Site icon Jist Feed

সোডিয়াম-আয়ন ব্যাটারি: লিথিয়ামের বিকল্প শক্তি-বিপ্লবে ভারত ঠিক কোথায় দাঁড়িয়ে ?

Sodium ion bn

নুন থেকে তৈরি এই নতুন প্রযুক্তি বদলে দিতে পারে গাড়ি আর বিদ্যুৎ-সঞ্চয়ের দুনিয়া, বিজ্ঞান থেকে বাজার, রিলায়েন্স থেকে আইআইটি রুরকি পর্যন্ত বিস্তারিত পর্যালোচনা

লিথিয়াম-আয়ন ব্যাটারির (Lithium-ion Battery) রমরমা বাজারে গত দু’-তিন বছরে যে প্রযুক্তি ক্রমশ আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এসেছে, তার নাম সোডিয়াম-আয়ন ব্যাটারি (Sodium-ion Battery)। রান্নাঘরের নুনে যে মৌল থাকে, সেই সোডিয়ামই এখন লিথিয়ামের প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে উঠছে বিশ্বের শক্তি-সঞ্চয় শিল্পে। চিনা সংস্থা CATL ২০২৬ সালে তাদের Naxtra ব্যাটারি নিয়ে গাড়ির বাজারে নেমে পড়েছে, রিলায়েন্স শিল্পগোষ্ঠী গুজরাতের জামনগরে গড়ে তুলছে সোডিয়াম-আয়ন প্রযুক্তির গিগাফ্যাক্টরি, আর তামিলনাড়ুর কোয়েম্বাটুরের এক স্টার্টআপ ইতিমধ্যেই বাজারে এনেছে ভারতের প্রথম বাণিজ্যিক সোডিয়াম-আয়ন এনার্জি স্টোরেজ সিস্টেম। কিন্তু এই প্রযুক্তি ঠিক কতটা পরিণত ? লিথিয়ামের তুলনায় শক্তি ঘনত্ব কম হওয়া সত্ত্বেও এটি কি সত্যিই বাণিজ্যিকভাবে লাভজনক ? খরচের নিরিখে লিথিয়াম আয়রন ফসফেট বা LFP ব্যাটারির সমকক্ষ হতে আর কত দেরি ? আর এই বিশ্বব্যাপী প্রতিযোগিতায় ভারত ঠিক কোথায় দাঁড়িয়ে ? এই প্রতিবেদনে বিস্তারিত ভাবে তারই খোঁজ।

সোডিয়াম-আয়ন ব্যাটারির মৌলিক বিজ্ঞান

সোডিয়াম-আয়ন ব্যাটারি কাজ করে অনেকটা লিথিয়াম-আয়ন ব্যাটারির মতোই , চার্জ ও ডিসচার্জের সময় সোডিয়াম আয়ন (Na⁺) ক্যাথোড ও অ্যানোডের মধ্যে ইলেকট্রোলাইটের মধ্য দিয়ে যাতায়াত করে, আর বাইরের বর্তনী দিয়ে বয়ে যায় ইলেকট্রন। পার্থক্য মূলত বাহক আয়নে – লিথিয়ামের বদলে সোডিয়াম, যা পৃথিবীর ভূত্বকে প্রায় ২.৮ শতাংশ পরিমাণে ছড়িয়ে থাকা একটি সহজলভ্য মৌল।

ব্যাটারির প্রতিটি অংশের উপকরণ যাচাই করলে বোঝা যায়, কেন এই প্রযুক্তি নিয়ে এত মাতামাতি –

শেষ বৈশিষ্ট্যটিই সোডিয়াম-আয়ন ব্যাটারির সবচেয়ে বড় বাণিজ্যিক সুবিধার একটি, কারণ তামার দাম অ্যালুমিনিয়ামের তুলনায় বহুগুণ বেশি।

