উমলিং থেকে শুরু হচ্ছে নজরদারি, পর্যটকদের জন্য বাধ্যতামূলক নথিভুক্তি, স্বনির্ভর গাড়ি ভাড়ায় নিষেধাজ্ঞা
শিলং, ১৩ জুলাই: পাহাড়, ঝর্না আর মেঘের রাজ্যে ঢুকতে গেলে এ বার আর শুধু টিকিট কাটলেই চলবে না। মেঘালয় সরকার ঘোষণা করেছে, রাজ্যে প্রবেশ করা প্রতিটি পর্যটক ও অ-বাসিন্দাকে বাধ্যতামূলক ভাবে নথিভুক্ত হতে হবে সরকারি মেঘালয় ট্যুরিজম অ্যাপে, এবং পরিচয় যাচাই করাতে হবে উমলিং-এর মতো নির্দিষ্ট চেকপোস্টে। প্রশাসনিক মহল একে বলছে ‘ভার্চুয়াল ইনার লাইন পারমিট’ বা সংক্ষেপে ‘ভার্চুয়াল আইএলপি’। প্রকৃত অর্থে যদিও এটি কেন্দ্রীয় সরকার অনুমোদিত পূর্ণাঙ্গ আইএলপি নয়, তবু কাজের দিক থেকে তা অনেকটাই সেই ধাঁচেই তৈরি।
শুধু নথিভুক্তিকরণই নয়, হোটেল-হোমস্টে-সহ থাকার জায়গায় কড়া রেজিস্ট্রেশনের নিয়ম বলবৎ হচ্ছে, এবং সেলফ-ড্রাইভ ভাড়া গাড়ির ব্যবহারেও আসছে নিষেধাজ্ঞা। রাজ্য সরকারের দাবি, এই পদক্ষেপগুলি নেওয়া হচ্ছে পর্যটকদের নিরাপত্তা ও রাজ্যের আভ্যন্তরীণ সুরক্ষা দুটোই মাথায় রেখে।
কেন এই সিদ্ধান্ত
এই পরিকল্পনার নেপথ্যে একাধিক কারণ কাজ করেছে বলে জানা যাচ্ছে।
১. দীর্ঘদিনের আইএলপি দাবি: মেঘালয়ে স্থানীয় জনজাতি সংগঠন ও রাজ্য বিধানসভা বহু বছর ধরেই পূর্ণাঙ্গ ইনার লাইন পারমিট চালুর দাবি জানিয়ে আসছে। উদ্দেশ্য একটাই রাজ্যের ভঙ্গুর জনজাতীয় জনবিন্যাসকে বহিরাগত জনস্রোতের চাপ থেকে রক্ষা করা। কিন্তু কেন্দ্রের অনুমোদন এখনও না মেলায়, ২০১৬ সালের মেঘালয় রেসিডেন্টস সেফটি অ্যান্ড সিকিউরিটি অ্যাক্ট (MRSSA)-এর আওতায় এই ‘ভার্চুয়াল’ সংস্করণ তৈরি করে একই কাজ চালানোর চেষ্টা করছে রাজ্য সরকার।
২. সীমান্ত-ঘেঁষা অনুপ্রবেশ উদ্বেগ: বাংলাদেশ সীমান্তের দীর্ঘ, ছিদ্রপ্রবণ অংশ মেঘালয়ের একটি বড় দুর্বলতা। প্রশাসনের বক্তব্য, চেকপোস্টে কঠোর নথি যাচাইয়ের ফলে বিদেশি নাগরিকদের বৈধ ভিসা আছে কি না, তা নিশ্চিত করা সহজ হবে।
৩. সাম্প্রতিক অপরাধের ঘটনা: রঘুবংশী দম্পতির হানিমুন-খুনের ঘটনার পরে প্রশাসনিক তৎপরতা অনেকটাই বেড়ে যায়। পর্যটনের আড়ালে ঘটা অপরাধ ঠেকাতেই থাকার জায়গার নথিভুক্তি ও স্বনির্ভর ভাড়া গাড়ি নিষিদ্ধ করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে সরকারি সূত্রের দাবি।
৪. পর্যটক তথ্যের অভাব: এত দিন রাজ্যে প্রতিদিন কত পর্যটক ঢুকছেন, কোথায় যাচ্ছেন তার কোনও সুসংহত হিসেব ছিল না। মেঘালয় ট্যুরিজম অ্যাপ ও চেকপোস্ট এ বার প্রশাসনকে বাস্তব সময়ে পর্যটক-গতিবিধির তথ্য দেবে।
নতুন নয়, এই চেষ্টা চলছে বহু বছর ধরে
