Brics_featurImage

১৮তম ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলন ঘিরে ভারত মণ্ডপে ঐতিহাসিক আয়োজন, রাশিয়া-চিন-ইরানের ত্রিমুখী বার্তায় সরগরম আন্তর্জাতিক রাজনীতি

নয়াদিল্লি, ১২ সেপ্টেম্বর: প্রগতি ময়দানের ভারত মণ্ডপ চত্বরে আজ থেকে শুরু হল ১৮তম ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলন। ব্রাজিল, রাশিয়া, ভারত, চিন ও দক্ষিণ আফ্রিকাকে নিয়ে দুই দশক আগে যে জোটের পথচলা শুরু হয়েছিল, আজ তার সদস্যসংখ্যা এগারো, আর তার সঙ্গে জুড়ে রয়েছে আরও একগুচ্ছ পার্টনার দেশ। এ বারের সম্মেলন ভারতের কাছে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ, একে তো এই নিয়ে চতুর্থবার ব্রিকসের সভাপতিত্বের ভার নয়াদিল্লির কাঁধে, তার উপর জোটের কুড়ি বছর পূর্তির বছরেই আয়োজক দেশ হিসেবে বিশ্বের প্রথম সারির নেতাদের একজোট করার নজির গড়ল ভারত।

দুই দিনের এই সম্মেলনে সশরীরে হাজির থেকেছেন রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন, চিনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং এবং ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান। কূটনৈতিক শিবিরের মতে, তিন নেতার একসঙ্গে নয়াদিল্লিতে উপস্থিতি নিছক প্রোটোকল নয়, বরং বদলে যেতে থাকা বিশ্ব-রাজনীতির একটি স্পষ্ট বার্তা।

ব্রিকস আসলে কী, আর কেন এই সম্মেলন এত জরুরি

জিয়োপলিটিক্সের হিসেবে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী কয়েক দশক বিশ্ব অর্থনীতি ও কূটনীতির রাশ মূলত ছিল আমেরিকা-ইউরোপ-জাপান তথা জি-৭ ঘরানার উন্নত দেশগুলোর হাতে। তার পাল্টা কণ্ঠস্বর হিসেবে ২০০৬ সালে রাষ্ট্রপুঞ্জের সাধারণ অধিবেশনের ফাঁকে ব্রাজিল, রাশিয়া, ভারত ও চিন, এই চার দেশ মিলে তৈরি করে ‘ব্রিক’ গোষ্ঠী। ২০০৯ সালে রাশিয়ার ইয়েকাতেরিনবার্গে বসে প্রথম শীর্ষ সম্মেলন। ২০১০ সালে দক্ষিণ আফ্রিকা যোগ দেওয়ার পর নাম হয় ‘ব্রিকস’।

গত দুই বছরে এই গোষ্ঠীর চেহারা আমূল বদলেছে। মিশর, ইথিওপিয়া, ইরান, সংযুক্ত আরব আমিরশাহি ও সৌদি আরবের পরে ২০২৫ সালে যোগ দেয় ইন্দোনেশিয়া, ফলে পূর্ণ সদস্য দেশের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে এগারোয়। এর পাশাপাশি ২০২৪ সালের কাজান সম্মেলনে তৈরি হওয়া ‘পার্টনার কান্ট্রি’ তালিকাতেও নাম লিখিয়েছে বেলারুশ, বলিভিয়া, কাজাখস্তান, কিউবা, মালয়েশিয়া, নাইজেরিয়া, থাইল্যান্ড, উগান্ডা, উজবেকিস্তান ও ভিয়েতনামের মতো দেশ। অর্থাৎ পশ্চিমি বলয়ের বাইরে বিশ্বের একটা বড় অংশ আজ এক ছাতার তলায়, জনসংখ্যার নিরিখে বিশ্বের প্রায় অর্ধেক, আর অর্থনীতির নিরিখে বিশ্বের প্রায় ৪০ শতাংশ এখন ব্রিকসভুক্ত দেশগুলির দখলে।