লিথিয়াম-আয়নের সঙ্গে পার্থক্য: এক নজরে

বিষয়সোডিয়াম-আয়ন ব্যাটারিলিথিয়াম-আয়ন ব্যাটারি (LFP-সহ)
কাঁচামালসোডিয়াম, লোহা, ম্যাঙ্গানিজ – সহজলভ্য ও বিশ্বজুড়ে ছড়ানোলিথিয়াম, কোবাল্ট, নিকেল, গ্রাফাইট – ভৌগোলিকভাবে সীমিত, আমদানি-নির্ভর
শক্তি ঘনত্ব (কোষ-স্তরে)বাণিজ্যিক স্তরে আনুমানিক ১০০-১৭৫ Wh/kg, গবেষণাগারে ২০০-৩০০ Wh/kg পর্যন্ত প্রোটোটাইপLFP আনুমানিক ১৪০-২০০ Wh/kg, প্রিমিয়াম NMC ২৫০-৩০০ Wh/kg
কারেন্ট কালেক্টরদু’দিকেই সস্তা অ্যালুমিনিয়ামঅ্যানোডে ব্যয়বহুল তামা প্রয়োজন
ঠান্ডায় কার্যক্ষমতাতুলনামূলক ভাল, সাব-জিরো তাপমাত্রাতেও সক্রিয় থাকেকম তাপমাত্রায় ক্ষমতা ও চার্জিং গতি উল্লেখযোগ্য ভাবে কমে
পরিবহণ-নিরাপত্তাশূন্য ভোল্টে সম্পূর্ণ ডিসচার্জ করে পরিবহণ করা যায়আংশিক চার্জ রেখেই পরিবহণ করতে হয়, কড়া নিয়ম মানতে হয়
চার্জ-ডিসচার্জ সাইকেলপ্রযুক্তিভেদে দাবি প্রায় ৩,০০০-১০,০০০+সাধারণত ৫০০-৩,০০০+
উৎপাদন পরিকাঠামোলিথিয়াম-আয়ন কারখানার সঙ্গে বড় অংশে সামঞ্জস্যপূর্ণবিশ্বজুড়ে সুপ্রতিষ্ঠিত, বিশাল গিগাফ্যাক্টরি নেটওয়ার্ক

(পরিসংখ্যান শিল্প-সমীক্ষা ও সংস্থার ঘোষণা অনুযায়ী আনুমানিক পরিসর; বিস্তারিত উৎস প্রতিবেদনের শেষে)

সুবিধা ও অসুবিধা

সোডিয়াম-আয়ন ব্যাটারিকে লিথিয়ামের ‘জাদুকাঠি বিকল্প’ বলে দেখানো ভুল হবে। এটি একটি নির্দিষ্ট ট্রেড-অফের প্রযুক্তি, কিছু ক্ষেত্রে সুবিধা প্রবল, আবার কিছু সীমাবদ্ধতাও স্পষ্ট।

সুবিধার দিক

সীমাবদ্ধতার দিক

বাণিজ্যিকভাবে সোডিয়াম-আয়ন কি আদৌ বাস্তব ?

এই প্রশ্নের জবাব একটিমাত্র শব্দে দেওয়া কঠিন, কারণ তা নির্ভর করছে কোন প্রয়োগক্ষেত্রের কথা হচ্ছে তার উপর।

স্থির শক্তি সঞ্চয় (গ্রিড স্টোরেজ), ছোট বৈদ্যুতিক দু’চাকা-তিন চাকা গাড়ি এবং ঠান্ডা অঞ্চলের বাণিজ্যিক গাড়ির ক্ষেত্রে সোডিয়াম-আয়ন এখন সত্যিকারের বাণিজ্যিক বাস্তবতা। চিনের ব্যাটারি জায়ান্ট CATL ২০২৬-এর এপ্রিলে বেজিংয়ের ESIE প্রদর্শনীতে বিশ্বের প্রথম প্ল্যাটফর্ম-ভিত্তিক সোডিয়াম-আয়ন গ্রিড-স্টোরেজ ব্যাটারি উন্মোচন করে, আর একই মাসে চিনা সংস্থা হাইপারস্ট্রং-এর সঙ্গে সই করে ৬০ গিগাওয়াট-ঘণ্টার (GWh) সরবরাহ চুক্তি , শিল্প-বিশ্লেষকদের মতে এটিই সোডিয়াম-আয়নের প্রথম প্রকৃত শিল্প-মাপের বাণিজ্যিক চুক্তি। গাড়ির বাজারেও ফেব্রুয়ারি ২০২৬-এ CATL ও চিনা সংস্থা চাংআন যৌথভাবে উন্মোচন করে বিশ্বের প্রথম গণ-উৎপাদিত সোডিয়াম-আয়ন যাত্রীবাহী গাড়ি, Changan Nevo A06, যার Naxtra ব্যাটারির শক্তি ঘনত্ব ১৭৫ Wh/kg, একবার চার্জে চলার পাল্লা ৪০০ কিলোমিটারের বেশি এবং দাবি অনুযায়ী ১০,০০০-এর বেশি চার্জ-সাইকেল।

