Tibet Flood

আন্তর্জাতিক ডেস্ক: নেপাল সীমান্ত ঘেঁষা হিমালয়ের বুকে ভয়াবহ হড়পা বানে মৃত্যুর প্রকৃত সংখ্যা নিয়ে প্রকাশ্যে সংঘাতে জড়াল চিন সরকার ও নির্বাসিত তিব্বতি সংগঠনগুলি। তথ্য প্রকাশে নিজেদের সম্পূর্ণ স্বচ্ছ বলে দাবি করেছে বেজিং। ঠিক উল্টো দাবি ভারতের ধর্মশালা-ভিত্তিক তিব্বতি সংগঠনগুলির।গত ২৬ অগস্ট নেপাল-তিব্বত সীমান্তে হিমালয়ের উঁচু এলাকায় একটি বিশাল হিমবাহ ধসে পড়ার জেরে আকস্মিক ও ভয়াবহ বন্যা দেখা দেয়। তার জেরে দুই দেশ মিলিয়ে মৃতের সংখ্যা ইতিমধ্যেই হাজার ছাড়িয়েছে, এবং কয়েক হাজার মানুষ এখনও নিখোঁজ। কিন্তু চিন-নিয়ন্ত্রিত তিব্বত অংশে প্রকৃত ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নিয়েই যাবতীয় বিতর্ক। ফরাসি সংবাদমাধ্যম ফ্রান্স ২৪ এবং সংবাদ সংস্থা এএফপি-র প্রতিবেদন অনুযায়ী, নির্বাসিত তিব্বতি সংগঠনগুলির দাবি, বেজিংয়ের ঘোষিত মৃতের সংখ্যা প্রকৃত ক্ষয়ক্ষতির তুলনায় অনেকটাই কম করে দেখানো হচ্ছে, যে অভিযোগ চিনের পররাষ্ট্র মন্ত্রক সরাসরি খারিজ করেছে।

২৬ অগস্টের বিপর্যয়

বিশেষজ্ঞদের প্রাথমিক পর্যবেক্ষণ বলছে, হিমালয়ের উঁচু এলাকায় একটি হিমবাহ ভেঙে পড়ার জেরেই নেপালের রাসুয়া জেলা এবং তিব্বতের কিইরং (Gyirong) সীমান্ত-বন্দর এলাকায় আকস্মিক বন্যা দেখা দেয়। ত্রিশূলী ও ভোটেকোশী নদী উপত্যকা জুড়ে বহু গ্রাম, সেতু এবং জলবিদ্যুৎ প্রকল্প ভেসে যায়। সীমান্তের অভিবাসন ভবন জলের তোড়ে তলিয়ে যাওয়ার দৃশ্য সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে বিশ্বজুড়ে চাঞ্চল্য তৈরি করে। নেপালেই এখনও পর্যন্ত সবচেয়ে বেশি প্রাণহানি হয়েছে। দেশটির বিপর্যয় মোকাবিলা কর্তৃপক্ষের হিসাবে, ১ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত মৃতের সংখ্যা ৯৮৭, নিখোঁজ ৩,৯১৬। নিখোঁজদের মধ্যে ৩০টিরও বেশি দেশের নাগরিক রয়েছেন, যাঁদের একটি বড় অংশ ভারতীয়, যা এই ঘটনাকে ভারতীয় পাঠকদের কাছে বিশেষ ভাবে তাৎপর্যপূর্ণ করে তুলেছে। কৈলাস মানসরোবর যাত্রায় যাওয়া বেশ কয়েকজন ভারতীয় তীর্থযাত্রীও দুর্ঘটনার সময়ে সীমান্ত এলাকায় উপস্থিত ছিলেন বলে জানা গিয়েছে।

বেজিংয়ের দাবি:

