চৈত্রের শেষ আলো যখন ধীরে ধীরে পৃথিবীকে সোনালি করে তোলে, দক্ষিণবঙ্গের মাটিতে তখন জেগে ওঠে এক প্রাচীন আহ্বান—বাসন্তী পূজা। এটি কোনো অকাল বোধন নয়; এটাই সেই আদি দুর্গোৎসব, যা রামচন্দ্রের শরৎকালীন পূজারও বহু পূর্বে প্রতিষ্ঠিত।

পুরাণকথায় বলা হয়, রামচন্দ্র লঙ্কা যুদ্ধে যাওয়ার আগে শরৎকালে দেবী দুর্গার আরাধনা করেছিলেন—যা “অকাল বোধন” নামে পরিচিত। অর্থাৎ, দেবীর যে পূজা মূলত বসন্তকালে অনুষ্ঠিত হতো, তাকেই তিনি শরৎকালে আহ্বান করেন বিশেষ প্রয়োজনে। সেই অকাল আহ্বানই পরবর্তীকালে শারদীয় দুর্গাপূজার রূপ নিয়ে বিস্তৃত হয়।
কিন্তু তার অনেক আগে থেকেই, বসন্তের কোলে, প্রকৃতির নবজাগরণের সঙ্গে মিলিয়ে, দেবী দুর্গার আরাধনা চলত—সেই ধারাই আজকের বাসন্তী পূজা।

দক্ষিণবঙ্গের মেদিনীপুর, হুগলি, বর্ধমান, নদীয়ার বিস্তীর্ণ অঞ্চলে এই প্রাচীন পূজার ধারাবাহিকতা আজও অটুট। বনেদি বাড়ির প্রাঙ্গণে, কিংবা গ্রামবাংলার মাটির উঠোনে, এই পূজা আজও স্মরণ করিয়ে দেয়—এটাই মূল, এটাই উৎস।

এখানে পূজার রূপ সরল, কিন্তু তার গভীরতা অসীম। কলাগাছের সবুজে বাঁধা মণ্ডপ, আলপনার শুভ্রতায় আঁকা প্রার্থনা, আর ঢাকের মৃদু সুরে ভেসে ওঠা সময়ের স্মৃতি—সবকিছু যেন বলে দেয়, এই পূজা প্রদর্শনের জন্য নয়, উপলব্ধির জন্য।
দেবী এখানে শুধু মহিষাসুরমর্দিনী নন, তিনি নবজীবনের প্রতীক—তিনি বসন্তের মতোই চিরনবীন, চিরজাগ্রত।

শারদীয় দুর্গাপূজা আজ বিশ্বব্যাপী বাঙালির সর্ববৃহৎ উৎসব—আলো, শিল্প, জনসমাগমে ভরপুর এক বিশাল আয়োজন। কিন্তু বাসন্তী পূজা সেই উৎসবের উৎস, তার প্রাচীনতম শিকড়। একটিতে আছে বিস্তার, অন্যটিতে আছে উৎস; একটিতে বহির্মুখী আনন্দ, অন্যটিতে অন্তর্মুখী চেতনা।

মেদিনীপুরের গ্রাম থেকে হুগলির বনেদি আঙিনা—দক্ষিণবঙ্গের সর্বত্র এই পূজা আজও সমান জনপ্রিয়। সময় বদলেছে, কিন্তু এই পূজার সুর বদলায়নি—ভক্তি, সরলতা আর প্রাচীনতার গভীর টান আজও একে জীবন্ত রেখেছে।

আজকের বিশ্বে, যেখানে মানুষ ক্রমশ শিকড়হীন হয়ে উঠছে, বাসন্তী পূজা এক চিরন্তন সত্যের কথা বলে—
যে শিকড় যত গভীর, তার বিস্তার তত সুদূর।

এই পূজা আমাদের শেখায়—
ফিরে যেতে হবে সেই আদি উৎসের কাছে, যেখানে ভক্তি ছিল নির্মল, যেখানে প্রকৃতি ছিল সঙ্গী, যেখানে দেবী ছিলেন জীবনেরই এক রূপ।

বাসন্তী পূজা তাই কেবল একটি উৎসব নয়—
এটি এক প্রাচীন সত্যের পুনর্জাগরণ,
দক্ষিণবঙ্গের মাটি থেকে উঠে আসা এক চিরন্তন আলোকধারা,
যা বিশ্বমানবকে স্মরণ করিয়ে দেয়—
শুরু যেখানে, সত্য সেখানেই।

[ লেখনীতে: সুরজিৎ চট্টোপাধ্যায় ]

About The Author


Discover more from Jist Feed

Subscribe to get the latest posts sent to your email.

Leave a Reply

You missed