Site icon Jist Feed

প্লাস্টিকের দাপটে সংকটে পাটচাষ, হুগলির বলাগড়ে জুটমিল খুললে লাভের আশা চাষিদের

Jute googly

আঁশ ছাড়ানোর পরে পাট মাথায় নিয়ে বাড়ি ফিরছেন এক চাষি, হুগলির বলাগড়ে —নিজস্ব চিত্র

এক বছরে সামান্য বাড়ল চাষের এলাকা, তবু জলের আকাল আর শ্রমিক-সংকটে নাজেহাল চাষিরা

বলাগড়, হুগলি: প্লাস্টিকের দাপটে ক্রমশ কমছে পাটজাত জিনিসের চাহিদা, আর তার সরাসরি প্রভাব পড়ছে চাষের জমিতে। হুগলির বলাগড় ব্লকের চাষিদের দাবি, বন্ধ হয়ে থাকা জুটমিলগুলি খুললে তবেই পাটের দাম বাড়বে এবং চাষে ফিরবে লাভ।

জেলার মধ্যে সবচেয়ে বেশি পাট চাষ হয় হুগলির বলাগড় ব্লকেই। রাজ্যে মূলত দু’ধরনের পাট হয় তিতা ও মিঠা। বলাগড়ের বেশিরভাগ জমিতেই চাষ হয় মিঠা পাটের।

ব্লক কৃষি দফতর সূত্রে জানা গিয়েছে, চলতি বছরে বলাগড়ে ৪,২৫০ হেক্টর জমিতে পাট চাষ হয়েছে, গত বছর (২০২৫) যা ছিল ৪,০৫০ হেক্টর। অর্থাৎ, গত বছরের তুলনায় এ বছর চাষের এলাকা কিছুটা বেড়েছে। কিন্তু ১০ বছর আগের ছবিটা ছিল অন্যরকম। তখন বলাগড়ে প্রায় ৬,০০০ হেক্টর জমিতে পাট চাষ হত। এখন তা অনেকটাই কমে গিয়েছে, যার মূল কারণ শ্রমিকের অভাব এবং চাষের খরচ বেড়ে যাওয়া।

ব্লকের ১৩টি পঞ্চায়েতেই কমবেশি পাট চাষ হয়। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য এলাকাগুলি হল

পঞ্চায়েতপাটচাষের জমি (হেক্টর)
বাকুলিয়া৭২৫
জিরাট৫৮২
চরকৃষ্ণবাটি৫১৮
সিজা কামালপুর৪৭৭
তেঁতুলবেড়িয়া৩৮২
ডুমুরদহ নিত্যানন্দপুর ১৩৭৪
শ্রীপুর৩৫৭
ডুমুরদহ নিত্যানন্দপুর ২১৭০
গুপ্তিপাড়া ২৬০
গুপ্তিপাড়া ১৩৮

এখন পাট কাটার সময়। কাটার পরে খাল বা ডোবায় পচিয়ে আঁশ ছাড়ানো হয়, যার জন্য প্রয়োজন পর্যাপ্ত জল আর দক্ষ শ্রমিকের। চাষিদের অভিযোগ, প্রয়োজনের তুলনায় জল অপ্রতুল, সঙ্গে মিলছে না পর্যাপ্ত শ্রমিকও।

খালের জলে পাট পচিয়ে আঁশ ছাড়ানোর কাজে ব্যস্ত চাষিরা, বলাগড়ে —নিজস্ব চিত্র

চাষিদের হিসেবে, এক বিঘা জমিতে পাট চাষ করতে এখন খরচ পড়ছে ২০ থেকে ২২ হাজার টাকা। কুইন্টাল-প্রতি দাম ১৫ থেকে ১৬ হাজার টাকা না হলে লোকসানের মুখে পড়তে হয়। বর্তমানে জুট কর্পোরেশন অফ ইন্ডিয়া (JCI) সরকারি দরে পাট কিনছে কুইন্টাল-প্রতি ৫,৯২৫ টাকায়, আর খোলা বাজারে দাম ঘোরাফেরা করছে ১১ থেকে ১২ হাজার টাকার মধ্যে। বাজারদর ওঠানামা করায় পাট বিক্রি করতেও সমস্যায় পড়ছেন চাষিরা।

চাষিদের একটাই দাবি বন্ধ হয়ে থাকা জুটমিলগুলি দ্রুত খুলতে হবে। তাতে পাটের চাহিদা বাড়বে, দামও মিলবে ভাল। নতুন সরকার ক্ষমতায় এসে মিল খোলার উদ্যোগ নিয়েছে। তবে চাষিদের বক্তব্য, প্লাস্টিক ব্যাগের ব্যবহারও বন্ধ করতে হবে। তাতে একদিকে যেমন পাটের বাজার ফিরবে, তেমনই রক্ষা পাবে পরিবেশও।

কৃষিপ্রধান বলাগড়ে এখনও অধিকাংশ মানুষ নির্ভরশীল চাষের উপরেই। এখানকার মাটি উর্বর। পাট বাঁচানো মানে আসলে তাঁদের সংসার বাঁচানো। পাটের পরেই এই এলাকায় শুরু হয় পেঁয়াজ চাষ।

