হুগলি জেলার ধনিয়াখালি বিধানসভা কেন্দ্রের রাজনৈতিক ইতিহাস এক কথায় পরিবর্তনের ইতিহাস। ১৯৫২ সালে প্রথম বিধানসভা নির্বাচনে জাতীয় কংগ্রেসের ধীরেন্দ্র নারায়ণ মুখার্জী ৬৩.৫৬ শতাংশ ভোট পেয়ে এই কেন্দ্রের প্রথম বিধায়ক হিসেবে নির্বাচিত হন। সেই সময় রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন বিধান চন্দ্র রায়। এরপর ১৯৬২ সাল পর্যন্ত টানা চারবার কংগ্রেস এই কেন্দ্র দখলে রাখে। মাঝখানে ১৯৭২ সালে একবার কংগ্রেস ফিরে এলেও, ২০০৬ সাল পর্যন্ত এই কেন্দ্র মূলত বামপন্থী দলগুলির দখলেই ছিল—মোট ১০ বার।
২০১১ সালে রাজ্য রাজনীতিতে পরিবর্তনের হাওয়া লাগে, এবং সেই প্রভাব পড়ে ধনিয়াখালিতেও। তৃণমূল কংগ্রেস এই কেন্দ্র থেকে সমর্থন পেয়ে টানা তিনবার জয়লাভ করে। এই ধারাবাহিকতা প্রমাণ করে, এখানে ভোটাররা কোনো নির্দিষ্ট দলের প্রতি স্থায়ীভাবে অনুগত নয়; বরং সময়, পরিস্থিতি এবং প্রয়োজন অনুযায়ী তারা নিজেদের সিদ্ধান্ত নেন।
২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে তিনটি প্রধান রাজনৈতিক দলই স্থানীয় প্রার্থীকে সামনে এনেছে, যা এই নির্বাচনের গুরুত্ব আরও বাড়িয়েছে।
বর্তমান বিধায়ক অসীমা পাত্র, তৃণমূল কংগ্রেসের প্রার্থী হিসেবে, তাঁর কাজের ভিত্তিতে আত্মবিশ্বাসী। তাঁর বক্তব্য, ৩৪ বছরের বাম শাসনে যা সম্ভব হয়নি, গত ১৫ বছরে তার অনেকটাই বাস্তবায়িত হয়েছে। অধিকাংশ প্রতিশ্রুতি পূরণ হয়েছে বলেও তিনি দাবি করেন এবং বাকি কাজ দ্রুত সম্পন্ন করার আশ্বাস দেন।
অন্যদিকে, বামফ্রন্ট সমর্থিত সিপিআই প্রার্থী রুমা আহেরি তাঁর প্রচারে তুলে ধরছেন কৃষকদের সমস্যার কথা। বিশেষ করে আলুর ন্যায্য দাম না পাওয়ার বিষয়টি তাঁর প্রচারের কেন্দ্রে রয়েছে। তিনি প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন, ক্ষমতায় এলে কৃষি ব্যবস্থায় উন্নতি এবং শোষণমুক্ত বাজার কাঠামো গড়ে তোলা হবে। তবে বাস্তব চিত্র বলছে, গত নির্বাচনে বামেদের ভোট শতাংশ নেমে আসে প্রায় এক শতাংশে। বর্তমানে রাজ্যের প্রধান বিরোধী শক্তি হিসেবে বিজেপির উত্থান, তাই শাসক বিরোধী ভোটের বড় অংশকে সেদিকে সরিয়ে দিয়েছে।
এদিকে বিজেপি, প্রার্থী হিসেবে সামনে এনেছে বর্ণালী দাস কে—প্রথমবারের মতো নির্বাচনে লড়তে নামা আরেক স্থানীয় কন্যা। মন্দিরে পুজো দিয়ে প্রচার শুরু করে তিনি ইতিমধ্যেই বাড়ি বাড়ি পৌঁছে মানুষের আশীর্বাদ চাইছেন। তাঁর মূল ইস্যু—নারী সুরক্ষা ও কর্মসংস্থান। আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে তিনি জানাচ্ছেন, এই দুই সমস্যার সমাধানেই তিনি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ এবং জয়ের ব্যাপারে তিনি আশাবাদী। অতীতের ভোটের ব্যবধানকেও চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিয়ে তিনি এগিয়ে চলেছেন। পরিসংখ্যান অনুযায়ী বিজেপি গত নির্বাচনে যেহেতু এক শতাংশেরও কম সংখ্যালঘু ভোট পেয়েছিল, তাই ৭৭.