দৈনন্দিন জীবনের ছোট ছোট ঘটনা নিয়েই গড়ে ওঠে কাহিনী। ২০১২ সালের অমরনাথের পথে যেতে যেতে সঞ্চয় করা নানা রকম ছোট ছোট স্মৃতিমেদুর অভিজ্ঞতা নিজস্ব ভঙ্গিতে উপস্থাপন করেছেন লেখিকা, প্রীতিলতা ঘোষ
বহুদিন মনে ছিল আশা যাইবো অনরনাথ দর্শনে
মিটিল সে আশা ২০১২ সনে ।
১৯৯৬ সালে তুষার ঝড়ে বহু অমরনাথ তীর্থ যাত্রী মারা গিয়েছিলেন এবং বহু মানুষ নিখোঁজ হয়েছিলেন । যাঁদের দেহ মেলেনি তাঁদের পরিবার অনেক বিপর্যয়ের মধ্য দিয়ে দিন বাহিত করেছিল । মৃত্যু শংসাপত্র না পাওয়ায় তাঁর পরিবার LIC থেকে অফিস থেকে কোনো সহায়তা পাননি । ফলে অসহায় হয়ে পড়েছিলেন সেই সব পরিবার । পাশে দাঁড়াননি কেউ । এই আশংকায় আমাদের ও অমরনাথ দর্শনে বাধা ছিল । সময়ই সব বাধা দূর করে একদিন আমার সঙ্গীর অমরনাথ যাবার সাধ হল ।
২০১২ সালে ২৬ যে জুন আমরা জম্মু তাওয়াই ট্রেনে চেপে বসেছিলাম । ট্রেন চলা আরম্ভ হলে সহযাত্রীদের সঙ্গে আলাপ হলে দেখেছিলাম বেশীর ভাগই অমরনাথ যাত্রায় অমাদের সঙ্গী । আমাদের সামনে বসা এক মহিলা শুধু রেডিও শিল্পী ছিলেন । ট্রেন যাত্রায় আমরা দুজন এক বিশেষ পোষাক ( six pockets pant আর পকেট ওয়ালা শার্ট ) পরতাম । সেই পোষাক দেখে অন্যান্য যাত্রীরা বলেছিলেন আপনারা পৌঁছবেনই । সত্যিই আমরা খুব ভালো ভাবেই সব কিছু করতে পেরেছিলাম ।
একজন সহযাত্রী সুকেশ আগরওয়ালের সব সময়ই নজর ছিল আমাদের উপর । আমাদের খাবার , জল ইত্যাদির উপর সব সময়ই নজর রাখতো । নিজের ছেলে সঙ্গে থাকলে যা করতো সেই রকমই । দশ বছরে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়নি তার সঙ্গে । সে প্রতিবছরেই অমরনাথ দর্শনে যায় । এবছরেও সে গিয়ে ছবি পাঠিয়েছে । ভাগ্য সহায় থাকলে মনের ইচ্ছা পুরণ হবেই হবে । ভাল কাজ করলে, ভাল হওয়া থেকে কেউ আটকাতে পারবে না ।
জম্মুতে পৌঁছে আমরা জম্মু কাশ্মীর টুরিজম এর হোটেলে উঠেছিলাম । হোটেলে স্নান করে জিনিস রেখে ভগবতী নগরে গিয়েছিলাম । ওখানে থেকেই পহেলগাঁও যাবার বাস ছাড়ে , এবং ওখানেই বাসের টিকিট পাওয়া যাবে । অমরনাথ শ্রাইন বোর্ড এর ঐ বাস ই শুধু মাত্র পহেলগাঁও পৌঁছবে কোনো চেক হবে না । গাড়ি করে গেলে পথে দাঁড় করিয়ে চেক এর নামে অযথা দেরী করিয়ে দেবে ।
