আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির কারণে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি ও অর্থনৈতিক চাপ বাড়ছে। বিশেষ করে পশ্চিম এশিয়ায় সংঘাতের জেরে তেল ও গ্যাস সরবরাহে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। এর প্রভাব পড়ছে ভারতসহ বহু দেশের অর্থনীতিতে। এই পরিস্থিতিতে দেশের মানুষকে জ্বালানি সাশ্রয়, অপ্রয়োজনীয় খরচ কমানো এবং বিকল্প ব্যবস্থার দিকে ঝুঁকতে আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী।
প্রধানমন্ত্রী দেশবাসীর কাছে কয়েকটি বিষয়ে বিশেষ অনুরোধ জানিয়েছেন—
- যতটা সম্ভব ব্যক্তিগত পেট্রোল ও ডিজেলের গাড়ি কম ব্যবহার করা
- মেট্রো, ট্রেন, বাস ও অন্যান্য গণপরিবহন বেশি ব্যবহার করা
- যাদের ইলেকট্রিক গাড়ি আছে, তারা সেগুলির ব্যবহার বাড়ানো
- রান্নার ক্ষেত্রে গ্যাসের ব্যবহার কমিয়ে ইন্ডাকশন বা বৈদ্যুতিক যন্ত্র ব্যবহার করা
- বিদেশ ভ্রমণ কিছুদিনের জন্য কমানো
- সোনা কেনা ও উপহার দেওয়ার প্রবণতা সাময়িকভাবে কমানো
ভারত বিদেশ থেকে যে সমস্ত পণ্য আমদানি করে, তার বেশিরভাগের মূল্য ডলারে পরিশোধ করতে হয়। তাই দেশের বৈদেশিক মুদ্রার ভান্ডার বা ফরেক্স রিজার্ভ ধরে রাখা এখন সরকারের কাছে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম হঠাৎ অনেক বেড়ে যাওয়াতেই পরিস্থিতি কঠিন হয়েছে।
আগে যেখানে প্রতি ব্যারেল তেল প্রায় ৬০ ডলারে পাওয়া যেত, এখন সেই দাম প্রায় ১০০ ডলারের কাছাকাছি পৌঁছে গেছে। ফলে একই পরিমাণ তেল আমদানি করতে এখন অনেক বেশি ডলার খরচ হচ্ছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার ভান্ডারের ওপর।
অর্থনীতিবিদদের মতে, ভারতে ব্যবহৃত বেশিরভাগ সোনা বিদেশ থেকে আমদানি করা হয়। মানুষ যদিও ভারতীয় টাকায় সোনা কেনেন, কিন্তু সেই সোনা বিদেশ থেকে আনতে সরকার বা আমদানিকারকদের ডলারে মূল্য পরিশোধ করতে হয়। তাই বেশি সোনা আমদানি মানেই বেশি ডলার দেশের বাইরে চলে যাওয়া। আগে যেখানে সোনার ওপর ১৫ শতাংশ শুল্ক ছিল, পরে তা কমিয়ে ১০.৭৫ শতাংশ করা হয়। এরপর আরও কমিয়ে প্রায় ৬ শতাংশে নামানো হয়েছিল। ফলে সোনা আমদানি তুলনামূলকভাবে সস্তা হয়ে যায় এবং বাজারে সোনার চাহিদা দ্রুত বাড়তে থাকে। গত বছরে ভারত প্রায় ৭২ বিলিয়ন ডলারের সোনা আমদানি করেছে। অর্থাৎ দেশের মোট আমদানির প্রায় ৯ শতাংশই ছিল সোনা। এর ফলে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার ভান্ডারের ওপর বড় চাপ তৈরি হয়েছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, এত বেশি সোনা আমদানি হওয়ার কারণে দেশের ফরেক্স রিজার্ভ ধীরে ধীরে কমতে শুরু করেছে। একই সঙ্গে কারেন্ট অ্যাকাউন্ট ডেফিসিট বা চলতি হিসাবের ঘাটতির ওপরও নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। সরকার ইতিমধ্যেই সোনার আমদানিতে শুল্ক বাড়িয়েছে, যার ফলে সোনা আরও দামি হতে পারে। এর উদ্দেশ্য সোনার আমদানি কিছুটা কমানো এবং ডলারের খরচ নিয়ন্ত্রণে রাখা।