চিন সরকারের ঘোষণা অনুযায়ী, তিব্বতের কিইরং কাউন্টিতে মৃতের সংখ্যা ১৬ এবং নিখোঁজ ৫৪৬ (পরবর্তী কিছু রিপোর্টে যা ৫৫৮ পর্যন্ত বলা হয়েছে)। সরকারি সংবাদ সংস্থা সিনহুয়ার তথ্য অনুযায়ী, নিখোঁজদের মধ্যে ২৩টি দেশের ২৬১ জন বিদেশি নাগরিক রয়েছেন, সবচেয়ে বেশি নেপালি ও ভারতীয়, তার পরে লাতভিয়া, আমেরিকা ও ব্রিটেনের নাগরিকেরা। চিনের পররাষ্ট্র মন্ত্রকের মুখপাত্র গুও চিয়াকুন সাংবাদিক বৈঠকে দাবি করেন, দুর্যোগের তথ্য প্রকাশে বেজিং সম্পূর্ণ স্বচ্ছ ও সময়োপযোগী পদক্ষেপ নিয়েছে। মৃতের সংখ্যা গোপন করার অভিযোগকে তিনি নির্বাসিত তিব্বতি সংগঠনগুলির “ইচ্ছাকৃত কুৎসা ও চটকদার অপপ্রচার” বলে অভিহিত করেন। এর কিছুদিন পরে চিনের সাইবার নিরাপত্তা দফতর মৃত ও নিখোঁজের সংখ্যা নিয়ে অতিরঞ্জিত তথ্য ছড়ানোর অভিযোগে অন্তত ১০ জনের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেয় বলে জানা গিয়েছে। দুর্যোগস্থল সরেজমিনে পরিদর্শন করেন চিনের প্রধানমন্ত্রী লি ছিয়াং। নিখোঁজদের খোঁজে বিদেশি সরকারগুলির সঙ্গে সমন্বয় আরও বাড়ানোর নির্দেশও দেন তিনি।

নির্বাসিত তিব্বতিদের দাবি

ভারতের ধর্মশালায় অবস্থিত নির্বাসিত তিব্বতি বেতার-কেন্দ্র জানিয়েছে, তাদের নিজস্ব সূত্রে অন্তত ২৫ জন তিব্বতির মৃত্যুর খবর মিলেছে, যাঁদের মধ্যে ১৫ জন সীমান্ত এলাকার বাসিন্দা এবং বাকি ১০ জন ব্যবসা বা কাজের সূত্রে সেখানে গিয়েছিলেন। চিনের ঘোষিত ১৬-র তুলনায় এই সংখ্যা বেশি হলেও, নির্বাসিত সংগঠনগুলির দাবি, প্রকৃত সংখ্যা আরও অনেক বেশি হতে পারে। আন্তর্জাতিক তিব্বত নেটওয়ার্ক-সহ একাধিক মানবাধিকার সংগঠনের যৌথ বিবৃতিতে দাবি করা হয়েছে, কিইরং এলাকার অন্তত চার থেকে পাঁচটি গ্রাম সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, যেখানে তিনশোরও বেশি বাড়ি সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে গিয়েছে এবং বহু বাসিন্দার এখনও কোনও হদিশ নেই। সংগঠনগুলির অভিযোগ, নেপাল অংশে যেভাবে স্বাধীন সংবাদমাধ্যম কাজ করতে পারছে, তিব্বতের অংশে তা সম্ভব নয়, ফলে ক্ষয়ক্ষতির প্রকৃত মাত্রা স্বাধীনভাবে যাচাই করা কার্যত অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে। তারা আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম ও ত্রাণ সংস্থাগুলিকে কিইরং এলাকায় অবাধ প্রবেশাধিকার দেওয়ার দাবি জানিয়েছে। আন্তর্জাতিক তিব্বত নেটওয়ার্কের গবেষক লবসাং ইয়াংৎসোর বক্তব্য, বিশ্ব উষ্ণায়নে তিব্বতি ও নেপালিদের অবদান তুলনায় অনেক কম হলেও, জলবায়ু পরিবর্তনজনিত বিপর্যয়ের প্রকোপ তাঁদেরই সবচেয়ে বেশি ভোগ করতে হচ্ছে।

এক নজরে পরিসংখ্যান

তথ্যসূত্রতিব্বত অংশে মৃততিব্বত অংশে নিখোঁজনেপালে মৃতনেপালে নিখোঁজ
চিন সরকার (সরকারি ঘোষণা/সিনহুয়া)১৬৫৪৬ (কোথাও ৫৫৮)
নির্বাসিত তিব্বতি বেতার ও মানবাধিকার সংগঠনকমপক্ষে ২৫নির্দিষ্ট নয়, “আরও অনেক বেশি” বলে দাবি
নেপাল সরকারি দুর্যোগ কর্তৃপক্ষ৯৮৭ (ক্রমবর্ধমান)৩,৯১৬

তথ্য হালনাগাদ: ১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ পর্যন্ত এএফপি ও অন্যান্য সংবাদমাধ্যমের রিপোর্ট অনুযায়ী। উদ্ধারকাজ চলায় সংখ্যা বদলাতে পারে।

বারবার একই বিতর্ক কেন ?

