কলকাতা, ২২ জুন: পশ্চিমবঙ্গের ২০২৬-২৭ অর্থবর্ষের বাজেটে শিল্প, ব্যবসা, প্রযুক্তি ও কর্মসংস্থানকে অর্থনৈতিক পুনরুত্থানের প্রধান ভিত্তি হিসেবে তুলে ধরেছে রাজ্য সরকার। বাজেট বক্তৃতায় শিল্পায়ন, MSME সম্প্রসারণ, নতুন বিনিয়োগ আকর্ষণ, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI), ডেটা সেন্টার, রপ্তানি অবকাঠামো এবং উদীয়মান প্রযুক্তি খাতে বড়সড় পরিকল্পনার ঘোষণা করা হয়েছে।
সরকারের দাবি, আগামী দিনের অর্থনৈতিক উন্নয়ন হবে কর্মসংস্থানভিত্তিক, আঞ্চলিকভাবে ভারসাম্যপূর্ণ এবং প্রযুক্তিনির্ভর। সেই লক্ষ্যেই শিল্প করিডর, ক্লাস্টারভিত্তিক উন্নয়ন এবং উচ্চ প্রযুক্তি বিনিয়োগের জন্য নতুন নীতি আনা হচ্ছে।
শিল্প ও বিনিয়োগে বড় ঘোষণা
রাজ্য সরকার West Bengal Investment Promotion Framework চালু করার ঘোষণা করেছে। এই কাঠামোর মাধ্যমে শিল্প করিডর ও ক্লাস্টারভিত্তিক উন্নয়নের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হবে।
উত্তরবঙ্গ ও পশ্চিমাঞ্চলে নতুন বিনিয়োগ উৎসাহিত করা, সবুজ শক্তি ব্যবহার বাড়ানো এবং বৈদ্যুতিক যান (EV), সেমিকন্ডাক্টর, গ্রিন হাইড্রোজেন ও প্রতিরক্ষা উৎপাদনের মতো ভবিষ্যৎ শিল্পে বিনিয়োগ টানাই হবে এই নীতির মূল লক্ষ্য।
এই প্রকল্পের জন্য চলতি অর্থবর্ষে ₹৫,০০০ কোটি বরাদ্দের ঘোষণা করা হয়েছে।
ঐতিহ্যবাহী শিল্পে পুনর্জাগরণের পরিকল্পনা
রাজ্য সরকার পুরনো শিল্প ক্লাস্টারগুলিকে পুনরুজ্জীবিত করতে ₹১,০০০ কোটি ব্যয়ের পরিকল্পনা করেছে।
বিশেষ গুরুত্ব পাবে –
- হাওড়া ও হুগলির পাটশিল্প
- শিলিগুড়ি ও দার্জিলিংয়ের চা ও কৃষি-প্রক্রিয়াকরণ শিল্প
- প্রাকৃতিক তন্তুভিত্তিক শিল্প
সরকারের মতে, এই উদ্যোগ ঐতিহ্যবাহী শিল্পকে আধুনিক বাজারের সঙ্গে যুক্ত করবে এবং নতুন কর্মসংস্থান তৈরি করবে।
চা শিল্পে নতুন অবকাঠামো
উত্তরবঙ্গের চা শিল্পকে পুনরুজ্জীবিত করতে ₹১০০ কোটি বরাদ্দ করা হয়েছে।
প্রস্তাবিত পদক্ষেপগুলির মধ্যে রয়েছে –
- চা বাগানের অভ্যন্তরীণ রাস্তার উন্নয়ন
- আধুনিক অবকাঠামো নির্মাণ
- শিলিগুড়িতে কমন টি প্রসেসিং সেন্টার
- আন্তর্জাতিক মানের Tea Processing Zone
এতে রপ্তানি বাড়বে এবং ক্ষুদ্র চা উৎপাদকরাও উপকৃত হবেন বলে মনে করা হচ্ছে।
MSME খাতে নতুন গতি
বাজেট বক্তৃতায় উল্লেখ করা হয়েছে যে পশ্চিমবঙ্গের শিল্প ইউনিটের ৯০ শতাংশেরও বেশি MSME খাতের অন্তর্গত এবং শিল্প উৎপাদনের প্রায় ৫০ শতাংশ এই খাত থেকে আসে।
সরকার MSME সম্প্রসারণের জন্য একাধিক নতুন কর্মসূচি গ্রহণের কথা ঘোষণা করেছে।
বিশেষভাবে—
- ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পে বিনিয়োগ বৃদ্ধি
- শিল্প ক্লাস্টার উন্নয়ন
- কারিগর ও হস্তশিল্পীদের জন্য সহায়তা
- PM Vishwakarma প্রকল্প বাস্তবায়ন
স্টার্টআপ ও উদ্যোক্তা উন্নয়নে নতুন সম্ভাবনা
যদিও বাজেটে সরাসরি নতুন স্টার্টআপ তহবিলের ঘোষণা নেই, তবে উদ্যোক্তাদের জন্য একাধিক পরোক্ষ সুযোগ তৈরি করা হয়েছে।
উদ্যোক্তাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র
- AI প্রযুক্তি
- ডেটা সেন্টার
- ক্লাউড কম্পিউটিং
- ইলেকট্রনিক্স
- সেমিকন্ডাক্টর
- ডিফেন্স ম্যানুফ্যাকচারিং
- কৃষি প্রক্রিয়াকরণ
- স্পাইস হাব
- লজিস্টিক্স
উত্তরবঙ্গে স্পাইস হাব গড়ার জন্য ₹৫০ কোটি বরাদ্দ করা হয়েছে, যা কৃষিভিত্তিক স্টার্টআপ ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের জন্য নতুন সুযোগ তৈরি করবে।
AI মিশন: প্রযুক্তিনির্ভর অর্থনীতির রূপরেখা
বাজেটের অন্যতম বড় ঘোষণা হল West Bengal Impact AI Mission
সরকারের লক্ষ্য –
