ভারতে জেনেটিক্যালি মডিফায়েড (GM) বীজ নিয়ে বিতর্ক ক্রমশ তীব্র হচ্ছে। একদিকে এর সমর্থকেরা প্রযুক্তিগত উন্নতির কথা বলছেন, অন্যদিকে সমালোচকেরা এর সম্ভাব্য ক্ষতিকর দিকগুলি নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তুলছেন। মূল প্রশ্ন রয়ে গেছে—এই প্রযুক্তি কি সত্যিই ভারতের কৃষির জন্য উপকারী, নাকি দীর্ঘমেয়াদে ঝুঁকিপূর্ণ?
সমর্থকদের মতে, GM বীজ কৃষিক্ষেত্রে উৎপাদন বাড়াতে এবং পোকামাকড়ের আক্রমণ কমাতে সহায়ক হতে পারে। কিছু ক্ষেত্রে কীটনাশকের ব্যবহার কমানো সম্ভব হয়েছে বলেও দাবি করা হয়। এছাড়া জলবায়ু পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে খরা বা লবণাক্ততা সহনশীল ফসল তৈরির সম্ভাবনার কথাও তুলে ধরা হচ্ছে।
তবে সমালোচকেরা এই দাবিগুলিকে প্রশ্নবিদ্ধ করছেন। তাদের মতে, সব GM ফসলেই উৎপাদন বাড়ে—এমন কোনো সার্বজনীন প্রমাণ নেই। বরং অনেক ক্ষেত্রেই প্রচলিত জাতের ফসল উন্নয়নের মাধ্যমে বেশি ফলন পাওয়া সম্ভব।
জেনেটিক্যালি মডিফায়েড (GM) সরিষা, যা আনুষ্ঠানিকভাবে DMH-11 নামে পরিচিত, তা নিয়ে বিতর্ক আরও তীব্র আকার ধারণ করেছে।স্বদেশী জাগরণ মঞ্চ (SJM)-এর জাতীয় সহ-সমন্বয়ক ড. অশ্বিনী মহাজনের মতে, হাইব্রিড সরিষা DMH-11-এর উৎপাদন প্রতি হেক্টরে প্রায় ২,২০০ কেজি, যেখানে ভারতের কিছু প্রচলিত গবেষণাভিত্তিক জাত ইতিমধ্যেই প্রতি হেক্টরে ৪,০০০ কেজি পর্যন্ত ফলন দিচ্ছে—কোনো জেনেটিক পরিবর্তন ছাড়াই। তিনি বলেন, GM প্রযুক্তি গ্রহণের বদলে ঐতিহ্যবাহী জাতগুলির উন্নয়নই বেশি যুক্তিযুক্ত।
পরিবেশগত দিক থেকে সবচেয়ে বড় উদ্বেগ হলো জীববৈচিত্র্যের ক্ষতি। GM ফসলের কারণে স্থানীয় ও ঐতিহ্যবাহী বীজের ব্যবহার কমে যেতে পারে। এছাড়া পরাগায়নের মাধ্যমে GM ও অ-GM ফসলের মিশ্রণ ঘটার আশঙ্কা রয়েছে, যা প্রাকৃতিক ভারসাম্য নষ্ট করতে পারে। কিছু গবেষণায় উপকারী পোকামাকড়ের ওপর এর নেতিবাচক প্রভাবের কথাও বলা হয়েছে।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো রাসায়নিকের ব্যবহার। হার্বিসাইড-সহনশীল GM ফসলের ক্ষেত্রে আগাছা দমনে বেশি মাত্রায় রাসায়নিক ব্যবহার হতে পারে, যার ফলে “সুপার আগাছা” তৈরি হওয়ার ঝুঁকি বাড়ে এবং মাটি ও জল দূষিত হতে পারে।
কৃষকদের ক্ষেত্রেও উদ্বেগ কম নয়। GM বীজ সাধারণত বেশি দামী এবং অনেক ক্ষেত্রে কৃষকরা সেই বীজ পুনরায় ব্যবহার করতে পারেন না। ফলে প্রতি মৌসুমে নতুন বীজ কিনতে হয়, যা বড় কর্পোরেট সংস্থার ওপর নির্ভরতা বাড়ায় এবং ছোট কৃষকদের ওপর আর্থিক চাপ সৃষ্টি করে।
