Site icon Jist Feed

ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬: এমবাপ্পের জোড়া গোলে ফ্রান্সের দাপট, ইতিহাস গড়ল নরওয়ে, ঘরের মাঠে দুর্দান্ত মেক্সিকো – জমে উঠল শেষ ষোলোর লড়াই

Fwc_day20

নিজস্ব প্রতিবেদন: ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬-এর রাউন্ড অব ৩২-এর লড়াই যত এগোচ্ছে, ততই স্পষ্ট হয়ে উঠছে কোন দলগুলো শিরোপার দাবিদার হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠা করছে। মঙ্গলবার (৩০ জুন) টুর্নামেন্টের ২০তম দিনে অনুষ্ঠিত তিনটি নকআউট ম্যাচে বড় কোনো অঘটন ঘটেনি। বরং তিনটি ম্যাচেই অভিজ্ঞতা, কৌশল এবং ক্লিনিক্যাল ফিনিশিংয়ের জোরে জয় তুলে নিয়েছে ফ্রান্স, নরওয়ে এবং সহ-আয়োজক মেক্সিকো।

নিউ ইয়র্ক–নিউ জার্সি স্টেডিয়ামে সুইডেনকে ৩-০ গোলে বিধ্বস্ত করেছে ফ্রান্স। ডালাস স্টেডিয়ামে শেষ মুহূর্তের গোলে আইভরি কোস্টকে ২-১ ব্যবধানে হারিয়ে বিশ্বকাপ ইতিহাসে প্রথমবার নকআউট জয়ের স্বাদ পেয়েছে নরওয়ে। অন্যদিকে মেক্সিকো সিটি স্টেডিয়ামে ইকুয়েডরকে ২-০ গোলে হারিয়ে শেষ ষোলোয় পৌঁছে ঘরের দর্শকদের আনন্দে ভাসিয়েছে মেক্সিকো।

এক সময় যে নকআউট পর্বে পেনাল্টি শুটআউট ছিল নিয়মিত নাটকীয়তার অংশ, সেই ধারার সম্পূর্ণ ব্যতিক্রম দেখা গেল এই দিনে। তিনটি ম্যাচেই নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই ফলাফল নিশ্চিত হয়েছে।

২০তম দিনের স্কোরবোর্ড

ম্যাচফলাফলগোলদাতাভেন্যু
আইভরি কোস্ট বনাম নরওয়ে১-২নুসা, হালান্দ (নরওয়ে), আইভরি কোস্টের একমাত্র গোলডালাস স্টেডিয়াম
ফ্রান্স বনাম সুইডেন৩-০এমবাপ্পে (২), বারকোলানিউ ইয়র্ক–নিউ জার্সি স্টেডিয়াম
মেক্সিকো বনাম ইকুয়েডর২-০হুলিয়ান কুইনোনস, রাউল হিমেনেসমেক্সিকো সিটি স্টেডিয়াম

ফ্রান্স ৩-০ সুইডেন

এমবাপ্পের জোড়া গোল, আক্রমণ-রক্ষণে নিখুঁত ভারসাম্যে শেষ ষোলোয় ‘লে ব্লুজ’

বিশ্বকাপ জয়ের অন্যতম দাবিদার হিসেবে যে ফ্রান্সকে ধরা হচ্ছে, সেই মর্যাদার পূর্ণ প্রমাণ দিল দিদিয়ের দেশমের দল। ম্যাচের প্রথম থেকেই সুইডেনের রক্ষণকে চাপে রাখে ফরাসিরা। প্রথমার্ধে দু’বার বল পোস্টে লাগলেও গোলের দেখা মিলছিল না। অবশেষে বিরতির ঠিক আগে উসমান দেম্বেলের নিখুঁত পাস থেকে কিলিয়ান এমবাপ্পে গোল করে জট কাটান।