ভগবতী নগরে গিয়ে বাসের টিকিট এর জন্য দাঁড়িয়ে ছিলাম । এক ভদ্রলোক এসে আমাকে সবার প্রথমে দাঁড় করিয়ে দিলেন । আমিও দুটি টিকিট পেয়ে গেলাম । টিকিট হাতে নিয়ে বাইরে এসে দেখি ত্রিপলের নীচে রান্না করা খাবার থালায় নিয়ে অনেক মানুষ খাচ্ছেন। তখন দুপুরের খাবারের সময় হয়েছিল । আমি ডাঃ ঘোষকে বললাম আমি ওখানে খেতে যাচ্ছি । তুমিও চল । উনি বললেন , আমি ওখানে খাব না । আমি তো দেরাদুন রাইসের ভাত , ডাল, সবজি, পাঁপড় ,আচার নিয়ে খেতে শুরু করেছিলাম । এবার দেখি উনিও এসে যোগ দিলেন । খাওয়া শেষ হলে আমরা অটোয় করে হোটেলে ফিরেছিলাম । এবং ঐ একই অটো বুক করে নিয়েছিলাম, ভোর রাতে আমাদের বাস স্ট্যান্ড এ নিয়ে যাবে । ২০০/- টাকা নেবে ।
এদিকে আমরা রাতে অল্প খেয়ে তাড়াতাড়ি শুয়ে পড়েছিলাম । রাত দুটোয় অটো আসবে আমাদের নিতে । একটায় উঠে তৈরী হয়ে নীচে গেটের কাছে এসে সিঁড়িতে বসেছিলাম । সামনে বিশাল বড় একটা আম গাছ । গাছে ভর্তি আম । কিছু তলায় পড়েও আছে । ২৯ শে জুন । আম পাকার সময় । অত রাতে একটি অল্প বয়সী ছেলে আর এক মধ্য বয়সী মানুষ ঢিল ছুঁড়ে ছুঁড়ে গাছের আম পাড়ছে । আমরা অটোর অপেক্ষায় বসে আছি । একবার ছেলেটি বললো আমরা দিয়ে আসবো তোমাদের , ২০০/- টাকা দিও । আমরা বলেছিলাম অটোকে বলা আছে , নিতে আসবে । অপেক্ষা করার পরও অটো এলোনা, দুটো বাজার পর ওদেরকে বলেছিলাম পৌঁছে দিতে । আমরা গাড়িতে উঠে কিছুটা যাবার পর দেখি অটো আসছে । কি আর করা যাবে ।
পৌঁছে গিয়ে দেখি সারি সারি বাস দাঁড়িয়ে আছে । আমাদের টিকিটের নং দেখে বাসে উঠে বসেছিলাম । ব্যাগ গুছিয়ে বসার পর দেখেছিলাম বড় বড় গ্লাসে লোকে চা আর একটা বিস্কুট খাচ্ছে । বললাম ডাঃ ঘোষকে চা খাবে ? বললো না , তুমি খেয়ে এস । নেমে গিয়ে দুটো চা আর দুটো বিস্কুট নিয়ে ফিরে এলাম । খুব ভাল চা , বিস্কুটও ততোধিক ভাল ।
বাস যাত্রা শুরু হল ভোর সাড়ে চারটে। আটটা নাগাদ এক জায়গায় বাস দাঁড়ালো । সবাই নেমে পড়লাম । ওখানে ভাণ্ডারায় লুচি, আলুর তরকারী, সিমুই এর পায়েস, চা খেয়ে আবার বাসে । সারা রাতই প্রায় জেগেই কেটেছিল । কিন্তু পথ চলার আনন্দে চোখ বন্ধ করিনি একবারের জন্যও । পথের বাম দিকে নদী, পরেই ক্ষেত, তারপরে পাহাড় । এই সবের পাশ দিয়ে যেতে যেতে কি চোখ বন্ধ করে রাখা যায় !