বাণিজ্যিক ক্ষেত্রেও ঝুঁকি রয়েছে বলে মনে করা হয়। অনেক দেশ অ-GM খাদ্যপণ্যকে অগ্রাধিকার দেয়। এই পরিস্থিতিতে ভারত যদি GM ফসলের দিকে এগোয়, তাহলে তার “নন-GM” পরিচিতির সুবিধা হারানোর আশঙ্কা রয়েছে।
স্বাস্থ্য সংক্রান্ত বিষয়েও বিতর্ক রয়েছে। যদিও এখনো পর্যন্ত GM খাদ্য সরাসরি ক্ষতিকর—এমন সুস্পষ্ট বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই, তবুও দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব নিয়ে প্রশ্ন রয়ে গেছে এবং সম্ভাব্য অ্যালার্জির ঝুঁকির কথাও উত্থাপিত হয়েছে।
জেনেটিক্যালি মডিফায়েড (GM) বীজের ক্ষেত্রে একটি বড় প্রশ্ন হলো এর ব্যবসায়িক প্রভাব (business impact)।
GM বীজের বাজার মূলত কয়েকটি বড় আন্তর্জাতিক কোম্পানির হাতে কেন্দ্রীভূত। এই কোম্পানিগুলোর ওপরই কৃষকদের অনেকটা নির্ভর করতে হয়। বিশ্বের প্রধান ছয়টি বড় কোম্পানি হলো—
- Bayer (যার সঙ্গে Monsanto যুক্ত হয়েছে)
- Corteva
- Syngenta
- BASF
- Dow AgroSciences
- DuPont
এই কোম্পানিগুলো GM বীজ তৈরি করে এবং অনেক ক্ষেত্রে এগুলোর ওপর পেটেন্ট থাকে।
সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো—
👉 কৃষকরা এই GM বীজ নিজেরা সংরক্ষণ করে পরের বছর ব্যবহার করতে পারেন না।
👉 প্রতি বছর নতুন করে বীজ কিনতে হয়।
এর ফলে কী হয়?
- বীজের দাম অনেক বেশি হয়
- কৃষকদের খরচ বেড়ে যায়
- বড় কোম্পানির ওপর নির্ভরতা বাড়ে
- ছোট ও মাঝারি কৃষকরা আর্থিক চাপে পড়ে
যদি ফসল ভালো না হয়, তাহলে কৃষকদের ক্ষতি আরও বেড়ে যায়। তাই অনেকেই মনে করেন, এই ব্যবস্থা দীর্ঘমেয়াদে কৃষকদের জন্য লোকসানের কারণ হতে পারে।
সহজভাবে বললে, GM বীজের ব্যবসা বড় কোম্পানিগুলোর হাতে থাকায় কৃষকদের স্বাধীনতা কমে যায় এবং খরচ বাড়ে—এটাই প্রধান উদ্বেগ।
সবশেষে, নিয়ন্ত্রক ব্যবস্থার স্বচ্ছতা ও কঠোরতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। অনেকের মতে, GM ফসল অনুমোদনের আগে আরও বিস্তৃত, নিরপেক্ষ এবং স্বচ্ছ বৈজ্ঞানিক মূল্যায়ন প্রয়োজন।
এই প্রেক্ষাপটে স্পষ্ট যে GM বীজ নিয়ে বিতর্ক শুধু বৈজ্ঞানিক নয়, বরং এটি পরিবেশ, অর্থনীতি এবং কৃষকদের ভবিষ্যতের সঙ্গেও গভীরভাবে জড়িত। তাই কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে সব দিক বিবেচনা করা জরুরি।

