Amit Shah
কলকাতা: নবনির্বাচিত বিজেপি বিধায়ক দল বৈঠকে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী Amit Shah বাংলার রাজনৈতিক পরিবর্তনকে “ঐতিহাসিক অধ্যায়” বলে উল্লেখ করে দলীয় কর্মী, ভোটার এবং সাধারণ মানুষকে ধন্যবাদ জানান। দীর্ঘ বক্তৃতায় তিনি বাংলার রাজনৈতিক পরিস্থিতি, নির্বাচন প্রক্রিয়া, আইন-শৃঙ্খলা, অনুপ্রবেশ, উন্নয়ন এবং সাংস্কৃতিক পুনর্জাগরণের মতো একাধিক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় তুলে ধরেন। একইসঙ্গে তিনি দাবি করেন, বাংলার মানুষ “ভয় ও হিংসার রাজনীতি” থেকে বেরিয়ে এসে বিজেপির উপর আস্থা রেখেছেন।
সভায় বক্তব্য রাখতে গিয়ে অমিত শাহ বলেন, কমিউনিস্ট আমল থেকেই বাংলায় ভয়ের পরিবেশ তৈরি হয়েছিল এবং পরে তা আরও গভীর হয়েছে। তাঁর অভিযোগ, এমন পরিস্থিতি তৈরি করা হয়েছিল যেখানে সাধারণ মানুষের পক্ষে স্বাধীনভাবে ভোট দেওয়া কঠিন হয়ে পড়েছিল। তবুও কঠিন রাজনৈতিক বাস্তবতার মধ্যেও বাংলার মানুষ বিজেপি এবং প্রধানমন্ত্রী Narendra Modi-র নেতৃত্বের উপর ভরসা রেখে বিপুল সমর্থন দিয়েছেন বলে তিনি দাবি করেন।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বিখ্যাত লাইন “চিত্ত যেথা ভয়শূন্য, উচ্চ যেথা শির” উদ্ধৃত করে শাহ বলেন, বাংলায় এখন ভয়মুক্ত সমাজ গঠনের নতুন পথ খুলে গিয়েছে। তাঁর মতে, ধর্ম, সংকীর্ণতা এবং বিভেদের ঊর্ধ্বে উঠে সাংবিধানিক মূল্যবোধের ভিত্তিতে নতুন বাংলা গড়ে তোলাই এখন প্রধান লক্ষ্য হওয়া উচিত।
“পাঁচ দশক ধরে বাংলা পিছিয়ে পড়েছে”
অমিত শাহ তাঁর বক্তব্যে দাবি করেন, গত কয়েক দশকে গণতন্ত্র, আইন-শৃঙ্খলা এবং উন্নয়নের ক্ষেত্রে বাংলা পিছিয়ে পড়েছে। শিল্প, কর্মসংস্থান ও প্রশাসনিক স্বচ্ছতার অভাবের কথাও তিনি উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, এখন বিজেপির দায়িত্ব হল নির্বাচনের সময় দেওয়া প্রতিশ্রুতিগুলি বাস্তবায়ন করা এবং বাংলাকে উন্নয়নের মূল স্রোতে ফিরিয়ে আনা।
একইসঙ্গে তিনি বাংলার সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের প্রসঙ্গ টেনে বলেন, বাংলাকে আবার Ramakrishna Paramahamsa, Swami Vivekananda এবং Rabindranath Tagore-এর আদর্শের বাংলা হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। বিদেশি চিন্তাধারার প্রভাব থেকে বাংলার সংস্কৃতিকে মুক্ত করার কথাও তিনি বলেন।
বিজেপির রাজনৈতিক উত্থানের খতিয়ান
বক্তৃতায় বিজেপির বাংলায় ক্রমবর্ধমান শক্তির কথাও তুলে ধরেন শাহ। তিনি বলেন, একসময় বাংলায় বিজেপির একটি আসনও ছিল না। পরে ধীরে ধীরে সংগঠন বিস্তার ঘটেছে। তাঁর দাবি অনুযায়ী, ২০১৬ সালে বিজেপি ৩টি আসন পেয়েছিল, ২০২১ সালে ৭৭টি এবং ২০২৬ সালে ২০০-র বেশি আসন নিয়ে দল উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করেছে।
এই রাজনৈতিক উত্থানের পেছনে দলীয় কর্মীদের আত্মত্যাগের কথা উল্লেখ করে তিনি জানান, ৩২১ জন বিজেপি কর্মী রাজনৈতিক হিংসার শিকার হয়ে প্রাণ হারিয়েছেন। বিশেষ করে বাংলা এবং কেরলের রাজনৈতিক পরিস্থিতির সমালোচনা করে তিনি বলেন, দেশের অন্য কোথাও এত বড় মাত্রায় রাজনৈতিক হিংসা দেখা যায়নি। নিহত কর্মীদের পরিবারের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে তিনি বলেন, তাঁদের আত্মত্যাগ বিজেপিকে আরও শক্তিশালী করেছে।
