চিত্র : শুভজিৎ বসু
ধনিয়াখালী, হুগলী: হুগলী ও পার্শ্ববর্তী জেলাগুলিতে এবছর আলুর বাম্পার ফলন হলেও চাষীদের মুখে হাসি ফোটেনি। বরং উল্টে গভীর সংকটে পড়েছেন হাজার হাজার আলু চাষী। উৎপাদন বেশি হওয়ার ফলে বাজারে আলুর দাম তলানিতে ঠেকেছে, যার ফলে চাষীরা তাঁদের খরচও তুলতে পারছেন না। হুগলির বিস্তীর্ণ গ্রামাঞ্চলে এখন শুধুই উদ্বেগ, হতাশা আর দীর্ঘশ্বাস।
রাজ্যের অন্যতম আলু উৎপাদনকারী জেলা হুগলী। আরামবাগ, খানাকুল, পুড়শুড়া, ধনিয়াখালি, তারকেশ্বর, হরিপাল, পোলবা সহ একাধিক এলাকায় চাষীরা ব্যাপক হারে আলু চাষ করে থাকেন। এ বছর অনুকূল আবহাওয়ার কারণে ফলন আগের তুলনায় অনেক বেশি হয়েছে। চন্দ্রমুখী ও হিমাঙ্কিনী আলু ইতিমধ্যেই জমি থেকে উঠতে শুরু করেছে, আর জ্যোতি আলুর প্রায় ৬০ শতাংশ এখনও মাটির নিচে রয়েছে।
খরচ আকাশছোঁয়া, কিন্তু আয় শূন্য
কিন্তু এই অতিরিক্ত উৎপাদনই এখন চাষীদের জন্য অভিশাপ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বাজারে আলুর চাহিদার তুলনায় সরবরাহ অনেক বেশি হওয়ায় দাম একেবারে ভেঙে পড়েছে। এক বিঘা জমিতে আলু চাষ করতে খরচ হয় প্রায় ৩৫ থেকে ৩৬ হাজার টাকা। বেশিরভাগ চাষীই ঋণ নিয়ে চাষ করেন—কেউ ব্যাংক থেকে, কেউ বা মহাজনের কাছ থেকে। কিন্তু যখন ফসল তোলার সময় আসে, তখন বাজারে নেই কোনো দাম।
এদিকে একটি আলুর বস্তা প্রস্তুত করতে খরচ পড়ছে:
- বস্তার দাম: ৩৫ টাকা
- হিমঘরে নিয়ে যাওয়ার খরচ: ২০–২৫ টাকা
- সব মিলিয়ে মোট খরচ: ২১০–২২০ টাকা
এই খরচের তুলনায় বাজারে যে দাম পাওয়া যাচ্ছে, তা প্রায় কিছুই নয়। ফলে চাষীরা আজ সম্পূর্ণ লোকসানের মুখে।
রাস্তায় নেমে ক্ষোভ উগরে দিচ্ছেন চাষীরা
ধনিয়াখালীর এক চাষী জানান, “এক বিঘা জমিতে আলু চাষ করতে খরচ হয় প্রায় ৩৫ থেকে ৩৬ হাজার টাকা। আমরা অনেকেই ঋণ নিয়ে চাষ করি। কিন্তু এখন আলুর দাম এত কম যে খরচই তুলতে পারছি না।”
তারকেশ্বরের মোজেপুর গ্রামের চাষী কাশীনাথ পাত্রের কথায়, “আলুর দাম নেই, আবার মাঠ থেকে আলু তুলতে শ্রমিকও পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে মাঠেই আলু পড়ে নষ্ট হচ্ছে।”
এই পরিস্থিতিতে চাষীরা চরম ক্ষোভে ফেটে পড়েছেন। হুগলীর বিভিন্ন এলাকায় রাস্তায় আলু ফেলে বিক্ষোভ দেখানোর ঘটনাও সামনে এসেছে। তাঁদের প্রধান দাবি—অবিলম্বে আলু ভিন রাজ্যে পাঠানোর ব্যবস্থা করতে হবে অথবা ঋণ মুকুব করতে হবে।
সরকারের আশ্বাস, কিন্তু মাঠের বাস্তবতা আলাদা