মেঘালয়ে প্রবেশ-নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা চালুর চেষ্টা এই প্রথম নয়। গত এক দশকে একাধিক বার একই লক্ষ্যে পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে, কিন্তু আইনি জটিলতা, নীতিগত পরিবর্তন এবং কোভিড অতিমারির কারণে প্রতিবারই তা থমকে গিয়েছে।
| সময়কাল | পদক্ষেপ | পরিণতি |
|---|---|---|
| ২০১৬ | মেগ-আরএসএসএ আইন পাশ | মূলত ভাড়াটে-বাড়িওয়ালা নথিভুক্তিতে সীমাবদ্ধ ছিল, পর্যটক নয় |
| ২০১৯ | ২৪ ঘণ্টার বেশি অবস্থানকারীদের জন্য বাধ্যতামূলক নথিভুক্তির প্রস্তাব | রাজ্যপাল ও কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের অনুমোদন না মেলায় দীর্ঘ সময় আটকে থাকে |
| ২০২০ | কোভিড-পরবর্তী পুনরায়-খোলার সময় অ্যাপ-ভিত্তিক নথিভুক্তি | সংক্রমণ পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতেই মান্যতা কমে যায় |
| ২০২২ | মেগ-আরএসএসএ অনলাইন পোর্টাল চালু | রূপায়ণ ঢিমেতালে, রাজ্যের সব থাকার জায়গা এই আওতায় আসেনি |
| ২০২৬ | ‘ভার্চুয়াল আইএলপি’ ও স্থায়ী চেকপোস্ট (উমলিং) | প্রথম বার পূর্ণাঙ্গ স্থায়ী পরিকাঠামো তৈরির উদ্যোগ |
এ বারের প্রচেষ্টা আগের তুলনায় স্পষ্টতই অনেক বেশি সুসংগঠিত রি-ভয় জেলার উমলিং-এ শুরু হচ্ছে স্থায়ী চেকপোস্ট, যা কার্যত প্রথাগত আইএলপি চেকপোস্টের আদলেই গড়া হচ্ছে।
আইএলপি আসলে কী
ইনার লাইন পারমিট হল একটি নির্দিষ্ট মেয়াদের সরকারি অনুমতিপত্র, যা ছাড়া দেশের অন্য প্রান্তের নাগরিকরা কিছু সংরক্ষিত এলাকায় ঢুকতে পারেন না। বর্তমানে ভারতের চারটি রাজ্যে অরুণাচল প্রদেশ, নাগাল্যান্ড, মিজোরাম ও মণিপুরে এই ব্যবস্থা বলবৎ আছে।
এই ব্যবস্থার শিকড় প্রায় দেড়শো বছরের পুরনো। ১৮৭৩ সালে ব্রিটিশ আমলে প্রণীত বেঙ্গল ইস্টার্ন ফ্রন্টিয়ার রেগুলেশন আইনের মাধ্যমে ব্রিটিশরা একটি ‘ইনার লাইন’ টেনে দিয়েছিল, যাতে সমতলের ব্যবসায়ীরা পাহাড়ের সম্পদে ভাগ বসাতে না পারেন। স্বাধীনতার পরেও কাঠামোটি রয়ে যায়, তবে উদ্দেশ্য বদলে যায় ব্রিটিশ বাণিজ্যিক স্বার্থ রক্ষার বদলে তা হয়ে ওঠে জনজাতি সমাজের সুরক্ষার হাতিয়ার।
আইএলপির পক্ষে যুক্তি মূলত চারটি জনজাতীয় পরিচয় ও সংস্কৃতি রক্ষা, ভূমি ও অর্থনৈতিক অধিকার সংরক্ষণ, স্পর্শকাতর আন্তর্জাতিক সীমান্তে (মায়ানমার, চিন, ভুটান-ঘেঁষা) নজরদারি বজায় রাখা, এবং ঔপনিবেশিক আমল থেকে চলে আসা প্রশাসনিক ধারাবাহিকতা।
আইএলপি বাতিলের দাবি: বিতর্কের অন্য পিঠ
তবে আইএলপি নিয়ে দেশজুড়ে মতভেদও কম নয়। একদিকে যেমন জনজাতি সংগঠনগুলি একে নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষার শেষ প্রাচীর বলে মনে করে, তেমনই একটি বড় অংশের মানুষ মনে করেন, একই দেশের মধ্যে নাগরিকদের চলাচলে এমন বিধিনিষেধ ভারতীয় সংহতির ধারণার পরিপন্থী।