- AI ইকোসিস্টেম গড়ে তোলা
- উদ্ভাবন বৃদ্ধি
- দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি
- সরকারি পরিষেবার আধুনিকীকরণ
- নতুন প্রযুক্তি শিল্পে বিনিয়োগ আকর্ষণ
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই উদ্যোগ সফল হলে কলকাতা ও শিলিগুড়ি পূর্ব ভারতের গুরুত্বপূর্ণ AI ও প্রযুক্তি কেন্দ্র হিসেবে উঠে আসতে পারে।
ডেটা সেন্টার ও ক্লাউড অবকাঠামো
পশ্চিমবঙ্গকে AI-ভিত্তিক ডেটা সেন্টার এবং হাইপারস্কেল ক্লাউড অবকাঠামোর গন্তব্য হিসেবে গড়ে তুলতে বিশেষ প্রণোদনার ঘোষণা করা হয়েছে।
বিনিয়োগকারীরা পাবেন –
- স্ট্যাম্প ডিউটি ফেরত
- বিদ্যুৎ শুল্কে ছাড়
- দ্রুত অনুমোদন
- উচ্চমানের বিদ্যুৎ সংযোগ
- FAR (Floor Area Ratio) শিথিলতা
সেমিকন্ডাক্টর ও ডিফেন্স ম্যানুফ্যাকচারিং
দুর্গাপুর শিল্পাঞ্চলে সেমিকন্ডাক্টর ইউনিট স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হবে।
অন্যদিকে , বাঁকুড়ার গঙ্গাজলঘাটি, বীরভূমের সাঁইথিয়া এলাকায় ডিফেন্স ম্যানুফ্যাকচারিং হাব তৈরির পরিকল্পনা রয়েছে। এটি পশ্চিমবঙ্গকে জাতীয় এবং বৈশ্বিক সাপ্লাই চেইনের সঙ্গে যুক্ত করতে পারে।
শিলিগুড়ি: উত্তরবঙ্গের বাণিজ্য রাজধানী
সরকার শিলিগুড়িকে একটি আন্তর্জাতিক লজিস্টিক্স ও ট্রেড হাব হিসেবে গড়ে তুলতে চায়।
ঘোষিত প্রকল্পগুলির মধ্যে রয়েছে –
- ইন্টিগ্রেটেড লজিস্টিক্স পার্ক
- আধুনিক গুদাম
- কোল্ড চেইন
- মাল্টিমোডাল পরিবহন অবকাঠামো
- সীমান্ত বাণিজ্য সুবিধা
এছাড়া শিলিগুড়ি IT Park সম্প্রসারণের জন্যও বিনিয়োগ করা হবে।
গুরুত্বপূর্ণ পরিসংখ্যান
| প্রকল্প/খাত | বরাদ্দ (₹ কোটি) | উদ্দেশ্য |
|---|---|---|
| West Bengal Investment Promotion Framework | 5,000 | শিল্প বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান |
| Legacy Industrial Cluster Revival | 1,000 | পাট, চা ও কৃষি-প্রক্রিয়াকরণ শিল্প পুনরুজ্জীবন |
| Tea Industry Infrastructure | 100 | চা শিল্প আধুনিকীকরণ |
| Siliguri Logistics Hub | 200 | বাণিজ্য ও রপ্তানি অবকাঠামো |
| North Bengal Spice Hub | 50 | কৃষিভিত্তিক উদ্যোক্তা উন্নয়ন |
| Siliguri IT Park Expansion | 26 | IT ও প্রযুক্তি শিল্প সম্প্রসারণ |
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই বাজেটের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হল শিল্প বিনিয়োগকে কেন্দ্র করে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা। ₹৫,০০০ কোটির বিনিয়োগ প্রণোদনা কাঠামো বাস্তবায়িত হলে পশ্চিমবঙ্গে নতুন শিল্প প্রকল্পের গতি বাড়তে পারে। MSME এবং ঐতিহ্যবাহী শিল্পকে একসঙ্গে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। পাট, চা এবং কৃষি-প্রক্রিয়াকরণ শিল্পে বিনিয়োগ গ্রামীণ অর্থনীতিকে শক্তিশালী করবে। AI Mission, Data Centre Policy এবং Semiconductor উদ্যোগ পশ্চিমবঙ্গকে পূর্ব ভারতের প্রযুক্তি মানচিত্রে নতুন অবস্থান দিতে পারে। তবে দ্রুত বাস্তবায়নই হবে সাফল্যের প্রধান শর্ত।
পশ্চিমবঙ্গের ২০২৬-২৭ বাজেটে শিল্প, MSME, প্রযুক্তি ও বিনিয়োগকে কেন্দ্র করে যে রূপরেখা উপস্থাপন করা হয়েছে, তা রাজ্যের অর্থনীতিকে নতুন গতিপথে নিয়ে যাওয়ার প্রচেষ্টা বলেই মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। বিশেষত AI, সেমিকন্ডাক্টর, ডিফেন্স ম্যানুফ্যাকচারিং, লজিস্টিক্স এবং MSME খাতে ঘোষিত পদক্ষেপগুলি বাস্তবায়িত হলে আগামী কয়েক বছরে পশ্চিমবঙ্গে শিল্পায়ন ও কর্মসংস্থানের নতুন অধ্যায় সূচিত হতে পারে।