৬০ % সনাতনী ভোটার সমৃদ্ধ ধনিয়াখালীর মত বিধানসভা গুলোতেই বিশেষ নজর দিয়েছে রাজ্য। তবে স্থানীয় সংগঠন ভোটারদের কাছে কতটা পৌঁছতে পারে সেটাই দেখার।
বিগত পাঁচটি নির্বাচনে তৃণমূল কংগ্রেসএর প্রাপ্ত ভোটের হার নিম্নরূপ:
| নির্বাচনী বছর | নির্বাচনের ধরন | ভোটের হার (%) | Candidate |
|---|---|---|---|
| 2024 | লোকসভা | 56.7% | রচনা ব্যানার্জি |
| 2021 | বিধানসভা | 53.37% | অসীমা পাত্র |
| 2019 | লোকসভা | 49.20% | রত্না দে (নাগ) |
| 2016 | বিধানসভা | 57.55% | অসীমা পাত্র |
| 2011 | বিধানসভা | 51.18% | অসীমা পাত্র |
বিগত পাঁচটি নির্বাচনে বিজেপির প্রাপ্ত ভোটের হার নিম্নরূপ:
| নির্বাচনী বছর | নির্বাচনের ধরন | ভোটের হার (%) | Candidate |
|---|---|---|---|
| 2024 | লোকসভা | 36.54% | লকেট চট্টোপাধ্যায় |
| 2021 | বিধানসভা | 40.47% | তুষার কুমার মজুমদার |
| 2019 | লোকসভা | 43.70% | লকেট চট্টোপাধ্যায় |
| 2016 | বিধানসভা | 7.51% | ষষ্ঠী দুলে |
| 2011 | বিধানসভা | 2.21% | কৃপাসিন্ধু রায় |
বিগত পাঁচটি নির্বাচনে বাম দলের এর প্রাপ্ত ভোটের হার নিম্নরূপ:
| নির্বাচনী বছর | নির্বাচনের ধরন | ভোটের হার (%) | Candidate |
|---|---|---|---|
| 2024 | লোকসভা | 5.43% | মানদীপ ঘোষ |
| 2021 | বিধানসভা | 1.20% | সজল কুমার দে |
| 2019 | লোকসভা | 4% | প্রদীপ সাহা |
| 2016 | বিধানসভা | 31.10% | প্রদীপ মজুমদার |
| 2011 | বিধানসভা | 42.90% | শ্রাবণী সরকার |
অতীতের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ধনিয়াখালিতে ৫ শতাংশ ভোটের সুইং খুবই স্বাভাবিক। এখানে ভোটাররা স্থানীয়, রাজ্য এবং জাতীয়—তিন স্তরের ইস্যু বিবেচনা করেই নিজেদের প্রতিনিধি নির্বাচন করেন। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এবারের নির্বাচনে Gen Z ভোটাররাই হতে পারে মূল ফ্যাক্টর।
SIR পরবর্তী স্থিতি
ধনেখালি (AC-197) বিধানসভা কেন্দ্রে, সংশ্লিষ্ট নির্বাচনের বছরগুলোতে মোট নিবন্ধিত ভোটারের (ভোটারদের) সংখ্যা নিম্নরূপ:
| নির্বাচনী বছর | নির্বাচনের ধরন | মোট নিবন্ধিত ভোটার | পরিবর্তন |
|---|---|---|---|
| 2026 | বিধানসভা (চূড়ান্ত ) | 264,632 | (-) 13,160 (হ্রাস) |
| 2024 | লোকসভা | 277,792 | 14,937 (বৃদ্ধি) |
| 2021 | বিধানসভা | 262,855 | 166 (বৃদ্ধি) |
| 2019 | লোকসভা | 262,689 |
