Site icon Jist Feed

পশ্চিমবঙ্গ বাজেট ২০২৬: স্বাস্থ্যখাতে অভূতপূর্ব বিনিয়োগ, আয়ুষ্মান ভারত থেকে নতুন মেডিক্যাল কলেজ—বড় ঘোষণা রাজ্যের

Health Sector

কলকাতা, ২২ জুন, পশ্চিমবঙ্গের ২০২৬-২৭ অর্থবর্ষের বাজেটে স্বাস্থ্যখাতকে কেন্দ্র করে যে রূপরেখা তুলে ধরা হয়েছে, তাকে রাজ্যের চিকিৎসা ব্যবস্থার ইতিহাসে অন্যতম বৃহত্তম সংস্কার কর্মসূচি বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। স্বাস্থ্যবিমা সম্প্রসারণ থেকে শুরু করে নতুন মেডিক্যাল কলেজ, সুপার স্পেশালিটি হাসপাতাল, ক্যানসার চিকিৎসা কেন্দ্র, চিকিৎসক তৈরির পরিকাঠামো বৃদ্ধি এবং সাশ্রয়ী ওষুধ সরবরাহ – সব মিলিয়ে স্বাস্থ্য পরিষেবাকে সাধারণ মানুষের আরও কাছে পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্যে একাধিক উচ্চাভিলাষী প্রকল্প ঘোষণা করেছে রাজ্য সরকার।

বাজেট বক্তৃতায় স্বাস্থ্যকে ‘জীবন শক্তি’ কর্মসূচির অন্যতম প্রধান স্তম্ভ হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। সরকারের দাবি, আগামী কয়েক বছরে এই উদ্যোগগুলি বাস্তবায়িত হলে স্বাস্থ্য পরিষেবার ক্ষেত্রে পশ্চিমবঙ্গ দেশের অন্যতম অগ্রগণ্য রাজ্যে পরিণত হতে পারে।

আয়ুষ্মান ভারত চালুর মাধ্যমে ৭ কোটি মানুষের স্বাস্থ্য সুরক্ষা

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঘোষণা নিঃসন্দেহে আয়ুষ্মান ভারত–প্রধানমন্ত্রী জন আরোগ্য যোজনা (AB-PMJAY) চালু করা। দীর্ঘদিন পর পশ্চিমবঙ্গে এই কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্যবিমা প্রকল্প কার্যকর করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

সরকার জানিয়েছে, এই প্রকল্পের জন্য প্রায় ₹৮৩,১০০ কোটি টাকার আর্থিক সংস্থান রাখা হয়েছে। এর ফলে রাজ্যের প্রায় ৭ কোটি মানুষ স্বাস্থ্যবিমার আওতায় আসবেন।

প্রতিটি উপযুক্ত পরিবার বছরে সর্বোচ্চ ₹২৫ লক্ষ পর্যন্ত চিকিৎসা ব্যয়ের বিমা সুবিধা পাবে। সরকারি ও বেসরকারি উভয় হাসপাতালেই এই সুবিধা পাওয়া যাবে।

এছাড়া আশা কর্মী, অঙ্গনওয়াড়ি কর্মী, আইসিডিএস কর্মী এবং ৭০ বছরের ঊর্ধ্বে সমস্ত নাগরিকদেরও এই প্রকল্পে অন্তর্ভুক্ত করার ঘোষণা করা হয়েছে।

স্বাস্থ্য অর্থনীতিবিদদের মতে, পশ্চিমবঙ্গে স্বাস্থ্যখাতে ব্যক্তিগত খরচ কমানোর ক্ষেত্রে এটি একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ হতে পারে।

উত্তরবঙ্গে AIIMS: চিকিৎসা পরিষেবায় নতুন দিগন্ত

উত্তরবঙ্গের দীর্ঘদিনের দাবি পূরণ করে AIIMS-মানের একটি অত্যাধুনিক চিকিৎসা প্রতিষ্ঠান স্থাপনের প্রস্তাব ঘোষণা করা হয়েছে।

বর্তমানে জটিল রোগের চিকিৎসার জন্য উত্তরবঙ্গের বহু রোগীকে কলকাতা কিংবা ভিন রাজ্যে যেতে হয়। নতুন এই প্রতিষ্ঠান চালু হলে সেই চাপ অনেকটাই কমবে বলে মনে করা হচ্ছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, AIIMS-স্তরের হাসপাতাল শুধুমাত্র চিকিৎসা পরিষেবাই নয়, গবেষণা, প্রশিক্ষণ এবং উন্নত চিকিৎসা প্রযুক্তির ক্ষেত্রেও উত্তরবঙ্গকে একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলতে পারে।

