প্রান্ত প্রচারক বৈঠকে জনসংখ্যার ভারসাম্যহীনতা, মাদকাসক্তি ও রামমন্দিরের দানবাক্স বিতর্কে উদ্বেগ প্রকাশ; বাংলার প্রেক্ষাপটে বিশেষ তাৎপর্য
বেলাগাভি, ১২ জুলাই: কর্ণাটকের সীমান্তবর্তী শহর বেলাগাভি গত তিনদিন ধরে যে নিঃশব্দ কিন্তু সুচারু আয়োজনের সাক্ষী থেকেছে, তার রেশ কাটতে সময় লাগবে। রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘের (আরএসএস) বার্ষিক অখিল ভারতীয় প্রান্ত প্রচারক বৈঠক শনিবার শেষ হয়েছে এমন এক আবহে, যেখানে সাংগঠনিক পরিকল্পনার পাশাপাশি জাতীয় স্তরের বেশ কয়েকটি স্পর্শকাতর প্রশ্ন জনগণনা, জনসংখ্যার ভারসাম্যহীনতা, মাদকাসক্তি এবং অযোধ্যার রামমন্দিরে দানবাক্সের অর্থ গোনায় অনিয়ম একসঙ্গে চর্চায় উঠে এসেছে। সঙ্ঘ পরিবারের কাছে এই বৈঠকটি নিছক প্রশাসনিক পর্যালোচনা নয়; এটি আসন্ন এক বছরের কর্মপন্থা নির্ধারণের সেই মঞ্চ, যেখান থেকে সারা দেশের শাখা সংগঠনের যোজনা ঠিক হয়।
তিনদিনের বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন সঙ্ঘের সরসঙ্ঘচালক ড. মোহন ভাগবত এবং সরকার্যবাহ দত্তাত্রেয় হোসবলে। দেশের ৪৬টি প্রান্ত থেকে আসা মোট ২২৬ জন কার্যকর্তা এই বৈঠকে অংশ নেন। তিনদিনের আলোচনার পরিধি ছিল বিস্তৃত, মার্চ ২০২৬-এর পর দেশজুড়ে অনুষ্ঠিত প্রশিক্ষণ শিবিরগুলির পর্যালোচনা থেকে শুরু করে শতবর্ষ উদযাপনের বাকি কর্মসূচির রূপরেখা, সবকিছুই এই তিন দিনে আলোচিত হয়েছে।
কী নিয়ে কথা হলো বেলাগাভিতে ?
সঙ্ঘের সাংগঠনিক কাঠামোয় প্রতি বছর মার্চ মাসের পর বিভিন্ন স্তরে যে প্রশিক্ষণ শিবির চলে, তার হিসেব-নিকেশ এই বৈঠকের অন্যতম মূল অংশ। এবারের হিসেব বলছে, সারা দেশে মোট ৮৩টি সঙ্ঘ শিক্ষা বর্গ এবং ১২টি কার্যকর্তা বিকাশ বর্গ সম্পন্ন হয়েছে, যেখানে প্রশিক্ষণ নিয়েছেন প্রায় ১৮ হাজার ৮৪২ জন স্বয়ংসেবক। দৈনিক শাখা পরিচালনা, সঙ্ঘের কার্যপদ্ধতি, গ্রাম বিকাশ, কুটুম্ব প্রবোধন, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও পরিবেশ, এই বিষয়গুলি শিবিরের আলোচনাসূচিতে অন্তর্ভুক্ত ছিল।
| বিষয় | সংখ্যা |
|---|---|
| সম্পন্ন সঙ্ঘ শিক্ষা বর্গ | ৮৩টি |
| কার্যকর্তা বিকাশ বর্গ | ১২টি |
| মোট প্রশিক্ষিত স্বয়ংসেবক | ১৮,৮৪২ জন |
| অংশগ্রহণকারী কার্যকর্তা (এবারের বৈঠক) | ২২৬ জন |
| মোট প্রান্তের সংখ্যা | ৪৬টি |
শুধু প্রশিক্ষণ পর্যালোচনাতেই থেমে থাকেনি আলোচনা। শাখাস্তরে কর্মপরিকল্পনা রূপায়ণ নিয়ে বিস্তারিত কথা হয়েছে, এবং সেপ্টেম্বর মাসে সর্বাধিক শাখা বিস্তার যোজনা নিয়ে আলাদা করে পরিকল্পনা তৈরি হয়েছে। শতবর্ষ বর্ষের যে কর্মসূচিগুলি ইতিমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে, তার পর্যালোচনার পাশাপাশি বাকি কর্মসূচির পরিকল্পনাও নেওয়া হয়েছে, কারণ ২০২৫ সালের বিজয়াদশমী থেকে শুরু হওয়া এই শতবর্ষ উদযাপন চলবে ২০২৬ সালের বিজয়াদশমী, অর্থাৎ ২০ অক্টোবর পর্যন্ত। সরসঙ্ঘচালকের ২০২৬-২৭ সালের ভ্রমণ পরিকল্পনাও এই বৈঠকে চূড়ান্ত রূপরেখা পেয়েছে।
জনগণনা ও জনসংখ্যার ভারসাম্যহীনতা: কেন এত গুরুত্ব ?