দ্বিতীয়ার্ধে ফ্রান্স আরও আক্রমণাত্মক হয়ে ওঠে। মাইকেল অলিসের দুর্দান্ত সৃজনশীলতায় প্রথমে গোল করেন ব্র্যাডলি বারকোলা। এরপর অলিসের আরেকটি নিখুঁত পাস থেকে নিজের দ্বিতীয় গোলটি করেন এমবাপ্পে। শুধু জয় নয়, ম্যাচ জুড়ে ফ্রান্সের খেলায় ছিল পরিকল্পনা, গতি এবং শৃঙ্খলার অনন্য সমন্বয়। সুইডেনকে কার্যত ম্যাচে ফিরতেই দেয়নি তারা। এমবাপ্পের এই জোড়া গোল বিশ্বকাপ ইতিহাসের সর্বকালের অন্যতম সেরা গোলদাতাদের তালিকায় তাঁকে আরও এগিয়ে নিয়ে গেল। এখন তিনি লিওনেল মেসির বিশ্বকাপ গোলসংখ্যার রেকর্ড স্পর্শ করার থেকে মাত্র এক গোল দূরে।

ফ্রান্সের সাফল্যের মূল চাবিকাঠি ছিল তাদের ভারসাম্যপূর্ণ ফুটবল। ৪-২-৩-১ ছকে আদ্রিয়েন রাবিও এবং অরেলিয়েন চুয়ামেনির ডাবল-পিভট সুইডেনের মাঝমাঠকে কার্যত অকার্যকর করে দেয়। মাইকেল অলিস এবং উসমান দেম্বেলের গতি ও সৃজনশীলতা এমবাপ্পের জন্য পর্যাপ্ত জায়গা তৈরি করে দেয়। ফলে ফরাসি আক্রমণ বারবার সুইডিশ রক্ষণকে বিপদে ফেলে।

বিশ্লেষকদের মতে, ফ্রান্স শুধু তারকানির্ভর দল নয়; বরং পুরো দল একটি সুসংগঠিত ইউনিট হিসেবে খেলছে। এমবাপ্পে গোল করছেন ঠিকই, কিন্তু মাঝমাঠ এবং রক্ষণভাগের অবদান সমান গুরুত্বপূর্ণ।অনেক বিশেষজ্ঞের মতে, এই ধারাবাহিকতা বজায় থাকলে ফ্রান্স শিরোপার অন্যতম প্রধান দাবিদার।

আইভরি কোস্ট ১-২ নরওয়ে

হালান্দের জয়সূচক গোলে ইতিহাস লিখল নরওয়ে

বিশ্বকাপের ইতিহাসে প্রথমবার নকআউট পর্বে জয়ের আনন্দ পেল নরওয়ে। ম্যাচের শুরুতেই আন্তোনিও নুসার দুর্দান্ত বাঁকানো শটে এগিয়ে যায় স্ক্যান্ডিনেভিয়ান দলটি। এরপর আইভরি কোস্ট সমতা ফিরিয়ে ম্যাচে উত্তেজনা বাড়ায়। তবে শেষ কথা বলেন আর্লিং হালান্দ।

৮৬ মিনিটে প্যাট্রিক বার্গ অসাধারণ বুদ্ধিদীপ্ত পাস বাড়ান ফাঁকায় থাকা হালান্দের উদ্দেশে। সুযোগ নষ্ট করেননি বিশ্বের অন্যতম সেরা এই স্ট্রাইকার। ঠান্ডা মাথায় বল জালে জড়িয়ে নরওয়েকে ঐতিহাসিক জয় এনে দেন তিনি। এই গোলটি ছিল চলতি বিশ্বকাপে হালান্দের পঞ্চম গোল। এখন শেষ ষোলোয় ব্রাজিলের বিপক্ষে অপেক্ষা করছে নরওয়ের সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষা।

নরওয়ে পুরো ম্যাচে খুব বেশি বল নিজেদের দখলে রাখেনি। কিন্তু প্রতিটি আক্রমণ ছিল সুপরিকল্পিত। আন্তোনিও নুসার গতি, মার্টিন ওডেগার্ডের পাসিং এবং হালান্দের অসাধারণ পজিশনিং এই তিনের সমন্বয়ই তাদের সবচেয়ে বড় শক্তি হয়ে উঠেছে। ব্রাজিলের বিপক্ষে একই কৌশল কাজে লাগাতে পারলে নরওয়ে বড় চমকও দিতে পারে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, নরওয়ের সবচেয়ে বড় অস্ত্র আর্লিং হালান্দ। খুব বেশি সুযোগ তৈরি না করেও ম্যাচের গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে গোল করার অসাধারণ ক্ষমতা রয়েছে তাঁর। তবে শুধু হালান্দ নন, নুসা ও ওডেগার্ডের অবদানও নরওয়ের সাফল্যের বড় ভিত্তি।

