগত। তৃতীয়ত, শি জিনপিংয়ের স্বাস্থ্য বা রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে জল্পনা নতুন কিছু নয়। ২০১২ সালে ক্ষমতায় আসার ঠিক আগে টানা দু’সপ্তাহ প্রকাশ্যে না আসায় জল্পনা ছড়ায়। ২০২২ সালে এসসিও সম্মেলনের পরে কিছু দিন প্রকাশ্যে না আসায় ভারতীয় সংবাদমাধ্যমেই ছড়ায় তাঁর ‘গৃহবন্দি’ হওয়ার গুজব, যা পরে ভিত্তিহীন প্রমাণিত হয়। ২০২৪-২৫ সালেও তাঁর অসুস্থতা ও পদত্যাগের চাপ নিয়ে একই ধরনের অপ্রমাণিত দাবি ছড়িয়েছিল কিছু ইউটিউব চ্যানেল ও নির্বাসিত সংগঠনের সূত্রে। প্রতিবারই সময়ের সঙ্গে সেই জল্পনা মিথ্যা প্রমাণিত হয়েছে।
| ভাইরাল ভিডিয়োর দাবি | যাচাইকৃত তথ্য |
|---|---|
| ভারতীয় “গোয়েন্দা অপারেটিভরা” শি-র শারীরিক ভাষা বিশ্লেষণ করে স্বাস্থ্য নিয়ে সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন | সরকারি বা কোনও দায়িত্বশীল সূত্র এমন মূল্যায়ন প্রকাশ্যে নিশ্চিত করেনি; দাবিটি একটি অনলাইন ভাষ্যকারের নিজস্ব ব্যাখ্যা মাত্র |
| আচরণ দেখে শি-র ‘কৌশলগত অভিপ্রায়’ বোঝা গিয়েছে | আচরণ দেখে মানসিক অবস্থা নির্ণয় স্বীকৃত পদ্ধতি নয়, সম্পূর্ণ বিষয়ীগত ব্যাখ্যা |
| শি-র স্বাস্থ্য নিয়ে জল্পনা এই প্রথম | ২০১২, ২০২২ ও ২০২৪-২৫ সালেও একই ধরনের অপ্রমাণিত জল্পনা ছড়িয়েছিল, প্রতিবারই তা ভিত্তিহীন প্রমাণিত হয়েছে |
| শি সাত বছর পরে ভারতে এলেন, পুতিনের একদিন পরে | সত্য, শেষ সফর ২০১৯-এ চেন্নাইয়ে; পুতিন ১১ সেপ্টেম্বর, শি ১২ সেপ্টেম্বর দিল্লি পৌঁছন |
| মোদী-শি বৈঠক এই প্রথম | ভুল, পরপর তৃতীয় বছর সাক্ষাৎ, আগে কাজ়ান ও তিয়েনচিনে দেখা হয়েছে |
বিশেষজ্ঞ বিশ্লেষণ
কূটনৈতিক পর্যবেক্ষকদের একাংশের মতে, চিনের মতো তুলনামূলক অস্বচ্ছ ব্যবস্থায় নেতৃত্বের প্রকৃত অবস্থা বাইরে থেকে বোঝা কঠিন বলেই একে ঘিরে নানা কল্পকাহিনি তৈরি হয়, বিশ্লেষকরা যাকে বলেন ‘ন্যারেটিভ ট্র্যাপ’ বা আখ্যানের ফাঁদ। তথ্যের ফাঁকফোকর নিজে থেকেই একটা গল্প তৈরি করে ফেলে, আর সেই গল্প যত নাটকীয় হয়, তত বিশ্বাসযোগ্য মনে হয়, যদিও তার সত্যতার কোনও প্রমাণ থাকে না। শি জিনপিংকে ঘিরে গত এক দশকে এমন জল্পনা বারবার ফিরে এসেছে, আর প্রতিবারই বাস্তবে তার কোনও ভিত্তি মেলেনি।
আসল কূটনীতির মূল্যায়ন হওয়া উচিত ঘোষণাপত্রের প্রকৃত ভাষা, দ্বিপাক্ষিক বৈঠকের ফলাফল আর তার পরবর্তী পদক্ষেপ দিয়ে, কোনও নেতার হাঁটাচলার ভঙ্গি বিশ্লেষণ করে নয়। পুতিনের তুলনায় শি-র প্রোটোকল-সর্বস্ব ব্যবহারও ব্যাখ্যা করা যায় অনেক সহজ কারণে, রাশিয়ার সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক দীর্ঘদিনের ও তুলনামূলক সহজ, অন্য দিকে ভারত-চিন সম্পর্কে এখনও সীমান্ত বিরোধের জটিলতা রয়ে গিয়েছে। কূটনৈতিক শৈলীর এই ফারাক বোঝার জন্য গোয়েন্দা তত্ত্বের প্রয়োজন পড়ে না।
শেষ কথা
নয়াদিল্লি ঘোষণাপত্র প্রমাণ করে, সদস্য দেশগুলির মধ্যে গভীর মতবিরোধ সত্ত্বেও ভারত ব্রিকসকে একটি অভিন্ন অবস্থানে নিয়ে যেতে পেরেছে— পহেলগাঁও নিন্দা থেকে ইরান-আমিরশাহি সমঝোতা পর্যন্ত, এই সাফল্য নথিভুক্ত ও যাচাইযোগ্য। অন্য দিকে, শি জিনপিংকে নিয়ে ছড়ানো ‘বডি ল্যাঙ্গুয়েজ বিশ্লেষণ’ এখনও পর্যন্ত অপ্রমাণিত অনলাইন জল্পনার বাইরে কিছু নয়। দুটোকে গুলিয়ে না ফেলাই পাঠকের জন্য সবচেয়ে জরুরি— একটি সরকারি নথির ভাষা, অন্যটি একটি ভিডিয়ো ভাষ্যকারের ব্যক্তিগত অনুমান।
তথ্যসূত্র: ভারত সরকারের প্রধানমন্ত্রী দফতর ও পিআইবি-র প্রকাশিত ঘোষণাপত্র; রয়টার্স, আলজাজিরা, এএনআই, পিটিআই-সহ একাধিক সংবাদ সংস্থার প্রতিবেদন।