বিশ্ব মঞ্চে এবার ‘ভারত’ নামেই পরিচয়, ভারত মণ্ডপে ফুটে উঠল ঐতিহ্য

এ বারের সম্মেলনের সবচেয়ে চোখ-টানা মুহূর্তগুলোর একটি অবশ্যই প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর সামনে রাখা নেমপ্লেট। আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক মঞ্চে যেখানে গোটা বিশ্ব এত দিন দেশটিকে চিনেছে ইংরেজি ‘India’ নামে, নয়াদিল্লির এই আসরে সেই নেমপ্লেটে লেখা হল ‘Bharat’। বাংলাভাষী পাঠকের কাছে অবশ্য ‘ভারত’ নামটা নতুন কিছু নয়, বাংলায় তো দেশকে চিরকালই ‘ভারত’ বলা হয়। কিন্তু আন্তর্জাতিক কূটনীতির ইংরেজি-নির্ভর আঙিনায়, যেখানে চিরাচরিত ভাবে ব্যবহৃত হয় ‘India’ শব্দটিই, সেখানে সরকারি নেমপ্লেটে সরাসরি ‘Bharat’ লেখা হওয়াটা একটি সুচিন্তিত বার্তা, নিজের ভাষায়, নিজের পরিচয়ে বিশ্বের দরবারে দাঁড়ানোর বার্তা।

ভারত মণ্ডপ চত্বরে এই ব্র্যান্ডিংয়ের সঙ্গে সঙ্গত রেখে ফের নজর কেড়েছে চত্বরে স্থাপিত প্রায় আঠাশ ফুট উঁচু নটরাজ মূর্তি। অষ্টধাতুতে তৈরি, চোল আমলের সেই বিখ্যাত মোম-ঢালাই পদ্ধতিতে গড়া এই মূর্তি তামিলনাড়ুর স্বামীমালাইয়ের ভাস্কর রাধাকৃষ্ণ স্থপতি ও তাঁর দলের হাতে তৈরি হয়েছিল ২০২৩ সালের জি-২০ সম্মেলন উপলক্ষে। শিবের তাণ্ডবনৃত্যের এই মূর্তিকে সরকারি ভাবেই বলা হয় ‘মহাজাগতিক শক্তি, সৃজনশীলতা ও ক্ষমতার প্রতীক’। বিশ্বের সামনে নিজের প্রাচীন শিল্প-ঐতিহ্য ও সাংস্কৃতিক গভীরতা তুলে ধরার এই প্রয়াস স্বাভাবিক ভাবেই দেশের সাধারণ মানুষের মনে গর্বের অনুভূতি জাগানোর মতো একটি মুহূর্ত।

রাশিয়া: পুতিনের জি-৭ কটাক্ষ, আর ব্যবসার নতুন দিগন্ত

সম্মেলনের ঠিক আগের দিন, ১১ সেপ্টেম্বর নয়াদিল্লিতে পা রাখেন প্রেসিডেন্ট পুতিন। দু-সপ্তাহেরও কম সময়ের ব্যবধানে এটি মোদী-পুতিনের দ্বিতীয় বৈঠক, এর আগে কিরঘিজস্তানের বিশকেকে সাংহাই কোঅপারেশন অর্গানাইজেশনের একটি সম্মেলনের ফাঁকে দুই নেতার দেখা হয়েছিল। উল্লেখযোগ্য ভাবে, ২০২২ সালে ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর এই প্রথম রাশিয়ার বাইরে কোনও ব্রিকস সম্মেলনে সশরীরে হাজির হলেন পুতিন, জোহানেসবার্গ সম্মেলনে তিনি যাননি, আর গত বছর ব্রাজিলের রিও সম্মেলনেও তিনি যোগ দিয়েছিলেন ভিডিয়ো-বার্তায়। এই পটভূমিতে দিল্লিতে তাঁর সশরীর উপস্থিতি ইঙ্গিত দেয়, ইউক্রেন যুদ্ধ ঘিরে যতই পশ্চিমি চাপ থাকুক, ভারত-রাশিয়া সম্পর্ককে অগ্রাধিকার দেওয়ার বার্তা মস্কো স্পষ্ট ভাবেই দিতে চায়।

