Site icon Jist Feed

লোকসানের মুখে আলু চাষ, আলু-সরিষার বিকল্পে লাভজনক কৃষির পথে হুগলীর চাষীরা: পশ্চিমবঙ্গে ক্যাপসিকাম চাষে নতুন দিগন্ত

Capsicum Farming at Hoogly

চিত্র : শুভজিৎ বসু

নদী চলার পথে বাধা পেলে , গতিপথ পাল্টে ঠিক তার রাস্তা খুঁজে নেয়। মানুষের জীবিকাও ঠিক তেমনি। সমস্যা থেকেই সমাধানের পথ বের হয়। এটাই চিরন্তন সত্য। দীর্ঘদিন ধরে হুগলী জেলার প্রধান ফসল ছিল আলু ও সরিষা। তবে বাজারের অনিশ্চয়তা এবং উৎপাদন ঝুঁকির কারণে বর্তমানে কৃষক লাভের মুখ দেখছেন না। সরকারের দিক থেকেও কোনো ইতিবাচক কার্যকরী দীর্ঘমেয়াদি সমাধান পাওয়া যাচ্ছেনা। ইতিমধ্যে তিনজন আলু চাষির আত্মহত্যার খবর সামনে এসেছে। তাই বাজারের অনিশ্চয়তা এবং উৎপাদন ঝুঁকির কারণে দূরদৃষ্টি সম্পন্ন কৃষকেরা এখন ব্যক্তিগত উদ্যোগে বিকল্প ফসল হিসেবে ক্যাপসিকামকে বেছে নিয়েছেন । হুগলী জেলার ধনিয়াখালি ব্লকের বেলমুড়ি গ্রাম পঞ্চায়েতের কানাজুলি, রাধাবল্লভপুর, জোথারান, খাজুরদহ ও মেলকি সহ একাধিক গ্রামের চাষীরা এ বছর উল্লেখযোগ্যভাবে ক্যাপসিকাম চাষের দিকে ঝুঁকেছেন।

চাষের সময় ও পদ্ধতি

ক্যাপসিকাম বীজ বপনের উপযুক্ত সময় আগস্ট থেকে অক্টোবর (ভাদ্র-কার্তিক)। দোআঁশ বা বেলে দোআঁশ মাটি এই চাষের জন্য সবচেয়ে উপযোগী। জমিকে ৪-৫ বার গভীর চাষ করে এবং মই দিয়ে ঝুরঝুরে করে নিতে হয়। মাটির সঙ্গে প্রায় এক-তৃতীয়াংশ জৈব সার (কম্পোস্ট বা গোবর) মেশানো আবশ্যক।

২৫-৩০ দিন বয়সী চারা বিকেলের দিকে রোপণ করা হয় এবং প্রতিটি চারার মধ্যে ১.৫ থেকে ২ ফুট দূরত্ব রাখা হয়। চারা লাগানোর পর নিয়মিত জৈব সার প্রয়োগ করতে হয়। ফুল আসার পর প্রতি ১৫ দিন অন্তর জৈব তরল সার বা নাইট্রোজেন ও ফসফরাসসমৃদ্ধ সার ব্যবহার করলে ফলন ভালো হয়।

উৎপাদন ও লাভের হিসাব

স্থানীয় চাষী সঞ্জীব হেমরম জানান, প্রায় ৫০০ বিঘা জমিতে এ বছর ক্যাপসিকাম চাষ হচ্ছে। এক বিঘা জমিতে চাষ করতে খরচ হয় প্রায় ৩০,০০০ থেকে ৪০,০০০ টাকা। কিন্তু সঠিক পরিচর্যা করলে লাভ দাঁড়ায় ১.৫ থেকে ২ লক্ষ টাকা পর্যন্ত। ফলে আলু চাষের তুলনায় এই ফসল অনেক বেশি লাভজনক হয়ে উঠেছে।

পশ্চিমবঙ্গের জেলা ভিত্তিক ক্যাপসিকাম উৎপাদন

রাজ্যের মধ্যে কিছু নির্দিষ্ট জেলা ক্যাপসিকাম উৎপাদনে এগিয়ে রয়েছে—

এই জেলাগুলো মিলেই রাজ্যের মোট উৎপাদনের বড় অংশ যোগান দেয়।

সারা দেশে পশ্চিমবঙ্গের অবস্থান: বাস্তব চিত্র

বর্তমানে পশ্চিমবঙ্গ মোট উৎপাদনের দিক থেকে দেশের অন্যতম শীর্ষ ক্যাপসিকাম উৎপাদক, তবে প্রযুক্তিনির্ভর ও রপ্তানিযোগ্য উৎপাদনে অন্যান্য রাজ্য এগিয়ে। ২০২৪–২৫ এবং ২০২৫–২৬ অর্থবছরে মোট উৎপাদন আনুমানিক ১,৬২,৩৭১ টন, যদিও আগের বছরের তুলনায় উৎপাদনে প্রায় ১.৬৫% হ্রাস লক্ষ্য করা গেছে।

পশ্চিমবঙ্গ মূলত খোলা মাঠে, স্বাভাবিক আবহাওয়ায় বৃহৎ পরিসরে কম খরচে উৎপাদনের জন্য পরিচিত।

