WC 4th day

ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬-এর চতুর্থ দিনটি ছিল টুর্নামেন্টের এখন পর্যন্ত অন্যতম স্মরণীয় ম্যাচডে। চারটি ম্যাচে মোট ১৯টি গোল, এক বিশ্বকাপ অভিষেককারী দেশের ঐতিহাসিক গোল, শেষ মুহূর্তের নাটকীয় জয় এবং গ্রুপ টেবিলের বড় পরিবর্তন সব মিলিয়ে ফুটবলপ্রেমীদের জন্য এটি ছিল এক রোমাঞ্চকর দিন। জার্মানি তাদের পুরনো আধিপত্যের ইঙ্গিত দিল সাত গোলের ঝড় তুলে, জাপান দেখাল লড়াইয়ের মানসিকতা, আইভরি কোস্ট শেষ মুহূর্তে ছিনিয়ে নিল মূল্যবান তিন পয়েন্ট এবং সুইডেন আক্রমণাত্মক ফুটবলে গ্রুপের শীর্ষে উঠে গেল।

গ্রুপ ই: জার্মানি ৭-১ কুরাসাও

ভেন্যু: হিউস্টন স্টেডিয়াম, টেক্সাস

বিশ্বকাপে নিজেদের প্রত্যাবর্তনের বার্তা দিল জার্মানি। ম্যাচের মাত্র ষষ্ঠ মিনিটে ফেলিক্স এনমেচা দূরপাল্লার দুর্দান্ত কার্লিং শটে গোল করে দলকে এগিয়ে দেন। তবে ২১তম মিনিটে ইতিহাস গড়ে কুরাসাও। লিভানো কোমেনেনসিয়ার শট ডিফ্লেক্ট হয়ে জালে জড়ালে বিশ্বকাপে নিজেদের প্রথম গোলের স্বাদ পায় ক্যারিবিয়ান দ্বীপদেশটি। কিন্তু এরপর শুরু হয় জার্মান ঝড়। নিকো শ্লটারবেকের হেড, কাই হাভার্টজের পেনাল্টি এবং বিরতির পর জামাল মুসিয়ালা, নাথানিয়েল ব্রাউন, ডেনিজ উনদাভ ও হাভার্টজের দ্বিতীয় গোল জার্মানিকে ৭-১ ব্যবধানে জয় এনে দেয়। জার্মানির আক্রমণভাগ যেমন ধারালো ছিল, তেমনি তাদের প্রেসিং এবং বল দখলের ক্ষমতা কুরাসাওকে ম্যাচ থেকে পুরোপুরি ছিটকে দেয়।

ম্যাচ পরিসংখ্যান

পরিসংখ্যানজার্মানিকুরাসাও
গোল
বল দখল৭০%৩০%
মোট শট২৪
লক্ষ্যে শট১২
কর্নার
পাস সফলতা৯১%৭৪%

গ্রুপ এফ: নেদারল্যান্ডস ২-২ জাপান

ভেন্যু: ডালাস স্টেডিয়াম, টেক্সাস

প্রথমার্ধে গোলশূন্য থাকার পর ম্যাচটি দ্বিতীয়ার্ধে রূপ নেয় এক নাটকীয় লড়াইয়ে। ৫১তম মিনিটে রায়ান গ্রাভেনবার্খের ক্রস থেকে হেডে গোল করে নেদারল্যান্ডসকে এগিয়ে দেন অধিনায়ক ভার্জিল ভ্যান ডাইক। তবে ছয় মিনিট পরই কেইতো নাকামুরার নিচু শটে সমতা ফেরায় জাপান। ৬৪তম মিনিটে ক্রাইসেনসিও সামারভিল অসাধারণ একক প্রচেষ্টায় আবারও ডাচদের এগিয়ে দেন। মনে হচ্ছিল তিন পয়েন্ট নিশ্চিত। কিন্তু শেষ কথা বলার ছিল জাপানের। ৮৯তম মিনিটে জুনিয়া ইতোর কর্নার থেকে দাইচি কামাদার গোল জাপানকে গুরুত্বপূর্ণ এক পয়েন্ট এনে দেয়। এই ড্র প্রমাণ করল, জাপানকে হালকাভাবে নেওয়ার সুযোগ নেই।

ম্যাচ পরিসংখ্যান

পরিসংখ্যাননেদারল্যান্ডসজাপান
গোল
বল দখল৫৫%৪৫%
মোট শট১৪১২
লক্ষ্যে শট
কর্নার
পাস সফলতা৮৮%৮৫%