কিন্তু দীর্ঘ-পাল্লার প্রিমিয়াম বৈদ্যুতিক গাড়ি বা উচ্চ-ক্ষমতার ইলেকট্রনিক্সের মতো ক্ষেত্রে, যেখানে ওজন-প্রতি সর্বাধিক শক্তি জরুরি, সেখানে লিথিয়াম-আয়নই এখনও একচ্ছত্র। আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থা (IEA) ২০২৬-এর ফেব্রুয়ারির এক প্রতিবেদনে স্পষ্ট জানিয়েছে, শক্তি ঘনত্বের ঘাটতি সোডিয়াম-আয়নের একটি কাঠামোগত সীমাবদ্ধতা, যা আপাতত থেকেই যাচ্ছে।

এই প্রযুক্তির ঝুঁকিও কম নয়। আমেরিকার সংস্থা Natron Energy, যারা মিশিগান ও উত্তর ক্যারোলাইনায় বিশাল কারখানা গড়ার পরিকল্পনা করেছিল, ২০২৫-এর সেপ্টেম্বরে পুঁজির অভাবে ঝাঁপ বন্ধ করে দেয়। সুইডেনের নর্থভোল্ট, যারা নিজস্ব প্রাশিয়ান হোয়াইট সোডিয়াম প্রযুক্তির কথা ঘোষণা করেছিল, ২০২৫-এর মার্চে সম্পূর্ণ দেউলিয়া ঘোষণা করে, যদিও তার মূল কারণ ছিল সংস্থার সামগ্রিক লিথিয়াম-আয়ন ব্যবসার আর্থিক সংকট, সোডিয়াম প্রকল্প নির্দিষ্ট ভাবে নয়। তবে সুইডেনেরই আর একটি সংস্থা আলট্রিস (Altris) এখনও টিকে আছে এবং ২০২৬-এর জানুয়ারিতে চেক সংস্থা দ্রাসলোভকার সঙ্গে হাত মিলিয়েছে।

বিশেষজ্ঞ বিশ্লেষণ – এই ওঠাপড়া থেকে স্পষ্ট, সোডিয়াম-আয়ন প্রযুক্তি বৈজ্ঞানিক পরীক্ষায় উতরে গেলেও তার বাণিজ্যিক সাফল্য নির্ভর করছে মূলধনের জোগান, বাজারের ধৈর্য আর লিথিয়ামের দামের অনিশ্চয়তার উপর। চিনের মতো যেখানে বিপুল রাষ্ট্রীয়-বেসরকারি পুঁজি আর নিশ্চিত অর্ডার (যেমন গাড়ি সংস্থাগুলির সঙ্গে চুক্তি) জোগাড় করা গিয়েছে, সেখানেই প্রযুক্তি দ্রুত পরিণত হচ্ছে। আমেরিকার মতো যেখানে তা হয়নি, সেখানে সাশ্রয়ী মূলধনের অভাবে প্রকল্প থমকে গিয়েছে।

বিশ্বজুড়ে গবেষণা ঠিক কোন জায়গায়

ভারতের নবীকরণযোগ্য জ্বালানি মন্ত্রকের সচিব সন্তোষ কুমার সারঙ্গি ২০২৬-এর অগস্টে নয়াদিল্লিতে ব্লুমবার্গএনইএফ সম্মেলনে জানান, ভারতীয় গবেষকরা সোডিয়াম-আয়ন প্রযুক্তিতে টেকনোলজি রেডিনেস লেভেল বা TRL ৭ ছুঁয়ে ফেলেছেন, অর্থাৎ পাইলট প্রকল্প থেকে বাণিজ্যিক উৎপাদনে পৌঁছতে আর মাত্র দুই থেকে তিন বছর সময় লাগতে পারে বলে তাঁর দাবি।

বিশ্বজুড়ে গবেষণাগারে শক্তি ঘনত্ব বাড়ানোর প্রতিযোগিতা তুঙ্গে। মালয়েশিয়ার ন্যানোম্যালয়েশিয়া বেরহাদ ২০২৬-এর অগস্টে NASICON-ভিত্তিক সোডিয়াম ভ্যানাডিয়াম ফসফেট ক্যাথোড দিয়ে তৈরি একটি প্রোটোটাইপ ৩০০ Wh/kg-রও বেশি শক্তি ঘনত্ব ছুঁয়েছে বলে দাবি করে, যা দেখায়, গবেষণাগারে এই প্রযুক্তি লিথিয়াম-আয়নের কাছাকাছি পৌঁছে যেতে পারে। চিনা সংস্থা BAIC আবার এমন একটি প্রিজম্যাটিক সেল প্রোটোটাইপ তৈরি করেছে, যার ঘনত্ব ১৭০ Wh/kg-র বেশি এবং যা অতিরিক্ত চার্জ, তাপ বা যান্ত্রিক আঘাতেও আগুন ধরে না বলে দাবি সংস্থার।