যাঁরা আইএলপি তুলে দেওয়ার পক্ষে সওয়াল করেন, তাঁদের যুক্তি “এক দেশ, এক নাগরিক” ধারণায় একই সংবিধানের অধীনে থাকা দুই রাজ্যের মধ্যে অভ্যন্তরীণ ভ্রমণে অনুমতিপত্র লাগা উচিত নয়; এতে জাতীয় সংহতি ও অর্থনৈতিক সংযুক্তিতে বাধা পড়ে, লগ্নি ও পর্যটন ব্যাহত হয়, এবং উত্তর-পূর্বের সঙ্গে দেশের বাকি অংশের দূরত্ব বাড়ে বই কমে না। কারও কারও মতে, ডিজিটাল যুগে ভিন্ন প্রযুক্তি-নির্ভর নজরদারি ব্যবস্থা থাকা সত্ত্বেও ঔপনিবেশিক আমলের এই কাঠামো ধরে রাখার আর প্রাসঙ্গিকতা নেই।
অন্য দিকে, আইএলপি সমর্থকদের বক্তব্য জনজাতি অধ্যুষিত এই রাজ্যগুলির জনসংখ্যা তুলনায় খুবই কম, আর বাইরে থেকে অনিয়ন্ত্রিত জনস্রোত এলে স্থানীয় ভাষা, জমি-মালিকানা ও সংস্কৃতি অল্প সময়েই সংখ্যালঘু হয়ে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়। তাঁদের মতে, সংবিধানের ষষ্ঠ তফসিলের চেতনা মেনেই এই সুরক্ষা প্রয়োজন, এবং এটি বিচ্ছিন্নতার প্রতীক নয় বরং বৈচিত্র্যের মধ্যে বিশেষ প্রয়োজনের স্বীকৃতি।
মেঘালয়ের ক্ষেত্রে অবশ্য পরিস্থিতি কিছুটা আলাদা যেহেতু কেন্দ্রের কাছ থেকে পূর্ণাঙ্গ আইএলপি অনুমোদন মেলেনি, তাই রাজ্য সরকার একটি সমান্তরাল, রাজ্য-আইন নির্ভর কাঠামো তৈরি করে কার্যত একই লক্ষ্য পূরণের চেষ্টা করছে যাকে ঘিরে আইনি ও রাজনৈতিক প্রশ্নও থেকে যাচ্ছে।
লক্ষণীয় বিষয় হল, আইএলপি নিয়ে বিতর্কে বিভিন্ন মতভেদ উঠে আসছে, কোথাও এই ব্যবস্থা তুলে দেওয়ার দাবি উঠছে, তো কোথাও আবার একে চালু করারই দাবি জোরালো হচ্ছে। যেমন, ২০২৩ সালের জানুয়ারিতে প্রাক্তন জাতীয় ফুটবলার তথা হামরো সিকিম পার্টির নেতা ভাইচুং ভুটিয়া কলকাতায় আরএসএস প্রধান মোহন ভাগবতের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে একটি স্মারকলিপি তুলে দেন। তাতে সিকিমের জাতীয় নিরাপত্তা ও জনবিন্যাসের ভারসাম্য রক্ষার স্বার্থে রাজ্যে আইএলপি চালুর বিষয়ে কেন্দ্রের কাছে সুপারিশ করতে ভাগবতকে অনুরোধ জানানো হয়। একই স্মারকলিপিতে সিকিমি-নেপালি ও লিম্বু-তামাং সম্প্রদায়ের জন্য বিধানসভায় সংরক্ষিত আসনের দাবিও তোলা হয়। এই ঘটনা থেকে স্পষ্ট, আইএলপি নিয়ে জাতীয় স্তরের রাজনৈতিক সংগঠনগুলির কাছেও নিয়মিত দরবার চলে কোথাও তা প্রত্যাহারের জন্য, কোথাও আবার সম্প্রসারণের জন্য।
উমলিং চেকপোস্ট চালুর পরে ধাপে ধাপে রাজ্যের অন্যান্য প্রবেশপথেও একই ব্যবস্থা বিস্তৃত হওয়ার সম্ভাবনা। পর্যটন-নির্ভর অর্থনীতির উপরে এর প্রভাব কতটা পড়ে, আর জনজাতি সুরক্ষা বনাম নাগরিক অবাধ চলাচলের এই বহু পুরনো টানাপড়েনে মেঘালয়ের এই পরীক্ষা শেষ পর্যন্ত কোন দিকে গড়ায় আগামী কয়েক মাসেই তার আভাস মিলবে।
About The Author
Discover more from Jist Feed
Subscribe to get the latest posts sent to your email.