একসময় আমরা পহেলগাঁও পৌঁছে গেলাম । ওখানে তাঁবু আছে, প্রচুর টয়লেট ও আছে । অনেকেই ওখানে থেকে গেল । আমাদের জম্মু কাশ্মীর টুরিজম-র এক ঘর বুক করা ছিল । ওখান থেকে একটা ছোট বাস এল, আমরা উঠে পড়লাম । দু কিমির মত পথ। পৌঁছে গিয়েও নামতে পারছিলাম না । পিছনে ব্যাগ সামনে ব্যাগ, গাড়ির দরদায় আটকে যাচ্ছিল । নীচে একটি ছেলে দাঁড়িয়ে ছিল , বলল কাকিমা তুমি নেমে এসো । আমি তোমার ব্যাগ নামিয়ে দিচ্ছি। ভাবলাম আমার চেনা কেউ হয়তো ! পহেলগাঁও-এ বাংলায় কাকিমা বলে কে ডাকবে। জিজ্ঞাসা করতে, বলল হাওড়া থেকে এসেছে , সঙ্গে বউ ছিল । বলল আমাদের দর্শন হয়ে গিয়েছে । আমরা ২৪ ফুট শিব লিঙ্গ দেখেছি । খুব ভাল দর্শন করেছি। ব্যাগ তো নামিয়ে দিল, উপরন্তু যে লাঠি নিয়ে অমরনাথ থেকে ফিরেছে, সেই লাঠিও দিল।
এবার আমরা টুরিস্ট লজ এর দিকে এগিয়ে গেলাম । তিনটে লজ আছে । প্রথমটায় গেলাম । বলল এটা নয়, উপরে উঠতে হবে। তখন খুব ক্লান্ত । শরীর বইছে না । উপায় নেই । উপরের দিকে হাঁটা শুরু করলাম । মনে হয় ভাগ্যবানের বোঝা ভগবানই বন। পিছনে একটা গাড়ি এসে দাঁড়িয়ে জিজ্ঞাসা করলো কোথায় যাবেন ? ঠিকানা বললাম, বলল উঠে পড়ুন। কিছুটা খাড়াই পথ গিয়ে নামিয়ে দিল, কেয়ার টেকার কে বলে দিল ভাল ঘর দিতে এবং লাগেজ নিয়ে যেতে। ভদ্রলোক যথেষ্ট বয়স্ক, খারাপ লাগছিল। আমাদের ঘরে লাগেজ নামিয়ে দিয়ে , বলে গেল কিছু লাগলে বলতে ।
রাতে শুয়ে পড়ে চিন্তা করছিলাম ডাঃ ঘোষের হাঁটুটা নিয়ে বেশ সমস্যায় পড়ছিলেন। হেলিকপ্টারে গেলে বেশ হয়। সকালে উঠে দেখি, মেন রোডে খুব ঝামেলা চলছে পুলিশের সঙ্গে স্থানীয় জনতার। ভয় পেয়ে গেলাম । কার্ফু জারি হয়ে গেল । ভাবলাম আমাদের কি গতি হবে ?কেউ কেউ বললো একটু পরেই কার্ফু উঠে যাবে । সত্যিই হল তাই ।
হেলিকপ্টারের টিকিটের খোঁজে হন্যে হয়েখুঁজে বেড়াচ্ছি । কত চিন্তা মাথায় । লাগেজ রেখে যেতে হবে , এসে থাকার জন্য ঘর বুক করে রাখতে হবে । কবে ফিরতে পারবো ঠিক নেই । তাই বুক করতে পারছি না । নীচের টুরিস্ট লজে তাৎক্ষণিক বুকিং হয়। ব্লক করা যাবে না ।
নীচের টুরিস্ট লজ দেখতে গিয়ে একজন জম্মুবাসীর সঙ্গে আলাপ হল । ভদ্রলোক ব্যাঙ্ক ম্যানেজার উনি পরিবার নিয়ে নিজের গাড়িতে এসেছেন । জোর করে আমাদের নিয়ে বেচাব ভ্যালী বেড়াতে নিয়ে গেলেন এবং আমাদের হোটেলটা দেখে গেলেন । পরের বারে এসে থাকবেন । তারপর ফিরে ওদের সঙ্গে আইসক্রীম খাওয়া, বেড়ানোর পরে উনি আমাদের জন্য হেলিকপ্টারের টিকিটের জন্য এখানে ওখানে গিয়ে অনেক চেষ্টা করে বিফল হয়ে হোটেলে ফিরে গেলেন। যেখানে টিকিট দেওয়া হয়, সেখানে একজন বলেছিল মন্ত্রী রাত আটট্য় আসবেন, তখন টিকিট পেতে পারেন । আবার রাতে গেলাম, শুনলাম দুদিনের টিকিট নেই, কারণ গত দুদিন হেলিকপ্টার বন্ধ ছিল । আমরাও বিফলমনোরথ হয়ে হোটেলে ফিরে এলাম ।
