Site icon Jist Feed

হুগলির মুকুটে নতুন পালক: জিআই স্বীকৃতি পেল চন্দননগরের জলভরা, বলাগড়ের নৌশিল্প, জনাইয়ের মনোহরা ও বেগমপুরের শাড়ি

Hoogly_GI tag

শুভজিৎ বসু, হুগলি: বাংলার মিষ্টি ও লোকশিল্পের ইতিহাসে যুক্ত হলো এক নতুন অধ্যায়। দীর্ঘ প্রতীক্ষা ও আইনি লড়াইয়ের পর হুগলি জেলার চার ঐতিহ্য চন্দননগরের জলভরা সন্দেশ, বলাগড়ের নৌশিল্প, জনাইয়ের মনোহরা এবং সিঙ্গুরের বেগমপুরের শাড়ি পেল জিওগ্রাফিক্যাল ইন্ডিকেশন (জিআই) স্বীকৃতি। এই স্বীকৃতিতে উচ্ছ্বসিত মিষ্টি প্রস্তুতকারক থেকে নৌশিল্পী সকলেই। তাঁদের আশা, এই স্বীকৃতি আন্তর্জাতিক বাজারে নতুন সম্ভাবনার দরজা খুলে দেবে। একই সঙ্গে হারিয়ে যেতে বসা বলাগরের ঐতিহ্যবাহী নৌশিল্পকে পুনরুজ্জীবিত করতে সরকারি উদ্যোগের দাবিও উঠেছে।

চন্দননগরের জলভরা সন্দেশ শুধু একটি মিষ্টি নয়, বাঙালির আবেগের অংশ। টলটলে রসে ভরা এই বৃহদাকার সন্দেশের সুনাম বহুদিনের। চলতি মাসে তারকেশ্বরে পশ্চিমবঙ্গ দিবসের অনুষ্ঠানে এসে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে এই জলভরা সন্দেশই উপহার হিসেবে তুলে দেওয়া হয়েছিল।

চন্দননগরের এক মিষ্টান্ন ব্যবসায়ী শৈবাল মোদক বলেন, “চন্দননগরের জলভরার সর্বভারতীয় স্তরে যথেষ্ট সুনাম রয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে পরিচিতি ও ব্যবসা সম্প্রসারণের জন্য জিআই স্বীকৃতি অত্যন্ত প্রয়োজন ছিল। ২০২২ সালের সেপ্টেম্বর মাসে আমরা জিআই-এর জন্য আবেদন করেছিলাম। দীর্ঘ চার বছর পর সেই স্বীকৃতি পেলাম। বিভিন্ন ধাপের যাচাই-বাছাইয়ের পর এই স্বীকৃতি এসেছে। এখন থেকে সূর্য মোদকের জলভরা ‘চন্দননগরের জলভরা’ হিসেবেই পরিচিতি পাবে।”

তিনি আরও বলেন, “আমরা চাই চন্দননগরে সূর্য মোদকের একটি মূর্তি স্থাপন করা হোক। সে জন্য বিধায়কের কাছে আবেদনও জানানো হয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে জলভরাকে পৌঁছে দিতে হলে এর সংরক্ষণকাল বাড়াতে হবে। সেই লক্ষ্যে সরকারের উদ্যোগে গবেষণা হওয়া জরুরি। তবেই বিদেশের বাজারে এই ঐতিহ্যবাহী মিষ্টির মর্যাদা আরও বাড়বে এবং ব্যবসার নতুন দিগন্ত খুলবে।”

অন্যদিকে, হুগলির বলাগড় বহুদিন ধরেই ডিঙি নৌকার আঁতুড়ঘর হিসেবে পরিচিত। প্রায় ৪০০ থেকে ৫০০ বছরের পুরনো এই শিল্পের শুরু হয়েছিল সম্পূর্ণ পেরেকবিহীন কাঠ জোড়ার বিশেষ কৌশলে। বর্তমানে পেরেক ব্যবহার করা হলেও ঐতিহ্যবাহী নির্মাণশৈলীর ছাপ এখনও বজায় রয়েছে। আজও কয়েকটি শিল্পী পরিবার এই শিল্পকে আঁকড়ে ধরে জীবিকা নির্বাহ করছেন।