ব্রিকস বিজনেস ফোরামে বক্তৃতা দিতে গিয়ে পুতিন কটাক্ষের সুরে বলেন, গত পাঁচ বছরে বিশ্বের মোট জিডিপি-র ৪০ শতাংশের বেশি এসেছে ব্রিকসভুক্ত দেশগুলি থেকে, সেখানে তথাকথিত জি-৭ গোষ্ঠীর অবদান মেরেকেটে ২৯ শতাংশ, এই পরিসংখ্যান তুলে ধরে তিনি প্রশ্ন তোলেন, তা হলে ওই গোষ্ঠীকে ‘সাত পরাশক্তির দল’ বলার যৌক্তিকতা আজ কতটা টিকে আছে।

কূটনৈতিক বার্তার পাশাপাশি বাস্তবের মাটিতেও এগোচ্ছে ভারত-রাশিয়া সহযোগিতা। গত কয়েক মাসে ভারতের হিন্দুস্তান অ্যারোনটিক্স লিমিটেড (হ্যাল) ও রাশিয়ার ইউনাইটেড এয়ারক্রাফট কর্পোরেশনের (ইউএসি) মধ্যে সুখোই সুপারজেট এসজে-১০০ যাত্রীবাহী বিমান ভারতেই তৈরির লাইসেন্স-চুক্তি হয়েছে, প্রায় তিন দশক পর ফের ভারতের মাটিতে সম্পূর্ণ যাত্রীবাহী বিমান তৈরির পথ খুলছে এই চুক্তিতে। পাশাপাশি আইএল-১১৪ টার্বোপ্রপ বিমান নিয়েও একাধিক ভারতীয় উড়ান সংস্থার সঙ্গে আলোচনা এগিয়েছে রাশিয়ার। প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রে সুখোই সু-৫৭ স্টেলথ যুদ্ধবিমান ভারতে তৈরির সম্ভাবনা নিয়েও দু’দেশের মধ্যে কথা চলছে বলে জানা যাচ্ছে। জ্বালানি, মহাকাশ ও বাণিজ্য নিয়েও মোদী-পুতিন বৈঠকে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে।

চিন: সাত বছর পর ভারতের মাটিতে শি জিনপিং

এ বারের সম্মেলনের অন্যতম বড় চমক প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের উপস্থিতি। ২০১৯ সালে চেন্নাইয়ে অনানুষ্ঠানিক শীর্ষ বৈঠকের পর এই প্রথম ভারতে পা রাখলেন তিনি। ২০২০ সালে লাদাখের গালওয়ানে সীমান্ত সংঘর্ষের জেরে দুই দেশের সম্পর্কে যে তিক্ততা তৈরি হয়েছিল, তার পর থেকে এত দিন ভারত সফরে আসেননি চিনা প্রেসিডেন্ট।

সাত বছরের এই বিরতির পরে শি জিনপিংয়ের সফরকে অনেকেই দেখছেন সম্পর্ক স্বাভাবিক করার স্পষ্ট ইঙ্গিত হিসেবে। ইতিমধ্যেই দুই দেশের মধ্যে সরাসরি বিমান পরিষেবা ও সীমান্ত বাণিজ্য ফের চালু হয়েছে। অগস্ট মাসে বেজিংয়ে জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত ডোভাল ও চিনা বিদেশমন্ত্রী ওয়াং ই-র মধ্যে সীমান্ত নিয়ে আলোচনাতেও কয়েকটি বিষয়ে সহমত তৈরি হয়েছে বলে জানা গিয়েছে, সীমান্তে শান্তি বজায় রাখা, সামরিক স্তরে যোগাযোগ বাড়ানো, তীর্থযাত্রা ও সীমান্ত বাণিজ্য নিয়ে ধারাবাহিকতা রাখার মতো বিষয়গুলি। ভারতের বিদেশ মন্ত্রকের তরফে শি জিনপিংয়ের সফরকে স্বাগত জানিয়ে বলা হয়েছে, বহুমুখী ও ভারসাম্যপূর্ণ বিশ্ব-ব্যবস্থা গড়ে তুলতে এই ধরনের গঠনমূলক আলোচনা জরুরি।