নতুন সুপার স্পেশালিটি হাসপাতাল

রাজ্যের প্রত্যন্ত এলাকায় উন্নত চিকিৎসা পৌঁছে দিতে সুন্দরবন, পুরুলিয়া এবং দার্জিলিংয়ে নতুন সুপার স্পেশালিটি হাসপাতাল গড়ে তোলার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।

এই অঞ্চলগুলিতে দীর্ঘদিন ধরে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক এবং উন্নত চিকিৎসা পরিষেবার অভাব রয়েছে। নতুন হাসপাতালগুলি চালু হলে হৃদরোগ, কিডনি রোগ, স্নায়ুরোগ, ক্যানসারসহ জটিল রোগের চিকিৎসা স্থানীয় স্তরেই পাওয়া সম্ভব হবে।

উত্তরবঙ্গে ক্যানসার হাসপাতাল

ক্যানসার চিকিৎসার জন্য উত্তরবঙ্গের রোগীদের বড় অংশকে কলকাতায় আসতে হয়। বাজেটে উত্তরবঙ্গে একটি পূর্ণাঙ্গ ক্যানসার হাসপাতাল প্রতিষ্ঠার কথা ঘোষণা করা হয়েছে।

স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, এর ফলে রোগ নির্ণয় থেকে চিকিৎসা—সমস্ত পরিষেবা উত্তরবঙ্গেই পাওয়া যাবে এবং চিকিৎসার সময় ও ব্যয় উভয়ই কমবে।

চারটি নতুন মেডিক্যাল কলেজ

চিকিৎসক সংকট দূর করতে আলিপুরদুয়ার, কালিম্পং, দক্ষিণ দিনাজপুর এবং পশ্চিম বর্ধমানে চারটি নতুন মেডিক্যাল কলেজ স্থাপনের ঘোষণা করা হয়েছে।

একইসঙ্গে সরকারি মেডিক্যাল কলেজগুলিতে প্রায় ৬৫০টি নতুন এমবিবিএস আসন এবং ৪৫০টিরও বেশি স্নাতকোত্তর আসন বাড়ানোর পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।

স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, আগামী এক দশকে চিকিৎসকের ঘাটতি কমাতে এই পদক্ষেপ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।

সিউড়ি সুপার স্পেশালিটি হাসপাতাল হবে মেডিক্যাল কলেজ

বীরভূম জেলার সিউড়ি সুপার স্পেশালিটি হাসপাতালকে উন্নীত করে পূর্ণাঙ্গ সরকারি মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতাল হিসেবে গড়ে তোলার ঘোষণা করা হয়েছে।

এর ফলে জেলার স্বাস্থ্য পরিকাঠামো যেমন শক্তিশালী হবে, তেমনি চিকিৎসা শিক্ষার নতুন সুযোগও তৈরি হবে।

সস্তায় ওষুধ: জনঔষধি ও AMRIT স্টোর

চিকিৎসার অন্যতম বড় খরচ ওষুধ। এই ব্যয় কমাতে প্রধানমন্ত্রী ভারতীয় জনঔষধি প্রকল্প চালুর ঘোষণা করা হয়েছে।

সরকার জানিয়েছে, জেনেরিক ওষুধ ব্র্যান্ডেড ওষুধের তুলনায় ৫০ থেকে ৮০ শতাংশ কম দামে পাওয়া যাবে।

একইসঙ্গে জেলা ও মহকুমা হাসপাতালগুলিতে AMRIT স্টোর খোলা হবে, যেখানে জীবনরক্ষাকারী ওষুধ, স্টেন্ট, ইমপ্ল্যান্ট এবং অন্যান্য চিকিৎসা সামগ্রী ৫০ থেকে ৯০ শতাংশ পর্যন্ত কম মূল্যে পাওয়া যাবে।

পৃথক AYUSH দফতর

আয়ুর্বেদ, যোগ, ইউনানি, সিদ্ধা, ন্যাচারোপ্যাথি এবং হোমিওপ্যাথি চিকিৎসাকে আরও সংগঠিতভাবে পরিচালনার জন্য পৃথক AYUSH দফতর গঠনের কথা ঘোষণা করা হয়েছে।

