Site icon Jist Feed

অকল্যান্ডে মোদী-লাক্সন বৈঠকে ভারত-নিউজিল্যান্ড “স্ট্র্যাটেজিক পার্টনারশিপ”, ইন্দো-প্যাসিফিকে নয়াদিল্লির কূটনৈতিক জয়

India_NZ

বাণিজ্য, প্রতিরক্ষা আর জ্বালানি সুরক্ষা- তিন দেশের সফরে ভারত কীভাবে ইন্দো-প্যাসিফিকের “ভরসাযোগ্য পার্টনার” হয়ে উঠছে

অকল্যান্ড, ১২ জুলাই: নিউজিল্যান্ডের মাটিতে মাওরি নববর্ষ মাতারিকি-র রেশ তখনও কাটেনি। ঠিক তার পরদিনই, অকল্যান্ডের গভর্নমেন্ট হাউসে বসল এক ঐতিহাসিক বৈঠক। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী আর তাঁর নিউজিল্যান্ডীয় প্রতিপক্ষ ক্রিস্টোফার লাক্সনের যৌথ ঘোষণা ভারত ও নিউজিল্যান্ড এখন থেকে “স্ট্র্যাটেজিক পার্টনার”। চার দশক পর কোনও ভারতীয় প্রধানমন্ত্রীর নিউজিল্যান্ড সফর, আর সেই সফরেই সম্পর্কের মানচিত্র বদলে দেওয়ার মতো একটি ঘোষণা বিষয়টি নিছক কূটনৈতিক শিষ্টাচার নয়, বরং ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে ভারতের অবস্থান পুনর্নির্ধারণের একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ।

সংক্ষেপে যা ঘটল

চার দশকের নীরবতা ভেঙে যে বার্তা

লাক্সন নিজের বক্তব্যের শুরুতেই মনে করিয়ে দেন, এটি কোনও সাধারণ রাষ্ট্রীয় সফর নয়, এটি ঐতিহাসিক, কারণ চল্লিশ বছরে এই প্রথম কোনও ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী নিউজিল্যান্ডের মাটিতে পা রাখলেন। কূটনীতির ভাষায় এই ধরনের “সফরের শূন্যতা” সাধারণত সম্পর্কের অগ্রাধিকার-হীনতার লক্ষণ হিসেবে পড়া হয়। সেই শূন্যতা ভরাট করতে গত এক বছরে দুই দেশ যে গতিতে এগিয়েছে, তা লক্ষণীয় মুক্ত বাণিজ্য আলোচনা শুরু, নয় মাসের মধ্যে তা সম্পন্ন করা এবং এপ্রিলে চুক্তি সাক্ষর, সব মিলিয়ে একটি “কম্প্রেসড টাইমলাইন” যা সচরাচর দেখা যায় না।

মোদী তাঁর হিন্দি ভাষণে এই গতিকেই তুলে ধরেছেন। তিনি বলেছেন, রেকর্ড সময়ে সম্পন্ন হওয়া এই বাণিজ্য চুক্তি দুই দেশের শিল্প, কৃষক ও যুবসমাজের জন্য নতুন দরজা খুলে দিয়েছে। গত তিন বছরে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য ৫০ শতাংশের বেশি বেড়েছে বলে তিনি দাবি করেন, এবং আগামী পাঁচ বছরে তা দ্বিগুণ করার লক্ষ্যমাত্রার কথা জানান।

“স্ট্র্যাটেজিক পার্টনারশিপ” আসলে কী

কূটনৈতিক পরিভাষায় “স্ট্র্যাটেজিক পার্টনারশিপ” একটি নির্দিষ্ট স্তর নির্দেশ করে, এটি স্রেফ বাণিজ্যিক সৌহার্দ্যের ঊর্ধ্বে গিয়ে প্রতিরক্ষা, নিরাপত্তা, প্রযুক্তি ও দীর্ঘমেয়াদী নীতিগত সমন্বয়ের প্রতিশ্রুতি বহন করে। লাক্সন নিজেই বলেছেন, ক্রমবর্ধমান অস্থির বিশ্বে এই ধরনের মজবুত পার্টনারশিপ আগের চেয়ে অনেক বেশি জরুরি হয়ে পড়েছে।