আমরা ফ্রেশ হয়ে বাইরে লনে এসে দেখি, জন বারো মহিলা ও পুরুষ বসে আড্ডা দিচ্ছেন । আমাদের দেখেই বাংলায় সাদর সম্ভাষণ করলেন । আমরাও বাঙালী পেয়ে অতিরিক্ত খুশী হলাম । একজন বললেন এঁদেরকে কে বাড়ি থেকে ছাড়লো ? হো হো শব্দে হেসে উঠলেন সবাই।
এখন তো সবার উদ্দেশ্য একই ,অমরনাথজী দর্শন ।
কথা আরম্ভ হতেই বললেন সঙ্গে গাড়ি আছে ? ভোরে চন্দনবাড়ি যাবার ? বললাম না। বললেন আমরা এগারো জন, দুটো টাটা সুমো গাড়ি আছে। বললাম আমাদের হবে ? অল্প বয়সী ছেলেটি বললো আমার কোনো আপত্তি নেই । তখন অন্যান্য রা ও বললেন আমাদের কোনো আপত্তি নেই । তাড়াতাড়ি শুয়ে ভোর বেলায় উঠে তৈরী হয়ে ওনাদেরগাড়িতে উঠে বসেছিলাম । ওনাদের একজন বললেন আপনারা এসে বসায় গাড়ির ঝাঁকুনির থেকে রেহাই পাওয়া গেল ।
নির্বিঘ্নে পৌঁছলাম চন্দনবাড়ি ।
এখানে পৌঁছে এক বিপত্তি হল । প্রচুর লোক জড়ো হওয়ায় বিশাল চিৎকার চেঁচামেচিতে ডাঃ ঘোষের টেনসন বেড়ে গিয়ে উনি ওনার পর্চি খুঁজে না পেয়ে ব্যাগ হাতড়ে খোঁজারবৃথা চেষ্টা করছিলেন। এদিকে পর্চি আগেই আমার হাতে দিয়ে রেখেছিলেন । আমিও নার্ভাস হয়ে, না দেখে ওনার কাজে সাহায্য করছি । এদিকে দেবাশীষ ( যাঁদের গাড়িতে এসেছি ) আমাদের জন্য ঘোড়ার ব্যবস্থা করে রেখেছে, লাইনে দাঁড়াতে বলছে । আমি কিংকর্তব্য বিমুঢ় হয়ে ওনাকে ছেড়ে লাইনে দাঁড়ালাম। এবার স্থির হয়ে দাঁড়াবার পর দেখি ওনার পর্চি আমার হাতে । আমি দল ছাড়া হয়ে গিয়েছি । আমি তৎক্ষনাত গেটের কাছে গিয়ে বললাম ঘোষণা করতে যে ডাঃ ঘোষের পর্চি প্রীতিলতা ঘোষের কাছে আছে ভিতরে। সুবিধা হল এই যে ওনাকে ২০০ জনের পিছনে লাইনে দাঁড়াতে হল না অনেক আগেই গেটের ভিতরে চলে এসেছিলেন ।
ঘোড়া ওলাদের চিৎকার, ভাণ্ডারওয়ালাদের চিৎকারে উনি অতিষ্ঠ হয়ে চিৎকার করে আমাকে বললেন, এ আমায় কোথায় নিয়ে এলে, আমি এসব একদম পছন্দ করি না। আমি তো খুব ভয় পেয়ে গেলাম । ঘোড়া ওয়ালারা বলছে চিৎকার করে , ঘোড়া নেবে ঘোড়া নেবে ।ওদেরকে ঠোঁটে আঙুল দিয়ে চুপ করতে বলে আমরা এগিয়ে গিয়ে ঘোড়া নিলাম একটা । আমি তো হেঁটেই যাব ঠিক ছিল । উনি বললেন তাহলে আমরা আলাদা হয়ে যাব । অগত্য আমিও ঘোড়ার পিঠে চড়ে বসলাম । ঘোড়ার মানুষ গুলো খুবই ভাল ।
বিভৎস খাড়াই পিসু টপ পৌঁছে গেলাম।