সরকারের মতে, প্রতিরোধমূলক স্বাস্থ্যসেবা এবং সামগ্রিক সুস্থতা বৃদ্ধিতে AYUSH ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।

মেডিক্যাল ট্যুরিজমে নতুন সম্ভাবনা

রাজ্যকে চিকিৎসা পর্যটনের কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলতে পাঁচটি আঞ্চলিক মেডিক্যাল হাব তৈরির পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।

বেসরকারি বিনিয়োগের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক মানের হাসপাতাল গড়ে তোলা হবে। একইসঙ্গে সামাজিক দায়বদ্ধতার অংশ হিসেবে নির্দিষ্ট সংখ্যক শয্যা বিনামূল্যে বা স্বল্প খরচে সাধারণ মানুষের জন্য সংরক্ষিত থাকবে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এর ফলে স্বাস্থ্য পরিষেবার পাশাপাশি কর্মসংস্থান ও বিনিয়োগও বাড়বে।

ট্রমা কেয়ার ও জরুরি স্বাস্থ্য পরিষেবার সম্প্রসারণ

দীঘা, দার্জিলিং এবং ফরাক্কায় নতুন ট্রমা কেয়ার সেন্টার গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে।

সড়ক দুর্ঘটনা ও জরুরি চিকিৎসা পরিষেবার ক্ষেত্রে এই কেন্দ্রগুলি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।

সুন্দরবনের মতো দুর্গম অঞ্চলে মোটরবোট অ্যাম্বুল্যান্স পরিষেবা চালু করা হবে। পাশাপাশি দ্বীপাঞ্চলে প্রসূতি পরিষেবার জন্য বিশেষ মাতৃসদন গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

হাসপাতালের রোগীদের খাদ্য বরাদ্দ দ্বিগুণ

সরকারি হাসপাতালে ভর্তি রোগীদের পুষ্টির মান উন্নত করতে ‘ফুল রাইস ডায়েট’-এর দৈনিক বরাদ্দ ₹৫৬.৬৪ থেকে বাড়িয়ে ₹১১০ করা হয়েছে।

স্বাস্থ্য প্রশাসনের মতে, উন্নত পুষ্টি রোগীর দ্রুত আরোগ্যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

স্বাস্থ্যখাতে বাজেটের প্রধান পরিসংখ্যান

সূচকঘোষণা
স্বাস্থ্যবিমা বরাদ্দ₹৮৩,১০০ কোটি
সম্ভাব্য উপভোক্তাপ্রায় ৭ কোটি
বিমা কভারেজপরিবারপিছু ₹২৫ লক্ষ
নতুন মেডিক্যাল কলেজ৪টি
নতুন MBBS আসনপ্রায় ৬৫০
নতুন PG আসন৪৫০+
AIIMS১টি (উত্তরবঙ্গ)
ক্যানসার হাসপাতাল১টি
সুপার স্পেশালিটি হাসপাতাল৩টি
মেডিক্যাল হাব৫টি
ট্রমা সেন্টার৩টি
রোগী খাদ্য বরাদ্দ₹৫৬.৬৪ → ₹১১০

বিশেষজ্ঞদের মূল্যায়ন

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, এই বাজেটের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো স্বাস্থ্যবিমা, স্বাস্থ্য অবকাঠামো এবং মানবসম্পদ উন্নয়ন—এই তিনটি ক্ষেত্রকে একসঙ্গে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

তাঁদের মতে, পরিকল্পনাগুলি নির্ধারিত সময়ের মধ্যে বাস্তবায়িত হলে পশ্চিমবঙ্গে স্বাস্থ্য পরিষেবার ভৌগোলিক বৈষম্য অনেকটাই কমবে। উত্তরবঙ্গ, জঙ্গলমহল এবং সুন্দরবনের মতো অঞ্চলগুলিতে উন্নত চিকিৎসার সুযোগ বৃদ্ধি পাবে।

তবে বিশেষজ্ঞদের একাংশের মত, প্রকল্পগুলির সফলতা নির্ভর করবে দ্রুত বাস্তবায়ন, পর্যাপ্ত চিকিৎসক নিয়োগ এবং দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের উপর।

সব মিলিয়ে ২০২৬-২৭ সালের বাজেটে স্বাস্থ্যখাতকে যে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে, তা স্পষ্টভাবে ইঙ্গিত করছে যে আগামী দশকে পশ্চিমবঙ্গের উন্নয়ন কৌশলের কেন্দ্রে থাকবে জনস্বাস্থ্য।

Exit mobile version