Site icon Jist Feed

বারুইপুরে পরপর দুই মৃত্যু: গুজব নয়, চাই প্রকৃত তদন্ত ও প্রশাসনিক সক্রিয়তা

surjapur

গত কয়েক দিনে বারুইপুর পুলিশ জেলার অন্তর্গত সূর্যপুর ও ফুলতলা এলাকায় ঘটে যাওয়া দু’টি পৃথক মর্মান্তিক ঘটনা গোটা এলাকা তো বটেই, সমগ্র রাজ্যের রাজনীতি কে উত্তাল করে তুলেছে। আজকের এনকাউন্টার এর ঘটনার পরে, দেশের জাতীয় মিডিয়াতেও বিষয়গুলি ব্যাপক আলোচিত হয়েছে। একটি ক্ষেত্রে এক নাবালিকাকে ধর্ষণ করে খুনের অভিযোগ উঠেছে, অন্যটিতে সামান্য খেলাকে কেন্দ্র করে সতেরো বছরের এক কিশোরের মৃত্যু হয়েছে। দুটি ঘটনাই ভয়ংকর, দুটি ঘটনাতেই ন্যায়বিচার প্রাপ্য। কিন্তু এই দুই ঘটনাকে ঘিরে যেভাবে গুজব, পাল্টা-গুজব এবং রাজনৈতিক বাগ্‌যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়েছে, তা এলাকার সামাজিক সম্প্রীতির পক্ষে বিপজ্জনক।

প্রথম ঘটনা: সূর্যপুরে নাবালিকা হত্যার অভিযোগ

স্থানীয় সূত্রে জানা গিয়েছে, শনিবার রাতে সূর্যপুর এলাকায় এক নাবালিকাকে ধর্ষণ করে খুনের অভিযোগ ওঠে। ঘটনার পরদিন, অর্থাৎ পাঁচ তারিখ সকালে ঘটনাস্থলে পৌঁছে দেখা যায়, জেলার প্রধান সড়কে কাঠের গুঁড়ি ফেলে অবরোধ করা হয়েছে, পুলিশের গাড়ি সারি দিয়ে দাঁড়িয়ে এবং উত্তেজিত জনতা রাস্তায় নেমে এসেছে। কথাবার্তায় প্রকাশ পাচ্ছিলো চরম সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ। স্থানীয় বাসিন্দাদের একাংশের অভিযোগ, ঘটনার পিছনে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপে অভিযুক্তদের রেহাই দেওয়া হয়েছে। এই অভিযোগ কতটা সত্য, তা এখনও তদন্তসাপেক্ষ এবং প্রশাসনিক স্তরে এর কোনো সমর্থন পাওয়া যায়নি। এখনো পর্যন্ত চার জন দুষ্কৃতী প্রভাস মন্ডল, আনন্দ সর্দার , দিবাকর সর্দার ও কবির মোল্লা কে গ্রেপ্তার হয়েছে। ঘটনা পুনর্নির্মাণের সময় পালিয়ে যাবার চেষ্টা করলে পুলিশের গুলিতে মৃত্যু হয় প্রভাস মন্ডলের।

অন্যদিকে, স্থানীয় সূত্র ও আইনজীবী মহলের বক্তব্য অনুযায়ী, এই দুষ্কর্মের সঙ্গে যুক্ত সন্দেহভাজনরা এলাকারই কিছু নেশাগ্রস্ত যুবক, এবং কোনও রাজনৈতিক সংগঠনের সঙ্গে তাদের সরাসরি যোগসূত্রের প্রমাণ এখনও প্রকাশ্যে আসেনি।

বিজেপির জেলা সূত্রে জানাযায় বারুইপুর চার নম্বর মন্ডলের জিএস শান্তনু মন্ডল গতকাল ঘটনার পর থেকেই এলাকাবাসীর সঙ্গে নিয়ে অনুসন্ধান চালাচ্ছেন এবং থানায় লিখিত অভিযোগ জমা দিয়েছেন।

এই টানাপড়েনের মধ্যেই বিভিন্ন রাজনৈতিক শিবিরের তরফে পরস্পরবিরোধী বয়ান ছড়িয়ে পড়ে। সিপিএম এর দাবি অনুসারে লাহেক আলী বিক্ষোভ কর্মসূচিতে নেতৃত্ব দিয়েছেন। লাহেক আলী সহ কয়েক জনকে বিভিন্ন মিডিয়াতে বিজেপি ও আর এস এস কে দায়ী করে বক্তব্য দিতে দেখাযায়। বিজেপির অভিযোগ, প্রকৃত ঘটনা বিকৃত করে রাজনৈতিক লেভার আশায় একটি নির্দিষ্ট সম্প্রদায়ের মানুষকে উত্তেজিত করে তোলা হচ্ছে, লাহেক আলীর নেতৃত্বে, যার জেরে পুলিশের উপর হামলা, গাড়ি ভাঙচুর এবং ধপধপি ও সূর্যপুর স্টেশনে রেল অবরোধের ঘটনা ঘটে। সেই সঙ্গে ইন্দ্রজিৎ তাঁতি নামে পেশায় এক অটোচালককে উত্তেজিত জনতা গুজবের বশবর্তী হয়ে পিটিয়ে হত্যা করে। এই অভিযোগের প্রশাসনিক তদন্ত শুরু হয়েছে। এই ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে ৮-৯ জুলাই রাতভর তল্লাশি চালিয়ে মোট ৩২ জনকে গ্রেফতার এবং বেশ কয়েকজনকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আটক করা হয়েছে।