ভোটার সংখ্যার দিক থেকেও কিছু গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন দেখা গেছে। ২০২৪ থেকে ২০২৬ সালের মধ্যে এই কেন্দ্রে মোট ভোটার সংখ্যা ১৩,১৬০ জন কমেছে। যদিও ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে ভোটার সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছিল। ২০১৬ সালের পর থেকে মোট বৃদ্ধি প্রায় ১৪,৭৪৫ জন।
বর্তমান প্রজন্মের দৃষ্টিভঙ্গিও বদলেছে। আজকের ১৮ বছরের ভোটাররা বাম আমল প্রত্যক্ষ করেনি। তাদের কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ অন্যান্য রাজ্যের উন্নয়নের গল্প, নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ এবং স্টার্টআপ সংস্কৃতি। তারা চায় নতুন ভারতের অংশ হতে।
ধনিয়াখালির অর্থনৈতিক সম্ভাবনাও কম নয়। ১৯৩০-এর দশকে শুরু হওয়া তাঁত শিল্প আজ বিশ্বজোড়া খ্যাতি অর্জন করেছে এবং জি আই ট্যাগ পেয়েছে। কিন্তু বাস্তবে নানা সমস্যায় জর্জরিত এই শিল্প। একইভাবে, আলু চাষ এই অঞ্চলের প্রধান অর্থকরী ফসল হলেও, উৎপাদন বেশি বা কম—দুই অবস্থাতেই কৃষক সমস্যায় পড়েন। আধুনিক কোল্ড স্টোরেজের অভাব এবং বাজার ব্যবস্থার দুর্বলতা আগ্রো ইন্ডাস্ট্রির বিকাশে বাধা সৃষ্টি করছে।
অঞ্চলটিতে কৃষিভিত্তিক শিল্প গড়ে তোলার যথেষ্ট সুযোগ ছিল। বহু ফসলি কৃষি জমি, দুর্গাপুর এক্সপ্রেসওয়ে, হাওড়া-বর্ধমান কর্ড লাইন, ডিভিসির বিদ্যুৎ ও জলের সুবিধা—সবই রয়েছে। তবুও কর্মসংস্থানের অভাবে প্রতিদিন বহু যুবক-যুবতীকে হাওড়া বা বর্ধমানের দিকে ছুটতে হয়।
শিক্ষা ও স্বাস্থ্য পরিকাঠামোর ক্ষেত্রেও চাহিদা অনুযায়ী উন্নয়ন এখনও প্রশ্নের মুখে। প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরে কিছু পরিকাঠামোগত পরিবর্তন হলেও, উচ্চশিক্ষার সুযোগ উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়েনি। ফলে বহু ছাত্র-ছাত্রীকে উচ্চশিক্ষার জন্য এখনও কলকাতা বা অন্যান্য শহরের উপর নির্ভর করতে হয়। একই চিত্র স্বাস্থ্য ব্যবস্থার ক্ষেত্রেও। জরুরি চিকিৎসার প্রয়োজন হলে আজও অধিকাংশ মানুষকে কলকাতার দিকেই ছুটতে হয়। স্থানীয় স্তরে উন্নত চিকিৎসা পরিষেবা ও আধুনিক হাসপাতালের অভাব এই অঞ্চলের একটি বড় সমস্যা হিসেবেই রয়ে গেছে।
সর্বোপরি নির্বাচন কমিশনের হিংসা মুক্ত পরিবেশে ভোট পরিচালনা ও স্বচ্ছ গণনা ব্যবস্থার প্রতিশ্রুতি সাধারণ মানুষ কে কতটা প্রভাবিত করে সেই দিকে বিশেষ নজর রেখেছে রাজনৈতিক মহল।
এই বাস্তবতার মধ্যেই ২০২৬ সালের নির্বাচন দাঁড়িয়ে আছে। উন্নয়ন, কর্মসংস্থান, কৃষি এবং নতুন প্রজন্মের প্রত্যাশা—সব মিলিয়ে ধনিয়াখালির ভোট এবার কোন দিকে যাবে, তা নির্ধারণ করবে ভবিষ্যতের রাজনৈতিক সমীকরণ।

