কাল্পনিক চিত্র
নির্বাচন যত এগিয়ে আসে, ততই বাড়ে প্রচার, প্রতিশ্রুতি আর রাজনৈতিক উত্তেজনা। কিন্তু এসবের আড়ালে লুকিয়ে আছে আরও বড় এক বাস্তব—গ্রামের মানুষের জীবন, তাদের দুশ্চিন্তা, আর না বলা গল্প। গ্রামের কাঁচা রাস্তায় দাঁড়িয়ে কথা বলছিলেন দুই সাধারণ গৃহবধূ, দিনের বেশিরভাগ সময় কাটে সংসার আর টানাটানির হিসেব মেলাতে। কিন্তু নির্বাচন এলেই তাদের কথায় উঠে আসে বড় বড় প্রশ্ন। এই ছোট্ট কথোপকথনেই ধরা পড়ে গ্রামের মানুষের মানসিকতা—রাজনীতির প্রতি কৌতূহল আছে, কিন্তু তার সঙ্গে মিশে আছে অনিশ্চয়তা আর অবিশ্বাস।
ফুলমণি: অরে শুনলি? সকাল থিকা ওই হেলিকপ্টার ঘুরঘুর করতেছে মাথার ওপর। কি রে, দেশে যুদ্ধ লাগবো নাকি?
ঝর্ণা দি : ধুর পাগলি! যুদ্ধ-টুদ্ধ কিচ্ছু না। শুনস নাই? ভোট আইছে। দিদি আসবো বলে এত সিকিউরিটি।
ফুলমণি: বটে, ওই দিদি আর আগের মতো নাই রে ? এখন হেলিকপ্টার ছাড়া এদিকে পা দেয় না।
ঝর্ণা দি: ওটাই তো! একে কয় নিরাপত্তা। ভোট এলেই দিদির নাকি কিসু না কিসু হয়। তাই আগে থিকাই সাবধান করছে পন্ডিতরা।
ফুলমণি : তাতে তো আরো ভয়! এই চৈত্র-বৈশাখের ঝড়-বৃষ্টির মাসে আকাশ পথে ঘোরা, ইটা কি ঠিক হলো ! ওই পন্ডিত গুলা নিশ্চই বিজেপির চর।
ঝর্ণা দি: তাই আবার হয় নাকি! তয় তুই কি করবি?
ফুলমণি: জনসভায় যামু। গিয়া দিদিরে সব কইয়া দিমু।
ঝর্ণা দি: তুই কইবি? তোরে কইতে দিবে নাকি? আগের বার ভুলে গেছিস? সবার সামনে কেমন বেইজ্জত করলো!
ফুলমণি: সে বটে, এবার দিদির মেজাজডা কেমন জানি লাগতেছে। আবার যদি মাওবাদী কয় দিয়া দেয়?
ঝর্ণা দি: অরে না রে! সব মাওবাদী নাকি সাফ কইরা দিছে ওই মোটা লোকডা—কি নাম যেন? টিভিতে দেখায় মাঝে মাঝে।
ফুলমণি: সে তো ভালো বটে । তয় দিদি এবার কি করবো?
ঝর্ণা দি: ভোট তো আর বেশি দিন নাই। কিসু না কিসু করবেই।ভোট তো আর বেশি দিন নাই। কিসু না কিসু করবেই।
ফুলমণি: গেলবার ওই গরমে পা-এ ব্যান্ডেজ কইরা কত কষ্ট করছিল।
ঝর্ণা দি: ওতুক কষ্ট তো করতেই হইবো জিততে হইলে।
ফুলমণি: ডাক্তাররাও নাকি এখন ভয় পায়, চাকরি হবার ভয়ে । বয়েসও তো হইছে। কতদিন ধইরা দেখতেছি—চিন্তা হয়।
ঝর্ণা দি: চার দিকে যেরকম পরপর পেলেন ভেঙেপড়ছে।
ফুলমণি: তবু একবার গিয়া দিদিরে সব কইয়া দিমু ।
ঝর্ণা দি: আরে তোর কথা শুনবে কেনে, লোকজন কইতেছে দিদি নাকি খুব চাপে আছে। সবাই নাকি পদ্মফুলের দিকে যাইতেছে।
ফুলমণি: সে তো আগের বারেই গিয়েছিলো। গুনতীতে তো জিতেই গিয়েছিলো পদ্ম পার্টি । ওই কে যেন এক সরকারি অফিসার বাবু না থাকলে দিদির দল আর জিততে পারতো না।
ঝর্ণা দি: সেই সরকারি বাবুকেও তো শুনলাম বদলি করে দিয়েছে। তাই আরো মেজাজ খারাপ হয়েছে রে।
তয় লক্ষীর ভাণ্ডারের টাকা বাড়াইছে। এবার আর কেউ আটকাইতে পারবো না।
ফুলমণি: ধুর! ওই কটা টাহা দিয়া কি হয়? মাছ কিনতেও পারি না।
ঝর্ণা দি: দিদি যে ঘরের ওতো টাকা দিলো সেটাও লোকজন জাইনা গছে—ওই টাহা নাকি মোদির দিক থেইকা আসছে! তাই মেজাজ আরো খারাপ রে।
ফুলমণি: বলিস কি! আমার ছেলেডা সুরাট থিকা আইলে আমি এপলাই করমু ভাবতেছিলাম।
ঝর্ণা দি: সে তুই কর না। মোদির দল আইয়া আটকাইবো নাকি? করোনা থিকা ফ্রি চালও তো দিতেছে।
ফুলমণি: তুইও নাকি ওইদিকে টান খাইতেছিস?