তবে গবেষকরা এটাও মনে করিয়ে দিচ্ছেন যে, সোডিয়াম আয়নের আকার লিথিয়ামের তুলনায় বড় হওয়ায় তড়িৎদ্বারের উপর যান্ত্রিক চাপ বেশি পড়ে, ফলে ক্ষয় দ্রুত হতে পারে এবং সাইকেল-লাইফ কমে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। ২০২৬-এর অগস্টে প্রকাশিত একটি আন্তর্জাতিক পর্যালোচনা-নিবন্ধে উচ্চতর স্ব-স্রাব হার, অপরিণত সরবরাহ শৃঙ্খল এবং জটিল উৎপাদন প্রক্রিয়াকেও বড় বাধা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

গবেষণার পরবর্তী বড় ধাপ সলিড-স্টেট সোডিয়াম ব্যাটারি, যেখানে তরল ইলেকট্রোলাইটের বদলে কঠিন পদার্থ ব্যবহৃত হবে, নিরাপত্তা আরও বাড়বে। কিন্তু কক্ষ তাপমাত্রায় কঠিন ইলেকট্রোলাইটের আয়ন-পরিবাহিতা তরলের তুলনায় অনেক কম হওয়ায় এটি এখনও মূলত গবেষণাগার-স্তরেই সীমাবদ্ধ। ব্রিটেনের ফ্যারাডে ইনস্টিটিউট ২০২৬-এর জুনে সোডিয়াম-আয়ন গবেষণার জন্য নতুন করে অর্থ বরাদ্দের ঘোষণা করেছে, যা কার্যকর হবে অক্টোবর থেকে।

বিশ্ববাজারের বড় খেলোয়াড় ও তাদের পণ্য

সংস্থাদেশমূল পণ্য/প্রযুক্তি২০২৬-এর অবস্থা
CATLচিনNaxtra সেল (১৭৫ Wh/kg), গাড়ি ও গ্রিড-স্টোরেজ উভয়েইবাজারের নেতা; বার্ষিক আনুমানিক ৩০ GWh উৎপাদন-ক্ষমতা; হাইপারস্ট্রং-এর সঙ্গে ৬০ GWh চুক্তি
BYDচিনগ্রিড-স্টোরেজ ও সাশ্রয়ী গাড়ির জন্য সোডিয়াম-আয়নসক্রিয় বিকাশের পথে
HiNa BatteryচিনJAC Yiwei বৈদ্যুতিক গাড়িতে ব্যবহৃত সেলআনুমানিক ৫ GWh উৎপাদন-ক্ষমতা
Faradion (রিলায়েন্স-মালিকানাধীন)যুক্তরাজ্য/ভারতসোডিয়াম-আয়ন সেল, LFP-র কাছাকাছি ১৫০-১৬০ Wh/kgজামনগরে গিগাফ্যাক্টরি নির্মীয়মাণ
Altrisসুইডেনপ্রাশিয়ান হোয়াইট ক্যাথোড প্রযুক্তিনর্থভোল্ট-বিপর্যয়ের পরেও টিকে থাকা ইউরোপীয় সংস্থাগুলির অন্যতম
TIAMAT Energyফ্রান্সস্থির শক্তি সঞ্চয় ও হালকা-গতিশীলতার সেলবাণিজ্যিক পণ্য বাজারে উপলব্ধ
Northvolt (বন্ধ)সুইডেনপ্রাশিয়ান হোয়াইট প্রযুক্তি ঘোষিত হয়েছিল২০২৫-এর মার্চে সম্পূর্ণ দেউলিয়া, সম্পদ বিক্রি হয়ে গিয়েছে
Natron Energy (বন্ধ)আমেরিকাডেটা সেন্টারের জন্য উচ্চ-ক্ষমতার প্রাশিয়ান ব্লু সেল২০২৫-এর সেপ্টেম্বরে কার্যক্রম বন্ধ