চাষিদের কথায়

চরখয়রামারি এলাকার পাটচাষি রসময় বৈদ্যর কথায়, “পাট চাষে খরচ অনেক। এক বিঘা জমিতে খরচ হয় কুড়ি থেকে বাইশ হাজার টাকা। দর ১৫ থেকে ১৬ হাজার টাকা না হলে চাষি কোনও ভাবেই বাঁচতে পারবে না। কখনও পাটের বাজার বাড়ছে, আবার কখনও কমে যাচ্ছে। সরকারের কাছে আমাদের দাবি, দাম ১৫ হাজার টাকার নীচে থাকলে লাভ হবে না। প্লাস্টিক আসার আগে মানুষ পাটের বস্তাই ব্যবহার করত।”

আর এক চাষি অসীম ঘোষালের বক্তব্য, “বিগত সরকার কলকারখানা বন্ধ করে দিয়ে গিয়েছিল, নতুন সরকার সেগুলি চালু করার চেষ্টা করছে। প্রথম দিকে পাটের দাম ১৫ হাজার টাকা হয়েছিল, কিন্তু আস্তে আস্তে তা নেমে এসেছে ১০-১১ হাজারে। পাট মজুত রাখারও কোনও জায়গা নেই আমাদের, কারণ আমরা গরিব চাষি, তাই অল্প দামেই ব্যবসায়ীদের কাছে বিক্রি করে দিতে হয়। চটকল খুললে চাষিরাই লাভবান হবেন। সরকার যদি JCI-র মাধ্যমে সংরক্ষণের ব্যবস্থা করে, তা হলে ভাল হয়। কারখানা খুললে অনেকে কাজ পাবেন, সেখানে পাটেরও প্রয়োজন হবে। তাই কারখানা খোলা হোক।”

পাটচাষি স্বপন মণ্ডল গোঁসাইয়ের কথায়, “চাষের বাজার ভাল হয়েছিল, কিন্তু মাঝখানে সেই দাম অনেকটাই কমে যায়। অন্যান্য বার পাটের দাম ৮ হাজার টাকা থাকে, এ বার তা অনেকটাই বেশি। তবে গত বছরের তুলনায় এ বছর শ্রমিকের মজুরি একশো টাকা বেড়েছে। চাষ করতে গিয়ে অনেক টাকা খরচ হচ্ছে, একদিকে শ্রমিকের সমস্যা, তেমনই সারের দামও প্রতি বস্তায় বাড়ছে। তাতেই সমস্যায় পড়ছেন ক্ষুব্ধ চাষিরা।”

পাটচাষি বাপ্পা দাসের কথায়, “গত তিন-চার বছরের তুলনায় এ বছর পাটের বাজার একটু ভাল, ফলনও ভাল হয়েছে। এ বছর ১০ বিঘা জমিতে পাট চাষ করেছি। বিঘাপ্রতি খরচ হয়েছে ১৭ হাজার টাকা, তাতে লাভ হবে সামান্যই। আমরা স্থানীয় মহাজনদের কাছেই পাট বিক্রি করি, তবে সরকারি দর অনুযায়ী দাম পাচ্ছি না। গতবারের তুলনায় চাষ কিছুটা বাড়লেও খরচ বেড়েছে প্রচণ্ড পরিমাণে। সারের দাম বেড়েছে। নিজের জমি না থাকলে খাজনা নিয়ে চাষ করতে হয়, সেই জমির জন্যও লাগে অনেক টাকা। সরকার সারের দাম কমালে প্রত্যেক চাষিই উপকৃত হবেন। চটের বস্তার চাহিদা আর সে ভাবে দেখাই যায় না, কারণ সব দিকে প্লাস্টিক ছেয়ে গিয়েছে। সরকার প্লাস্টিক বন্ধের নির্দেশ দিলেও, কম খরচের জন্য সকলেই তা ব্যবহার করছেন।”

মন্ত্রীর বক্তব্য

বলাগড়ের বিধায়ক তথা মন্ত্রী সুমনা সরকার বলেন, “চাষিদের জন্য মুখ্যমন্ত্রী ভাবছেন। বিগত সরকারের আমলে দাম ছিল ৬ হাজার টাকা, আমরা ক্ষমতায় আসার পরে তা ৯ হাজার টাকা করা হয়েছে। চাষিদের কথা যেমন ভাবা হচ্ছে, তেমনই বন্ধ হয়ে থাকা জুটমিলগুলিও ফের খুলে দেওয়া হয়েছে। মুখ্যমন্ত্রী পাটচাষিদের জন্য আগে থেকেই ভেবে রেখেছিলেন। বন্ধ জুটমিল খুলেছে, নিশ্চয়ই চাষিরা পাটের ভাল দাম পাবেন। সংরক্ষণের ব্যবস্থা করা গেলে সেটাও আমরা নিশ্চয়ই করব। এই সরকার সবে ১০০ দিন পার করেছে, তবে এই বিষয়ে আমরা নিশ্চয়ই কথা বলব।”

Exit mobile version