পিসু টপে উঠতে উঠতে উনি ছবি তুলছিলেন, কিন্তু খাড়াই পথে যেতে যেতে ছবি তুলতে গিয়ে ভয়ংকর খারাপ যদি কিছু ঘটে। এই ভেবে ওনার কাছ থেকে ক্যামেরা নিয়ে নিলাম । ক্যামেরা অন করে শুধু চোখে যা দেখছি তাই তুলে নিয়েছি ক্যামেরার দিকে না তাকিয়ে। হয়তো ওখানে কোন বানরের হাতে ক্যামেরা দিলে একই ছবি হত। এখন আক্ষেপ হয় কেন অনেক ভিডিও তুলিনি। এক হাতে লাগাম ধরে অন্য হাতে ক্যামেরা নিয়ে ছবি তোলা চলন্ত ঘোড়ার পিঠে খাড়াই পথে অসম্ভব। আমার তো মনে হচ্ছিল, যা হবার হবে, অমরনাথজীর নাম করতে করতে গিয়েছি। পিসু টপের পরে দু কিমি ঘোড়া থেকে নেমে হেঁটে যেতে হল । পথে একটা বড় জলপ্রপাত ছিল। খুব সুন্দর। সেখানে ঘোড়া ওয়ালারা ঠান্ডা পানীয় খেতে চাইলো। খাওয়ালাম ।
আবার ঘোড়ায় উঠে শেষনাগে পৌঁছলাম।
এখানে ঘোড়া ছেড়ে দিলাম। শেষ নাগের জলে বড় বড় থালার মত বরফ ভাসছে । চারিদিকে বরফাচ্ছাদিত পর্বত চুড়া। বরফ গলা জলে লেক পূর্ণ হয়ে নদী হয়ে নীচে নেমে আসছে। স্থির জলে বরফ চুড়ার প্রতিবিম্ব লেকের সৌন্দর্য বাড়িয়ে দিয়েছে। বর্ণাতীত সৌন্দর্য, এই সৌন্দর্যের টানেই মানুষ ছুটে যায়। লেকের কাছে নেমে দাঁড়ালাম। অনেক তাঁবু টাঙানো আছে। বড় তাঁবুতে রান্না হচ্ছে তীর্থযাত্রীদের জন্য ।
লেকের কাছে দাঁড়িয়ে মনে হচ্ছিল আমরা কত তুচ্ছ এই প্রকৃতির কাছে। সেবার তুষার ঝড়ে কত মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন। কত মানুষের দেহ মেলেনি। পরিবার সর্বশ্রান্ত হয়েছে।
শেষনাগ পর্যন্ত ঘোড়াওলাদের টাকা মিটিয়ে কিছু বখশিস দেওয়ায় ওরা খুব আনন্দ পেল। পরের ঘোড়াওলাদের বলল মাইজীদের খুশী করে দেবে । নতুন ঘোড়াওলা এল, ওনারাও খুব ভাল। পিঠ পেতে দিয়ে বলছে পিঠের উপর জুতো শুদ্ধ পা দিয়ে ঘোড়ার পিঠে উঠতে । আমরা কিছুতেই উঠবো না । কিন্তু অন্য জায়গায় পা দেবার ব্যবস্থাও নেই , অগত্যা ।
ডানদিকে তিনটি পাহড় ,বরফে ঢাকা ওরা বললো এঁনারা ব্রহ্মা বিষ্ণু মহেশ্বর। চারিদিকেই বরফ। আমাদের বরফের উপর দিয়েই যেতে হবে। পায়ে হেঁটে গেলে তিন দিন লাগবে। সবাই শেষনাগে রাত কাটায়। আমরা থাকলাম না ।
এক জায়গায় ঘোড়া থেকে নেমে মধ্যাহ্নভোজ সারলাম। অত দুর্গম জায়গায় দেরাদুন চালের ভাত, রাজমা, আচার, পাঁপড় সহযোগে খেলাম। কত কষ্ট করে ওরা নিয়ে এসেছে আমাদের জন্য। তারপর আবার শরবত নিয়ে হাজির। খেতে পারছি না। চলন্ত ঘোড়া দাঁড় করিয়ে দিচ্ছে।
জায়গায় জায়গায় ছোট ছোট ঠান্ডাপানীয় ও দিচ্ছে। ওখানে তীর্থযাত্রীদের খাবার ব্যবস্থা আছে। আমরা খেলাম ও। কিন্তু ঐ মানুষগুলোর জন্য কোন খাবারের ব্যবস্থা নেই। বাইরে দোকান আছে। ওরা যা খেতে চাইল খাওয়ালাম। আবার ঘোড়া চলতে শুরু করলো। প্রাকৃতিক সৌন্দর্য দেখতে দেখতে চললাম।
এবার মহাগুণাপাশে এলাম।