যে ক্ষেত্রগুলিতে সরাসরি প্রভাব পড়বে –

ক্ষেত্রকী পরিবর্তন হচ্ছে
বাণিজ্য ও বিনিয়োগFTA বাস্তবায়ন, ২০ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ প্রতিশ্রুতি, ২০৩০-এর মধ্যে বাণিজ্য দ্বিগুণের লক্ষ্য
প্রতিরক্ষা ও সামুদ্রিক নিরাপত্তাBilateral Naval Exercise, Logistics Support, Hydrographic সহযোগিতা
আইন প্রয়োগTransnational Crime, Cyber Crime, আর্থিক অপরাধ দমনে যৌথ কাঠামো
শিক্ষা ও দক্ষতানিউজিল্যান্ডের বিশ্ববিদ্যালয়গুলিকে ভারতে ক্যাম্পাস খোলার আমন্ত্রণ
সংস্কৃতিCultural Cooperation MOU-র মাধ্যমে আর্ট, হেরিটেজ ও ক্রিয়েটিভ ইন্ডাস্ট্রি বিনিময়
স্বাস্থ্যTraditional Medicine (আয়ুর্বেদ-সহ) সহযোগিতা বৃদ্ধি

FTA থেকে স্ট্র্যাটেজিক পার্টনারশিপ

গত ২৭ এপ্রিল নয়াদিল্লির ভারত মণ্ডপমে সাক্ষরিত হয়েছিল ভারত-নিউজিল্যান্ড FTA। বর্তমানে দুই দেশের মধ্যে মোট দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যের পরিমাণ প্রায় ৩৯৫ কোটি নিউজিল্যান্ড ডলার, যা তুলনামূলকভাবে ছোট, কিন্তু এখানেই লুকিয়ে আছে সম্ভাবনার বীজ। FTA কার্যকর হলে ৮ হাজারের বেশি ভারতীয় রপ্তানি পণ্য নিউজিল্যান্ডে শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার পাবে দিন এক থেকেই, পাশাপাশি ভারতীয় পেশাদারদের জন্য বছরে প্রায় পাঁচ হাজার ওয়ার্ক ভিসার সুযোগ তৈরি হবে বলে জানা যাচ্ছে।

এই চুক্তির একটি বিশেষ দিক হল, বিশ্বের প্রথম কোনও দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য চুক্তিতে AYUSH (আয়ুর্বেদ, যোগ, ইউনানি, সিদ্ধা, হোমিওপ্যাথি)-কে আলাদা অধ্যায় হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে, যা ভারতের সফট পাওয়ার কূটনীতির একটি নতুন মাত্রা।

সমুদ্র, নিরাপত্তা আর ইন্দো-প্যাসিফিকের নতুন সমীকরণ

লাক্সন তাঁর বক্তৃতায় স্পষ্ট করে দিয়েছেন, নিউজিল্যান্ডের সমৃদ্ধি ও নিরাপত্তা একটি স্থিতিশীল ইন্দো-প্যাসিফিকের উপর নির্ভরশীল। এই প্রেক্ষিতেই দুই দেশ সামুদ্রিক নিরাপত্তা সহযোগিতার একটি Framework-এ সহমত হয়েছে, যার মধ্যে রয়েছে যৌথ নৌ-মহড়া ও হাইড্রোগ্রাফিক সহযোগিতা। প্রতিরক্ষা মন্ত্রক পর্যায়ে নিয়মিত কাঠামোগত আলোচনার সিদ্ধান্তও নেওয়া হয়েছে।

এই সফরটি বিচ্ছিন্ন কোনও ঘটনা নয়। মোদীর তিন-দেশীয় সফরের প্রথম দুই পর্বে ইন্দোনেশিয়া ও অস্ট্রেলিয়ায় গিয়ে তিনি প্রতিরক্ষা, সাইবার নিরাপত্তা ও জ্বালানি ক্ষেত্রে একাধিক চুক্তি সম্পন্ন করেছেন। মেলবোর্নে অস্ট্রেলিয়ার সঙ্গে সম্পাদিত ইউরেনিয়াম রপ্তানি চুক্তিটি এক্ষেত্রে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য, এই চুক্তি নিউজিল্যান্ড লেগের অংশ না হলেও, গোটা সফরের কৌশলগত বার্তাকে আরও জোরালো করে তোলে।