চাংআন, চেরি, GAC এবং SAIC-GM-উলিং-এর মতো চিনা গাড়ি সংস্থাগুলি এখন CATL-এর তৈরি ‘ডুয়াল-পাওয়ার’ প্যাক ব্যবহার শুরু করেছে, যেখানে একই ব্যাটারি প্যাকে সোডিয়াম-আয়ন ও LFP সেল পাশাপাশি বসানো থাকে, ঠান্ডা আবহাওয়ায় দায়িত্ব নেয় সোডিয়াম, দীর্ঘ পাল্লার জন্য দায়িত্ব নেয় LFP। শিল্প-সমীক্ষা অনুযায়ী, ২০২৬ সালে বিশ্বের সোডিয়াম-আয়ন উৎপাদন-ক্ষমতার প্রায় সবটাই এখনও চিনে কেন্দ্রীভূত, এবং ২০৩০ নাগাদ চিনের হাতেই থাকতে পারে বিশ্ব-ক্ষমতার ৯৫ শতাংশের বেশি। বাজার-গবেষণা সংস্থা মার্কেটসঅ্যান্ডমার্কেটসের হিসেবে গোটা বিশ্বের সোডিয়াম-আয়ন ব্যাটারির বাজার ২০২৫-এর প্রায় ৬৭ কোটি ডলার থেকে ২০৩০ নাগাদ ২০০ কোটি ডলারের কাছাকাছি পৌঁছতে পারে, বার্ষিক বৃদ্ধির হার (CAGR) প্রায় ২৫ শতাংশ, যদিও বিভিন্ন সমীক্ষা সংস্থার হিসেবে এই পরিসংখ্যানে কিছুটা ফারাক রয়েছে।

উপাদান বাস্তুতন্ত্র: কারা তৈরি করছে ব্যাটারির প্রতিটি অংশ

সম্পূর্ণ একটি সোডিয়াম-আয়ন ব্যাটারি তৈরি করতে যে বাস্তুতন্ত্র প্রয়োজন, তা ধীরে ধীরে আকার নিচ্ছে –

খরচ: কবে মিলবে LFP-র সমান দর ?

প্রশ্নটা যতটা সহজ শোনায়, উত্তর ততটা সরল নয়, কারণ ব্যাটারির ‘দাম’ বলতে ঠিক কোন স্তরের দামের কথা হচ্ছে, তার উপর অনেক কিছু নির্ভর করে।

খরচের স্তরসোডিয়াম-আয়ন (২০২৬)LFP লিথিয়াম-আয়ন (২০২৬)
চিনা বাজারে সেল-দর (বৃহৎ অর্ডার)আনুমানিক ৫০-৭০ ডলার/kWhআনুমানিক ৪৫-৭০ ডলার/kWh, কিছু বড় টেন্ডারে আরও কম
বিশ্ব গড় ব্যাটারি প্যাক-দরতুলনীয় তথ্য এখনও সীমিত, তবে দ্রুত নামছে২০২৫ নাগাদ প্রায় ১০০ ডলার/kWh-র আশেপাশে
২০২৮-এর পূর্বাভাস (IRENA)প্রায় ৪০ ডলার/kWh-এ নামার সম্ভাবনাধীরে ধীরে আরও সস্তা, তবে গতি তুলনায় শ্লথ
ভারতের খুচরো বাজার (স্থির শক্তি সঞ্চয়)সবে বাজারে ঢুকছে, বড় তুলনীয় তথ্য এখনও অপ্রতুলআনুমানিক ২০,০০০-৩৫,০০০ টাকা/kWh (আমদানি, ব্যাটারি ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম ও মার্জিন-সহ)

কাঁচামালের নিরিখে সোডিয়াম-আয়নের সুবিধা আরও স্পষ্ট, আর এখানেই লুকিয়ে আসল গল্প। গত চার বছরে লিথিয়াম কার্বনেটের দাম চলেছে রোলার-কোস্টারের মতো , ২০২২ সালে টনপ্রতি প্রায় ৮০,০০০ ডলারের রেকর্ড ছোঁয়ার পরে ২০২৪ নাগাদ তা ৭০ শতাংশেরও বেশি পড়ে যায়, কিন্তু ২০২৫-এর দ্বিতীয়ার্ধ থেকে চিনে খনি বন্ধ হয়ে যাওয়া আর শক্তি-সঞ্চয় শিল্পে চাহিদা বৃদ্ধির জেরে দাম আবার কিছুটা চড়েছে। ২০২৬-এর সেপ্টেম্বরে ব্যাটারি-গ্রেড লিথিয়াম কার্বনেটের দাম মোটামুটি টনপ্রতি ১১,০০০ থেকে ১৯,০০০ ডলারের আশেপাশে ঘোরাফেরা করছে, উৎস ও অঞ্চলভেদে যা কিছুটা আলাদা। এর বিপরীতে সোডা অ্যাশের দাম বরাবরই তুলনামূলক স্থিতিশীল, টনপ্রতি মোটামুটি কয়েকশো ডলারের আশেপাশে ঘোরাফেরা করে।