বলাগড়ের আঞ্চলিক গবেষক পার্থ চট্টোপাধ্যায় বলেন, “বলাগড়ের নৌশিল্পের জিআই স্বীকৃতির জন্য প্রায় চার বছর ধরে লড়াই করতে হয়েছে। ভারতের বিভিন্ন প্রান্তে নৌকা তৈরি হলেও বলাগরের নৌশিল্পের নিজস্ব বৈশিষ্ট্য রয়েছে। সেই ঐতিহাসিক তথ্যপ্রমাণ সংগ্রহ ও গবেষণায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছিলেন অধ্যাপক ড. পিনাকী ঘোষ এবং ড. শান্তনু পান্ডা। আইনগতভাবে গবেষণাপত্র জমা দেওয়ার পর পাঁচটি শুনানির মাধ্যমে আমরা প্রমাণ করতে সক্ষম হই যে ডিঙি নৌকাই ছিল এই অঞ্চলের নৌনির্মাণের প্রথম ধাপ। এরপরই জিআই স্বীকৃতি মেলে।”

বলাগড় নৌশিল্প সমিতির সম্পাদক উৎপল বারিক বলেন, “জিআই স্বীকৃতি পাওয়ায় আমরা খুশি। ভারতবর্ষের মানচিত্রে বলাগড়ের নৌশিল্প একটি স্বতন্ত্র পরিচিতি পেল। তবে আর্থিকভাবে কতটা লাভ হবে, তা এখনই বলা কঠিন। আমাদের নৌকা মূলত মৎস্যজীবীদের জন্য তৈরি হয়। তাঁদের আর্থিক সামর্থ্য সীমিত হওয়ায় আমরাও নৌকার যথাযথ মূল্য পাই না। ফলে নৌশিল্পীরাও আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী হতে পারছেন না। সরকারি সহায়তা না পেলে আগামী দিনে এই শিল্পের অস্তিত্বই সংকটের মুখে পড়বে।”

জনাইয়ের বিখ্যাত মনোহরা মিষ্টির জিআই স্বীকৃতির জন্য চণ্ডীতলার জনাই থেকে দশজন আবেদন করেছিলেন। তাঁদের অন্যতম স্বপন দাস বলেন, “দীর্ঘদিন ধরে আমরা এই স্বীকৃতির জন্য চেষ্টা করে আসছিলাম। আজ জিআই স্বীকৃতি পাওয়ায় আমরা অত্যন্ত আনন্দিত। জমিদারি আমলে সন্দেশের স্থায়িত্ব বাড়ানোর জন্য তার উপর চিনি বা গুড়ের আবরণ দেওয়ার যে প্রথা শুরু হয়েছিল, সেই ঐতিহ্যের স্বীকৃতি মিলল।”

বলাগড়ের বিধায়ক তথা রাজ্যের মন্ত্রী সুমনা সরকার বলেন, “নৌশিল্পীদের দীর্ঘদিনের দাবি আজ পূরণ হয়েছে। আগের সরকার তাঁদের বারবার আশ্বাস দিলেও বাস্তবায়ন করতে পারেনি। বর্তমান সরকার কথা দিয়ে কথা রেখেছে। এর জন্য আমরা গর্বিত। মুখ্যমন্ত্রী এবং প্রধানমন্ত্রী উভয়কেই ধন্যবাদ জানাই। এই স্বীকৃতির ফলে বলাগরের নৌশিল্পীরা ভবিষ্যতে উপকৃত হবেন বলে আমরা আশা করি।”

ওয়েস্ট বেঙ্গল ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অব জুরিডিক্যাল সায়েন্সেস-এর প্রাক্তন আইপিআর চেয়ার প্রফেসর ড. পিনাকী ঘোষ জানান,
“এবার মোট ১৩টি পণ্য জিআই রেজিস্ট্রেশন পেয়েছে। তার মধ্যে হুগলি জেলার বেগমপুরের শাড়ি, জনাইয়ের মনোহরা এবং বলাগড়ের নৌশিল্প উল্লেখযোগ্যভাবে জিআই স্বীকৃতি অর্জন করেছে।”

হুগলির এই চার ঐতিহ্যের জিআই স্বীকৃতি শুধু জেলার গর্বই নয়, বাংলার ঐতিহ্য, কারুশিল্প ও খাদ্যসংস্কৃতির আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির পথে এক গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক বলেই মনে করছেন সংশ্লিষ্ট মহল।

Exit mobile version