রাজনৈতিক তরজা ও সোশ্যাল মিডিয়ায় বিদ্বেষ

ঘটনার জেরে বাংলা সংবাদমাধ্যম ও সোশ্যাল মিডিয়ায় ব্যাপক চর্চা শুরু হয়। স্থানীয় দুই বিধানসভা কেন্দ্রের দুই প্রার্থী টুম্পা সর্দার ও বিশ্বজিৎ পালের ফেসবুক পেজে একটি বিশেষ রাজনৈতিক মতাদর্শি উশৃঙ্খল বাহিনী অশালীন মন্তব্য ও সাম্প্রদায়িক উস্কানিমূলক কমেন্ট করতে থাকে বলে অভিযোগ। দুই প্রার্থীই নিজেদের ফেসবুক পোস্টে অভিযুক্তদের কঠোরতম শাস্তির দাবি জানিয়েছেন। পরিস্থিতি যাতে আরও উত্তপ্ত না হয়, তার জন্য এক প্রার্থী বিশ্বজিৎ পাল ব্যক্তিগতভাবে ঘটনাস্থলে না গিয়ে পুলিশের কাছে যথাযথ তদন্তের আর্জি জানিয়েছেন বলে জানা গিয়েছে। স্থানীয় রাজনৈতিক নেতৃত্বের একাংশ প্রয়োজনে মানহানির মামলা দায়েরের কথাও ভাবছে বলে খবর।

এই পর্যায়ে আমাদের স্পষ্টভাবে বলা দরকার: কোনও অপরাধের বিচার হোক আদালতে, প্রমাণের ভিত্তিতে। সোশ্যাল মিডিয়ায় নাম করে দোষারোপ, সম্প্রদায়গত ভাষায় আক্রমণ, বা যাচাই না করা তথ্য ছড়িয়ে দেওয়া কোনওটাই ন্যায়বিচারের পথ প্রশস্ত করে না, বরং সমাজে অবিশ্বাস ও উত্তেজনা বাড়ায়।

দ্বিতীয় ঘটনা: ফুলতলায় কিশোরের মৃত্যু

প্রথম ঘটনার ঠিক পরের দিনই বারুইপুর ফুলতলা এলাকায় সতেরো বছর বয়সি কিশোর প্রসেনজিৎ বিশ্বাসের মৃত্যু হয় বলে জানা গিয়েছে। প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, ফুটবল খেলাকে কেন্দ্র করে বচসার জেরে সমবয়সি কয়েকজন যুবকের সঙ্গে বিরোধে তার মৃত্যু হয়। এই ঘটনায় আক্রমণের ধরণ দেখে এলাকাবাসী স্তম্ভিত এবং অভিভাবক মহলে আতঙ্ক ছড়িয়েছে। তাদের প্রশ্ন, এই ভাবে ধারালো অস্ত্রনিয়ে যদি নাবালকরা খুনোখুনি করে তাহলে ছেলে মেয়েদের কি ভাবে একা বাইরে ছাড়া যাবে !

এই দুটি ঘটনার মধ্যে সরাসরি কোনও কার্যকারণ সম্পর্ক আছে কি না, তা এখনও নিশ্চিতভাবে বলা যাচ্ছে না এবং তা তদন্তসাপেক্ষ। তবে স্থানীয় বাসিন্দাদের একটি বড় অংশের প্রশ্ন সঙ্গত: এত অল্প বয়সে ছেলেরা কীভাবে ধারালো অস্ত্র হাতে তুলে নিচ্ছে? কিশোর-কিশোরীদের মধ্যে হিংসার প্রবণতা কোথা থেকে আসছে, কারা এই মানসিকতা তৈরি করছে এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজা জরুরি। অন্যদিকে, এলাকার নাগরিকদের একাংশের দাবি, আগেরদিন ঘটে যাওয়া সূর্যপুরের ঘটনায় লাহেক আলীর নেতৃতে সিপি এম যেভাবে হিন্দু সংগঠন ও বিজেপি কে দায়ী করে মিথ্যা বিদ্বেষ ছড়ায়, তাতে, এলাকায় চরম উত্তেজনার বাতাবরণ তৈরী হয়। যা এই ঘটনায় ইন্ধন যোগায়। এলাকাবাসী লাহেক আলীর গ্রেপ্তার চান এবং এই ঘটনার পূর্ণাঙ্গ ও নিরপেক্ষ তদন্ত দাবি করেছেন। এই ঘটনায় পুলিশ তিন জন কে আটক করেছে।