জ্বালানি সুরক্ষা: তিন দেশের সফরে লুকিয়ে থাকা আসল গল্প

ভারতের ২০৪৭ সালের মধ্যে ১০০ গিগাওয়াট পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতার লক্ষ্যমাত্রা দীর্ঘদিন ধরেই আটকে ছিল ইউরেনিয়ামের নিশ্চিত জোগানের অভাবে। বিশ্বের প্রায় ২৮ শতাংশ ইউরেনিয়াম ভাণ্ডার যে দেশের হাতে, সেই অস্ট্রেলিয়ার সঙ্গে ২০১৪ সালে সমঝোতা হলেও অস্ত্র-নিরাপত্তা সংক্রান্ত উদ্বেগে তা কার্যকর হয়নি। এবারের সফরে সেই দীর্ঘদিনের অচলাবস্থা কাটল, শুধুমাত্র শান্তিপূর্ণ ব্যবহারের শর্তে ইউরেনিয়াম রপ্তানির প্রশাসনিক চুক্তি সাক্ষরিত হয়েছে।

এই প্রেক্ষাপটে নিউজিল্যান্ডের সঙ্গে সম্পর্কের উত্তরণকে বিচ্ছিন্নভাবে না দেখে গোটা সফরের অংশ হিসেবে দেখাই সমীচীন। ভারত এখানে একই সঙ্গে তিনটি কাজ করছে, জ্বালানি সুরক্ষা নিশ্চিত করা (অস্ট্রেলিয়া), বাণিজ্য ও বিনিয়োগের নতুন বাজার তৈরি করা (নিউজিল্যান্ড), এবং প্রতিরক্ষা-প্রযুক্তি সহযোগিতা গভীর করা (তিনটি দেশেই)। এই ত্রিমুখী কৌশল একটি স্পষ্ট বার্তা দেয়, ইন্দো-প্যাসিফিকে ভারত আর শুধু একজন অংশগ্রহণকারী নয়, বরং একটি নির্ভরযোগ্য, দীর্ঘমেয়াদী কৌশলগত শক্তি হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করতে চাইছে।

খেলাধুলার কূটনীতি: হকি থেকে রাগবি পর্যন্ত

দুই নেতার বক্তৃতাতেই খেলাধুলার প্রসঙ্গ এসেছে বিশেষ গুরুত্ব নিয়ে। ১৯২৬ সালে মেজর ধ্যানচাঁদের নেতৃত্বে ভারতীয় সেনা হকি দলের নিউজিল্যান্ড সফরের শতবর্ষ উদযাপনে সারা বছর ধরে চলবে “১০০ ইয়ার্স অফ ইউনিটি থ্রু স্পোর্ট” কর্মসূচি। লাক্সন নিজে একটি মজার ঘটনার কথা তুলে ধরেন, দিল্লিতে রাস্তার ক্রিকেটে প্রাক্তন কিউয়ি অধিনায়ক রস টেলরকে এক কিশোর ভারতীয় বোলারের বলে আউট হওয়ার গল্প, যা কূটনৈতিক মঞ্চেও দুই দেশের ক্রীড়া-সম্পর্কের উষ্ণতাকে তুলে ধরে।

এই ধরনের “স্পোর্টস জয়েন্ট অ্যাকশন প্ল্যান” যেখানে কোচিং, যুব ক্রীড়া, নারী ও কন্যাদের খেলাধুলা এবং হাই-পারফরম্যান্স স্পোর্টস সায়েন্স নিয়ে কাজ হবে, ভারতের ক্রীড়া-বাস্তুতন্ত্রের জন্যও একটি শেখার সুযোগ। ফুটবল-সহ অন্যান্য খেলায় ভারতের কাঠামোগত উন্নয়নের আলোচনায় প্রায়ই ছোট দেশগুলির সংগঠিত ক্রীড়া-অংশীদারিত্ব মডেল উদাহরণ হিসেবে উঠে আসে, এক্ষেত্রেও তেমনই একটি কাঠামোগত সহযোগিতার সূচনা হল বলা যায়।

প্রবাসী ভারতীয় সমাজ: সম্পর্কের ভিত্তি

নিউজিল্যান্ডে প্রায় তিন লক্ষের বেশি ভারতীয় বংশোদ্ভূত মানুষ বসবাস করেন, যাঁরা দেশটির রাজনীতি, অর্থনীতি ও ব্যবসায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন। লাক্সন নিজেই স্বীকার করেছেন, কিউয়ি-ভারতীয়দের মাধ্যমেই দুই দেশ পরস্পরকে বোঝার সুযোগ পায়। তবে এই সফর সম্পূর্ণ ঘটনাবিহীন ছিল না, স্পার্ক অ্যারিনার বাইরে খালিস্তানপন্থী ও অভিবাসন-বিরোধী কয়েকটি গোষ্ঠীর বিক্ষোভও দেখা গিয়েছে, যদিও পুলিশি নিরাপত্তার মধ্যে অনুষ্ঠান নির্বিঘ্নেই সম্পন্ন হয়েছে।