বৈঠকের যে অংশটি সবচেয়ে বেশি নজর কেড়েছে, তা হলো দেশের বর্তমান পরিস্থিতি সংক্রান্ত আলোচনা, বিশেষত জনগণনা এবং জনসংখ্যার ভারসাম্যহীনতা থেকে উদ্ভূত চ্যালেঞ্জ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ। এই প্রসঙ্গটি নতুন নয়, সঙ্ঘ পরিবার দীর্ঘদিন ধরেই দেশের বিভিন্ন রাজ্যের মধ্যে জন্মহারের ফারাক এবং তার সম্ভাব্য রাজনৈতিক-সামাজিক প্রভাব নিয়ে সরব। সাম্প্রতিক এসআরএস বুলেটিনের তথ্য এই উদ্বেগের একটি বাস্তব ভিত্তিও তুলে ধরে। কেরালা, তামিলনাড়ু ও পশ্চিমবঙ্গের মতো রাজ্যে মোট প্রজনন হার (টিএফআর) ইতিমধ্যে প্রতিস্থাপন স্তরের নিচে নেমে গেছে, যেখানে বিহার, উত্তরপ্রদেশ, রাজস্থানের মতো রাজ্যে জন্মহার এখনও জাতীয় গড়ের অনেক ওপরে। এই অসম জনসংখ্যা বৃদ্ধির চিত্র আগামী দিনে লোকসভা আসন পুনর্বিন্যাস তথা ডিলিমিটেশনের প্রশ্নে রাজনৈতিক জটিলতা তৈরি করতে পারে বলে বিশেষজ্ঞদের একাংশ মনে করছেন।
তবে সঙ্ঘের অন্দরে “জনসংখ্যার ভারসাম্যহীনতা” শব্দবন্ধটির অর্থ শুধু রাজ্যভিত্তিক জন্মহারের ফারাকে সীমাবদ্ধ থাকে না; এর সঙ্গে যুক্ত থাকে সীমান্তবর্তী জেলাগুলিতে ধর্মীয় জনবিন্যাসের পরিবর্তন সংক্রান্ত আলোচনাও। সমালোচকদের একাংশের মতে, এই আখ্যান কখনও কখনও অনুপ্রবেশ ও ধর্মীয় জনবিন্যাসের প্রশ্নকে একই বন্ধনীতে ফেলে দেয়, যা বিতর্কের জন্ম দেয়। সঙ্ঘ ও তার অনুসারী সংগঠনগুলির বক্তব্য অনুসারে, সীমান্ত এলাকায় জনবিন্যাসের পরিবর্তন জাতীয় নিরাপত্তা ও সাংস্কৃতিক ভারসাম্যের প্রশ্নে গুরুত্বপূর্ণ এবং তাই এই বিষয়ে সচেতনতা প্রয়োজন। বৈঠকে ঠিক কী সুপারিশ করা হয়েছে, তার বিস্তারিত বিবরণ প্রকাশ্যে না এলেও, ভবিষ্যত কর্মসূচিতে এই প্রসঙ্গ কীভাবে প্রতিফলিত হয়, সেদিকে নজর থাকবে পর্যবেক্ষকদের।
মাদক-বিরোধী উদ্যোগ ও রামমন্দির দানবাক্স বিতর্ক
জনসংখ্যা প্রসঙ্গের পাশাপাশি বৈঠকে মাদকদ্রব্যের ক্রমবর্ধমান কুপ্রভাব নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে এবং নেশামুক্তির কাজে অগ্রাধিকার দেওয়ার প্রয়োজনীয়তার কথা বলা হয়েছে। সাধু-সন্ত রবিদাস মহারাজের ৬৫০তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে সারা বছর ধরে কী কী কর্মসূচি নেওয়া যায়, তারও পরিকল্পনা হয়েছে এই বৈঠকে।
