Road name debate

কলকাতার রাস্তার ঐতিহ্যবাহী নাম ফেরানোর দাবি নিয়ে উত্তাল রাজনীতি। লেনিন সরণি প্রসঙ্গে ডাঃ জিষ্ণু বসুর বক্তব্য, লেনিনগ্রাদ থেকে সেন্ট পিটার্সবার্গ এবং ইউক্রেনের উদাহরণ টেনে কড়া জবাব।

কলকাতা, ২ অক্টোবর ২০২৬: কলকাতার রাস্তার নাম বদলের প্রশ্নে বামপন্থী মহলের প্রতিবাদের হুঁশিয়ারির পাল্টা তীব্র আক্রমণ শানালেন রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘের পূর্ব ক্ষেত্রের শীর্ষ নেতৃত্ব ডাঃ জিষ্ণু বসু। তাঁর সোজা প্রশ্ন, “যে লেনিনের দেশে লেনিনের নামেই শহরের নাম টিকল না, সেই লেনিনের নামে কলকাতার রাস্তা কেন থাকবে?”

বিতর্কের সূত্রপাত

স্বামী প্রদীপ্তানন্দজি মহারাজ সম্প্রতি মন্তব্য করেছিলেন, কলকাতা শহরে লেনিনের নামে রাস্তা থাকার কথাই নয়। এর পরই প্রতিবাদে পথে নামার হুঁশিয়ারি দেয় বিরোধী শিবির। সেই প্রেক্ষিতেই ডাঃ বসুর এই প্রতিক্রিয়া।

“নিজের দেশেই যিনি অপ্রাসঙ্গিক”

ডাঃ বসুর বক্তব্য, লেনিনের জন্মভূমি রাশিয়াতেই লেনিনগ্রাদের নাম বদলে আবার সেন্ট পিটার্সবার্গ করা হয়েছে। তাঁর দাবি, ইউক্রেনে হাজার হাজার লেনিন মূর্তি নামানো হয়েছে। তাঁর কথায়, মাত্র একটি মূর্তি চেরনোবিল পারমাণবিক কেন্দ্র চত্বরে রয়ে গিয়েছে, তেজস্ক্রিয়তার ভয়ে সেটি সরানো যায়নি। “এর বিরুদ্ধে আপনাদের প্রতিবাদ করা উচিত নয়?” – প্রশ্ন ছুঁড়ে দিয়ে তিনি বলেন, গাজা ও প্যালেস্টাইনের সমর্থনে যাঁরা কলকাতার রাস্তা অচল করে দিতে পারেন, তাঁরা আগে মস্কোর কাছে জানতে চান লেনিনগ্রাদের নাম কেন বদলাল। “আগে সেই প্রতিবাদ করুন, তারপর আমাদের দেশের কথা।”

বদলে কার নাম ? ডাঃ বসুর তালিকা

ডাঃ বসুর মতে, কলকাতার রাস্তার নাম হওয়া উচিত এ দেশের মাটির সন্তানদের নামে:

  • ডাঃ সুভাষ মুখোপাধ্যায়: দেশের প্রথম টেস্ট-টিউব বেবির কারিগর। ডাঃ বসুর অভিযোগ, বামপন্থীরা তাঁকে মানসিকভাবে নিগ্রহ করেছিল, যার পরিণতিতে তিনি আত্মহত্যা করেন।
  • বিজ্ঞানী বিভা চৌধুরী ও অমল রায়চৌধুরী: ডাঃ বসুর ক্ষোভ, এঁদের নামে কলকাতায় আজও কোনও রাস্তা নেই।

বিশ্বের উদাহরণ: ইতিহাসের সঙ্গে আত্মপরিচয়ের পুনর্মিলন

বিশ্বের অন্যান্য উন্নত দেশগুলির নজির অনুসারে, কমুনিস্ট শাসনের মায়া থেকে মুক্তি পাওয়ার পরে বহুক্ষেত্রেই তারা তাদের পূর্বের অবস্থানে ফিরে গেছে।ডাঃ বসুর যুক্তির সমর্থনে ইতিহাসের তথ্যগুলি একটু দেখে নেওয়া যাক :

