৩ জুলাই ২০২৬: বিশ্বকাপের বাইশতম দিনটি হয়ে রইল আবেগ, নাটকীয়তা আর তারার দ্যুতিতে ভরা এক সন্ধ্যা। রাউন্ড অফ ৩২-এর তিনটি ম্যাচেই একচেটিয়া আধিপত্য দেখা গেল স্পেন, পর্তুগাল ও সুইজারল্যান্ড ; তিনটি দলই জয়ের হাসি নিয়ে পা রাখল শেষ ষোলোয়। তবে পরিসংখ্যানের বাইরেও এই দিনটি মনে রাখার কারণ আরও গভীর, লুকা মদরিচের সম্ভাব্য শেষ বিশ্বকাপ ম্যাচ, ক্রিস্টিয়ানো রোনাল্ডোর নকআউট পর্বে প্রথম গোলের রেকর্ড, আর তরুণ প্রতিভাদের রাজত্ব বিস্তার।
দিন ২২-এর ফলাফল এক নজরে
| ম্যাচ | চূড়ান্ত স্কোর | গোলদাতা | পরবর্তী রাউন্ডে |
|---|---|---|---|
| স্পেন বনাম অস্ট্রিয়া | ৩–০ | মিকেল ওইয়ারসাবাল (৩৬’, ৮৯’), পেদ্রো পোর্রো (৬৬’) | স্পেন |
| পর্তুগাল বনাম ক্রোয়েশিয়া | ২–১ | ইভান পেরিসিচ (৫৩’), রোনাল্ডো (৬৮’ পেনাল্টি), গনসালো রামোস (৯০+৪’) | পর্তুগাল |
| সুইজারল্যান্ড বনাম আলজেরিয়া | ২–০ | ব্রিল এমবোলো (১০’), দান এনদোয়ে (৪৬’) | সুইজারল্যান্ড |
স্পেন ৩–০ অস্ট্রিয়া: শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত দাপট
লস অ্যাঞ্জেলেসের গ্যালারিতে প্রথম বাঁশি থেকেই বোঝা গিয়েছিল, অস্ট্রিয়ার জন্য রাতটা কঠিন হতে চলেছে। খেলার ৩৬ মিনিটে বাঁ-দিক থেকে মার্ক কুকুরেয়ার নিখুঁত নিচু ক্রস খুঁজে নেয় মিকেল ওইয়ারসাবালকে, যিনি ঠান্ডা মাথায় বল জালে জড়িয়ে দেন।
দ্বিতীয়ার্ধে ব্যবধান বাড়ান রাইট-ব্যাক পেদ্রো পোর্রো আলেক্স বেনার ক্রস থেকে মাঝমাঠ চিরে উঠে আসা এক দৌড়ে বল জালে পাঠান তিনি। ম্যাচের একেবারে শেষদিকে ফের একবার নিজের জাদু দেখান কুকুরেয়া, যার অ্যাসিস্ট থেকে নিজের দ্বিতীয় গোলটি করেন ওইয়ারসাবাল।
সারা সন্ধ্যা জুড়ে ডান প্রান্তে তাণ্ডব চালিয়ে গেছেন তরুণ বিস্ময় লামিনে ইয়ামাল, যাঁর উপস্থিতিই যেন প্রমাণ করে দিচ্ছিল কেন স্পেনকে ধরা হচ্ছে এবারের শিরোপার অন্যতম বড় দাবিদার।
