ভিকট্রি স্ট্যান্ডে দাঁড়িয়ে ২০ জন। গলায় সোনার পদক। আর বেজে উঠল ‘জন গণ মন … ’ সুর যত এগোয়, কারও চোখের কোণ তত ভিজে ওঠে। ৪৪ বছরের অপেক্ষা যে এক মুহূর্তে শেষ হয়, সে মুহূর্তে কান্নাই তো সবচেয়ে সৎ ভাষা।
জাপানের কাকামিগাহারায় এশিয়ান গেমসের ফাইনালে বর্তমান চ্যাম্পিয়ন ও শক্তিশালী চীনকে ১-০ গোলে হারিয়ে স্বর্ণপদক জিতল ভারতীয় মহিলা হকি দল। ১৯৮২ সালের পর এই প্রথম। সঙ্গে বাড়তি পাওনা, ২০২৮ সালের লস অ্যাঞ্জেলেস অলিম্পিকের সরাসরি ছাড়পত্র।
দশম মিনিটেই লেখা হয়ে গেল ইতিহাস
শুরু থেকেই ম্যাচে ছিল আক্রমণ আর পাল্টা আক্রমণের টানটান লড়াই। খেলার ১০ মিনিটের মাথায় ভারতের তরুণ ফরোয়ার্ড লালরেমসিয়ামি অবিশ্বাস্য দক্ষতায় ফিল্ড গোল করে দলকে ১-০ এগিয়ে দেন। তাঁর ‘টোমাহক’ শটই শেষ পর্যন্ত ম্যাচের ভাগ্য ঠিক করে দেয়।পিছিয়ে পড়ে সমতা ফেরাতে মরিয়া হয়ে ওঠে চীন। শেষ কোয়ার্টারগুলোয় ভারতীয় রক্ষণে চাপ বাড়তে থাকে। ম্যাচের সবচেয়ে সংকটময় মুহূর্তে পেনাল্টি স্ট্রোক পায় চীন। গোলের সামনে দাঁড়িয়ে ছিলেন অধিনায়ক ও অভিজ্ঞ গোলরক্ষক সবিতা পুনিয়া। দুর্দান্ত দক্ষতায় সেই শট রুখে তিনি বাঁচিয়ে দেন গোটা দলের স্বপ্ন।শেষ কোয়ার্টারে গোলরক্ষককে তুলে নিয়ে ১১ জন ফিল্ড প্লেয়ার নামিয়ে সর্বস্ব বাজি রাখে চীন। কিন্তু মানসিক দৃঢ়তা আর পরিণত খেলায় প্রতিটি আক্রমণ ঠেকিয়ে দেয় ভারত। সরু ব্যবধান (১-০) আগলে রেখেই মাঠ ছাড়েন মেয়েরা।
এক নজরে ফাইনাল
| বিষয় | বিবরণ |
|---|---|
| ম্যাচ | ভারত বনাম চীন (ফাইনাল) |
| ফলাফল | ভারত ১-০ |
| ভেন্যু | কাকামিগাহারা, জাপান |
| জয়সূচক গোল | লালরেমসিয়ামি (১০ মিনিট, ফিল্ড গোল) |
| ম্যাচের নির্ণায়ক মুহূর্ত | চীনের পেনাল্টি স্ট্রোক রুখলেন সবিতা পুনিয়া |
| শেষ লগ্নের চাল | গোলরক্ষক তুলে ১১ ফিল্ড প্লেয়ার নামায় চীন |
| বড় প্রাপ্তি | ২০২৮ লস অ্যাঞ্জেলেস অলিম্পিকের সরাসরি টিকিট |
১৯৮২ থেকে ২০২৬: দুই সময়ের মধ্যে কত দূরত্ব
১৯৮২ সালে প্রথমবার এশিয়ান গেমসে সোনা জেতে ভারতের মহিলা হকি দল। কিন্তু তখন দেশে মহিলা ক্রীড়ার পরিবেশ ছিল অত্যন্ত সীমিত। সুযোগ-সুবিধা অপর্যাপ্ত, আর্থিক সহায়তা নামমাত্র, প্রচারও প্রায় ছিল না। সেই জয় তাই অনেকটাই থেকে গিয়েছিল আড়ালে। লড়াইটা ছিল প্রতিকূল সামাজিক পরিস্থিতি আর পরিকাঠামোর অভাবের সঙ্গে।
| বিষয় | ১৯৮২ | ২০২৬ |