অন্যদিকে—

কর্ণাটক, মহারাষ্ট্র, তামিলনাড়ু, হিমাচল প্রদেশ এই রাজ্যগুলি পলিহাউস প্রযুক্তি ব্যাবহার করে উচ্চমানের রঙিন ক্যাপসিকাম (লাল, হলুদ) উৎপাদনে এগিয়ে, যা সুপারমার্কেট ও রপ্তানি বাজারের জন্য উপযুক্ত ।

২০২৫ সালের সম্ভাব্য তথ্য অনুযায়ী পলিহাউস বা প্রটেক্টেড ফার্মিং ব্যবহারের করে উত্তর ২৪ পরগনা ও দক্ষিণ ২৪ পরগনা জেলা ।  বাণিজ্যিক ক্যাপসিকাম চাষে অন্যতম প্রধান এলাকা, হিসাবে পরিচিতি লাভ করেছে।

পলিহাউস প্রযুক্তি: সারা বছর উৎপাদনের চাবিকাঠি

পলিহাউস (Polyhouse) হল একটি নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে চাষের পদ্ধতি, যেখানে তাপমাত্রা, আর্দ্রতা ও আলো নিয়ন্ত্রণ করা যায়। পলিহাউস ব্যবহারে ফলন প্রায় ২–৩ গুণ বৃদ্ধি পায়

সুবিধা:

খরচ (প্রায় হিসাব):

উৎপাদন ও ফলনের চিত্র

সূচকওপেন ফিল্ড চাষপলিহাউস/গ্রীনহাউস
ফলন২০–৪০ টন/হেক্টর৮০–১০০ টন/হেক্টর
সময়৪–৫ মাস৭–১০ মাস
উৎপাদন স্থায়িত্বমৌসুমিসারা বছর

বাজার ও রপ্তানি সম্ভাবনা

বর্তমানে পশ্চিমবঙ্গের ক্যাপসিকাম শুধু রাজ্যের মধ্যে নয়, বরং—

দেশের মধ্যে যাচ্ছে: দিল্লি, উত্তরপ্রদেশ, বিহার, ঝাড়খণ্ড

আন্তর্জাতিক বাজারে: বাংলাদেশ, নেপাল প্রভৃতি দেশে রপ্তানি হচ্ছে

উন্নত পলিহাউস ব্যবস্থায় উৎপাদিত রঙিন ক্যাপসিকামের আন্তর্জাতিক বাজারে দাম আরও বেশি পাওয়া যায়।

বিশ্ববাজারে ভারতের জন্য সুযোগ

বিশ্ববাজারে ক্যাপসিকাম একটি উচ্চমূল্যের সবজি হিসেবে দ্রুত জনপ্রিয়তা পেয়েছে। স্বাস্থ্য সচেতনতা বৃদ্ধি, ফাস্ট ফুড ও হোটেল শিল্পের বিস্তার এবং প্রসেসড ফুড সেক্টরের চাহিদা বৃদ্ধির কারণে এর আমদানি ক্রমাগত বাড়ছে।

উন্নত প্যাকেজিং, কোল্ড স্টোরেজ ও পলিহাউস চাষের মাধ্যমে ভারত সহজেই এই আন্তর্জাতিক বাজারে বড় অংশীদার হতে পারে।

শীর্ষ ক্যাপসিকাম আমদানিকারক দেশ

বিশ্ববাজারে ক্যাপসিকামের বড় ক্রেতা মূলত ইউরোপ, উত্তর আমেরিকা ও মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলি।

উন্নত দেশ ও আবহাওয়াগত সীমাবদ্ধ দেশগুলিই ক্যাপসিকামের প্রধান আমদানিকারক, যেখানে সারা বছর চাহিদা স্থির থাকে। বিশ্বে ক্যাপসিকামের চাহিদা দ্রুত বাড়ছে এবং আমদানিকারক দেশগুলির তালিকা থেকে স্পষ্ট যে এটি একটি শক্তিশালী আন্তর্জাতিক বাজার তৈরি করেছে।

সরকারি সহায়তা ও ভর্তুকি

পলিহাউস চাষে সরকার বিভিন্ন প্রকল্পের মাধ্যমে ভর্তুকি দেয়—

১. MIDH (Mission for Integrated Development of Horticulture)

২. National Horticulture Board (NHB)

৩. রাজ্য সরকারের কৃষি প্রকল্প (West Bengal Horticulture Mission)

সঠিক প্রযুক্তি, সরকারি সহায়তা এবং বাজার ব্যবস্থার উন্নতি হলে— কৃষকের প্রকৃত খরচ অনেক কমে আসে এবং লাভের সম্ভাবনা বাড়ে।এই চাষ পশ্চিমবঙ্গের গ্রামীণ অর্থনীতিকে আরও শক্তিশালী করে তুলবে, এমনটাই আশা করছেন চাষীরা। সঠিক পরিকল্পনা ও প্রযুক্তি ব্যবহার করলে ভারতের কৃষকরা—বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গের তথা ভারতের চাষীরা—এই বৈশ্বিক বাজারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পারেন।

Exit mobile version