ফুটবল বিশ্লেষকরা লুইস দে লা ফুয়েন্তের রণকৌশলের ভূয়সী প্রশংসা করেছেন। তাঁদের মতে, স্পেনের নমনীয় ৪-১-২-৩ ফরমেশন মধ্যমাঠে জায়গা দখল করে রেখে ফুলব্যাকদের উইং দখলের স্বাধীনতা দিয়েছিল। কুকুরেয়া ও ইয়ামালকে একসঙ্গে সামলাতে গিয়ে অস্ট্রিয়ার রক্ষণ পুরোপুরি ভেঙে পড়েছিল বলে মত বিশেষজ্ঞদের। উল্টোদিকে, রালফ রাংনিকের রক্ষণাত্মক কৌশল যথেষ্ট গোছানো হলেও আক্রমণে ফেরার পথ খুঁজে পায়নি অস্ট্রিয়া পুরো ম্যাচে তারা একটিও লক্ষ্যে শট নিতে পারেনি।
পর্তুগাল ২–১ ক্রোয়েশিয়া: মদরিচের বিদায়ে রোনাল্ডোর ইতিহাস
টরন্টোয় হওয়া এই ম্যাচটি ছিল রাতের সবচেয়ে হৃদয়স্পর্শী লড়াই। প্রথমার্ধ ছিল সতর্ক ও সংযত, কিন্তু ৫৩ মিনিটে দুর্দান্ত এক কাটব্যাক রানে ক্রোয়েশিয়াকে এগিয়ে দেন অভিজ্ঞ ইভান পেরিসিচ।
তবে ৬৮ মিনিটে বক্সের মধ্যে রেনাতো ভেইগাকে ফাউল করা হলে পেনাল্টি পায় পর্তুগাল। স্পট-কিক থেকে গোল করেন ক্রিস্টিয়ানো রোনাল্ডো যা তাঁর ক্যারিয়ারের প্রথম বিশ্বকাপ নকআউট-পর্বের গোল হিসেবে লেখা থাকবে ইতিহাসে।
রক্ষণ সামলাতে খেলার শেষদিকে তুলে নেওয়া হয় রোনাল্ডোকে। যোগ করা সময়ের ৯০+৪ মিনিটে রাফায়েল লেয়াওয়ের ক্রস থেকে দুর্দান্ত হেডে জয়সূচক গোলটি করেন গনসালো রামোস, যা রীতিমতো বিস্ফোরণ ঘটায় পর্তুগিজ শিবিরে। এরপর ১০০ মিনিটে জোশকো গাভারদিওলের একটি সমতাসূচক গোল VAR-এ অফসাইডের কারণে বাতিল হলে নিশ্চিত হয় পর্তুগালের জয়—আর এর মধ্য দিয়েই সম্ভবত শেষ হয়ে গেল লুকা মদরিচের কিংবদন্তি বিশ্বকাপ যাত্রা।
পণ্ডিতরা এই ম্যাচকে বর্ণনা করেছেন “ধৈর্যশীল চাপ বনাম সুযোগসন্ধানী ফিনিশিং”-এর লড়াই হিসেবে। বল দখলে ৬২ শতাংশ এগিয়ে থাকলেও রবার্তো মার্তিনেজের দল প্রথমার্ধে বল সঞ্চালনে গতি না আনায় সমালোচিত হয়েছিল। ৬২ মিনিটে চার জন খেলোয়াড় বদলে খেলার মোড় ঘুরিয়ে দেন মার্তিনেজ গনসালো রামোসের আগমন আক্রমণে নতুন গতি আনে। ক্রোয়েশিয়া লক্ষ্যে বেশি শট নিলেও (৭-৩), পর্তুগালের বারবার প্রতিপক্ষের অন্তিম তৃতীয়াংশে প্রবেশ (৯০ বনাম ২৩) শেষ পর্যন্ত ম্যাচের ফল নির্ধারণ করে দেয়।
সুইজারল্যান্ড ২–০ আলজেরিয়া: ইতিহাস গড়া হার-না-মানা রাত
ভ্যাঙ্কুভারে আলজেরিয়াকে কার্যত নিয়ন্ত্রণে রেখে ম্যাচ জেতে সুইজারল্যান্ড, যার ফলে বিশ্বকাপে প্রথমবারের মতো টানা তিনটি ম্যাচ জেতার কীর্তি গড়ল তারা।