এই সেই মহ্গুণাপাশ যেখানে মহাদেব পার্বতিকে গোপনে কানে কানে কি করে অমর হওয়া যায় বলার জন্য এসেছিলেন। সঙ্গে গণেশ ছিল , গণেশকে এইখানে রেখে মহাদেব দুর্গাকে নিয়ে গুহায় গিয়েছিলেন বলার জন্য। গণেশকে এখানে রেখেছিলেন বলে তাই এই জায়গার নাম মহাগুণাপাশ। উচ্চতা ১৫,৪৭৫ ফুট। আমরা বিস্ময়ে তাকিয়ে আছি চারিদিকে। কি দেখছি, আ--হা যে দিকে তাকাই নানা রঙের পাহাড়। নানা রকম ছবি দেখতে পারছি পাহাড়ের গায়ে, নানা নকসা। ঘোড়াওলাদের বললাম একটু দাঁড়াও ভাল করে দেখি। খুব রেগে গিয়ে বলল, এখানে কি দাঁড়াবো ? জানো এটা মহাগুনাশ, এখানে সব ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল। এখানে শিব দূর্গাকে আর গণেশকে নিয়ে এসেছিল । ডানদিকে অনেক নীচে দেখছি মানুষ ফিরে যাচ্ছে শেষনাগের দিকে । অতঃপর আমরাও সামনে পিছনের ছবি নিতে নিতে এগিয়ে গেলাম ।
পঞ্চতনণীর পথে
মহাগুণাপাশ পেরিয়ে আমরা পঞ্চতরণীর দিকে এগিয়ে চললাম । মনে মনে ভাবলাম পঞ্চতরণী পৌঁছে একটু বিশ্রাম নিতে পারবো হয়তো । পঞ্চতরণী তে এসে আবার ঘোড়া বদল করতে হবে । এই ঘোড়া যাবে না । তখন প্রায় সাড়েতিনটে বাজে । সাড়েতিনটের পর গেট বন্ধ হয়ে যাবে । তাই খুব তাড়াতাড়ি গেট পার হতে হল । কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে সৌন্দর্য দেখবো তারও উপায় ছিল না । পঞ্চতরণী পৌঁছে গেলাম । খুব সুন্দর জায়গা । বড় ভ্যলি। দূরে দূরে পাহাড় । পাহাড় থেকে পাঁচটি নদী এসেছে । তাই নাম পঞ্চতরণী । উচ্চতা 3637 মিটার । পাঁচটি নদীর নাম ভীমা, সরস্বতী, ভগবতী, ঢাকা ও বর্ণশিখা । নদীর উপর একটি সেতু রয়েছে । সেই সেতুর উপর দিয়ে ঘোড়ায় চড়ে পার হলাম ।
খুবই ক্ষিদে পেয়েছিল। কিন্তু উপায় ছিল না ক্ষিদে মেটাবার । অনেক ভাণ্ডারা আছে কিন্তু সময় নেই খাবার । গেট পার হয়ে কিছুটা গিয়ে দেখি বিশাল যানজট । পঞ্চতরণী থেকে ভবনের দিকে মানুষ চলেছে, আবার ভবনের দিক থেকেও মানুষ এদিকে আসছে । ওদিকে বালতালের দিক থেকেও ভবনের দিকে মানুষের স্রোত চলেছে, আবার উল্টো দিকে বালতালের দিকেও যাচ্ছে মানুষের ঢল । ক্রসিং এর যানজট এর পরিস্থিতি। ঘোড়াওয়ালাকে বললাম এগিয়ে যেতে । ও কিছুতেই যাবে না পুলিশের ডাণ্ডা খাবার ভয়ে । শরীর আর দিচ্ছে না। ঘোড়ার পিঠে মাথা রেখে শুয়ে থাকলাম । তাতেও কিছু হল না । এক পুলিশ কে বললাম শরীর খারাপ লাগছে । তখন আমাদের লাইন ছেড়ে দিল । একটু একটু করে এগিয়ে চলছিল লাইন । একটু উপরে উঠতেই ভবন দেখা গেলো, আর তীর্থযাত্রীদের চিৎকার জয় অমরনাথ জী কি জয় । সামনে ভবনকে দেখতে দেখতে আমাদের ঘোড়া এগিয়ে চলেছে । পৌঁছে গেলাম একসময়ে । তাঁবু নেওয়া হল বেশ বড়। কিন্তু আমারা