Brihannalaচিত্র: শুভজিৎ বসু

‘বৃহন্নলা’ শব্দটির উৎস হিন্দু মহাকাব্য মহাভারত। অজ্ঞাতবাসের সময় অর্জুন উর্বশীর অভিশাপে নপুংসক রূপ ধারণ করে বিরাট রাজার রাজ্যে নৃত্য ও সংগীত শিক্ষকের ভূমিকায় আত্মগোপন করেছিলেন। সেই ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট আজ বদলে গিয়ে আধুনিক সমাজে এই শব্দটি তৃতীয় লিঙ্গ বা রূপান্তরকামী মানুষদের পরিচয় বহন করছে।

কিন্তু নামের এই ঐতিহ্যবাহী গুরুত্ব থাকলেও বাস্তব জীবনে বৃহন্নলারা এখনও সমাজের প্রান্তিক স্তরে অবস্থান করছেন। সামাজিক কুসংস্কার, অবহেলা এবং বৈষম্য তাদের নিত্যসঙ্গী। শিক্ষা, স্বাস্থ্য এবং কর্মসংস্থানের মতো মৌলিক অধিকার থেকেও তারা প্রায়শই বঞ্চিত।

বেঁচে থাকার কঠিন লড়াই

বর্তমান সমাজে তৃতীয় লিঙ্গের মানুষদের জন্য স্থায়ী কর্মসংস্থানের সুযোগ অত্যন্ত সীমিত। অনেক ক্ষেত্রেই তারা উপযুক্ত শিক্ষা গ্রহণের সুযোগ পান না, ফলে বিকল্প জীবিকার পথও সংকুচিত হয়ে পড়ে। স্বাস্থ্যসেবার ক্ষেত্রেও তারা নানা বাধার সম্মুখীন হন।

রাজ্য ও কেন্দ্রীয় সরকার বিভিন্ন জনকল্যাণমূলক প্রকল্প চালু করলেও বৃহন্নলাদের জন্য বিশেষ উদ্যোগের অভাব স্পষ্ট। নারী, যুবক-যুবতী, বিধবা কিংবা প্রবীণদের জন্য একাধিক ভাতা চালু থাকলেও এই সম্প্রদায়ের জন্য নির্দিষ্ট ও কার্যকর সহায়তা এখনও অনেকটাই অপ্রতুল।

এক অনুচ্চারিত কণ্ঠস্বর

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক বৃহন্নলা জানালেন—
“আমরা পশ্চিমবঙ্গের বাসিন্দা। সরকার লক্ষ্মীর ভান্ডার, যুবশ্রী, কন্যাশ্রী, বিধবা ভাতা, বার্ধক্য ভাতা—অনেক কিছুই দিচ্ছে। কিন্তু আমাদের জন্য আজ পর্যন্ত তেমন কোনও নির্দিষ্ট ভাতা বা সহায়তা নেই। বাধ্য হয়ে আমাদের হাসপাতালে, লোকাল ট্রেন বা দূরপাল্লার ট্রেনে ঘুরে ভিক্ষা করে জীবিকা নির্বাহ করতে হয়। এটা আমাদের পছন্দ নয়, পরিস্থিতির জন্যই করতে হয়। সমাজে আমাদের কোনও জায়গা নেই, আমরা মূলস্রোত থেকে অনেক দূরে।”

ভবিষ্যতের প্রশ্ন

প্রশ্ন থেকেই যায়—কবে এই বৃহন্নলারা মূলস্রোতের অংশ হয়ে উঠতে পারবেন?

আইনি স্বীকৃতি ও সচেতনতা কিছুটা বাড়লেও প্রকৃত পরিবর্তনের জন্য প্রয়োজন বাস্তব পদক্ষেপ। শিক্ষা, কর্মসংস্থান, স্বাস্থ্যসেবা এবং সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা—এই চারটি স্তম্ভ শক্তিশালী না হলে এই সম্প্রদায়ের উন্নয়ন সম্ভব নয়।

নির্বাচনের সময় তারা ভোটাধিকার প্রয়োগ করেন, গণতন্ত্রের অংশ হন। কিন্তু তাদের জীবনে কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন এখনও অধরা।

আজ সময় এসেছে শুধুমাত্র সহানুভূতির নয়, কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার—যাতে লিঙ্গ পরিচয়ের কারণে কেউ সমাজের বাইরে না থাকে।

ফেব্রুয়ারি ২০২৬ অনুযায়ী, পশ্চিমবঙ্গে মোট ১,৩৮২ জন তৃতীয় লিঙ্গভুক্ত নিবন্ধিত ভোটার রয়েছেন। এই তথ্যটি ২০২৬ সালের পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনের আগে ভারতের নির্বাচন কমিশন (ECI) পরিচালিত বিশেষ নিবিড় সংশোধন (SIR) প্রক্রিয়ার পর প্রকাশিত চূড়ান্ত ভোটার তালিকার অংশ।

পশ্চিমবঙ্গের ভোটার পরিসংখ্যান (২০২৬)

পশ্চিমবঙ্গের মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিক (CEO) কর্তৃক প্রকাশিত সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী ভোটারদের বিভাজন নিম্নরূপ:

  • মোট ভোটার সংখ্যা: ৭,০৪,৫৯,২৮৪
  • পুরুষ ভোটার: ৩,৬০,২২,৬৪২
  • মহিলা ভোটার: ৩,৪৪,৩৫,২৬০
  • তৃতীয় লিঙ্গভুক্ত ভোটার: ১,৩৮২

About The Author


Discover more from Jist Feed

Subscribe to get the latest posts sent to your email.

Leave a Reply

You missed