রাশিয়া ও সাবেক সোভিয়েত ভূখণ্ড

দেশ / শহরকমিউনিস্ট-যুগের নাম বা প্রতীকবদলের পরবছর
রাশিয়ালেনিনগ্রাদসেন্ট পিটার্সবার্গ১৯৯১
রাশিয়াগোর্কিনিজনি নভগোরোদ১৯৯০
রাশিয়াকালিনিনত্ভের১৯৯০
রাশিয়াকুইবিশেভসামারা১৯৯১
রাশিয়াসভের্দলোভস্কইয়েকাটেরিনবুর্গ১৯৯১
ইউক্রেনডনিপ্রোপেত্রভস্কডনিপ্রো২০১৬
ইউক্রেনকিরোভোগ্রাদক্রোপিভনিৎস্কি২০১৬
ইউক্রেনকিয়েভ ও খারকিভে লেনিন মূর্তিগণবিক্ষোভে ভেঙে ফেলা হয়২০১৩ – ২০১৪
ইউক্রেনসোভিয়েত-যুগের নাম ও প্রতীককমিউনিস্ট প্রতীক নিষিদ্ধকারী আইন২০১৫
কিরগিজস্তানফ্রুনজেবিশকেক১৯৯১
কাজাখস্তানআকমোলা / ৎসেলিনোগ্রাদঅস্তানা (রাজধানী)১৯৯৮
উজবেকিস্তানতাসখন্দে কার্ল মার্ক্সের মূর্তিআমির তৈমুরের মূর্তি১৯৯৩
জর্জিয়াগোরিতে স্তালিনের মূর্তিঅপসারিত২০১০

পূর্ব ও মধ্য ইউরোপ

দেশ / শহরকমিউনিস্ট-যুগের নাম বা প্রতীকবদলের পরবছর
জার্মানিকার্ল-মার্ক্স-স্টাটকেমনিৎস১৯৯০
জার্মানিপূর্ব বার্লিনে লেনিনপ্লাৎসঅন্য নামকরণ, লেনিন মূর্তি অপসারিত১৯৯১–৯২
চেক প্রজাতন্ত্রগটভালদভজ্লিন১৯৯০
পোল্যান্ডরাষ্ট্রীয় স্মারক ও রাস্তার কমিউনিস্ট নামবিশেষ আইনে নাম পরিবর্তন২০১৬
হাঙ্গেরিবুদাপেস্টের লেনিন বুলেভার্ডতেরেজ ও এরজেবেত বুলেভার্ড১৯৯০
হাঙ্গেরিকমিউনিস্ট যুগের মূর্তিমেমেন্টো পার্কে সরানো১৯৯৩
বুলগেরিয়াসোফিয়ায় গেওর্গি দিমিত্রভের সমাধিসৌধভেঙে ফেলা১৯৯৯
আলবেনিয়াতিরানায় এনভার হোজার মূর্তিগণবিক্ষোভে ভেঙে ফেলা১৯৯১

বাল্টিক দেশ

দেশ / শহরকমিউনিস্ট-যুগের প্রতীকপদক্ষেপবছর
এস্তোনিয়াতালিনে সোভিয়েত “ব্রোঞ্জ সৈনিক”সরিয়ে সামরিক সমাধিক্ষেত্রে নেওয়া২০০৭
লিথুয়ানিয়াভিলনিউসের সবুজ সেতুর সোভিয়েত ভাস্কর্যঅপসারণ২০১৫
লাত্ভিয়ারিগায় সোভিয়েত বিজয় স্মারকভেঙে ফেলা২০২২
এস্তোনিয়াসোভিয়েত স্মারকবহু স্মারক সরানো২০২২

এছাড়াও এশিয়ার অন্যান্য উল্লেখযোগ্য স্থানে নিজের ঐতিহ্যকে ফিরিয়ে আনা হয়েছে

দেশ / শহরবিবরণবছর
মঙ্গোলিয়াউলানবাটারের কেন্দ্রীয় চত্বরে চেঙ্গিজ খানের বিশাল মূর্তি, জাতীয় নায়কের মর্যাদায় পুনঃপ্রতিষ্ঠা২০০৬
ভারতবম্বে, মাদ্রাজ, ক্যালকাটা থেকে মুম্বই, চেন্নাই, কলকাতা১৯৯৫ – ২০০১

আত্মবিশ্বাসী জাতির লক্ষণ

ঐতিহ্য-পুনরুদ্ধারের সমর্থকদের যুক্তি: একটি আত্মবিশ্বাসী জাতি নিজের সভ্যতা ও সন্তানদের সম্মান জানায়। বিদেশি মতাদর্শের প্রতীকের পরিবর্তে মাটির নায়কদের স্থান দেওয়া তাঁদের চোখে কেবল নাম বদল নয়, মানসিক ঔপনিবেশিকতা কাটানোর পথ। রাশিয়া, জার্মানি ও পূর্ব ইউরোপের দেশগুলি নিজেদের ইতিহাসের নতুন মূল্যায়ন করেছে, তাই ভারতের পক্ষেও একই পথ স্বাভাবিক, এমনটাই বক্তব্য।

বিরোধী পক্ষের অবস্থান: বামপন্থী মহলের মতে, লেনিন সরণির নাম আন্তর্জাতিক শ্রমিক আন্দোলনের সঙ্গে শহরের দীর্ঘ সম্পর্কের স্মারক, এবং নাম বদল রাজনৈতিক প্রতিহিংসা। কলকাতার বাসিন্দাদের একাংশ ঠিকানা ও নথিপত্র বদলের অসুবিধার কথাও তুলছেন।

About The Author


Discover more from Jist Feed

Subscribe to get the latest posts sent to your email.

Leave a Reply