ভারতের প্রতিরক্ষা গবেষণা সংস্থা DRDO হাইপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রযুক্তিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ সাফল্য অর্জন করেছে। ২০২৬ সালের ৯ মে Defence Research and Development Laboratory হায়দরাবাদের Hyderabad-এ অবস্থিত স্ক্র্যামজেট কানেক্ট পাইপ টেস্ট ফ্যাসিলিটিতে দীর্ঘ সময়ের জন্য ফুল-স্কেল অ্যাক্টিভলি কুলড স্ক্র্যামজেট কমবাস্টরের সফল পরীক্ষা সম্পন্ন করে।
Press Information Bureau-এর প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, এই পরীক্ষায় স্ক্র্যামজেট ইঞ্জিনটি ১,২০০ সেকেন্ডেরও বেশি সময় ধরে সফলভাবে চালানো হয়েছে। এর আগে জানুয়ারি মাসে ৭০০ সেকেন্ডের সফল পরীক্ষা হয়েছিল।
হাইপারসনিক মিসাইল কী ?
হাইপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্র এমন এক ধরনের অত্যন্ত দ্রুতগতির মিসাইল, যা শব্দের গতির পাঁচ গুণ বা তারও বেশি গতিতে উড়তে পারে।
সহজভাবে বলতে গেলে:
- সাধারণ বিমান ঘণ্টায় প্রায় ৯০০ কিলোমিটার বেগে চলে
- কিন্তু হাইপারসনিক মিসাইল ঘণ্টায় ৬,০০০ কিলোমিটারেরও বেশি গতিতে চলতে পারে
এত দ্রুত গতির কারণে এই ধরনের ক্ষেপণাস্ত্রকে মাঝপথে আটকানো অত্যন্ত কঠিন।
স্ক্র্যামজেট ইঞ্জিন কী ?
এই প্রযুক্তির মূল শক্তি হলো “স্ক্র্যামজেট ইঞ্জিন”।
সাধারণ রকেটের মতো আলাদা অক্সিজেন বহন না করে, এই ইঞ্জিন বাতাস থেকেই অক্সিজেন ব্যবহার করে কাজ করে।
ফলে:
- ক্ষেপণাস্ত্র হালকা হয়,
- বেশি গতিতে চলতে পারে,
- এবং দীর্ঘ দূরত্ব অতিক্রম করতে সক্ষম হয়।
এই পরীক্ষার গুরুত্ব কী ?
এই সাফল্যের মূল শক্তি হলো অত্যাধুনিক সুপারসনিক এয়ার-ব্রিদিং ইঞ্জিন প্রযুক্তি। এতে ব্যবহার করা হয়েছে দেশীয়ভাবে তৈরি বিশেষ তরল হাইড্রোকার্বন জ্বালানি, উচ্চ তাপমাত্রা সহ্য করতে সক্ষম থার্মাল ব্যারিয়ার কোটিং এবং আধুনিক উৎপাদন প্রযুক্তি। হাইপারসনিক গতিতে চলার সময় প্রচণ্ড তাপ উৎপন্ন হয়। অনেক সময় তাপমাত্রা ১,০০০ ডিগ্রি সেলসিয়াসেরও বেশি হয়ে যায়। এজন্যে প্রয়োজন হয় এই নতুন অ্যাক্টিভলি কুলড কমবাস্টর এর। এই নতুন অ্যাক্টিভলি কুলড কমবাস্টর সেই তাপ সহ্য করে দীর্ঘ সময় কাজ করতে সক্ষম হয়েছে। ফলে ভারত ভবিষ্যতের হাইপারসনিক ক্রুজ মিসাইল তৈরির ক্ষেত্রে বড় অগ্রগতি অর্জন করল।
ভারতের জন্য এর গুরুত্ব
১. উন্নত সামরিক শক্তি
এই প্রযুক্তি ভারতের ভবিষ্যৎ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করবে এবং দ্রুত আঘাত হানার ক্ষমতা বাড়াবে।
২. বিশ্বমঞ্চে ভারতের অবস্থান শক্তিশালী
বিশ্বের খুব কম দেশের কাছে এই ধরনের প্রযুক্তি রয়েছে। ভারতের এই সাফল্য আন্তর্জাতিক মহলে দেশের প্রযুক্তিগত ক্ষমতার পরিচয় বহন করে।
৩. আত্মনির্ভর প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি
এই প্রকল্পে ব্যবহৃত জ্বালানি, তাপ প্রতিরোধক প্রযুক্তি এবং ইঞ্জিন নির্মাণের বড় অংশই দেশীয়ভাবে তৈরি হয়েছে।
কোন কোন দেশের কাছে এই প্রযুক্তি রয়েছে ?
বর্তমানে হাইপারসনিক প্রযুক্তিতে অগ্রগামী দেশগুলি হলো:
- United States
- Russia
- China
এছাড়াও:
- India
- France
- Japan
- Australia
এই প্রযুক্তি উন্নয়নে কাজ করছে।
প্রতিরক্ষামন্ত্রক সূত্রে আরো জানানো হয়েছে, এই উন্নত কমবাস্টরটি তৈরি ও ডিজাইন করেছে Defence Research and Development Laboratory এবং বিভিন্ন দেশীয় শিল্প সংস্থার সহযোগিতায় সেটিকে বাস্তবে রূপ দেওয়া হয়েছে। এই সফল পরীক্ষার ফলে উন্নত মহাকাশ প্রযুক্তি এবং ভবিষ্যতের আধুনিক যুদ্ধ প্রযুক্তির ক্ষেত্রে ভারত বিশ্বের অগ্রগণ্য দেশগুলির মধ্যে নিজের অবস্থান আরও শক্তিশালী করল।
দীর্ঘ সময়ের স্ক্র্যামজেট ইঞ্জিন পরীক্ষায় সফলতা ভারতের প্রতিরক্ষা ও মহাকাশ গবেষণার ইতিহাসে এক বড় মাইলফলক। এটি শুধু সামরিক শক্তির পরিচয় নয়, বরং ভারতের বৈজ্ঞানিক ও প্রযুক্তিগত অগ্রগতিরও প্রতীক।
এই সাফল্য ভবিষ্যতে ভারতকে বিশ্বের অন্যতম উন্নত প্রতিরক্ষা প্রযুক্তিধারী দেশের তালিকায় আরও শক্ত অবস্থানে নিয়ে যাবে।
প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিংহ এই সফল পরীক্ষার জন্য DRDO, শিল্প সংস্থা এবং গবেষণা ও শিক্ষাজগতের সঙ্গে যুক্ত বিশেষজ্ঞদের অভিনন্দন জানিয়েছেন। তিনি বলেন, এই সাফল্য ভারতের ভবিষ্যৎ হাইপারসনিক ক্রুজ মিসাইল কর্মসূচির জন্য একটি শক্ত ভিত তৈরি করল। এছাড়াও প্রতিরক্ষা গবেষণা ও উন্নয়ন বিভাগের সচিব এবং DRDO-র চেয়ারম্যান, সমীর ভি কামাত , এই পরীক্ষার সঙ্গে যুক্ত সমস্ত বিজ্ঞানী ও কর্মীদের অভিনন্দন জানিয়েছেন।