আরেকটি স্পর্শকাতর প্রসঙ্গ ছিল অযোধ্যার শ্রীরাম জন্মভূমি মন্দিরের দানবাক্সের অর্থ গণনায় অনিয়মের ঘটনা। বৈঠকে উপস্থিত সকলে এই ঘটনায় দুঃখ প্রকাশ করেছেন এবং আশা প্রকাশ করেছেন যে তীর্থক্ষেত্র ন্যাসের অনুরোধে শুরু হওয়া তদন্তকারী দল (এসআইটি) ও পুলিশি তদন্ত একটি সিদ্ধান্তমূলক পরিণতিতে পৌঁছবে। ভবিষ্যতে যাতে রাম ভক্তদের শ্রদ্ধা ও বিশ্বাসে আঘাত লাগে এমন কোনো ঘটনা আর না ঘটে, তা নিশ্চিত করার প্রত্যাশাও ন্যাসের কাছ থেকে রাখা হয়েছে।
অখিল ভারতীয় প্রান্ত প্রচারক বৈঠক সঙ্ঘের বার্ষিক ক্যালেন্ডারে একটি রুটিন বৈঠক। সংঘের কার্যপদ্ধতি অনুসারে সিদ্ধান্তগ্রহণকারী বৈঠক অখিল হল ভারতীয় প্রতিনিধি সভা (এবিপিএস), যা প্রতি বছর মার্চ মাসে অনুষ্ঠিত হয় এবং যেখানে জাতীয় বিষয়ে প্রস্তাব গৃহীত হয়। প্রান্ত প্রচারক বৈঠক বরং সাংগঠনিক বাস্তবায়নের মঞ্চ, এখানে প্রান্তে প্রান্তে কাজের অগ্রগতি, প্রশিক্ষণ শিবিরের ফলাফল এবং আগামী বছরের কর্মপরিকল্পনা নিয়ে খোলামেলা আলোচনা হয়।
গত বছর, অর্থাৎ ২০২৫ সালে, এই বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছিল দিল্লির ঝান্ডেওয়ালানে সঙ্ঘের সদর দফতর কেশব কুঞ্জে, ৪ থেকে ৬ জুলাই। সেবার ২৩৩ জন কার্যকর্তা অংশ নিয়েছিলেন এবং মূল আলোচ্যসূচি ছিল শতবর্ষ বর্ষের প্রস্তুতি, কারণ ২০২৫ সালের ২ অক্টোবর বিজয়াদশমীর দিনেই সঙ্ঘের একশো বছর পূর্তি উদযাপিত হয় নাগপুরে, যেখানে প্রধান অতিথি ছিলেন প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি রামনাথ কোবিন্দ এবং পথসঞ্চলনে অংশ নেন প্রায় ১৪ হাজার ১০১ জন স্বয়ংসেবক। এবারের বেলাগাভি বৈঠক সেই ধারাবাহিকতারই পরবর্তী ধাপ, শতবর্ষের বাকি কর্মসূচি বাস্তবায়ন এবং আগামী বছরের রূপরেখা তৈরির মঞ্চ।
বাংলার প্রেক্ষাপট: সীমান্ত রাজ্যে শাখার নিঃশব্দ বিস্তার
জাতীয় স্তরের এই বৈঠকের প্রতিটি সিদ্ধান্তের একটি বিশেষ প্রভাব তৈরি হয় পশ্চিমবঙ্গে, এবং তার কারণ সাংগঠনিক পরিসংখ্যানেই তা স্পষ্ট। রাজ্যে সঙ্ঘের কাজ তিনটি প্রান্তে বিভক্ত উত্তরবঙ্গ, মধ্যবঙ্গ ও দক্ষিণবঙ্গ। ২০২৩ থেকে ২০২৫-এর মধ্যে এই তিন প্রান্তেই শাখা, মিলন ও মণ্ডলীর সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। উত্তরবঙ্গে সংখ্যা বেড়েছে ১,০৩৪ থেকে ১,১৫৩, মধ্যবঙ্গে ১,৩২০ থেকে ১,৮২৩, আর দক্ষিণবঙ্গে ১,২০৬ থেকে ১,৫৬৪-তে পৌঁছেছে। মোট হিসেবে এই দুই বছরে রাজ্যে প্রায় ৫০০টি নতুন শাখা যুক্ত হয়েছে।
