Site icon Jist Feed

ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬: কেপ ভার্দের বিরুদ্ধে রুদ্ধশ্বাস জয় আর্জেন্টিনার, শেষ বত্রিশে বিদায় নিল ঘানা-অস্ট্রেলিয়া, উঠল কলম্বিয়া-মিশর

fwc_day_23

৩-৪ জুলাই, ২০২৬: ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬-এর শেষ বত্রিশের শেষ দিনটি ফুটবলপ্রেমীদের উপহার দিল এমন এক রাত, যা বহুদিন মনে রাখবে গোটা ফুটবল-বিশ্ব। মিয়ামিতে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনাকে অতিরিক্ত সময় পর্যন্ত কাঁপিয়ে দিল ক্ষুদ্র দ্বীপরাষ্ট্র কেপ ভার্দে, কানসাস সিটিতে দৃঢ়তার সঙ্গে ঘানাকে হারিয়ে শেষ ষোলো নিশ্চিত করল কলম্বিয়া, আর ডালাসে স্নায়ুর লড়াইয়ে অস্ট্রেলিয়াকে টাইব্রেকারে হারিয়ে ইতিহাস গড়ল মিশর। তিনটি ম্যাচ মিলিয়ে ফুটে উঠল একটাই বার্তা ৪৮ দলের এই বিশ্বকাপ ছোট দলগুলোর জন্য এনে দিয়েছে স্বপ্ন দেখার সাহস।

আর্জেন্টিনা ৩-২ কেপ ভার্দে (অতিরিক্ত সময়ে)

মিয়ামি স্টেডিয়ামে খেলা শুরুর আগে কে ভেবেছিল, বিশ্বের ৬৭ নম্বর র‍্যাঙ্কিংয়ের এক দ্বীপরাষ্ট্র বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের ঘাম ছুটিয়ে দেবে ১২০ মিনিট ধরে! প্রথমার্ধের ২৯ মিনিটে লিওনেল মেসি লিসান্দ্রো মার্তিনেজের একটি নিখুঁত থ্রু বল ধরে গোলরক্ষক ভোজিনহাকে পরাস্ত করে আর্জেন্টিনাকে এগিয়ে দেন। বিশ্বকাপে এটি ছিল মেসির ২০তম গোল, যা তাঁকে ফের সোনার বুটের দৌড়ে এগিয়ে রাখল।

কিন্তু কেপ ভার্দে দমে যাওয়ার দল নয়। ৫৯ মিনিটে দেরয় দুয়ার্তের নিখুঁত ফিনিশে সমতায় ফেরে “ব্লু শার্কস”রা। অতিরিক্ত সময়ে ফের এগিয়ে যায় আর্জেন্টিনা ক্রিস্তিয়ান রোমেরোর হেড থেকে। কিন্তু ১০৩ মিনিটে সিদনি লোপেস কাব্রালের এক অবিশ্বাস্য দূরপাল্লার শটে ফের সমতা ফেরায় কেপ ভার্দে, যা ইতিমধ্যেই বিশ্বকাপের ইতিহাসের অন্যতম সেরা গোল হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। শেষ পর্যন্ত ১১১ মিনিটে মেসির কর্নার থেকে দিনেই বর্গেসের গায়ে লেগে বল জালে জড়ালে (আত্মঘাতী গোল) স্বস্তি ফেরে আর্জেন্টিনা শিবিরে। ম্যাচ শেষে বিশেষজ্ঞদের মত, বল হারানোর পরেই দ্রুত রক্ষণে সংগঠিত হতে না পারাই ছিল আর্জেন্টিনার মূল দুর্বলতা। উল্টোদিকে, মাত্র পাঁচ লক্ষ মানুষের দেশ কেপ ভার্দের ফুটবলাররা যেভাবে বিশ্বের এক নম্বর দলের বিরুদ্ধে লড়াই চালিয়ে গেলেন, তা রীতিমতো বিস্ময়কর।

আলোচনার টেবিলে: ছোট দেশের বড় লড়াই

ম্যাচ-পরবর্তী আলোচনায় বিশ্বের তাবড় ফুটবল বিশেষজ্ঞদের হৃদয়ে জায়গা করে নিয়েছে কেপ ভার্দের এই লড়াই । একজন বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, “কেপ ভার্দে হেরে গেলেও আসলে জিতে নিয়েছে গোটা বিশ্বের হৃদয়। এই পারফরম্যান্স আগামী প্রজন্মকে ফুটবলের দিকে টেনে আনবে, এটা নিশ্চিত।” ভারতের প্রাক্তন ফুটবলাররা মনে করেন, “ভারতের মতো দেশেরও এখান থেকে শেখার আছে অনেক কিছু। জনসংখ্যা বা সম্পদ নয়, সংগঠন আর দৃঢ় প্রতিজ্ঞাই তৈরি করতে পারে প্রতিযোগিতামূলক ফুটবল দল কেপ ভার্দে তার জ্বলন্ত উদাহরণ।” আলোচনায় বারবার উঠে আসে মেসির প্রসঙ্গও। প্যানেলের মতে, ২০২২ কাতার বিশ্বকাপ জয়ের পরেও মেসির খেলায় যেন নতুন এক পরিণতমনস্কতা ধরা পড়ছে এবারের আসরে গতি কিছুটা কমলেও বল বিতরণ ও ম্যাচ পড়ার ক্ষমতায় তিনি যেন আরও শাণিত। আর্জেন্টিনা এখন শেষ ষোলোয় মুখোমুখি হবে মিশরের।