তবে বিশেষজ্ঞদের একাংশের মতে, সীমান্ত বিরোধ সম্পূর্ণ মিটে যাওয়া থেকে এখনও অনেক দূরে দুই দেশ। বরং ব্রিকসের কাঠামোর মধ্যে থেকেই ভারত ও চিন নিজেদের মতপার্থক্যকে পাশে সরিয়ে রেখে বৃহত্তর সহযোগিতার বার্তা দিতে চাইছে বলে মত কূটনৈতিক পর্যবেক্ষকদের।

ইরান: পেজেশকিয়ানের প্রস্তাব, আর পশ্চিম এশিয়ার অস্থির প্রেক্ষাপট

আমেরিকার সঙ্গে দীর্ঘদিনের সংঘাতের আবহে ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের নয়াদিল্লি সফরও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। ব্রিকস বিজনেস ফোরামে তিনি প্রস্তাব দেন, ব্রিকসভুক্ত দেশগুলি মিলে একশো কোটি ডলার (১০ বিলিয়ন ডলার) প্রাথমিক পুঁজি নিয়ে একটি যৌথ পুনর্বিমা (রি-ইনস্যুরেন্স) সংস্থা তৈরি করুক, যা বড় বড় পরিকাঠামো ও জ্বালানি প্রকল্পের ঝুঁকি সামলাতে ও বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের আস্থা বাড়াতে কাজে লাগবে। পাশাপাশি নিউ ডেভেলপমেন্ট ব্যাঙ্ককে স্থানীয় মুদ্রায় ঋণ দেওয়ার ক্ষেত্রে আরও সক্রিয় ভূমিকা নেওয়ার আর্জিও জানান তিনি।

মোদীর সঙ্গে পৃথক বৈঠকেও ইরান-ভারত দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক ও পশ্চিম এশিয়ার পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, আমেরিকাকে চটানোর ঝুঁকি নিয়েও ইরানের প্রেসিডেন্টকে সসম্মানে আপ্যায়ন করে ভারত বুঝিয়ে দিতে চেয়েছে যে, নিজের স্বাধীন কূটনৈতিক অবস্থান থেকে সরছে না নয়াদিল্লি।

ভারতের নিজস্ব প্রস্তাব: স্থানীয় মুদ্রা, ডলার-নির্ভরতা কমানোর ভাবনা

সম্মেলনের প্রথম দিনেই সর্বসম্মতিক্রমে গৃহীত হয়েছে ‘নয়াদিল্লি ঘোষণাপত্র ২০২৬’। প্রধানমন্ত্রী মোদী নিজেই জানিয়েছেন, বন্ধ কক্ষে হওয়া আলোচনায় কোনও সদস্য দেশ এই ঘোষণাপত্রের বয়ানে আপত্তি তোলেনি। এই ঘোষণাপত্রে সদস্য দেশগুলির মধ্যে স্থানীয় মুদ্রায় লেনদেন বাড়ানো, সীমান্ত-পারাপার পেমেন্ট ব্যবস্থাকে দ্রুত-সস্তা-নিরাপদ করে তোলা এবং একতরফা শুল্ক ও অ-শুল্ক বাধার বিরুদ্ধে অবস্থান স্পষ্ট করার কথা বলা হয়েছে।

তবে বিদেশ মন্ত্রকের আধিকারিকরা স্পষ্ট করে দিয়েছেন, আলাদা কোনও ‘ব্রিকস মুদ্রা’ তৈরির প্রস্তাব আপাতত নেই। স্থানীয় মুদ্রায় লেনদেনের এই উদ্যোগকে বিদ্যমান বিশ্ব লেনদেন-ব্যবস্থার পরিপূরক হিসেবেই দেখা হচ্ছে, যার লক্ষ্য মূলত দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যের খরচ কমানো। পাশাপাশি সীমান্ত-পারাপার লেনদেনে ডিজিটাল রুপি-ভিত্তিক একটি কাঠামো তৈরির প্রস্তাবও রেখেছে ভারত, যা আন্তর্জাতিক মঞ্চে টাকার গুরুত্ব বাড়ানোর একটি দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অংশ বলে মনে করা হচ্ছে।