মাত্র ১০ মিনিটেই এগিয়ে যায় সুইসরা ২০ বছর বয়সী উদীয়মান তারকা ইয়োহান মানজাম্বির বাঁ-প্রান্ত ধরে করা দুর্দান্ত দৌড় থেকে আসা ক্রসে গোল করেন ব্রিল এমবোলো। দ্বিতীয়ার্ধ শুরুর মাত্র ৪৭ সেকেন্ডের মাথায় আলজেরিয়ার ব্যর্থ ক্লিয়ারেন্স থেকে বল পেয়ে ব্যবধান দ্বিগুণ করেন দান এনদোয়ে। মাঝমাঠে গ্রানিত জাকা ও রেমো ফ্রয়লারের অভিজ্ঞতা পুরো ম্যাচে রিয়াদ মাহরেজদের কোনো সুযোগই দেয়নি ফিরে আসার।
এই ম্যাচ মাঠের দখল ও এলাকা নিয়ন্ত্রণে (৫৫.৪%) এগিয়ে থাকলেও আলজেরিয়া ফিনিশিংয়ে ছিল একেবারে ভোঁতা। মুরাত ইয়াকিনের নির্দেশে সুইজারল্যান্ড মাঝমাঠে অহেতুক বল দখলের লড়াই এড়িয়ে গিয়ে হাফ-স্পেস আটকে রাখার কৌশল নেয়, যার ফলে বিরতি পর্যন্ত তারা এগিয়ে ছিল । আলজেরিয়া প্রায় ১০০টি বেশি নির্ভুল পাস দিলেও বক্সের ভেতরে বল ক্লিয়ার করতে ব্যর্থতাই এনদোয়ের ৪৬ মিনিটের গোলের সরাসরি কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
দিন ২২-এর বিস্তারিত পরিসংখ্যান
| পরিসংখ্যান | স্পেন | অস্ট্রিয়া | পর্তুগাল | ক্রোয়েশিয়া | সুইজারল্যান্ড | আলজেরিয়া |
|---|---|---|---|---|---|---|
| চূড়ান্ত স্কোর | ৩ | ০ | ২ | ১ | ২ | ০ |
| বল দখল (%) | ৬৫% | ৩৫% | ৬২% | ৩৮% | ৪৪.৬% | ৫৫.৪% |
| মোট শট | ২২ | ৫ | ১৫ | ১৩ | ১ | ১৮ |
| লক্ষ্যে শট | ১০ | ০ | ৩ | ৭ | ২ | ২ |
| এক্সপেক্টেড গোল (xG) | ২.৩৮ | ১.১৯ | ২.১৮ | ১.৩৪ | ১.৫৫ | ০.৮২ |
| মোট পাস | ৬১১ | ৩২৯ | ৫৪২ | ৩৮৪ | ৩৬৫ | ৪৪৫ |
| পাস সাফল্যের হার | ৯১% | ৮৩% | ৯২% | ৮৫% | ৮১% | ৮৫% |
| কর্নার | ৯ | ০ | ৯ | ৫ | ৪ | ২ |
| ফাউল | ৮ | ১৫ | ৬ | ১১ | ১২ | ১৪ |
| হলুদ কার্ড | ০ | ১ | ১ | ২ | ১ | ২ |
তিনটি দলই এখন তাকিয়ে আছে শেষ ষোলোর দিকে। স্পেনের প্রতিপক্ষ হবে পর্তুগাল বা ক্রোয়েশিয়া-জয়ী দল, আর সুইজারল্যান্ড মুখোমুখি হবে সুইজারল্যান্ড/আলজেরিয়া বনাম কলম্বিয়া/ঘানা লড়াইয়ের বিজয়ীর। বিশ্বকাপের নাটক যেন প্রতিদিনই নতুন উচ্চতায় পৌঁছাচ্ছে আর দিন ২২ তার এক উজ্জ্বল উদাহরণ হয়ে রইল।
About The Author
Discover more from Jist Feed
Subscribe to get the latest posts sent to your email.