|---|---|---|
| খেলার মাঠ | প্রথাগত ঘাসের মাঠ | আন্তর্জাতিক মানের জলভিত্তিক অ্যাস্ট্রোটার্ফ, আধুনিক ইনডোর ট্রেনিং সেন্টার |
| প্রশিক্ষণ | সীমিত সুযোগ | জিম, রিকভারি সেশন, স্পোর্টস সায়েন্স, ডেটা অ্যানালিটিক্স |
| কোচিং | সীমিত | বিদেশি কোচ ও উচ্চমানের সাপোর্ট স্টাফ |
| আর্থিক সহায়তা | ন্যূনতম | ‘খেলো ইন্ডিয়া’, ‘টপস’ (TOPS)-এর মতো সরকারি প্রকল্প |
| প্রচার ও স্বীকৃতি | প্রায় নেই | জাতীয় স্তরে ব্যাপক আগ্রহ |
| মানসিকতা | টিকে থাকার লড়াই | সম্পূর্ণ পেশাদার |
এই সোনা হঠাৎ আসেনি
১. পরিকাঠামো। ঘাস থেকে অ্যাস্ট্রোটার্ফে উত্তরণ শুধু মাঠ বদল নয়। আন্তর্জাতিক মানের সারফেসে নিয়মিত খেললে গতি, বল নিয়ন্ত্রণ আর কৌশলের সঙ্গে খাপ খাওয়ানো সহজ হয়। এতদিন এই জায়গাতেই পিছিয়ে পড়তে হত।
২. বিজ্ঞানসম্মত প্রস্তুতি। ফিটনেস, রিকভারি আর ডেটা-নির্ভর বিশ্লেষণ এখন দলের রোজকার অংশ। বিদেশি কোচ ও সাপোর্ট স্টাফের অন্তর্ভুক্তি দলের কৌশলগত মান বাড়িয়েছে। ফাইনালে চাপের মুখেও ভারতীয় রক্ষণের শৃঙ্খলা তারই প্রতিফলন।
৩. আর্থিক নিরাপত্তা ও রাজ্যের ভূমিকা। ‘খেলো ইন্ডিয়া’ ও ‘টপস’-এর মতো উদ্যোগে খেলোয়াড়দের আর্থিক দুশ্চিন্তা কমেছে। ওড়িশার মতো রাজ্য হকির হাব হিসেবে নিজেদের গড়ে তুলে আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্টের আয়োজন করছে। পরিকাঠামো উন্নয়নে এটি নতুন মাইলফলক।
৪. অভিজ্ঞতা ও তারুণ্যের মেলবন্ধন। একদিকে সবিতা পুনিয়ার মতো অভিজ্ঞ গোলরক্ষক-অধিনায়ক, অন্যদিকে লালরেমসিয়ামির মতো তরুণ ফরোয়ার্ড। ফাইনালের দুই নির্ণায়ক মুহূর্ত, গোল আর পেনাল্টি রক্ষা, এই মেলবন্ধনেরই ফসল।
সামনে লস অ্যাঞ্জেলেস
এই সোনার সুবাদে সরাসরি ২০২৮ লস অ্যাঞ্জেলেস অলিম্পিকের টিকিট পাকা করল ভারত। এশিয়ান গেমসের মঞ্চে চীনের মতো প্রতিপক্ষকে হারানোর আত্মবিশ্বাস অলিম্পিকের প্রস্তুতিতে বড় রসদ হবে।গোলের নীচে সবিতার অনড় দাঁড়িয়ে থাকা, লালরেমসিয়ামির সেই এক ঝলক, আর ভিক্টরি স্ট্যান্ডের অশ্রু, এই ছবিগুলোই মনে করিয়ে দিল, সঠিক পরিকল্পনা, উন্নত পরিকাঠামো আর মেয়েদের ওপর ভরসা রাখলে ভারত বিশ্বমঞ্চে জয় ছিনিয়ে আনতে পারে। ৪৪ বছর আগে ঘাসের মাঠে যে লড়াইয়ের শুরু, আজ জাপানের মাটিতে তার সোনালি পূর্ণতা।
About The Author
Discover more from Jist Feed
Subscribe to get the latest posts sent to your email.