বিশেষজ্ঞ বিশ্লেষণ — এই ওঠানামাই সোডিয়াম-আয়নের সবচেয়ে বড় কাঠামোগত যুক্তি, লিথিয়ামের দাম যেমন আচমকা চড়তে পারে, তেমনই আচমকা পড়তেও পারে, কিন্তু সোডা অ্যাশের দাম এভাবে ওঠানামা করে না। ফলে সোডিয়াম-আয়ন ব্যাটারির উৎপাদন-খরচ অনেক বেশি অনুমানযোগ্য। ঠিক এই অস্থিরতার কারণেই Natron Energy-র মতো সংস্থাকে বাজার ছাড়তে হয়েছিল, যে সময়ে তাদের প্রকল্প শুরু হয়েছিল, তখন লিথিয়ামের দাম ছিল অনেক চড়া, কিন্তু প্রকল্প শেষ হওয়ার আগেই দাম পড়ে গিয়ে সোডিয়াম-আয়নের সাময়িক খরচ-সুবিধা অনেকটাই মুছে দেয়। অর্থাৎ, সোডিয়াম-আয়নের আসল প্রতিদ্বন্দ্বিতা স্বল্পমেয়াদী মূল্য-যুদ্ধে নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদী মূল্য-স্থিতিশীলতা আর সরবরাহ-নিশ্চয়তায়। আন্তর্জাতিক নবীকরণযোগ্য জ্বালানি সংস্থা (IRENA)-র পূর্বাভাস অনুযায়ী ২০২৮ নাগাদ সোডিয়াম-আয়ন সেলের দাম ৪০ ডলার/kWh ছুঁতে পারে, যা তখন LFP-র থেকেও সস্তা হবে, তবে এই পূর্বাভাস অনেকটাই নির্ভর করছে উৎপাদন কত দ্রুত স্কেল-আপ হয়, তার উপর।

ভারত কোথায় দাঁড়িয়ে

ভারতের কাছে সোডিয়াম-আয়ন ব্যাটারির গুরুত্ব নেহাত প্রযুক্তিগত নয়, কৌশলগতও বটে, কারণ দেশের নিজস্ব লিথিয়াম ভাণ্ডার প্রায় নেই বললেই চলে, অথচ নুন ও কৃষি বর্জ্যের কোনও অভাব নেই।

নীতিগত কাঠামো: ২০২১-এর মে মাসে কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভা অনুমোদিত ১৮,১০০ কোটি টাকার ‘প্রোডাকশন লিঙ্কড ইনসেনটিভ’ বা PLI প্রকল্প, লক্ষ্য ৫০ GWh অ্যাডভান্সড কেমিস্ট্রি সেল (ACC) উৎপাদন-ক্ষমতা তৈরি, সম্পূর্ণ প্রযুক্তি-নিরপেক্ষ, অর্থাৎ লিথিয়াম হোক বা সোডিয়াম, সরকারের কাছে দুই-ই সমান গুরুত্বপূর্ণ। এখনও পর্যন্ত মোট ৪০ GWh ক্ষমতা চারটি সংস্থাকে বরাদ্দ করা হয়েছে, যার মধ্যে ২০২৫-এর ফেব্রুয়ারিতে রিলায়েন্স নিউ এনার্জি একটি পৃথক চুক্তিতে পায় ১০ GWh।

রিলায়েন্স-ফ্যারাডিয়ন: ২০২১ সালে ব্রিটেনের ফ্যারাডিয়ন সংস্থা অধিগ্রহণের চুক্তি করে রিলায়েন্স শিল্পগোষ্ঠী, ২০২৪-এর অক্টোবরে নেয় সম্পূর্ণ ১০০ শতাংশ মালিকানা। গুজরাতের জামনগরে ধীরুভাই আম্বানি গ্রিন এনার্জি জায়ান্ট কমপ্লেক্সে তৈরি হচ্ছে ৪০ GWh ক্ষমতার গিগাফ্যাক্টরি, যার একাংশ চলবে সোডিয়াম-আয়ন প্রযুক্তিতে, সংবাদ-প্রতিবেদন অনুযায়ী এই ক্ষমতার প্রায় ১৫ GWh জাতীয় PLI প্রকল্পের আওতাভুক্ত। প্রথমে ২০২৬-এর দ্বিতীয়ার্ধে উৎপাদন শুরুর কথা থাকলেও সময়সীমা এর আগেও পিছিয়েছে বলে সংবাদমাধ্যমের রিপোর্ট, ফলে এই তারিখকেও চূড়ান্ত ধরে নেওয়া সমীচীন নয়।