গ্রুপ ই: আইভরি কোস্ট ১-০ ইকুয়েডর

ভেন্যু: ফিলাডেলফিয়া স্টেডিয়াম, পেনসিলভানিয়া

দিনের সবচেয়ে কৌশলগত ও শারীরিক লড়াই দেখা যায় এই ম্যাচে। ইকুয়েডর প্রথম এক ঘণ্টায় বেশি আক্রমণাত্মক ছিল। জন ইয়েবোয়া ও নিলসন অ্যাঙ্গুলোর প্রচেষ্টা দুইবার ক্রসবারে লেগে ফিরে আসে। গোলের এত কাছে গিয়েও সফল হতে পারেনি দক্ষিণ আমেরিকার দলটি। অন্যদিকে আইভরি কোস্ট ধৈর্য ধরে নিজেদের সুযোগের অপেক্ষায় ছিল। ৯০তম মিনিটে উইলফ্রিড সিঙ্গোর দারুণ ওভারল্যাপিং রান থেকে আসা ক্রসে বদলি খেলোয়াড় আমাদ দিয়ালো নিখুঁত ফিনিশে ম্যাচের একমাত্র গোলটি করেন। শেষ মুহূর্তের এই গোল গ্রুপের সমীকরণ বদলে দিয়েছে।

ম্যাচ পরিসংখ্যান

পরিসংখ্যানআইভরি কোস্টইকুয়েডর
গোল
বল দখল৪৮%৫২%
মোট শট১৫
লক্ষ্যে শট
কর্নার
ক্রসবারে শট

গ্রুপ এফ: সুইডেন ৫-১ তিউনিসিয়া

ভেন্যু: মন্টেরে স্টেডিয়াম, মেক্সিকো

চতুর্থ দিনের সবচেয়ে ধারাবাহিক ও কার্যকর ফুটবল খেলেছে সুইডেন। মাত্র ছয় মিনিটে ইয়াসিন আয়ারি গোল করে দলকে এগিয়ে দেন। ২৯ মিনিটে আলেকজান্ডার ইসাক ব্যবধান বাড়ান। প্রথমার্ধের শেষ দিকে ওমর রেকিকের সেট-পিস থেকে তিউনিসিয়া একটি গোল শোধ করলেও দ্বিতীয়ার্ধে পুরো ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ নেয় সুইডেন। ৫৮ মিনিটে ভিক্টর গিয়োকেরেস গোল করেন। এরপর ম্যাটিয়াস সভানবার্গ চতুর্থ গোল যোগ করেন। যোগ করা সময়ে নিজের দ্বিতীয় গোল করে আয়ারি ৫-১ ব্যবধান নিশ্চিত করেন। এই জয়ের ফলে গোল ব্যবধানে গ্রুপ এফ-এর শীর্ষে উঠে গেছে সুইডেন।

ম্যাচ পরিসংখ্যান

পরিসংখ্যানসুইডেনতিউনিসিয়া
গোল
বল দখল৫৮%৪২%
মোট শট১৮
লক্ষ্যে শট
কর্নার
বড় সুযোগ

চতুর্থ দিনের ফলাফল

ম্যাচফলাফল
জার্মানি বনাম কুরাসাও৭-১
নেদারল্যান্ডস বনাম জাপান২-২
আইভরি কোস্ট বনাম ইকুয়েডর১-০
সুইডেন বনাম তিউনিসিয়া৫-১

দিনের মোট পরিসংখ্যান

সূচকসংখ্যা
মোট ম্যাচ
মোট গোল১৯
গড় গোল প্রতি ম্যাচ৪.৭৫
শেষ ১০ মিনিটে গোল
ক্লিন শিট
সর্বোচ্চ গোলদাতা দলজার্মানি (৭)

ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬-এর চতুর্থ দিন প্রমাণ করে দিল, এই আসরে কোনো ম্যাচই সহজ নয়। জার্মানি নিজেদের শিরোপা প্রত্যাশার ঘোষণা দিয়েছে, সুইডেন উড়ছে আত্মবিশ্বাসে, জাপান দেখিয়েছে লড়াইয়ের মানসিকতা, আর আইভরি কোস্ট শিখিয়েছে শেষ বাঁশি বাজার আগে ম্যাচ শেষ হয় না। টুর্নামেন্ট যত এগোচ্ছে, বিশ্বকাপের উত্তাপও ততই বাড়ছে। আর যদি চতুর্থ দিনের মতো নাটকীয়তা অব্যাহত থাকে, তাহলে ২০২৬ বিশ্বকাপ ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম স্মরণীয় আসরে পরিণত হতে পারে।