দুজন । ভিতরে গিয়ে একটু শুয়ে পড়লাম । তারপর toilet দেখতে গেলাম । টিন দিয়ে ঘেরা জায়গা ভিতরে বড় একটা গর্ত । বেরিয়ে এসে ওনাকে বললাম তুমি দেখে এসো । উনি যাবার পর এক মহিলা জল নিয়ে বাইরে অপেক্ষা করছিলেন । ওনারা যাত্রীদের সেবা দিতে আসেন । তাঁবুর ভিতরে আমাদের খাবার, চা, খাবার জন্য গরম জল নিয়ে অশোক অপেক্ষা করছিলেন । তাঁবুর মালিক অশোক । মুসলিমদের একটি হিন্দু আর একটি মুসলিম নাম থাকে । ভেবেছিলাম সন্ধ্যর পর ভবনে গিয়ে একবার দর্শন করে আসবো । কিন্তু তাঁবুর বাইরে বেরিয়ে দেখি প্রায় দেড় কিলোমিটার অসমান পাহাড়ি পথে সন্ধ্যা বেলায় একা যাওয়া উচিত হবে না । তাই ফিরে এসে খেয়েদেয়ে তাড়াতাড়ি শুয়ে পড়লাম । জ্যাকেট সোয়েটার ইনার টুপি সব শুদ্ধু শুয়ে পড়লাম । শুয়ে পড়ার পর অশোক তাঁবুতে ঢুকে আরও দুটো রেজাই আমাদের গায়ে দিয়ে গেলো । বললাম তুমি মামাদের এত করছো, ভাবা যায় না ! উত্তরে ও বলেছিল তোমরাই তো আমাদের মা বাবা । বাড়িতে মা বাবাকে তোসেবা করি । তোমাদের করবো না !
আরও বললো রাত্রে দরকার হলে আমাকে ডেকো । সামনের তাঁবুতে আমি আছি । আমিতো শুয়েই ঘুমিয়ে পড়েছিলাম । সারাদিন ঘোড়ার পিঠে । আগের দিন সারা রাত জেগে । অত ক্লান্ত ঘুম তো আসবেই । কিন্তু ডাক্তারের তো ঘুম নেই বা ঘুমিয়ে পড়ার পর ভুল বকা শুরু হলো । বাড়ীর যত মৃৎ গুরুজনদের সঙ্গে কথা বলা শুরু হলো । আমি খুব ভয় পেয়ে গেলাম । ঘুম চলে গেল । ভাবলাম কখন ভোর হবে । জেগে অমরনাথজী কেই ডাকতে শুরু করলাম । অত রাতে হাড় কাঁপানো ঠান্ডায় মানুষ বাইরে বেরিয়েছে ডাক্তারের খোঁজে । কার ও প্রেশার বেড়ে গেছে আর কারের বা অন্য কিছু সমস্যা । সমতলে হলে ওনাকে ডেকে তুলে বলতাম যাও ওনাদের কি সমস্যা দেখো । কিন্তু এখানে ওনার নিজের ই সমস্যা কি আর করা যাবে ।
একসময় ভোর হল । বাইরে বেরিয়ে ছবি তুললাম ।
তারপর কিছুপরে ওনাকে ডেকে তুলে ভবনের দিকে এগোতে লাগলাম । পথের দুপাশে মানুষ যেখানে সেখানে প্রকৃতির ডাকে সাড়া দিতে বসে পড়ছেন । কিছুটা এগিয়ে ঘোড়ায় চড়ে বসলাম। ভবনের নীচে পৌঁছে গেলাম। বরফের ঊপর দিয়ে হেঁটে যদি বিপদ হয় তাই ডুলিতে করে অমরনাথ জির কাছে গেলাম । ডুলিতে যাবার সময় একজন আমাদের পিছনে আসছিলেন । বললাম আপনি কেন আসছেন ! ভাবলাম আবার বেশী টাকা দিতে হবে হয়তো ।
মহাদেবের সামনে দাঁড়িয়ে বুকের মধ্যে ধড়াশ ধড়াশ করতে লাগলো । বিশ্বাস করতে কষ্ট হচ্ছিলো । সত্যি আমরা অমরনাথজীর সামনে দাঁড়িয়ে ! খুব ভোরে আরতি হচ্ছিল, মহাদেবের উদ্দেশ্যে গান বাজছিল। বেশ কিছুক্ষণ রইলাম । চারিদিকে তাকিয়ে দেখলাম ।এ জীবনে আবার কি আসবে এমন দিন !