এক নজরে ব্রিকস সম্মেলন ২০২৬

বিষয়তথ্য
সম্মেলন১৮তম ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলন
তারিখ১২-১৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
স্থানভারত মণ্ডপ, প্রগতি ময়দান, নয়াদিল্লি
আয়োজক ও সভাপতিত্বভারত (চতুর্থ বার; আগে ২০১২, ২০১৬, ২০২১-এ)
থিম‘স্থিতিস্থাপকতা, উদ্ভাবন, সহযোগিতা ও স্থায়িত্বের লক্ষ্যে নির্মাণ’; জনকেন্দ্রিক ‘হিউম্যানিটি ফার্স্ট’ দৃষ্টিভঙ্গি
পূর্ণ সদস্য (১১)ব্রাজিল, রাশিয়া, ভারত, চিন, দক্ষিণ আফ্রিকা, মিশর, ইথিওপিয়া, ইরান, সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরশাহি, ইন্দোনেশিয়া
পার্টনার দেশবেলারুশ, বলিভিয়া, কাজাখস্তান, কিউবা, মালয়েশিয়া, নাইজেরিয়া, থাইল্যান্ড, উগান্ডা, উজবেকিস্তান, ভিয়েতনাম
উল্লেখযোগ্য অতিথিভ্লাদিমির পুতিন (রাশিয়া), শি জিনপিং (চিন, ৭ বছর পর ভারত সফর), মাসুদ পেজেশকিয়ান (ইরান)
প্রধান দলিল‘নয়াদিল্লি ঘোষণাপত্র ২০২৬’ — স্থানীয় মুদ্রায় লেনদেন বৃদ্ধি, একতরফা শুল্কের বিরোধিতা
আলোচিত মন্তব্যপুতিন: গত ৫ বছরে বিশ্ব জিডিপি-র ৪০ শতাংশের বেশি ব্রিকসের, জি-৭-এর ২৯ শতাংশ
উল্লেখযোগ্য প্রস্তাবপেজেশকিয়ানের ১০ বিলিয়ন ডলারের ব্রিকস পুনর্বিমা সংস্থা গঠনের প্রস্তাব

বিশেষজ্ঞ বিশ্লেষণ: উচ্ছ্বাসের বাইরেও যা মাথায় রাখা জরুরি

সম্মেলনের চাকচিক্যের বাইরে বেরিয়ে কূটনৈতিক বিশ্লেষকরা কয়েকটি বিষয়ে সতর্ক করছেন। প্রথমত, ভারত সরকার নিজে বারবার স্পষ্ট করেছে, ব্রিকস কোনও ‘পশ্চিমবিরোধী’ নয়, বরং ‘অ-পশ্চিমি’ একটি মঞ্চ, অর্থাৎ আমেরিকা-ইউরোপের বিরুদ্ধে জোট বাঁধা এর লক্ষ্য নয়। কিছু দিন আগেই ফ্রান্সের বিদেশমন্ত্রী জাঁ-নোয়েল বারো এবং প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মাকরঁ মন্তব্য করেছেন, ফ্রান্স যখন জি-৭-এর নেতৃত্বে, ভারত তখন ব্রিকসের সভাপতি, দুই তরফই যেন একে অপরের বিরুদ্ধে না দাঁড়িয়ে সেতুবন্ধনের কাজ করে, এটাই কাম্য। বিশ্লেষকদের একাংশ মনে করছেন, ভারত এখানে ঠিক এই ‘সেতু’ হয়ে ওঠার ভূমিকাতেই স্বচ্ছন্দ, পশ্চিমের সঙ্গেও সম্পর্ক অটুট রেখে রাশিয়া-চিন-ইরানের সঙ্গেও আলোচনার টেবিলে বসা।

