২৯ জুন, ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬-রাউন্ড অব ৩২ এর নকআউট পর্বের ১৯তম দিন ফুটবলপ্রেমীদের উপহার দিল একের পর এক রোমাঞ্চকর মুহূর্ত। পেনাল্টি শুটআউটে চারবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন জার্মানিকে বিদায় করল প্যারাগুয়ে। একইভাবে মরক্কো নাটকীয়ভাবে হারিয়ে দিল নেদারল্যান্ডসকে। অন্যদিকে, শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত লড়াই করে অতিরিক্ত সময়ের যোগ করা মিনিটে গোল করে জাপানের বিরুদ্ধে জয় নিশ্চিত করল পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ব্রাজিল।
🇵🇾 প্যারাগুয়ে ১–১ জার্মানি 🇩🇪 (প্যারাগুয়ে ট্রাইবেকারে ৪-৩ ব্যবধানে জয়ী)
ম্যাচের অধিকাংশ সময় বলের দখল ছিল জার্মানির। কিন্তু আক্রমণে ধার না থাকায় সেই আধিপত্য কাজে লাগাতে পারেনি ইউরোপীয় দলটি। ৪২ মিনিটে হুলিও এনসিসোর গোলে এগিয়ে যায় প্যারাগুয়ে। ৫৪ মিনিটে কাই হাভার্টজ হেডে সমতা ফেরান। অতিরিক্ত সময়ে জনাথন তাহ গোল করলেও ভিএআর পরীক্ষার পর সেটি বাতিল হয়। শেষ পর্যন্ত ম্যাচ গড়ায় টাইব্রেকারে। সেখানে অসাধারণ মানসিক দৃঢ়তা দেখিয়ে ৪-৩ ব্যবধানে জিতে ইতিহাস গড়ে প্যারাগুয়ে।
বিশেষজ্ঞদের বিশ্লেষণ
ফুটবল বিশ্লেষকদের মতে, গুস্তাভো আলফারোর রক্ষণভিত্তিক কৌশল ছিল ম্যাচের মূল চাবিকাঠি। মাত্র ২৪ শতাংশ বল দখলে রেখেও তারা জার্মানির আক্রমণকে কার্যত নিষ্ক্রিয় করে রাখে। প্রথমার্ধে জার্মানির ২৫৩টি পাসের বিশাল ব্যবধান থাকলেও তাদের আক্রমণভাগ ছিল পুরোপুরি ধারহীন। কোচ জুলিয়ান নাগেলসম্যানের বল দখলে রাখার কৌশলটি কার্যকর হলেও, তাতে কোনো আগ্রাসী ভাব ছিল না। ফলে প্যারাগুয়ের গোলরক্ষক অরল্যান্ডো গিলকে প্রথমার্ধে কোনো কঠিন পরীক্ষার মুখে পড়তে হয়নি। প্যারাগুয়ের কোচ গুস্তাভো আলফারো রক্ষণভাগের একটি দুর্দান্ত ব্লুপ্রিন্ট তৈরি করেছিলেন। তারা জার্মানিকে বল খেলার সুযোগ দিয়ে নিজেদের ডি-বক্সের জায়গা ছোট করে ফেলে। এরপর ডানপ্রান্তে মিগুয়েল আলমিরনের গতিকে কাজে লাগিয়ে পাল্টা আক্রমণ চালিয়ে জার্মান রক্ষণভাগকে পুরোপুরি বিপর্যস্ত করে দেয়।
ম্যাচ পরিসংখ্যান
| পরিসংখ্যান | প্যারাগুয়ে | জার্মানি |
|---|---|---|
| বলের দখল | ২৪% | ৭৬% |
| শট (লক্ষ্যে) | ৫ (২) | ১৮ (৪) |
| সফল পাস | ১৬৫ | ৭১০ |
| কর্নার | ৩ | ১১ |
| ফাউল | ১৬ | ৯ |
| ফলাফল | পেনাল্টিতে ৪-৩ জয় | বিদায় |
🇲🇦 মরক্কো ১–১ নেদারল্যান্ডস 🇳🇱 (মরক্কো ট্রাইবেকারে ৩-২ ব্যবধানে জয়ী)
৭২ মিনিটে কোডি গাকপোর গোলে এগিয়ে গিয়েছিল নেদারল্যান্ডস। কিন্তু যোগ করা সময়ের প্রথম মিনিটে কর্নার থেকে ইসা ডিওপের গোল ম্যাচে নতুন প্রাণ ফেরায়। টাইব্রেকারে আবারও নায়ক গোলরক্ষক বোনো। তিনি গুরুত্বপূর্ণ সেভ করে মরক্কোকে এগিয়ে দেন।শেষ শটটি সফলভাবে নিয়ে মরক্কোকে শেষ ষোলোয় পৌঁছে দেন ইসমাইল সাইবারি।
বিশেষজ্ঞদের বিশ্লেষণ