মেক্সিকো ২-০ ইকুয়েডর

ঘরের মাঠে আত্মবিশ্বাসী মেক্সিকো, রক্ষণ আর পাল্টা আক্রমণেই সাফল্য

মেক্সিকো সিটি স্টেডিয়ামের গ্যালারি যেন শুরু থেকেই স্বাগতিক দলের পক্ষে গর্জে উঠেছিল। ২২ মিনিটে হুলিয়ান কুইনোনসের গোল ভিএআর পর্যালোচনার পর বৈধ ঘোষণা করা হলে উল্লাসে ফেটে পড়ে পুরো স্টেডিয়াম। এর মাত্র কয়েক মিনিট পর অভিজ্ঞ রাউল হিমেনেস ব্যবধান বাড়িয়ে দেন।

দ্বিতীয়ার্ধে বলের দখল বেশি ছিল ইকুয়েডরের। কিন্তু জমাট রক্ষণ আর দ্রুত পাল্টা আক্রমণে মেক্সিকো পুরো ম্যাচ নিয়ন্ত্রণে রাখে। অতিরিক্ত সময়ে পিয়েরো হিনকাপির সরাসরি লাল কার্ড ইকুয়েডরের প্রত্যাবর্তনের শেষ সম্ভাবনাটুকুও শেষ করে দেয়। ঘরের মাঠে ধারাবাহিকভাবে দুর্দান্ত পারফরম্যান্স করে মেক্সিকো এখন শেষ ষোলোয় অন্যতম আত্মবিশ্বাসী দল।

ইকুয়েডরের তুলনায় কম বল দখলে রেখেও ম্যাচ জিতেছে মেক্সিকো।তাদের সংগঠিত রক্ষণ, দ্রুত কাউন্টার অ্যাটাক এবং সুযোগ কাজে লাগানোর দক্ষতাই পার্থক্য গড়ে দিয়েছে। টুর্নামেন্টে এখন পর্যন্ত চার ম্যাচে গোল না খাওয়া মেক্সিকোর রক্ষণকে এই বিশ্বকাপের অন্যতম সেরা বলা হচ্ছে।

বিশ্লেষকদের মতে, মেক্সিকোর রক্ষণাত্মক সংগঠনই তাদের সবচেয়ে বড় শক্তি। কম বল দখল রেখেও কীভাবে ম্যাচ জেতা যায়, তার আদর্শ উদাহরণ দেখিয়েছে স্বাগতিকরা। ঘরের মাঠের সমর্থন তাদের আত্মবিশ্বাস আরও বাড়িয়ে তুলছে।

ম্যাচ পরিসংখ্যান

পরিসংখ্যানফ্রান্স vs সুইডেনআইভরি কোস্ট vs নরওয়েমেক্সিকো vs ইকুয়েডর
ফলাফল৩-০১-২২-০
বল দখল৬১%-৩৯%৫২%-৪৮%৪৩%-৫৭%
মোট শট২৫-৮১৪-৮১৫-১১
টার্গেটে শট১৩-৩৫-৩৪-১
পাস সফলতা৯১%-৮১%৮৬%-৮৯%৭৮%-৮৪%
কর্নার৯-১৬-২৪-৭

শেষ ষোলোয় সম্ভাব্য চিত্র

বিশ্বকাপের ২০তম দিন প্রমাণ করে দিল, নকআউট পর্বে শুধু বলের দখল নয়, বরং সুযোগকে কাজে লাগানোর দক্ষতাই সবচেয়ে বড় অস্ত্র। ফ্রান্স দেখাল কেন তারা শিরোপার অন্যতম দাবিদার, নরওয়ে লিখল নতুন ইতিহাস, আর মেক্সিকো ঘরের মাঠের আবেগকে শক্তিতে পরিণত করে আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে এগিয়ে গেল শেষ ষোলোয়। এখন অপেক্ষা আরও কঠিন পরীক্ষার। কারণ এখান থেকে প্রতিটি ম্যাচই এক একটি ফাইনাল, আর একটি ভুলই শেষ করে দিতে পারে বিশ্বকাপ জয়ের স্বপ্ন।

Exit mobile version