মঙ্গলবার রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী নিহত কিশোরের পরিবারের সঙ্গে কথা বলেন এবং উপযুক্ত বিচারের আশ্বাস দেন। এটি স্বাগত পদক্ষেপ, তবে আশ্বাস যেন কথার কথা না থেকে বাস্তবে প্রতিফলিত হয়, তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব প্রশাসনের।

প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে প্রশাসনের দিকেই

এই দুই ঘটনার প্রেক্ষিতে বারুইপুর পুলিশ জেলার সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়েও প্রশ্ন উঠছে। এলাকাবাসীর দীর্ঘদিনের অভিযোগ, বারুইপুর পুরসভার বিভিন্ন ওয়ার্ডে , স্টেশন সংলগ্ন অঞ্চলে সন্ধ্যা নামলেই প্রকাশ্য রাস্তায় মদ, জুয়া ও সাট্টার আসর বসে, অথচ প্রশাসনের নজর সেদিকে পড়ে না। ব্যস্ত রাস্তার দুই ধারে যততত্র দোকান বসিয়ে জবরদখল চলছে। যত্রতত্র রাস্তা আটকে পার্কিং, বাইপাসে ট্র্যাফিক আইন ভেঙে উল্টো দিকে গাড়ি-অটো-টোটো-বাইক-সাইকেল চলাচল এসবই এলাকার নিত্যদিনের ছবি। মূল রাস্তার ব্যস্ততম কাছারি বাজার এলাকায় রাস্তা জুড়ে পেয়ারা বাজার সামলাতে সামান্য কয়েকজন সিভিক ভলান্টিয়ারের কেবল দেখা মেলে, পর্যাপ্ত পুলিশ কর্মী সেখানে দেখা যায়না। এলাকার প্রবীণ নাগরিকদের মতে, অতীতের মতো পেট্রোলিং এর কোনো ব্যাবস্থাই আর চোখে পড়ে না। তার ওপরে তৃণমূল জমানায় ঢালাও মদের লাইসেন্স দেওয়ার ফলে, সামাজিক সুরক্ষায় আরো চ্যালেঞ্জ এর মুখে।

এই সার্বিক শৃঙ্খলাহীনতা- ট্র্যাফিক থেকে শুরু করে অবৈধ কারবার পর্যন্ত- দীর্ঘদিন ধরে চলতে থাকলে তার প্রভাব সমাজের সার্বিক নিরাপত্তাবোধের উপর পড়তে বাধ্য। এলাকাবাসীর নিরাপত্তার দাবি নিছক আবেগের বিষয় নয়, এটি প্রশাসনিক দায়িত্বের প্রশ্ন।

শেষ কথা

সূর্যপুর ও ফুলতলার দুটি ঘটনাই মর্মান্তিক, এবং দুটি ক্ষেত্রেই প্রকৃত দোষীদের চিহ্নিত করে দ্রুত ও নিরপেক্ষ বিচার হওয়া প্রয়োজন। রাজ্য সরকারের সুস্পষ্ট নীতি অনুসারে তদন্তের অগ্রগতি অভুতপূর্ব। সমস্ত নাগরিকের কাছে আবেদন প্রশাসনকে সর্বত ভাবে সাহায্য করা। ধৈর্য রাখা। কিন্তু তদন্তের আগেই কোনও সম্প্রদায় বা রাজনৈতিক পক্ষকে সামগ্রিকভাবে দায়ী করে দেওয়া, বা প্রতিহিংসামূলক ভাষায় সামাজিক মাধ্যমে বিদ্বেষ ছড়ানো এই প্রবণতা বন্ধ হওয়া দরকার। প্রশাসনের কাছে এলাকাবাসীর প্রত্যাশা স্পষ্ট: গুজবের পিছনে না ছুটে প্রকৃত তদন্ত, দোষীদের দ্রুত শাস্তি, এবং দৈনন্দিন আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় সক্রিয় ও ধারাবাহিক পদক্ষেপ। বারুইপুরের মতো ক্রমবর্ধমান জনবহুল এলাকায় প্রশাসনিক সক্রিয়তার অভাব শুধু একটি এলাকার সমস্যা নয়, এটি গোটা রাজ্যের নগরায়নের সঙ্গে তাল মিলিয়ে প্রশাসনিক পরিকাঠামো তৈরির ব্যর্থতারই একটি দৃষ্টান্ত।

Exit mobile version