একইভাবে বিদেশ ভ্রমণের ক্ষেত্রেও বৈদেশিক মুদ্রা খরচ হয়। কারণ বিদেশে গিয়ে যে দেশের মুদ্রা ব্যবহার করা হয়, তা শেষ পর্যন্ত ডলার বা আন্তর্জাতিক মুদ্রা ব্যবস্থার মাধ্যমেই রূপান্তরিত হয়। এই কারণেই সরকার আপাতত অপ্রয়োজনীয় বিদেশ সফর কমানোর পরামর্শ দিচ্ছে।
ফার্টিলাইজার বা সারের ক্ষেত্রেও একই সমস্যা দেখা দিচ্ছে। ভারতের চাহিদার বড় অংশ বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়, বিশেষ করে উপসাগরীয় দেশগুলি থেকে। আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়ায় এখন সেই সার অনেক বেশি খরচে কিনতে হচ্ছে। এতে কৃষিক্ষেত্রেও চাপ বাড়ছে। কৃষিক্ষেত্রেও সারের সাশ্রয়ী ব্যবহার এবং প্রাকৃতিক সার ব্যবহারের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। ভবিষ্যতে খাদ্য উৎপাদনে চাপ এড়াতে বিকল্প ব্যবস্থার ওপর গুরুত্ব বাড়ানো হচ্ছে।
অন্যদিকে, দেশের রপ্তানি বা এক্সপোর্টও আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির কারণে কিছু ক্ষেত্রে ধাক্কা খাচ্ছে। ফলে বাইরে থেকে ডলার আয় কমছে, আবার আমদানিতে বেশি ডলার খরচ হচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে সরকার চাইছে মানুষ অপ্রয়োজনীয় খরচ কমিয়ে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার ভান্ডার রক্ষা করতে সাহায্য করুক।
এই পরিস্থিতিতে সরকার চাইছে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার ভান্ডারের ওপর চাপ কমাতে। কারণ বিদেশ থেকে তেল, গ্যাস, সোনা বা অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ জিনিস আমদানি করতে ডলারে মূল্য পরিশোধ করতে হয়। তাই অপ্রয়োজনীয় আমদানি কমানো এখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
এছাড়াও পাইপলাইনের মাধ্যমে সরবরাহ হওয়া পিএনজি (পাইপড ন্যাচারাল গ্যাস) ব্যবহারের ওপরও জোর দেওয়া হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, পিএনজি ব্যবস্থায় দেশের নিজস্ব উৎপাদনের একটি অংশ ব্যবহার করা সম্ভব হয়, ফলে বিদেশি গ্যাসের ওপর নির্ভরতা কিছুটা কমে। পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন এলাকায় পিএনজি পাইপলাইন সম্প্রসারণের কাজ নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে বলেও জানা যাচ্ছে। ভবিষ্যতে আরও বেশি বাড়িতে পাইপলাইনের মাধ্যমে গ্যাস পৌঁছে দেওয়ার পরিকল্পনা নেওয়া হতে পারে।
সরকারের মতে, গত কয়েক বছরে দেশে যে মেট্রো রেল, বিদ্যুৎ ব্যবস্থা, ইলেকট্রিক ট্রেন ও ইভি অবকাঠামো গড়ে উঠেছে, তা এখন দেশের জন্য বড় সহায়তা হয়ে দাঁড়িয়েছে। আগে যেখানে বহু জায়গায় দীর্ঘ সময় লোডশেডিং হত, এখন অধিকাংশ এলাকায় তুলনামূলক স্থিতিশীল বিদ্যুৎ পরিষেবা পাওয়া যাচ্ছে। ফলে মানুষ সহজেই বৈদ্যুতিক বিকল্প ব্যবহার করতে পারছেন।
একই সঙ্গে ইলেকট্রিক গাড়ি, চার্জিং স্টেশন এবং সৌরশক্তির ব্যবহারও ধীরে ধীরে বাড়ছে। যদিও এখনও দেশে পেট্রোল ও ডিজেলের গাড়ির সংখ্যা অনেক বেশি, তবুও ইভির ব্যবহার দ্রুত বাড়ছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