বিশ্বকাপ বিশ্লেষকদের মতে, জার্মানি ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬-এ দুর্দান্ত জয় দিয়ে নিজেদের শক্তির পরিচয় দিয়েছে। বহু বছর পর দলটিকে আবারও আত্মবিশ্বাসী, আক্রমণাত্মক এবং সুসংগঠিত দেখাচ্ছে। সাবেক আন্তর্জাতিক ফুটবলারদের মতে, জাপানের বিরুদ্ধে দুইবার এগিয়ে থেকেও জয় না পাওয়া নেদারল্যান্ডসের জন্য সতর্কবার্তা। অন্যদিকে জাপান তাদের মানসিক দৃঢ়তার পরিচয় দিয়েছে। ইকুয়েডরকে নিয়ে বিশেষজ্ঞদের আক্ষেপ একটাই—সুযোগ নষ্ট। তারা যদি গোলের সামনে আরও কার্যকর হতে পারত, তাহলে অন্তত এক পয়েন্ট নিয়েই মাঠ ছাড়তে পারত। সুইডেনকে এখন গ্রুপ এফ-এর ‘ডার্ক হর্স’ হিসেবে দেখা হচ্ছে। তরুণ ও অভিজ্ঞ খেলোয়াড়দের মিশ্রণে গড়া দলটি আক্রমণ ও রক্ষণ—দুই ক্ষেত্রেই ভারসাম্যপূর্ণ ফুটবল খেলছে।গ্রুপ ই-তে দক্ষিণ আফ্রিকার বিরুদ্ধে বড় জয় তুলে নিয়ে তারা পুরো টুর্নামেন্টের অন্য দলগুলোর জন্য সতর্কবার্তা পাঠিয়েছে।

গত দুই বিশ্বকাপে হতাশাজনক পারফরম্যান্সের পর জার্মানির ওপর ছিল বড় চাপ। কিন্তু এই ম্যাচে তারা শুরু থেকেই আক্রমণাত্মক ফুটবল খেলেছে। দলের একাধিক খেলোয়াড় গোল করেছেন এবং আক্রমণে দারুণ সমন্বয় দেখিয়েছেন।

দক্ষিণ আফ্রিকা একটি ভালো গোল করলেও জার্মানির শক্তিশালী আক্রমণ এবং সংগঠিত খেলার সামনে তারা টিকতে পারেনি। ম্যাচের শেষে জার্মানি সহজেই বড় ব্যবধানে জয় পায়।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এই পারফরম্যান্সের পর জার্মানি আবারও বিশ্বকাপের অন্যতম শিরোপা দাবিদার হিসেবে উঠে এসেছে। যদি তারা এই ফর্ম ধরে রাখতে পারে, তাহলে অন্য দলগুলো তাদের মোকাবিলা করতে সতর্ক থাকবে।

অন্যদিকে, গ্রুপ ই-এর আরেক ম্যাচে আইভরি কোস্ট গুরুত্বপূর্ণ জয় পেয়ে তিন পয়েন্ট সংগ্রহ করেছে। ইকুয়েডর ভালো খেললেও অনেক সুযোগ নষ্ট করেছে এবং শেষ পর্যন্ত পরাজিত হয়েছে। তারা ম্যাচে তিনবার পোস্টে বল মেরেছিল, কিন্তু গোল করতে ব্যর্থ হয়।

গ্রুপ ই-তে বর্তমানে জার্মানি সবচেয়ে শক্ত অবস্থানে রয়েছে। কাতারও ভালো অবস্থায় আছে। ইকুয়েডরকে পরবর্তী ম্যাচগুলোতে ভালো ফল করতে হবে, আর দক্ষিণ আফ্রিকার সামনে কঠিন চ্যালেঞ্জ অপেক্ষা করছে।

এদিকে গ্রুপ এফ-এ নেদারল্যান্ডস ও জাপানের ম্যাচে দারুণ লড়াই দেখা যায়। নেদারল্যান্ডস দুইবার এগিয়ে গেলেও জাপান দুবারই সমতা ফেরায়। ফলে ম্যাচটি ড্র হয় এবং দুই দলই একটি করে পয়েন্ট পায়।

গ্রুপ এফ-এর অন্য ম্যাচে সুইডেন ও তিউনিসিয়ার মধ্যেও নাটকীয় লড়াই হয়। ইনজুরি টাইম পর্যন্ত ম্যাচের ফল অনিশ্চিত ছিল এবং শেষ মুহূর্তে গোল হওয়ায় দর্শকরা রোমাঞ্চকর ফুটবল উপভোগ করেন।

এখন পর্যন্ত বিশ্বকাপ ২০২৬-এ বেশ কয়েকটি ম্যাচ শেষ মুহূর্তের নাটকীয়তায় ভরা ছিল। তবে এই দিনের সবচেয়ে বড় বার্তা এসেছে জার্মানির কাছ থেকে। তারা দেখিয়ে দিয়েছে যে বিশ্ব ফুটবলের শীর্ষে ফেরার জন্য তারা পুরোপুরি প্রস্তুত।

About The Author


Discover more from Jist Feed

Subscribe to get the latest posts sent to your email.

Leave a Reply

You missed