বিশ্লেষকদের মতে, মরক্কো মাঠের ডানদিক ব্যবহার করে নেদারল্যান্ডসের মিডফিল্ড প্রেস ভাঙার চেষ্টা করেছিল। এক্ষেত্রে আশরাফ হাকিমির ওভারল্যাপ এবং ড্রিবলিং মরক্কোকে দারুণ সুবিধা দেয়। আশরাফ হাকিমির ডান প্রান্তের আক্রমণ এবং দ্রুত ট্রানজিশন মরক্কোর বড় অস্ত্র ছিল। কোডি গাকপোর গোলের পর ডাচ দল রক্ষণাত্মক হয়ে পড়ে, যা তাদের জন্য কাল হয়ে দাঁড়ায়। ম্যাচের একেবারে শেষ মুহূর্তে (৯০+১ মিনিটে) মরক্কোর ডিফেন্ডার ইসা দিওপ গোল করে ম্যাচ অতিরিক্ত সময়ে নিয়ে যান। এরপর পেনাল্টি শুটআউটে মরক্কোর গোলরক্ষক বোনোর মনস্তাত্ত্বিক দক্ষতার কাছে ডাচ পেনাল্টি শ্যুটাররা পরাস্ত হন। অন্যদিকে, এগিয়ে যাওয়ার পর নেদারল্যান্ডস অতিরিক্ত রক্ষণাত্মক হয়ে পড়ায় শেষ মুহূর্তে মূল্য দিতে হয়।
ম্যাচ পরিসংখ্যান
| পরিসংখ্যান | মরক্কো | নেদারল্যান্ডস |
|---|---|---|
| বলের দখল | ৫২% | ৪৮% |
| শট (লক্ষ্যে) | ১১ (৫) | ৯ (৪) |
| ড্রিবল (সফল) | ১৯ (১০) | ১২ (৫) |
| সেভ | ৩ | ৪ |
| ফাউল | ১৮ | ১৯ |
| ফলাফল | পেনাল্টিতে ৩-২ জয় | বিদায় |
🇧🇷 ব্রাজিল ২–১ জাপান 🇯🇵
শুরু থেকেই দুর্দান্ত লড়াই করে জাপান। ২৯ মিনিটে কাইশু সানোর গোলে এগিয়ে যায় এশিয়ার প্রতিনিধিরা। দ্বিতীয়ার্ধে কাসেমিরো সমতা ফেরানোর পরও জাপানের রক্ষণ ভাঙতে হিমশিম খাচ্ছিল ব্রাজিল। অবশেষে যোগ করা সময়ের পঞ্চম মিনিটে গ্যাব্রিয়েল মার্টিনেল্লির গোল ব্রাজিলকে রক্ষা করে।
বিশেষজ্ঞদের বিশ্লেষণ
প্রথমার্ধে জাপানের কাইশু সানোর দুর্দান্ত গোলের পর ব্রাজিলের মিডফিল্ড খেই হারিয়ে ফেলেছিল। তবে দ্বিতীয়ার্ধে কোচ কার্লো আনচেলত্তির কৌশল পরিবর্তন ব্রাজিলকে ম্যাচে ফিরিয়ে আনে। তিনি ব্রুনো গুইমারেসকে একটু ওপরের দিকে খেলিয়ে জাপানের সুশৃঙ্খল রক্ষণব্যূহ ভাঙতে সক্ষম হন। বিরতির পর কোচ কার্লো আনচেলত্তির কৌশলগত পরিবর্তন ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। ব্রুনো গিমারায়েসকে আরও সামনে খেলিয়ে ব্রাজিল আক্রমণের গতি বাড়ায়। জাপান দীর্ঘ সময় অসাধারণ শৃঙ্খলা বজায় রাখলেও শেষদিকে ক্লান্তির সুযোগ নেয় ব্রাজিল। বিশ্লেষকরা জাপানের প্রতি-আক্রমণের (counter-attack) ভূয়সী প্রশংসা করেছেন। জাপানি দল প্রায় ৫৫ মিনিট পর্যন্ত ব্রাজিলের আক্রমণ সামলে রেখেছিল। তবে ম্যাচের শেষ মুহূর্তে ব্রাজিলের রিজার্ভ বেঞ্চের খেলোয়াড়দের শক্তির কাছে জাপানি ফুটবলাররা ক্লান্ত হয়ে পড়ে।
ম্যাচ পরিসংখ্যান
| পরিসংখ্যান | ব্রাজিল | জাপান |
|---|---|---|
| বলের দখল | ৬১% | ৩৯% |
| শট (লক্ষ্যে) | ১৪ (৬) | ৮ (৩) |
| পোস্টে বল | ১ | ০ |
| কর্নার | ৭ | ৪ |
| ফাউল | ১১ | ১৪ |
| ফলাফল | ২-১ জয় | বিদায় |
বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে আবারও প্রমাণ হলো শুধু তারকাখচিত দলই নয়, সঠিক কৌশল, মানসিক দৃঢ়তা এবং সুযোগের সদ্ব্যবহারই বড় ম্যাচের ভাগ্য নির্ধারণ করে। প্যারাগুয়ে ও মরক্কো ইতিহাস গড়ে শেষ ষোলোয় জায়গা করে নিল, আর ব্রাজিল শেষ মুহূর্তের জয়ে টিকে থেকে শিরোপার লড়াইয়ে নিজেদের আশা অটুট রাখল।
About The Author
Discover more from Jist Feed
Subscribe to get the latest posts sent to your email.