প্রযুক্তি ও শিল্পক্ষেত্রে কপারের গুরুত্ব নিয়েও আলোচনা বাড়ছে। বিশেষজ্ঞদের একাংশের মতে, ভবিষ্যতের বৈদ্যুতিক অবকাঠামো, ইভি, মোটর, ব্যাটারি এবং বিভিন্ন শিল্প যন্ত্রে কপারের ব্যবহার আরও বাড়বে। তাই কপারের অপচয় রোধ এবং সঠিক ব্যবহারের ওপর গুরুত্ব দেওয়ার কথাও বলা হচ্ছে। অনেক অর্থনৈতিক বিশ্লেষকের মতে, ভবিষ্যতের শিল্প অর্থনীতিতে কপার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ধাতু হয়ে উঠতে পারে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতি চ্যালেঞ্জিং হলেও ভারত এখনও তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল অবস্থায় রয়েছে। এর পেছনে রয়েছে দেশের কৌশলগত মজুত, কূটনৈতিক প্রচেষ্টা এবং প্রযুক্তিগত উন্নয়ন। তবে আগামী কয়েক মাস সাধারণ মানুষের সচেতন ব্যবহার ও সাশ্রয়ী জীবনযাপন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হতে চলেছে।
তবে সরকারের এই আহ্বান নিয়ে বিরোধী দলগুলি সমালোচনা করেছে। বিরোধীদের অভিযোগ, অর্থনৈতিক সমস্যাকে ঢাকতেই সাধারণ মানুষের ওপর সাশ্রয়ের দায় চাপানো হচ্ছে। কেউ কেউ এটিকে সরকারের অর্থনৈতিক ব্যর্থতার ফল বলেও মন্তব্য করেছেন।
কিছু মহলে আবার নতুন করে লকডাউনের আশঙ্কাও তৈরি হয়েছে। কারণ সরকার ওয়ার্ক ফ্রম হোম, কম যাতায়াত এবং জ্বালানি সাশ্রয়ের কথা বলছে। তবে কেন্দ্রীয় মন্ত্রীরা স্পষ্ট জানিয়েছেন, দেশে নতুন করে লকডাউনের কোনও পরিকল্পনা নেই এবং এই ধরনের খবর সম্পূর্ণ গুজব।
সরকারের দাবি, বর্তমানে দেশের কাছে প্রায় ৬০ দিনের কাঁচা তেল, ৭ দিনের এলএনজি এবং প্রায় ৫০ দিনের এলপিজি মজুত রয়েছে। তবে আন্তর্জাতিক অনিশ্চয়তার কারণে সরকার সতর্ক অবস্থান নিচ্ছে এবং দীর্ঘমেয়াদে জ্বালানি সাশ্রয়ের ওপর জোর দিচ্ছে।
প্রধানমন্ত্রীর আহ্বানের পরে বিভিন্ন রাজ্যের নেতা-মন্ত্রীরাও নিজেদের কনভয়ে গাড়ির সংখ্যা কমাতে শুরু করেছেন। কোথাও মেট্রো, কোথাও ইলেকট্রিক বাইক বা রিকশা ব্যবহার করতে দেখা গেছে জনপ্রতিনিধিদের। যদিও অনেকে এটিকে প্রতীকী পদক্ষেপ বলছেন, তবুও এর মাধ্যমে জ্বালানি সাশ্রয়ের বার্তা দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে।
করোনা সময়ের মতো আবারও অনেক সংস্থাকে ‘ওয়ার্ক ফ্রম হোম’ ব্যবস্থার দিকে যেতে বলা হয়েছে। প্রযুক্তিনির্ভর কাজ, অনলাইন মিটিং এবং ডিজিটাল পরিষেবার ওপর আরও জোর দেওয়া হচ্ছে। কর্পোরেট সংস্থাগুলিও ওয়ার্ক ফ্রম হোম এবং ডিজিটাল কাজের পদ্ধতিকে আরও বাড়ানোর পক্ষে মত দিয়েছে। এতে জ্বালানির ব্যবহার কমবে এবং শহরগুলিতে চাপও কিছুটা হ্রাস পাবে।
সব মিলিয়ে সরকারের মূল লক্ষ্য এখন দেশের বৈদেশিক মুদ্রার ভান্ডার সুরক্ষিত রাখা এবং আন্তর্জাতিক সংকটের মধ্যে অর্থনীতিকে স্থিতিশীল রাখা। বিশেষজ্ঞদের মতে, আতঙ্কিত হওয়ার প্রয়োজন এখনই নেই, তবে সচেতনভাবে জ্বালানি ও বিদেশি নির্ভরতা কমানো আগামী দিনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হতে চলেছে।

