Site icon Jist Feed

আটলান্টায় মেসি-ঝড়, দুই গোলে পিছিয়ে থেকেও শেষ পনেরো মিনিটে অবিশ্বাস্য প্রত্যাবর্তন আর্জেন্টিনার

Argentina_Egypt

বিশ্বকাপ ২০২৬ শেষ ষোলো: আর্জেন্টিনা ৩ – ২ মিশর, নির্ধারিত সময়ের পরেও রুদ্ধশ্বাস নাটক

আটলান্টা, ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬: ফুটবল মাঝেমধ্যে এমন একটা রাত উপহার দেয়, যা বছরের পর বছর ধরে আলোচনার টেবিলে ফিরে আসে। শেষ ষোলোর লড়াইয়ে বৃহস্পতিবার রাতে আটলান্টার গ্যালারি ঠিক সেই রাতেরই সাক্ষী থাকল। বিশ্বজয়ী আর্জেন্টিনাকে প্রায় হারের মুখে ঠেলে দিয়েছিল মিশর। তারপর যা ঘটল, তাকে ফুটবল-বিশ্লেষকরা বলছেন এই বিশ্বকাপের অন্যতম সেরা নাটকীয় সমাপ্তি।

খেলার প্রথমার্ধ ছিল সম্পূর্ণভাবে মিশরের। শুরুর মিনিটেই ইয়াসের ইব্রাহিমের হেডে এগিয়ে যায় উত্তর আফ্রিকার দলটি। লিওনেল স্কালোনির রক্ষণ তখন থেকেই নড়বড়ে দেখাচ্ছিল। বিরতির পর সেই ছবিটা আরও স্পষ্ট হয় মিশরের দ্রুতগতির পাল্টা আক্রমণে দ্বিতীয় গোল তুলে নেন মোস্তফা জিকো, যিনি গ্রুপ পর্বে নিউজিল্যান্ডের বিরুদ্ধেও জাল কাঁপিয়েছিলেন। দুই গোলে পিছিয়ে পড়ে আর্জেন্টিনার বিশ্বকাপ-স্বপ্ন তখন সত্যিই বিপন্ন।

কিন্তু লিয়োনেল মেসি নামের অধ্যায়টা এত সহজে শেষ হওয়ার নয়। পেনাল্টি নষ্ট হওয়া সত্ত্বেও মিশরের গোলরক্ষক মোস্তফা শোবেইরের অসাধারণ দক্ষতায় সেই স্পট-কিক রুখে যায় মেসি হাল ছাড়েননি। ম্যাচের শেষ পনেরো মিনিটে যা ঘটল, তা রীতিমতো চিত্রনাট্যের মতো। প্রথমে ক্রিশ্চিয়ান রোমেরোর হেডে ব্যবধান কমায় আর্জেন্টিনা। এর কিছুক্ষণ পরেই বক্সের মধ্যে নিখুঁত ফিনিশিংয়ে সমতা ফেরান খোদ মেসি। আর যোগ করা সময়ে এনজো ফের্নান্দেজের হেডেই আসে ম্যাচের নিষ্পত্তিসূচক গোল। মাঠ জুড়ে তখন নীল-সাদা উচ্ছ্বাস, আর মিশরের চোখে-মুখে বিশ্বাস করতে না পারা এক নীরবতা।

এই জয়ে মেসি ছুঁয়ে ফেললেন নকআউট পর্বে দিয়েগো মারাদোনার সমান সংখ্যক ম্যাচ খেলার নজির। তবে পরিসংখ্যানের চেয়েও এই ম্যাচ মনে রাখার কারণ অন্য প্রায় হেরে বসা একটা দল কীভাবে চরিত্রের জোরে ম্যাচ ছিনিয়ে নিতে পারে, তার এক জ্বলন্ত উদাহরণ হয়ে থাকল আটলান্টার এই রাত।

ম্যাচের অঙ্ক: পরিসংখ্যানে আর্জেন্টিনা বনাম মিশর

পরিসংখ্যানআর্জেন্টিনা 🇦🇷মিশর 🇪🇬
চূড়ান্ত স্কোর
এক্সপেক্টেড গোল (xG)২.৮৪০.৮৯
বল দখল (%)৬৪%৩৬%
মোট শট (নিশানায়)১৭ (৭)৪ (২)
বড় সুযোগ তৈরি / নষ্ট৫ / ৪২ / ০
পাস সাফল্যের হার৯০% (৫৪১টি নিখুঁত পাস)৮২% (২৮৭টি নিখুঁত পাস)

সংখ্যাগুলো স্পষ্ট করে দিচ্ছে, ম্যাচের রাশ পুরোটা সময় ছিল আর্জেন্টিনার হাতেই। কিন্তু ফুটবলে সব সময় সংখ্যাই শেষ কথা বলে না মিশরের সংগঠিত রক্ষণ আর পাল্টা আক্রমণের তীক্ষ্ণতা প্রায় ৭০ মিনিট ধরে সেই পরিসংখ্যানকে অর্থহীন করে রেখেছিল।

আর্জেন্টিনার রক্ষণভাগের প্রাথমিক দুর্বলতা নিয়ে ধারাভাষ্যকার ও বিশ্লেষকদের একাংশের স্পষ্ট মত, স্কালোনির উঁচু রক্ষণরেখা শুরুর ৭০ মিনিটে কার্যত ভেঙে পড়েছিল এবং মিশরের পাল্টা আক্রমণগুলো ছিল নিখুঁত পরিকল্পিত, যার সরাসরি শিকার হন ক্রিশ্চিয়ান রোমেরো ও লিসান্দ্রো মার্তিনেসের মতো ডিফেন্ডাররা।

মেসির পেনাল্টি মিস প্রসঙ্গে একটি ব্রিটিশ ফুটবল প্যানেলের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, গড়পড়তা কোনও দলের মানসিকতা এমন ধাক্কায় ভেঙে পড়তে পারত, কিন্তু আর্জেন্টিনার আত্মবিশ্বাস তার চেয়ে অনেক বেশি দৃঢ়। শেষ পনেরো মিনিটে তিন গোল সেই সৃজনশীল চাপেরই ফসল বলে মত তাঁদের।

এই বিশ্বকাপে মিশরের মতো তুলনামূলক ছোট ফুটবল-শক্তির এমন লড়াকু পারফরম্যান্স আবারও প্রমাণ করছে, বিশ্ব ফুটবলে ব্যবধান কমছে ধীরে ধীরে। সংগঠিত রক্ষণ, দ্রুত পাল্টা আক্রমণ আর সীমিত সম্পদের মধ্যেও সাহসী পরিকল্পনা এই তিনটি উপাদান দিয়ে মিশর প্রায় বিশ্বজয়ীদের হারিয়েই দিচ্ছিল। ভারতীয় ফুটবলের প্রেক্ষাপটে এই ম্যাচ থেকে শেখার আছে অনেক কিছু বড় বাজেট বা তারকা-নির্ভরতা ছাড়াও শৃঙ্খলাবদ্ধ কাঠামো আর মানসিক দৃঢ়তা দিয়ে বিশ্বমঞ্চে কীভাবে লড়াই করা যায়, মিশরের এই পারফরম্যান্স তারই একটা পাঠ হয়ে থাকল।

Exit mobile version