ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬-এর দ্বাদশ দিনটি ফুটবল ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে থাকবে বহু কারণে। একদিকে লিওনেল মেসি ভেঙে দিলেন পুরুষদের বিশ্বকাপের সর্বকালের সর্বোচ্চ গোলদাতার রেকর্ড, অন্যদিকে কিলিয়ান এমবাপ্পে ও আর্লিং হালান্ড নিজেদের দুরন্ত ফর্ম বজায় রেখে দলকে নকআউট পর্বে তুলে দিলেন। দিনের শেষ ম্যাচে আলজেরিয়া নাটকীয় প্রত্যাবর্তনের মাধ্যমে জর্ডানকে হারিয়ে শেষ ষোলোয় ওঠার আশা জিইয়ে রাখে।
আর্জেন্টিনা, ফ্রান্স এবং নরওয়ে ইতোমধ্যেই রাউন্ড অব ৩২-এ নিজেদের জায়গা নিশ্চিত করেছে। অন্যদিকে গ্রুপ ‘জে’-তে দ্বিতীয় স্থানের লড়াই জমে উঠেছে আলজেরিয়া ও অস্ট্রিয়ার মধ্যে।
মেসির জোড়া গোলে ইতিহাস গড়ে নকআউটে আর্জেন্টিনা
ডালাস স্টেডিয়ামে অস্ট্রিয়ার বিরুদ্ধে মাঠে নেমে শুরুতেই ধাক্কা খায় আর্জেন্টিনা। নবম মিনিটে পাওয়া পেনাল্টি থেকে গোল করতে ব্যর্থ হন লিওনেল মেসি। তবে ম্যাচ যত এগোয়, ততই নিজের স্বাভাবিক ছন্দে ফেরেন আর্জেন্টাইন অধিনায়ক।
৩৮তম মিনিটে ডি-বক্সের ভেতর থেকে নিখুঁত ফিনিশে গোল করে তিনি স্পর্শ করেন ইতিহাসকে। সেই গোলের মাধ্যমে বিশ্বকাপে তাঁর মোট গোলসংখ্যা দাঁড়ায় ১৭, যা তাঁকে মিরোস্লাভ ক্লোসের রেকর্ডের ওপরে তুলে দেয়।
যোগ করা সময়ের তৃতীয় মিনিটে আরও একটি গোল করে মেসি নিজের বিশ্বকাপ গোলসংখ্যা বাড়িয়ে ১৮-তে নিয়ে যান। শেষ পর্যন্ত আর্জেন্টিনা ২-০ ব্যবধানে জয় তুলে নিয়ে নকআউট পর্ব নিশ্চিত করে। লিওনেল স্কালোনির ৪-৩-৩ ফর্মেশনে মেসিকে ‘ফলস নাইন’ হিসেবে ব্যবহার করার সিদ্ধান্তই ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। অস্ট্রিয়ার ঘন রক্ষণ ভাঙতে আর্জেন্টিনার ইনভার্টেড উইঙ্গারদের মুভমেন্ট গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
ম্যাচ পরিসংখ্যান
| পরিসংখ্যান | আর্জেন্টিনা | অস্ট্রিয়া |
|---|---|---|
| বল দখল | 58% | 42% |
| লক্ষ্যে শট | 7 | 3 |
| ফাউল | 11 | 16 |
| বড় সুযোগ | 4 | 1 |
আবহাওয়ার বাধা পেরিয়ে ফ্রান্সের দাপট, এমবাপ্পের রেকর্ড ছোঁয়া
ফিলাডেলফিয়ায় প্রবল বজ্রঝড় ও বৃষ্টির কারণে চার ঘণ্টা বিলম্বিত হয় ফ্রান্স-ইরাক ম্যাচ। কিন্তু দীর্ঘ অপেক্ষা ফরাসি ফুটবলারদের মনোযোগে কোনো প্রভাব ফেলতে পারেনি।
পুরো ম্যাচজুড়ে বলের দখল ধরে রেখে ইরাককে চাপে রাখে দিদিয়ের দেশঁর দল। কিলিয়ান এমবাপ্পে জোড়া গোল করে ফ্রান্সকে ৩-০ ব্যবধানে জয় এনে দেন। তাঁর বিশ্বকাপ গোলসংখ্যা দাঁড়ায় ১৬, যা মিরোস্লাভ ক্লোসের রেকর্ডের সমান।
ফ্রান্সের তৃতীয় গোল আসে মাইকেল অলিসে ও উসমান দেম্বেলের আক্রমণাত্মক সমন্বয় থেকে। চার ঘণ্টার বিরতির পরও ফ্রান্সের সংগঠিত ফুটবল ছিল প্রশংসনীয়। মিডফিল্ডের ডাবল পিভট পুরো ম্যাচে ইরাককে আক্রমণ গড়ার সুযোগ দেয়নি। এমবাপ্পের গতি ও ফিনিশিং ম্যাচের পার্থক্য গড়ে দেয়।
ম্যাচ পরিসংখ্যান
| পরিসংখ্যান | ফ্রান্স | ইরাক |
| বল দখল | 64% | 36% |
| মোট শট | 19 | 5 |
| লক্ষ্যে শট | 9 | 1 |
| কর্নার | 8 | 2 |
হালান্ডের জোড়া গোলে নরওয়ের রুদ্ধশ্বাস জয়