দীর্ঘমেয়াদী তাৎপর্য: ভারতের জন্য কী লাভ

এই সফর ও তার ফলাফলকে যদি নিছক একটি প্রোটোকল-ভিত্তিক রাষ্ট্রীয় সফর হিসেবে না দেখে বৃহত্তর কৌশলগত ছবির অংশ হিসেবে দেখা হয়, তাহলে কয়েকটি বিষয় স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

প্রথমত, বাজার বৈচিত্র্যকরণ। ২০২৬ সালের গোড়ায় মার্কিন শুল্ক নীতির অভিঘাতে ভারতের রপ্তানি করিডোর কিছুটা চাপে পড়েছিল। নিউজিল্যান্ডের মতো উচ্চ-আয়ের বাজারে শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার সেই বৈচিত্র্যকরণ কৌশলের একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ, বিশেষত প্রশান্ত মহাসাগরীয় দ্বীপরাষ্ট্রগুলিতে পৌঁছনোর প্রবেশদ্বার হিসেবে নিউজিল্যান্ডের ভৌগোলিক গুরুত্ব বিবেচনা করলে।

দ্বিতীয়ত, বিশ্বস্ততার রাজনৈতিক পুঁজি। ইন্দো-প্যাসিফিকে চিনের ক্রমবর্ধমান সামরিক তৎপরতার পটভূমিতে, বিশেষত দক্ষিণ প্রশান্ত মহাসাগরে চিনের সাম্প্রতিক ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা নিয়ে অস্ট্রেলিয়ার উদ্বেগের প্রেক্ষিতে, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ-ভিত্তিক দেশগুলির সঙ্গে ভারতের এই ধরনের কাঠামোগত অংশীদারিত্ব একটি স্পষ্ট বার্তা দেয়। ভারত এখানে কোনও পক্ষ নেওয়ার কথা প্রকাশ্যে না বললেও, নিয়ম-ভিত্তিক আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা ও নৌ-চলাচলের স্বাধীনতার পক্ষে তার অবস্থান জোরালো করছে।

তৃতীয়ত, জ্বালানি ও প্রযুক্তি সুরক্ষা। অস্ট্রেলিয়ার সঙ্গে ইউরেনিয়াম চুক্তি ভারতের পরিচ্ছন্ন জ্বালানি লক্ষ্যমাত্রাকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার পথ প্রশস্ত করেছে। এর সঙ্গে নিউজিল্যান্ডের সঙ্গে ফিনটেক (UPI সংযোগ), কৃষি-প্রযুক্তি ও দুগ্ধ শিল্পে সহযোগিতা যুক্ত হলে একটি সামগ্রিক অঞ্চলভিত্তিক প্রযুক্তি-অংশীদারিত্বের ছবি স্পষ্ট হয়।

চতুর্থত, বহুপাক্ষিক মঞ্চে সমর্থন। রাষ্ট্রসংঘ-সহ আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলির সংস্কার নিয়ে দুই দেশের অভিন্ন অবস্থান, এবং সন্ত্রাসবাদ দমনে যৌথ ওয়ার্কিং গ্রুপ গঠন, ভারতের দীর্ঘদিনের কূটনৈতিক এজেন্ডাকে আরও একটি সমর্থনকারী কণ্ঠ জোগাল।

চার দশকের কূটনৈতিক নীরবতার পর একটি সফর, একটি বাণিজ্য চুক্তি আর একটি কৌশলগত অংশীদারিত্বের ঘোষণা— অকল্যান্ডের এই দিনটি ভারতের ইন্দো-প্যাসিফিক কূটনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হয়ে থাকল। মাতারিকি আর কৃত্তিকা নক্ষত্রের এক ও অভিন্ন তারার নীচে দাঁড়িয়ে দুই প্রধানমন্ত্রী যে “একসঙ্গে জয়ী হওয়ার” বার্তা দিয়েছেন, তার বাস্তব পরীক্ষা শুরু হবে এখন থেকেই— বাণিজ্য পরিসংখ্যানে, বিনিয়োগের বাস্তবায়নে, আর ইন্দো-প্যাসিফিকের ক্রমশ জটিল হয়ে ওঠা ভূ-রাজনৈতিক দাবাখেলায়।

তথ্যসূত্র: RNZ, Business Standard, Al Jazeera, The Express Tribune, Press Information Bureau (ভারত সরকার), New Zealand Ministry of Foreign Affairs and Trade.

Exit mobile version