তিব্বতে প্রাকৃতিক দুর্যোগের পরে মৃতের সংখ্যা নিয়ে বেজিং ও নির্বাসিত তিব্বতিদের মধ্যে সংঘাত নতুন কিছু নয়। ২০২৫-এর জানুয়ারিতে তিব্বতের দিংরি এলাকায় ভূমিকম্পের পরেও একই ছবি দেখা গিয়েছিল। চিনের সরকারি হিসাবে তখন মৃতের সংখ্যা ছিল ১২৬। রেডিও ফ্রি এশিয়ার সূত্র এবং ধর্মশালার কেন্দ্রীয় তিব্বত প্রশাসন সে সময়েই দাবি করেছিল, প্রকৃত সংখ্যা ২০০ ছাড়িয়ে যেতে পারে।

এই বারবার ফিরে আসা বিতর্কের পিছনে মূলত দু’টি কাঠামোগত কারণ কাজ করে। প্রথমত, তিব্বতে বিদেশি সাংবাদিক ও স্বতন্ত্র পর্যবেক্ষকদের প্রবেশাধিকার দীর্ঘদিন ধরেই সীমিত, ফলে সরকারি সূত্র ছাড়া তথ্য যাচাইয়ের বিকল্প পথ প্রায় থাকে না। দ্বিতীয়ত, নির্বাসিত তিব্বতি সমাজের নিজস্ব পারিবারিক ও সামাজিক যোগাযোগ-নেটওয়ার্ক থাকায় তারা প্রায়ই এমন তথ্য পায়, যা সরকারি ঘোষণায় থাকে না বা অনেক দেরিতে আসে।

প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, তিব্বতে চিনের বিশাল জলবিদ্যুৎ পরিকাঠামো নির্মাণ নিয়ে, বিশেষত ব্রহ্মপুত্র নদীর উপরে নির্মীয়মাণ প্রায় ১৬৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের বিশ্বের বৃহত্তম জলবিদ্যুৎ প্রকল্প নিয়ে, আন্তর্জাতিক মহলে আগে থেকেই উদ্বেগ ছিল। এই বন্যার সঙ্গে জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের কোনও সম্পর্ক আছে কি না, সমালোচকদের একাংশ সে প্রশ্নও তুলেছিলেন। যদিও বেজিংয়ের দাবি, চিন ও নেপা, উভয় দেশের বিশেষজ্ঞদের পর্যবেক্ষণেই স্পষ্ট, এই বিপর্যয় সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক হিমবাহ-ধসের ফল, কোনও নির্মাণ-কার্যকলাপের সঙ্গে এর সরাসরি যোগ নেই।

এখন পরিস্থিতি কোথায় ?

দুই দেশেই উদ্ধারকাজ এখনও চলছে। নেপালে দ্রুত গতিতে মৃতদেহ উদ্ধার হওয়ায় হাসপাতাল ও মর্গে জায়গার আকাল দেখা দিয়েছে বলে স্থানীয় সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। তিব্বত অংশে চিনা প্রশাসনের দাবি, উদ্ধারকারী দল ও প্রযুক্তি নিয়োগে তারা সর্বোচ্চ শক্তি দিয়েছে। কিন্তু নির্বাসিত তিব্বতি সংগঠনগুলির দাবির সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাইয়ের কোনও উপায় এখনও নেই, এবং সেটাই এই গোটা বিতর্কের কেন্দ্রীয় সমস্যা। আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের প্রবেশাধিকার না মেলা পর্যন্ত দুই পক্ষের দাবির মধ্যে সত্যতা যাচাই কঠিনই থেকে যাবে।


তথ্যসূত্র: ফ্রান্স ২৪, এএফপি, রয়টার্স, আল জাজিরা, রেডিও ফ্রি এশিয়া, স্ট্র্যাটনিউজ গ্লোবাল, দ্য প্রিন্ট, ডিটি নেক্সট এবং সিএনএন-এর প্রতিবেদন । প্রতিবেদনটি লেখার সময়ে পাওয়া সবশেষ তথ্যের ভিত্তিতে তৈরি; পরিস্থিতি দ্রুত বদলাচ্ছে বলে সংখ্যায় পরিবর্তন হতে পারে।

About The Author


Discover more from Jist Feed

Subscribe to get the latest posts sent to your email.

Leave a Reply

You missed