রাজ্য সরকার চাষীদের আশ্বাস দিয়েছে। কুইন্টাল প্রতি ৯৫০ টাকা দরে আলু কেনার ঘোষণা করা হয়েছে। চাষীদের বলা হয়েছে, বিডিও বা এডিও অফিস থেকে স্লিপ নিয়ে হিমঘর বা নির্দিষ্ট কেন্দ্রে আলু বিক্রি করতে।
কৃষি বিপণন মন্ত্রী জানিয়েছেন—
- রাজ্যজুড়ে আলু কেনা শুরু হয়েছে
- সমবায় ও বেসরকারি হিমঘর—সব জায়গাতেই ব্যবস্থা রয়েছে
- ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক চাষীদের জন্য বিশেষ সংরক্ষণ করা হয়েছে
- ৮৪৪টি সুফল বাংলা কেন্দ্রের মাধ্যমেও আলু কেনা হচ্ছে
কিন্তু প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে—
এই আশ্বাস কি বাস্তবে পৌঁছাচ্ছে প্রত্যন্ত গ্রামের মাঠে ? বাস্তব চিত্র একেবারেই ভিন্ন বলেই দাবি করছেন চাষীরা। অনেক ক্ষেত্রেই মাঠে কোনও খরিদ্দার পৌঁছচ্ছে না। ফলে আলু তুলে হিমঘরে নিয়ে যাওয়ার মতো আর্থিক সামর্থ্যও হারাচ্ছেন অনেকেই।
অতিরিক্ত উৎপাদনেই ভেঙে পড়েছে বাজার
শুধু পশ্চিমবঙ্গ নয়, উত্তর প্রদেশ, পাঞ্জাব, গুজরাট—সব জায়গাতেই এবছর আলুর উৎপাদন বেড়েছে। ফলে বাজারে অতিরিক্ত সরবরাহ তৈরি হয়েছে, আর তাতেই ধসে পড়েছে দাম।
হতাশার চরম পরিণতি
পরিস্থিতি এতটাই ভয়াবহ যে পূর্ব বর্ধমান জেলায় এক চাষীর আত্মহত্যার খবর সামনে এসেছে। ঋণের বোঝা আর লোকসানের যন্ত্রণা সহ্য করতে না পেরে তিনি এই চরম পথ বেছে নিয়েছেন।
এই ঘটনা শুধু একটি পরিবারের নয়—এটা গোটা কৃষক সমাজের অসহায়তার প্রতিচ্ছবি।
অজানা ভবিষ্যতের দিকে তাকিয়ে চাষীরা
আজ হুগলির মাঠে শুধু আলু পড়ে নেই—পড়ে আছে হাজার হাজার চাষীর স্বপ্ন, তাদের পরিশ্রম, তাদের ভবিষ্যৎ। বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধুমাত্র উৎপাদন বৃদ্ধি নয়, সঠিক বিপণন ব্যবস্থার অভাব এবং বাজার নিয়ন্ত্রণে দুর্বলতা এই সংকটের মূল কারণ। অন্যদিকে, পাঞ্জাব, উত্তরপ্রদেশ ও গুজরাটেও উৎপাদন বাড়ায় সর্বভারতীয় বাজারেও দামের ওপর চাপ পড়েছে।
বিধানসভা নির্বাচন ঘনিয়ে আসার মুখে এই আলু সংকট রাজনৈতিকভাবেও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। চাষীদের একটাই প্রশ্ন—আগামী দিনে কি তাঁরা তাঁদের উৎপাদিত ফসলের ন্যায্য মূল্য পাবেন ? নির্বাচনে শাসকদলের ভোট ব্যাংকে এর প্রভাব কি পড়তে চলেছে ? তার উত্তর পেতে আমাদের চৌঠা মে পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে।
About The Author
Discover more from Jist Feed
Subscribe to get the latest posts sent to your email.