নিউ ইয়র্ক নিউ জার্সি স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত দিনের অন্যতম আকর্ষণীয় ম্যাচে নরওয়ে ৩-২ গোলে হারায় সেনেগালকে।
প্রথমার্ধের শেষ মুহূর্তে মার্কাস পেডারসেন গোল করে নরওয়েকে এগিয়ে দেন। দ্বিতীয়ার্ধে ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ নেন আর্লিং হালান্ড। বিশ্বের অন্যতম সেরা স্ট্রাইকার আরও দুটি গোল করে ব্যবধান বাড়িয়ে দেন।
সেনেগালের হয়ে ইসমাইলা সার দুটি গোল করে ম্যাচে উত্তেজনা ফিরিয়ে আনলেও শেষ পর্যন্ত জয় নিশ্চিত করে নরওয়ে। স্টালে সোলবাক্কেনের সরাসরি আক্রমণভিত্তিক ৪-৪-২ কৌশল সেনেগালের উচ্চ রক্ষণভাগকে বারবার সমস্যায় ফেলে। হালান্ডের গতিময়তা এবং ফিনিশিং নরওয়েকে নকআউটে পৌঁছে দেয়।
ম্যাচ পরিসংখ্যান
| পরিসংখ্যান | নরওয়ে | সেনেগাল |
| বল দখল | 47% | 53% |
| লক্ষ্যে শট | 6 | 5 |
| xG | 2.14 | 1.88 |
নাটকীয় প্রত্যাবর্তনে জর্ডানকে হারিয়ে স্বপ্ন বাঁচাল আলজেরিয়া
দিনের শেষ ম্যাচে সান ফ্রান্সিসকো বে এরিয়া স্টেডিয়ামে জর্ডানকে ২-১ গোলে হারিয়ে নকআউটে ওঠার আশা জিইয়ে রাখে আলজেরিয়া।
ম্যাচের ৩৬তম মিনিটে নিজার আল-রাশদানের গোলে এগিয়ে যায় জর্ডান। প্রথমার্ধে তারা ১-০ ব্যবধানে এগিয়ে ছিল এবং বড় অঘটনের সম্ভাবনা তৈরি করেছিল।
তবে দ্বিতীয়ার্ধে সম্পূর্ণ বদলে যায় ম্যাচের চিত্র। ৬৯তম মিনিটে রিয়াদ মাহরেজের কর্নার থেকে নাধির বেনবৌয়ালি শক্তিশালী হেডে সমতা ফেরান।
৮২তম মিনিটে আরেকটি কর্নার থেকে সৃষ্ট সুযোগে আমিন গুইরি কাছ থেকে বল জালে জড়িয়ে আলজেরিয়াকে ২-১ ব্যবধানে এগিয়ে দেন। শেষ পর্যন্ত সেই গোলই নির্ধারণ করে ম্যাচের ফলাফল।
এই পরাজয়ের ফলে বিশ্বকাপ থেকে বিদায় নিশ্চিত হয় জর্ডানের। অন্যদিকে আলজেরিয়া শেষ ম্যাচে অস্ট্রিয়ার বিরুদ্ধে সরাসরি নকআউটের টিকিটের লড়াইয়ে নামবে। পুরো ম্যাচে আলজেরিয়ার বল নিয়ন্ত্রণ ছিল অসাধারণ। মাহরেজের সেট-পিস দক্ষতা ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। দুই গোলই আসে কর্নার থেকে, যা জর্ডানের রক্ষণভাগের বড় দুর্বলতা প্রকাশ করে।
ম্যাচ পরিসংখ্যান
| পরিসংখ্যান | জর্ডান | আলজেরিয়া |
| বল দখল | 25% | 75% |
| মোট শট | 8 | 17 |
| লক্ষ্যে শট | 4 | 8 |
| কর্নার | 1 | 10 |
| সফল পাস | 192 | 566 |
| ফাউল | 11 | 6 |
গোল্ডেন বুট দৌড়
| খেলোয়াড় | দেশ | গোল |
| লিওনেল মেসি | আর্জেন্টিনা | 5 |
| কিলিয়ান এমবাপ্পে | ফ্রান্স | 4 |
| আর্লিং হালান্ড | নরওয়ে | 4 |
বিশ্বকাপ ইতিহাসের সর্বোচ্চ গোলদাতা
| খেলোয়াড় | গোল |
| লিওনেল মেসি | 18 |
| মিরোস্লাভ ক্লোসে | 16 |
| কিলিয়ান এমবাপ্পে | 16 |
| রোনালদো (ব্রাজিল) | 15 |
দিনশেষে বড় চিত্র
দ্বাদশ দিনের মূল শিরোনাম অবশ্যই লিওনেল মেসির ঐতিহাসিক রেকর্ড। কিন্তু একইসঙ্গে এমবাপ্পের ধারাবাহিকতা, হালান্ডের গোলমেশিন রূপ এবং আলজেরিয়ার দুর্দান্ত প্রত্যাবর্তন বিশ্বকাপের নাটকীয়তাকে আরও বাড়িয়ে তুলেছে।
নকআউট পর্ব যত এগিয়ে আসছে, ততই স্পষ্ট হচ্ছে যে এই বিশ্বকাপ শুধু দলগত লড়াই নয়; এটি মেসি, এমবাপ্পে ও হালান্ডের মতো মহাতারকাদের শ্রেষ্ঠত্ব প্রতিষ্ঠার মঞ্চেও পরিণত হয়েছে।