কলম্বিয়া ১-০ ঘানা

কানসাস সিটি স্টেডিয়ামে এদিন শুরু থেকেই আধিপত্য বিস্তার করে কলম্বিয়া। ঘানা রক্ষণাত্মক কৌশল নিয়ে মাঠে নামলেও তা কাজে আসেনি। মাত্র ১৪ মিনিটেই এগিয়ে যায় কলম্বিয়া লুইস সুয়ারেজের নিখুঁত ক্রস থেকে জোন আরিয়াস সহজেই বল জালে জড়ান।

এরপর পুরো ম্যাচেই বল দখলে (৫৪ শতাংশ) এবং আক্রমণে স্পষ্ট প্রাধান্য বজায় রাখে কলম্বিয়া। লুই দিয়াজ দুবার ব্যবধান বাড়ানোর সুযোগ পেলেও একবার অফসাইডের কারণে বাতিল হয় গোল, আরেকবার নষ্ট হয় সহজ সুযোগ। ঘানার গোলরক্ষক আতি জিগি একের পর এক দুর্দান্ত সেভ করে দলকে বড় ব্যবধানে হার থেকে বাঁচান গোটা ৯০ মিনিটে ঘানা লক্ষ্যে একটিও শট রাখতে পারেনি।

বিশেষজ্ঞদের মতে, কলম্বিয়ার রক্ষণ সংগঠন ও নিয়ন্ত্রিত আক্রমণ তাদের এই বিশ্বকাপের অন্যতম “ডার্ক হর্স” তকমা এনে দিয়েছে। কোচ নেস্তর লরেঞ্জোর ছাত্ররা এবার শেষ ষোলোয় মুখোমুখি হবে সুইজারল্যান্ডের। ঘানার বিশ্বকাপ অভিযান এখানেই শেষ হয়ে গেল।

অস্ট্রেলিয়া ১-১ মিশর (টাইব্রেকারে মিশরের ৪-২ জয়)

ডালাসের ম্যাচটি ছিল নিখাদ স্নায়ুর পরীক্ষা। নির্ধারিত সময় ও অতিরিক্ত সময় মিলিয়ে দুই দলই একটি করে গোল করলেও নিষ্পত্তি হয়নি খেলার। শেষ পর্যন্ত ম্যাচ গড়ায় টাইব্রেকারে, যেখানে সম্পূর্ণ নিখুঁত পারফরম্যান্স দেখিয়ে ৪-২ ব্যবধানে জয় ছিনিয়ে নেয় মিশর।

বিশেষজ্ঞদের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, দীর্ঘ সময় বল দখলে রাখলেও আক্রমণে প্রয়োজনীয় সৃজনশীলতা ও নিখুঁত ফিনিশিংয়ের অভাব দেখিয়েছে অস্ট্রেলিয়া, বিশেষত টাইব্রেকারে চাপের মুহূর্তে। উল্টোদিকে গোটা ম্যাচে রক্ষণে অসাধারণ শৃঙ্খলা এবং স্পট-কিকে অবিচল মানসিকতা দেখিয়ে ইতিহাস গড়ল মিশর এশিয়া-আফ্রিকার এই লড়াইয়ে শেষ হাসি হাসলেন মহম্মদ সালাহরাই। মিশরের প্রতিপক্ষ এবার শেষ ষোলোয় আর্জেন্টিনা।

পরিশেষে: ৪৮ দলের বিশ্বকাপ, অঘটনের রোমাঞ্চ

এই তিনটি ম্যাচ যেন আরও একবার প্রমাণ করে দিল, ৪৮ দলের সম্প্রসারিত বিশ্বকাপ ফুটবলকে দিয়েছে নতুন মাত্রা। জার্মানি, ফ্রান্সসহ একাধিক ঐতিহ্যবাহী ফুটবল-শক্তি ইতিমধ্যেই বিদায় নিয়েছে টাইব্রেকারে, আর কেপ ভার্দের মতো দল দেখিয়ে দিয়েছে সংখ্যায় ছোট হলেও সাহস আর সংগঠনে বড় দলগুলোর চোখে চোখ রেখে লড়াই করা যায়। ধারাভাষ্যকারদের প্যানেলের ভাষায়, “এটাই ফুটবলের আসল সৌন্দর্য এখানে ছোট দলও স্বপ্ন দেখার অধিকার রাখে।”

Exit mobile version