Site icon Jist Feed

ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬: পিছিয়ে পড়েও দুরন্ত প্রত্যাবর্তন, চেকিয়াকে ২-১ গোলে হারাল দক্ষিণ কোরিয়া

Korea Vs Czech

ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬-এর গ্রুপ ‘এ’-এর অন্যতম আকর্ষণীয় ম্যাচে দুরন্ত লড়াই করে চেকিয়াকে ২-১ গোলে হারাল দক্ষিণ কোরিয়া। পিছিয়ে পড়েও যেভাবে কোরিয়ানরা ম্যাচে ফিরে এসে জয় ছিনিয়ে নিল, তা বিশ্বকাপের শুরুতেই তাদের অন্যতম শক্তিশালী দাবিদার হিসেবে তুলে ধরল।

এস্তাদিও গুয়াদালাহারায় অনুষ্ঠিত এই ম্যাচে ফুটবলপ্রেমীরা দেখলেন দুই ভিন্ন ঘরানার ফুটবলের লড়াই। একদিকে ছিল দক্ষিণ কোরিয়ার দ্রুত পাসিং, বলের দখল এবং আক্রমণভিত্তিক খেলা। অন্যদিকে চেকিয়ার ভরসা ছিল শারীরিক শক্তি, রক্ষণাত্মক সংগঠন এবং সেট-পিস।

প্রথমার্ধে চেকিয়ার রক্ষণে আটকে কোরিয়া

ম্যাচের শুরু থেকেই বলের দখল ছিল দক্ষিণ কোরিয়ার পায়ে। তবে চেকিয়ার সুসংগঠিত রক্ষণভাগের সামনে কোরিয়ান ফুটবলাররা তেমন বড় সুযোগ তৈরি করতে পারেননি। চেকিয়ার রক্ষণভাগ অত্যন্ত শৃঙ্খলাবদ্ধ ছিল। তারা মাঝমাঠে চাপ সৃষ্টি করে কোরিয়ার আক্রমণের গতি কমিয়ে দেয়। ফলে প্রথমার্ধে কোরিয়া বল বেশি রাখলেও গোলের সামনে কার্যকর হতে পারেনি। বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রথম ৪৫ মিনিটে কোরিয়ার খেলায় গতি ও ধার দুটোরই অভাব ছিল। অন্যদিকে চেকিয়া নিজেদের পরিকল্পনা মাফিক খেলতে সক্ষম হয়।

সেট-পিস থেকে এগিয়ে যায় চেকিয়া

দ্বিতীয়ার্ধে ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দেয় চেকিয়া। একটি সুপরিকল্পিত সেট-পিস থেকে বক্সের মধ্যে উঠে আসা এক ফুটবলারের হেডে গোল পায় ইউরোপের দলটি।

গোলের সময় কোরিয়ার রক্ষণভাগের সমন্বয়ের অভাব স্পষ্ট হয়ে ওঠে। চেক খেলোয়াড়কে মার্ক করতে ব্যর্থ হওয়ায় তিনি প্রায় বাধাহীনভাবে বল জালে জড়িয়ে দেন।

প্রাক্তন ভারতীয় কোচ ইগর স্টিমাচ ম্যাচ-পরবর্তী বিশ্লেষণে বলেন, কোরিয়ার ডিফেন্ডাররা বলের দিকে বেশি নজর দিয়েছিলেন, প্রতিপক্ষের দৌড় লক্ষ্য করেননি। সেই ভুলেরই খেসারত দিতে হয়।

পুরো ম্যাচেই কর্নার, ফ্রি-কিক এবং থ্রো-ইন থেকে চেকিয়া বিপজ্জনক হয়ে উঠেছিল। তাদের শারীরিক শক্তি এবং আকাশপথে দক্ষতা কোরিয়ার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়।

পিছিয়ে পড়েও হাল ছাড়েনি কোরিয়া

গোল হজম করার পর অনেক দলই আত্মবিশ্বাস হারিয়ে ফেলে। কিন্তু দক্ষিণ কোরিয়া ঠিক উল্টো প্রতিক্রিয়া দেখায়। তারা আরও দ্রুতগতিতে আক্রমণ শুরু করে এবং মাঝমাঠ থেকে খেলার নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে নিয়ে আসে। বলের গতি বাড়ে, পাসিং আরও নিখুঁত হয় এবং চেক রক্ষণে চাপ বাড়তে থাকে। এই চাপের ফলেই আসে সমতা ফেরানোর গোল। ব্যক্তিগত দক্ষতা এবং দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতার মাধ্যমে কোরিয়া ম্যাচে ফিরে আসে। প্রাক্তন ভারত অধিনায়ক বাইচুং ভুটিয়া কোরিয়ার এই মানসিক দৃঢ়তার প্রশংসা করেন। তাঁর মতে, গোল খাওয়ার পর দলের প্রতিক্রিয়াই ম্যাচের ভাগ্য নির্ধারণ করে দেয়।