নাক্সিয়ন এনার্জি (পূর্বতন সোডিয়ন এনার্জি): কোয়েম্বাটুরের এই সংস্থাই ২০২৫-এর ডিসেম্বরে বাজারে আনে, সংস্থার দাবি অনুযায়ী, ভারতের প্রথম বাণিজ্যিক সোডিয়াম-আয়ন এনার্জি স্টোরেজ সিস্টেম- ৩.৫, ৫ ও ১০ কিলোওয়াটের মডেল, আবাসিক ও বাণিজ্যিক-শিল্প উভয় ব্যবহারের জন্য। প্রাক্তন ডিআরডিও চেয়ারম্যান জি সতীশ রেড্ডি এই উদ্বোধনে উপস্থিত ছিলেন। সংস্থাটি হায়দরাবাদে ১ GWh প্যাক-অ্যাসেম্বলি প্ল্যান্ট এবং ২০২৭-এর মধ্যে ৫০০ মেগাওয়াট-ঘণ্টা ক্ষমতার পাইলট সেল-কারখানা গড়ার পরিকল্পনা করেছে।

ইন্ডি এনার্জি: আইআইটি রুরকির TIDES বিজনেস ইনকিউবেটর থেকে উঠে আসা এই সংস্থা কৃষি বর্জ্য থেকে নিজস্ব ‘বায়োব্ল্যাক’ হার্ড কার্বন তৈরি করে এবং ক্যাথোড-ইলেকট্রোলাইট-সহ সম্পূর্ণ সেল দেশেই বানানোর দাবি করে, সংস্থার দাবি, তারাই ভারতের প্রথম সংস্থা যারা সম্পূর্ণ দেশীয় প্রযুক্তিতে সোডিয়াম-আয়ন পাউচ সেল তৈরি করেছে। ২০২৬-এর এপ্রিলে কেন্দ্রীয় বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রকের টেকনোলজি ডেভেলপমেন্ট বোর্ড (TDB) এই সংস্থাকে আর্থিক সহায়তা দিয়েছে।

কেপিআইটি-ট্রেন্টার মডেল: পুণের কেপিআইটি টেকনোলজিস আইআইএসইআর পুণের সহযোগিতায় ২০২৩ সালে নিজস্ব সোডিয়াম-আয়ন প্রযুক্তি তৈরি করে (শক্তি ঘনত্ব ১০০-১৭০ Wh/kg, ৩,০০০-৬,০০০ সাইকেলে ৮০ শতাংশ ক্ষমতা ধরে রাখার দাবি), পরে ২০২৫-এর ফেব্রুয়ারিতে তা লাইসেন্স দেয় ট্রেন্টার এনার্জি সলিউশন্সকে।

রিচার্জিয়ন এনার্জি: পুণেরই আর একটি সংস্থা, বিজ্ঞান-প্রযুক্তি গবেষণা পরিষদের (CSIR) ন্যাশনাল কেমিক্যাল ল্যাবরেটরির স্পিন-অফ। নিজস্ব হার্ড কার্বন ও অ্যালুমিনিয়াম কারেন্ট-কালেক্টর প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করছে, এবং অটোমোটিভ রিসার্চ অ্যাসোসিয়েশন অফ ইন্ডিয়ায় (ARAI) স্বাধীন নিরাপত্তা-পরীক্ষাও করিয়েছে।

একাডেমিক গবেষণা: কেরলের আইআইএসইআর তিরুবনন্তপুরমে ড. এম এম শাইজুমনের নেতৃত্বে উচ্চ-ভোল্টেজ ক্যাথোড উপাদান নিয়ে গবেষণা চলছে (২০২৩-২০২৬), যেখানে কাজ হচ্ছে নতুন যৌগ নিয়ে।

শেয়ার বাজারেও এই প্রবণতার প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে, বিনিয়োগকারীরা রিলায়েন্স ইন্ডাস্ট্রিজ ও কেপিআইটি টেকনোলজিসের মতো সংস্থাকে সরাসরি সোডিয়াম-আয়ন সংশ্লিষ্ট খেলোয়াড় হিসেবে দেখছেন, আবার হিমাদ্রি স্পেশালিটি কেমিক্যালের মতো রাসায়নিক সংস্থাকেও সম্ভাব্য হার্ড কার্বন সরবরাহকারী হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। এক্সাইড ইন্ডাস্ট্রিজ ও আমারা রাজা এনার্জি অ্যান্ড মোবিলিটির মতো প্রথাগত ব্যাটারি সংস্থাও একাধিক রসায়নে (লিথিয়াম, সিসা-অ্যাসিড ও সোডিয়াম) বিনিয়োগ সম্প্রসারণ করছে বলে শিল্প-সূত্রের খবর। (এই তথ্য নিছক বাজার-প্রেক্ষাপট জানানোর জন্য, কোনওরকম বিনিয়োগ-পরামর্শ নয়।)