ঝর্ণা দি: না রে, মানুষ কইলে শুইনা। বাড়ি বাড়ি জল, পায়খানা, গ্যাস, ব্যাংকের বই, চাষের টাহা—সব নাকি কেন্দ্র দিছে। দিদি নিজের নাম চালাচ্ছিল।
ফুলমণি: তয় ওই কথা আগেই কইলে এত ঝামেলা হইতো না!
ঝর্ণা দি : এখন সব ফাঁস হইয়া গছে। ছেলেপেলারা মোবাইলে খিল্লি করে।
ফুলমণি: তাই দিদির মাথা আরো গরম। ভালো কতা কইলেও রাগ করে। আগের বার তো হাতা-খুন্তি লইয়া দিল্লির পুলিশ এর লগে লড়তে কইছিল! এবারে নাজানি কি কি বলে। এইডা কি দেশের যুদ্ধ নাকি? এসব বাপু আমার ভালো লাগিনে ।
ঝর্ণা দি: কেনে তোর আবার কি হলো , এই তো দিদি দিদি করছিলি।
ফুলমণি: আগের মতো আর নাই রে। শুধু কয়—আমারে ভোট দাও। কিন্তু জিতলে কি করবো, ওইটা কয় না।
ঝর্ণা দি: মাঠে আলুর অবস্থা দেখছিস? আলুর দামের থিকা প্যাকেটের দাম বেশি! হারু কাকার কত আলু পচা গছে।কত কষ্ট করে চাষ করেছিল রে।
(দুজনেই কিছুক্ষণ চুপ)
ফুলমণি: আমার ছোট মাসির ছেলেডা মোদির ভক্ত আছিল। গেলবার ভোটের পর এমন মার খাইছে—এখনো কাম করতে পারে না। চানাচুর তৈরি করার ব্যবসা করছিলো। সে সব দোকান পাট, যন্ত্রপাতি, বস্তা বস্তা চানাচুর এমন নষ্ট করে দিলো আজ ও মাথা তুলে দাঁড়াতে পারলোনা।
ঝর্ণা দি: উল্টা থানায় ওদের নামেই নানারকম কেস দিছে। আজও চলতেছে।
ফুলমণি: দিদি তখন একটা কথাও কয় নাই। উল্টা কইছে—কিসু হয় নাই।
ঝর্ণা দি: ছেলেডা কইতেছে সুরাটে খুব শান্তি। কাম করে, টাহা জমায়। এসব ঝামেলা ওখানে নেই। ওখানকার লোকজন বেশি ব্যবসা করে। আর শ্রমিক যত বাঙালি। এখানে খুব একটা আস্তে চায় না। ভোটের জন্যে ইস্পেশাল টেরেন এ টিকেট করেছে। ভোট দিতে আবার আইবো।
ফুলমণি: কইছে—বাংলা ঠিক হইলে আবার ফিরে আইয়া ব্যবসা করবো।
ঝর্ণা দি: তয় তুই কি করবি?
ফুলমণি: বুঝতেছি না রে। দিদির কতা মাথায় ঢুকে না। সব মিলাইয়া মাথা ঘুইরা যায়।
ঝর্ণা দি: আগের বারও এমন হইছিল। পরে ভাঙা পা দেইখা আবার ভুইলা গেছিলি।
ফুলমণি: না রে… এবার আর ভুল করমু না।
About The Author
Discover more from Jist Feed
Subscribe to get the latest posts sent to your email.
