Baba Tarakeshwar Mandirনিজস্ব চিত্র

শুভজিৎ বসু : হুগলির তারকেশ্বর বাংলার এমনি এক পবিত্র শৈব ক্ষেত্র, যেখানে চৈত্র মাস জুড়ে অনুষ্ঠিত হয় শিবের গাজন ও সন্ন্যাস মেলা। এই উৎসব শুধুমাত্র ধর্মীয় নয়, এটি বাংলার এক প্রাচীন ও ঐতিহ্যবাহী ধর্মীয়-লোকউৎসব, যা ভক্তি, তপস্যা ও গ্রামীণ সংস্কৃতির এক অনন্য সংমিশ্রণ।

পৌরাণিক পটভূমি

পৌরাণিক কাহিনী অনুসারে, পিতা দক্ষের যজ্ঞে, পিতা দক্ষ স্বামী শিবকে আমন্ত্রণ জানাননি এবং যজ্ঞভাগও নির্দিষ্ট করেননি। উপরন্তু, যজ্ঞস্থলে তিনি স্বামী শিবকে অপমান করেন। এই অপমান সাধ্বী সতী সহ্য করতে পারেননি। নিজের ইচ্ছায় সতী যজ্ঞস্থলেই প্রাণত্যাগ করেন।

প্রিয়তমা স্ত্রীর মৃত্যুসংবাদ পেয়ে ভগবান শিব সতীর দেহ কাঁধে তুলে ক্রোধে তাণ্ডবলীলা শুরু করেন। এতে সমগ্র সৃষ্টিই ধ্বংসের মুখে পড়ে। স্বর্গের দেবতারা ভীত হয়ে পড়েন এবং শিবের এই প্রলয়ঙ্কর রূপ থেকে মুক্তি পেতে ভগবান নারায়ণের শরণাপন্ন হন।

তখন ভগবান নারায়ণ তাঁর সুদর্শন চক্র দিয়ে সতীর দেহকে ৫১ খণ্ডে বিভক্ত করেন। এই খণ্ডগুলি পৃথিবীর বিভিন্ন স্থানে পতিত হয়ে ৫১টি সতীপীঠ হিসেবে পরিচিত হয়।

এদিকে প্রিয়তমা স্ত্রীর শোকে কাতর হয়ে ভগবান শিব গভীর তপস্যায় নিমগ্ন হন। অপরদিকে, শিবের পরম ভক্ত তারকাসুর কঠোর তপস্যার মাধ্যমে শিবকে তুষ্ট করে তাঁর কাছ থেকে বর লাভ করে অমিত শক্তির অধিকারী হন। এই সুযোগে তারকাসুর স্বর্গ আক্রমণ করে দেবতাদের বিতাড়িত করে।

দেবতারা পুনরায় ভগবান ব্রহ্মার শরণাপন্ন হয়ে জানতে পারেন যে, শিবের অংশজাত দৈব শক্তি দ্বারাই কেবল তারকাসুরকে বধ করা সম্ভব।

এদিকে দেবী সতী পুনর্জন্মে হিমালয়ের রাজগৃহে পার্বতী রূপে জন্মগ্রহণ করেন এবং ভগবান শিবকে স্বামী হিসেবে পাওয়ার জন্য কঠোর তপস্যায় মগ্ন হন। কিন্তু সকল সৃষ্টির মূল শক্তি ভগবান শিব গভীর তপস্যায় নিমগ্ন থাকায় তিনি পার্বতীর কথা জানতে পারেননি।

অবশেষে, চৈত্র মাসের নীল পূজার দিনে অসংখ্য ভক্তের তপস্যার ফলে শিবের তপস্যা ভঙ্গ হয় এবং মাতা পার্বতীর সঙ্গে তাঁর বিবাহ সম্পন্ন হয়।

গাজন উৎসবের সূচনা

তারকেশ্বরের চৈত্র গাজন উৎসব হুগলি জেলার অন্যতম প্রাচীন শিব-উৎসব, যা চৈত্র মাসের শুরু থেকে চৈত্র সংক্রান্তি (১৪–১৫ এপ্রিল) পর্যন্ত পালন করা হয়। কথিত আছে, রাজা সুন্দরানন্দ ঠাকুর ১৪৮৫ খ্রিস্টাব্দে এই পূজার প্রচলন করেন।পুরো চৈত্র মাসব্যাপী চলা এই উৎসবে শিবভক্তরা মন্দির-সংলগ্ন ‘দুধপুকুরে’ স্নান করে গেরুয়া বা শ্বেত বস্ত্র ও উত্তরীয় পরিধান করে ব্রাহ্মণের নিকট থেকে সন্ন্যাস গ্রহণ করেন। এই সময়ে সন্ন্যাসী ভক্তরা কঠোর নিয়ম পালন করে নিত্য শিবের পূজা ও আরাধনায় মগ্ন থাকেন।পৌরাণিক বিশ্বাস অনুযায়ী, শিবভক্ত বাণরাজা যুদ্ধে গুরুতর আহত হয়ে নিজের আরোগ্য ও হারানো সম্পদ ফিরে পাওয়ার জন্য কঠোর ব্রত পালন করেন। তিনি নিজের রক্ত দিয়ে শিবের পূজা করে শিবকে তুষ্ট করেছিলেন। সেই থেকেই কঠোর নিয়ম পালন, সন্ন্যাস গ্রহণ এবং আত্মনিবেদনের প্রথার উৎপত্তি বলে মনে করা হয়।

প্রধান আচার-অনুষ্ঠান:

সন্ন্যাস গ্রহণ: ১লা চৈত্রে শিবভক্তরা মন্দিরের দুধপুকুরে স্নান করে শ্বেত বা গেরুয়া বস্ত্র পরিধান করেন। এরপর কণ্ঠে রুদ্রাক্ষের মালা ও উত্তরীয় ধারণ করে ব্রাহ্মণের নিকট সন্ন্যাস গ্রহণ করেন। এই সময়ে তারা কঠোর আচার-নিয়ম পালন করে প্রতিদিন শিবের পূজা-অর্চনা করেন এবং দিনান্তে একবার মাত্র হবিষ্য আহার গ্রহণ করেন।

নীল ষষ্ঠী:

চৈত্র সংক্রান্তির আগের দিন নীল ষষ্ঠী পালিত হয়। এই দিনে শিব ও পার্বতীর (এখানে মা পার্বতী ‘লীলাবতী’ রূপে কথিত) বিবাহোৎসব অনুষ্ঠিত হয়। একে শিব-পার্বতীর ঐশ্বরিক বিবাহ-উৎসব হিসেবে গণ্য করা হয়।

নিজস্ব চিত্র

এই সময়ে তারকেশ্বরে রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ভক্তদের ঢল নামে। ঢাক, ডুগডুগি ও “জয় বাবা তারকনাথ” ধ্বনিতে মুখরিত হয়ে ওঠে এলাকা । সাংস্কৃতিক এটি মূলত গ্রামীণ সংস্কৃতির সাথে মিশে থাকা একটি উৎসব, যা বাংলার কৃষি ও লোকজীবনের সাথে গভীরভাবে জড়িত চৈত্র সংক্রান্তির দিন সন্ন্যাসীরা ফল দান এবং অন্যান্য রীতি পালনের মাধ্যমে সন্ন্যাস ব্রত ত্যাগ করেন। এর মধ্য দিয়েই সমাপ্তি ঘটে এক মাসব্যাপী উৎসবের ।

About The Author


Discover more from Jist Feed

Subscribe to get the latest posts sent to your email.

Leave a Reply

You missed