নির্বাচন কমিশনের ভূমিকায় প্রশংসা
নির্বাচন প্রক্রিয়া নিয়েও গুরুত্বপূর্ণ মন্তব্য করেন অমিত শাহ। তিনি বলেন, অতীতে বাংলার নির্বাচন নিয়ে নানা অভিযোগ উঠলেও এবার ৯৩ শতাংশ ভোট পড়েছে এবং বড় ধরনের হিংসা বা বুথ দখলের অভিযোগ সামনে আসেনি। তাঁর দাবি, দুই দফার নির্বাচন প্রাণহানিহীনভাবে সম্পন্ন হয়েছে, যা বাংলার গণতান্ত্রিক ইতিহাসে বড় উদাহরণ।
এ জন্য তিনি নির্বাচন কমিশন, নিরাপত্তা বাহিনী, প্রশাসনিক কর্মী এবং রাজ্য পুলিশের ভূয়সী প্রশংসা করেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, এই নির্বাচন গোটা বিশ্বের সামনে গণতন্ত্রের ইতিবাচক উদাহরণ হিসেবে উঠে এসেছে।
বিভিন্ন জেলার ফলাফল তুলে ধরলেন শাহ
বিজেপির সাংগঠনিক সাফল্যের উদাহরণ হিসেবে তিনি বিভিন্ন জেলার ফলাফল তুলে ধরেন। তাঁর দাবি, ২৩টির মধ্যে ২০টি জেলায় বিজেপি প্রথম স্থানে রয়েছে। পূর্ব মেদিনীপুর, ঝাড়গ্রাম, পুরুলিয়া, বাঁকুড়া, দার্জিলিং, কালিম্পং, জলপাইগুড়ি এবং আলিপুরদুয়ারে দলের সাফল্যের কথা উল্লেখ করেন তিনি।
বিশেষভাবে ভবানীপুর ও নন্দীগ্রামের প্রসঙ্গও তোলেন শাহ। তিনি বলেন, Suvendu Adhikari নন্দীগ্রামে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে হারানোর পর এবার তাঁর নিজস্ব রাজনৈতিক এলাকাতেও বিজেপির জয় তাৎপর্যপূর্ণ। ভবানীপুরের ফলাফলকে তিনি “জাতীয় নিরাপত্তা এবং রাজনৈতিক পরিবর্তনের প্রতীক” বলেও উল্লেখ করেন।
অনুপ্রবেশ ও জাতীয় নিরাপত্তা প্রসঙ্গ
ভাষণের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল অনুপ্রবেশ ইস্যু। শাহ বলেন, বিজেপির লক্ষ্য শুধু বাংলায় নয়, গোটা দেশ থেকে অবৈধ অনুপ্রবেশকারীদের শনাক্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া। তিনি দাবি করেন, এটি কোনও বিভাজনের রাজনীতি নয়, বরং দেশের নিরাপত্তার প্রশ্ন।
একইসঙ্গে তিনি নারী নিরাপত্তা, দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসন এবং স্বচ্ছ নির্বাচনী পরিবেশ তৈরির প্রতিশ্রুতিও পুনর্ব্যক্ত করেন। তাঁর মতে, “ডাবল ইঞ্জিন সরকার” বাংলাকে দ্রুত উন্নয়নের পথে এগিয়ে নিয়ে যেতে সক্ষম হবে।
‘সোনার বাংলা’ গড়ার ডাক
অমিত শাহ তাঁর বক্তৃতার শেষাংশে বলেন, “অনুপ্রবেশমুক্ত বাংলা, নিরাপদ নারী ও নিরাপদ নাগরিক—এই লক্ষ্য নিয়েই বিজেপি এগোতে চায়।” তিনি দাবি করেন, এখন “নিচেও পদ্ম, উপরেও পদ্ম”, ফলে উন্নয়নের গতি আর কেউ থামাতে পারবে না।
তিনি আরও বলেন, একসময় বলা হত “বাংলা আজ যা ভাবে, ভারত কাল তা ভাবে।” সেই ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনাই এখন নতুন সরকারের দায়িত্ব। শিল্প, সাহিত্য, সংস্কৃতি ও শিক্ষাক্ষেত্রে বাংলাকে আবার দেশের নেতৃত্বের জায়গায় ফিরিয়ে আনার কথাও তিনি বলেন। থিয়েটার শিল্পের উন্নয়নের জন্য বাংলায় বিশেষ প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান তৈরির পরিকল্পনার কথাও উল্লেখ করেন।
শেষে তিনি বাংলার মানুষ, বিজেপির কর্মী-সমর্থক এবং নবনির্বাচিত বিধায়কদের অভিনন্দন জানিয়ে বলেন, দল ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করে বাংলায় “সুশাসন প্রতিষ্ঠা” করবে।
About The Author
Discover more from Jist Feed
Subscribe to get the latest posts sent to your email.