বিশেষজ্ঞ বিশ্লেষণ – ভারতের সোডিয়াম-আয়ন বাস্তুতন্ত্রের সবচেয়ে লক্ষণীয় দিক হল, এখানে একটিমাত্র বিশাল সংস্থার উপর (যেমন চিনে CATL) সবটা নির্ভর করছে না , বরং সমান্তরালে কাজ করছে বৃহৎ শিল্পগোষ্ঠী (রিলায়েন্স), আইআইটি-নির্ভর ডিপ-টেক স্টার্টআপ (ইন্ডি এনার্জি, রিচার্জিয়ন, নাক্সিয়ন) এবং প্রযুক্তি-হস্তান্তরের মডেল (কেপিআইটি-ট্রেন্টার)। এই বৈচিত্র্যই ভারতের বড় শক্তি, কিন্তু চ্যালেঞ্জও কম নয়। ক্যাথোড-উপাদানের ঘরোয়া উৎপাদন এখনও সীমিত, বড় মাপের সেল-উৎপাদন এখনও পাইলট পর্যায়ে, আর রিলায়েন্সের গিগাফ্যাক্টরির সময়সীমা বারবার পিছিয়ে যাওয়া প্রমাণ করে, বিশাল আকারে বাণিজ্যিক উৎপাদনে পা রাখা মোটেই সহজ কাজ নয়। TRL ৭ ছোঁয়া মানে প্রযুক্তি প্রস্তুত, কিন্তু তাকে লক্ষ লক্ষ ব্যাটারিতে পরিণত করা সম্পূর্ণ আলাদা চ্যালেঞ্জ।

উপসংহার: আগামী দু’-তিন বছরই নির্ধারক

সব মিলিয়ে ছবিটা দাঁড়ায় এই রকম, সোডিয়াম-আয়ন ব্যাটারি বৈজ্ঞানিক পরীক্ষায় পাশ করে ফেলেছে, বাণিজ্যিক বাস্তবতার প্রথম ধাপও পার করেছে, বিশেষত গ্রিড-স্টোরেজ ও ছোট গাড়িতে। কিন্তু এখনও তা লিথিয়াম-আয়নকে প্রতিস্থাপন করার বদলে তার পরিপূরক হিসেবেই বাজারে জায়গা করে নিচ্ছে। শক্তি ঘনত্বের ফারাক ঘুচতে আরও কয়েক বছর সময় লাগবে, আর LFP-র সঙ্গে খরচের পুরোপুরি সমতা আসতে আসতে ২০২৮ নাগাদ পৌঁছে যাবে বলে শিল্প-পূর্বাভাস, যদি না লিথিয়ামের দাম ফের অস্থির হয়ে ওঠে, বা সোডিয়াম-আয়নের উৎপাদন-স্কেল প্রত্যাশার চেয়ে ধীর গতিতে বাড়ে।

ভারতের জন্য এই প্রযুক্তি নিছক আর একটি বিকল্প নয়, লিথিয়ামের প্রায় সম্পূর্ণ আমদানি-নির্ভরতা থেকে বেরিয়ে আসার একটি বাস্তব পথ। রিলায়েন্সের গিগাফ্যাক্টরি সময়ে চালু হলে এবং ইন্ডি এনার্জি, রিচার্জিয়ন, নাক্সিয়নের মতো স্টার্টআপ গবেষণাগার থেকে বড় মাপের উৎপাদনে সফলভাবে পা রাখতে পারলে, আগামী পাঁচ বছরে ভারত এই ক্ষেত্রে শুধু গ্রাহক নয়, একটি গুরুত্বপূর্ণ উৎপাদক হিসেবেও নিজের জায়গা তৈরি করতে পারে। তবে তার জন্য প্রয়োজন ক্যাথোড ও উন্নত হার্ড কার্বনের ঘরোয়া উৎপাদন-শৃঙ্খল গড়ে তোলা, যা এখনও ভারতের সবচেয়ে বড় ফাঁক।


তথ্যসূত্র (নির্বাচিত)

(এই প্রতিবেদনে উল্লিখিত সংস্থার শেয়ার-সংক্রান্ত তথ্য নিছক বাজার-প্রেক্ষাপট জানানোর জন্য, কোনও বিনিয়োগ-পরামর্শ নয়। বিনিয়োগের আগে যোগ্য আর্থিক উপদেষ্টার পরামর্শ নেওয়া জরুরি। প্রতিবেদনে ব্যবহৃত সব খরচ ও বাজার-পরিসংখ্যান বিভিন্ন শিল্প-সমীক্ষা অনুযায়ী আনুমানিক, এবং সময়ের সঙ্গে বদলাতে পারে।)

Exit mobile version