| প্রান্ত | ২০২৩ সালের সংখ্যা | ২০২৫ সালের সংখ্যা |
|---|---|---|
| উত্তরবঙ্গ প্রান্ত | ১,০৩৪ | ১,১৫৩ |
| মধ্যবঙ্গ প্রান্ত | ১,৩২০ | ১,৮২৩ |
| দক্ষিণবঙ্গ প্রান্ত | ১,২০৬ | ১,৫৬৪ |
বাংলায় সঙ্ঘের এই যাত্রা অবশ্য একদিনের গল্প নয়। ১৯৩৯ সালের ২২ মার্চ, হিন্দু নববর্ষের দিন, কলকাতায় মাধব সদাশিব গোলওয়ালকর ও ভিঠল রাও পাটকির হাত ধরে বাংলার প্রথম শাখার গোড়াপত্তন হয়েছিল। প্রায় নয় দশক পর, ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে সরসঙ্ঘচালক মোহন ভাগবত টানা এগারো দিন বাংলায় কাটান এবং মধ্যবঙ্গের বর্ধমানে একটি প্রকাশ্য সভায় ভাষণ দেন, যা সঙ্ঘের কাছে রাজ্যে সাংগঠনিক গুরুত্বেরই ইঙ্গিত।
সঙ্ঘের পূর্ব ক্ষেত্র প্রচার প্রমুখ জিষ্ণু বসুর মতে, শাখা সংখ্যা বৃদ্ধির পেছনে রয়েছে দীর্ঘমেয়াদি শাখা স্তরের কাজ, ছোট ছোট বৈঠক, পদযাত্রা এবং মানুষের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ। তিনি সীমান্তবর্তী জেলা, বিশেষত উত্তর ও দক্ষিণ ২৪ পরগনার প্রসঙ্গে হিন্দু জনসংখ্যার আনুপাতিক পরিবর্তন নিয়ে উদ্বেগও প্রকাশ করেছেন, যা সঙ্ঘের “জনসংখ্যা ভারসাম্যহীনতা” সংক্রান্ত জাতীয় অবস্থানের সঙ্গে সরাসরি সাযুজ্যপূর্ণ।
তাৎপর্য ও ভবিষ্যৎ প্রভাব
বেলাগাভির এই বৈঠক সঙ্ঘের শতবর্ষ উদযাপনের শেষ পর্বের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। আগামী কয়েক মাসে শাখা বিস্তার, গৃহ সম্পর্ক অভিযান এবং সামাজিক সদ্ভাব বৈঠকের মতো কর্মসূচি যেভাবে বাস্তবায়িত হবে, তার রূপরেখা এখানেই স্থির হয়েছে। জাতীয় স্তরে জনগণনা ও জনসংখ্যার ভারসাম্যহীনতা নিয়ে যে আলোচনা হয়েছে, তা আসন্ন ডিলিমিটেশন বিতর্কের প্রেক্ষাপটে রাজনৈতিকভাবে তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। আর বাংলার প্রেক্ষাপটে, শাখা বিস্তারের এই ধারাবাহিকতা এবং এসআইআর-পরবর্তী ভোটার তালিকার বিতর্ক, আগামী দিনগুলিতে সঙ্ঘের কর্মসূচি বাংলার মাটিতে ঠিক কোন রূপ নেয়, রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক থেকে সাধারণ মানুষ সকলেরই নজর সেদিকে।
About The Author
Discover more from Jist Feed
Subscribe to get the latest posts sent to your email.