৮০ মিনিটে আসে জয়সূচক গোল

ম্যাচের সবচেয়ে সুন্দর মুহূর্তটি আসে ৮০ মিনিটে। দ্রুত পাসিং মুভ থেকে মাঝমাঠ থেকে একটি নিখুঁত লং বল পাঠানো হয় চেক রক্ষণের পিছনের ফাঁকা জায়গায়। সেখান থেকে প্রথম স্পর্শেই একটি ক্রস আসে বক্সের মধ্যে, যা সহজেই জালে জড়িয়ে দেন কোরিয়ার আক্রমণভাগের খেলোয়াড়। এই গোলটিকে বিশেষজ্ঞরা ‘সম্পূর্ণ দলগত প্রচেষ্টার ফল’ বলে উল্লেখ করেছেন। গোল তৈরির প্রতিটি ধাপ ছিল পরিকল্পিত এবং নিখুঁত। বাইচুং ভুটিয়া একে ‘বিশ্বমানের দলগত গোল’ বলে আখ্যা দেন। অন্যদিকে স্টিমাচ বলেন, সময়মতো দৌড় এবং নিখুঁত ক্রসই গোলটির মূল চাবিকাঠি।

বাতিল হওয়া গোল বদলে দিল ম্যাচের ছবি

চেকিয়া ম্যাচে দ্বিতীয়বার বল জালে জড়ালেও সেই গোল বাতিল হয়ে যায়। এই ঘটনাই ম্যাচের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মোড় বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। গোলের আনন্দে মেতে ওঠার পর হঠাৎ সিদ্ধান্ত বদলে যাওয়ায় চেক খেলোয়াড়দের মনোসংযোগে প্রভাব পড়ে। সেই সুযোগ কাজে লাগিয়ে ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ পুরোপুরি নিজেদের হাতে নিয়ে নেয় দক্ষিণ কোরিয়া।

কি ভাবে জিতল দক্ষিণ কোরিয়া

১. বলের দখলে আধিপত্য:
ম্যাচের বড় অংশে বল নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রেখেছিল কোরিয়া।

২. দ্রুত মানিয়ে নেওয়ার ক্ষমতা:
প্রথমার্ধে সমস্যায় পড়লেও দ্বিতীয়ার্ধে কৌশল বদলে আরও আক্রমণাত্মক ফুটবল খেলেছে।

৩. মানসিক দৃঢ়তা:
পিছিয়ে পড়ার পরও দল আত্মবিশ্বাস হারায়নি।

৪. গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে গুণগত মান:
দুটি গোলই এসেছে উচ্চমানের আক্রমণাত্মক ফুটবল থেকে।

কোথায় পিছিয়ে পড়ল চেকিয়া?

১. আক্রমণে ধার কম ছিল।
সেট-পিস ছাড়া নিয়মিত গোলের সুযোগ তৈরি করতে পারেনি।

২. সুযোগ নষ্ট।
কয়েকটি সম্ভাবনাময় আক্রমণ গোল পর্যন্ত পৌঁছায়নি।

৩. শেষদিকে ক্লান্তি।
কোরিয়ার নিরবচ্ছিন্ন চাপ সামলাতে গিয়ে রক্ষণে ফাঁক তৈরি হয়।

গ্রুপ ‘এ’-তে কোরিয়ার শক্ত অবস্থান

এই জয়ের ফলে গ্রুপ ‘এ’-তে গুরুত্বপূর্ণ তিন পয়েন্ট সংগ্রহ করল দক্ষিণ কোরিয়া। নকআউট পর্বে ওঠার লড়াইয়ে তারা এখন অনেকটাই এগিয়ে। অন্যদিকে হারলেও চেকিয়া দেখিয়েছে যে তারা সহজ প্রতিপক্ষ নয়। বিশেষ করে তাদের সেট-পিস দক্ষতা এবং রক্ষণাত্মক সংগঠন আগামী ম্যাচগুলোতে বড় ভূমিকা নিতে পারে।

বিশ্বকাপের শুরুতেই এই ম্যাচ ফুটবলপ্রেমীদের উপহার দিল নাটকীয়তা, কৌশলগত লড়াই এবং অসাধারণ গোলের সমাহার। চেকিয়া সাহসী লড়াই করলেও শেষ পর্যন্ত দক্ষিণ কোরিয়ার দক্ষতা, দলগত সমন্বয় এবং মানসিক শক্তির কাছে হার মানতে হয়েছে। যদি এই পারফরম্যান্স ধরে রাখতে পারে, তাহলে ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬-এ দক্ষিণ কোরিয়া যে অনেক দূর যেতে পারে, সেই ইঙ্গিত স্পষ্টভাবেই মিলেছে।

ফলাফল: দক্ষিণ কোরিয়া ২ – ১ চেকিয়া

গোলদাতারা

⚽ চেকিয়া: সেট-পিস থেকে হেডে গোল (দ্বিতীয়ার্ধ)

⚽ দক্ষিণ কোরিয়া: সমতাসূচক গোল

⚽ দক্ষিণ কোরিয়া: ৮০ মিনিটে জয়সূচক গোল

ম্যাচের গুরুত্বপূর্ণ পরিসংখ্যান

পরিসংখ্যানদক্ষিণ কোরিয়াচেকিয়া
বল দখল (Possession)৫৮%৪২%
মোট শট১৪
লক্ষ্যে শট (Shots on Target)
কর্নার
পাস সফলতার হার৮৭%৭৮%
ফাউল১১১৪
হলুদ কার্ড

গ্রুপ ‘এ’ পয়েন্ট তালিকা

অবস্থানদলম্যাচজয়ড্রহারগোলগোল হজমগোল পার্থক্যপয়েন্ট
মেক্সিকো+১
দক্ষিণ কোরিয়া+১
চেকিয়া-১
দক্ষিণ আফ্রিকা-১
Exit mobile version