দ্বিতীয়ত, ব্রিকসের অন্দরেই সদস্য দেশগুলির স্বার্থ সব সময় এক নয়। ইউরোপ-কেন্দ্রিক গবেষণা সংস্থাগুলির পর্যবেক্ষণ বলছে, চিন চায় ব্রিকসকে বহুমেরু বিশ্ব-ব্যবস্থার স্তম্ভ হিসেবে শক্তিশালী করতে, রাশিয়া ও ইরান চায় পশ্চিমি নিষেধাজ্ঞার প্রভাব কমাতে, আর ভারত-ব্রাজিল চায় নিজেদের কৌশলগত স্বাধীনতা বজায় রেখে কোনও একপক্ষের প্রতি ঝুঁকে না পড়তে। এই ভারসাম্য বজায় রাখাই ভারতীয় কূটনীতির আসল পরীক্ষা।

তৃতীয়ত, ভারত-চিন সীমান্ত সমস্যা এখনও পুরোপুরি মেটেনি। শি জিনপিংয়ের সফর সদর্থক বার্তা দিলেও, বাস্তবের মাটিতে সীমান্ত সমস্যার স্থায়ী সমাধান ছাড়া ব্রিকসের অভ্যন্তরীণ সমীকরণ পুরোপুরি স্বাভাবিক হবে না বলেই মত কূটনৈতিক মহলের।

সাধারণ মানুষের কাছে এই সম্মেলনের অর্থ কী

একজন সাধারণ ভারতীয় নাগরিকের কাছে ব্রিকস, জিডিপি বা ডি-ডলারাইজেশনের মতো শব্দগুলো দূরের মনে হতেই পারে। কিন্তু এই সম্মেলনের প্রভাব একেবারে বিমূর্ত নয়। বিশ্ব অর্থনীতিতে ভারত ইতিমধ্যেই জাপানকে টপকে চতুর্থ বৃহত্তম অর্থনীতির জায়গা করে নিয়েছে। রাশিয়ার সঙ্গে বিমান তৈরির যে চুক্তি হয়েছে, তা যদি বাস্তবায়িত হয়, তবে আগামী দিনে দেশের মাটিতেই তৈরি হতে পারে যাত্রীবাহী বিমান, যার হাত ধরে তৈরি হতে পারে নতুন কারখানা, নতুন কর্মসংস্থান, নতুন প্রযুক্তি হস্তান্তরের সুযোগ।

আবার একই সঙ্গে আমেরিকা, রাশিয়া, চিন ও ইরানের মতো পরস্পরবিরোধী স্বার্থের দেশগুলির নেতাদের নিজের মাটিতে বসিয়ে আলোচনার টেবিলে আনতে পারাটাও এক ধরনের কূটনৈতিক দক্ষতার প্রমাণ। কোনও একটি শিবিরে পুরোপুরি ঢুকে না পড়ে, নিজের স্বার্থ অক্ষুণ্ণ রেখে সকলের সঙ্গে সম্পর্ক রাখার এই প্রয়াসকেই কূটনীতির ভাষায় বলে ‘কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন’। ভারত মণ্ডপে নটরাজ মূর্তির সামনে দাঁড়িয়ে একের পর এক বিশ্বনেতার সঙ্গে হাত মেলানো প্রধানমন্ত্রীর ছবি, তাই নিছক প্রোটোকলের ছবি নয়, তা আসলে এক আত্মবিশ্বাসী দেশের নিজের শর্তে বিশ্বের সঙ্গে বসার ছবি।

আগামিকাল সম্মেলনের সমাপ্তি পর্ব পর্যন্ত আরও যে সব ঘোষণা ও দ্বিপাক্ষিক বৈঠক আসতে চলেছে, তার দিকে নজর রাখা জরুরি, বিশেষত ভারত-চিন সীমান্ত আলোচনার অগ্রগতি এবং স্থানীয়-মুদ্রা লেনদেন পরিকল্পনার বাস্তব রূপরেখা নিয়ে, যা ঠিক করে দেবে ব্রিকসের ভবিষ্যৎ পথ কতটা মসৃণ হবে।

তথ্যসূত্র: রয়টার্স, এএনআই, সংবাদ সংস্থা ও সরকারি বিবৃতি-ভিত্তিক আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের রিপোর্ট অবলম্বনে।

About The Author


Discover more from Jist Feed

Subscribe to get the latest posts sent to your email.

Leave a Reply

You missed