অমরনাথজী কে দর্শন করে প্রসাদ নিয়ে দেখি জুতো নেই। তখন দেখি সেই লোকটি আমার জুতো জোড়া হাতে করে নিয়ে আসছে আমার দিকে । তখন বুঝলাম ঐ লোকটি কেন আমাদের সাথে এসেছিল। ঘোড়ার পিঠে করে তাঁবুতে ফিরে ব্যগ নিয়ে বালতালের দিকে এগোতে লাগলাম ।
ঘোড়ার পিঠে চড়ে নামছি বালতালের দিকে । খাড়াই রাস্তা দিয়ে নামতে যথেষ্ট ভয় করছিল । ঘোড়ার পিঠে সোজা হয়ে বসে পিছন দিকে হেলে বসে নামছি । কিছুটা যাবার পর একটা ভাণ্ডারা পেয়ে নেমে বড় বড় লুচি আলুর তরকারি চা খেয়ে আবার চলা শুরু হলো । বালতালে নামার পর ছোট বিস্কুটের প্যাকেট চানাচুর চকোলেট পানের মশলা ইত্যাদি নিয়ে আবার ঘোড়ায় উঠে মেন রোডে নেমে বাসের অপেক্ষায় থাকলাম । বাস ছাড়তে তিন ঘণ্টা দেরি । অপেক্ষা ছাড়া গতি নেই । গাড়িতে গেলে অনেক তাড়াতাড়ি পৌঁছতে পারতাম পহেলগাঁও। গাড়ি না পাওয়াতে বাসেই যেতে হবে । দুপুর একটায় বাস ছাড়লো ।
পহেলগাঁও পৌঁছাতে রাত দশটা বেজে গেল। বাস থেকে নেমে আবার অটোতে করে জম্মু কাশ্মীর tourism এর হোটেলে যেতে হবে । গেলাম অটো থেকে নেমে দেখি সব বন্ধ । অনেক উঁচু গেট । ডাকাডাকিতে ও কারোর ঘুম ভাঙলো না । তখন অটো চালক গেট টপকে ওপারে গিয়ে দরজায় ধাক্কা মারতে গেট খুলে দিলো । আমরা হোটেলে এলাম । এই হোটেলের ভাড়া সব চেয়ে কম । এই হোটেল spot booking হয় ।
যাবেন কিভাবে ? খরচ কেমন এই অমরনাথ যাত্রার ?
কেউ যদি তীর্থ করতে, পূণ্য অর্জন করতে বা প্রকৃতি দর্শনের ইচ্ছায় যায় তবে বলবো একটু বেশী সময় নিয়ে ট্রেনে চেপে বসুন। জম্মুতে নেমে অটোয় করে ভগবতী নগর পৌঁছে যান। ওখানে থাকা খাওয়া বিনা পয়সায়। পৌঁছে বাসের টিকিট করে নিন। টিকিটে বাসের নং দেওয়া থাকবে। পরদিন ভোরে বাস ছাড়বে ঐ জায়গা থেকে। ট্রেনের টিকিট, অটো বা বাস আর বাসের টিকিট, টেন্টে রাত কাটোনো এই হল আপনার খরচ। ভোরে বাস ছাড়ার আগে অনেক ভাণ্ডারা থেকে বড় গ্লাসে চা আর বড় বিস্কুট আপনাকে খাওয়াবে । বাস নির্দিষ্ট সময়ে চলতে শুরু করলে জলখাবার খাওয়ার সময়ে রাস্তার পাশে লুচি , আলুর তরকারী, মিষ্টি, হালুয়া গরম গরম খাবার নিয়ে ভাণ্ডারা আছে । চা ও আছে তবে যাতা চা নয় ঘন দুধ দিয়ে তৈরী চা। চা এর গ্লাস হাতে নিয়ে বাসে এসে বসুন। সবাই বাসে এসে বসার পর বাস চলতে শুরু করবে। দুপুরের খাবার সময়ে ঠিক বাস ভাণ্ডারার সামনে এসে পৌঁছে যাবে। সন্ধ্যা আগে পৌঁছে যাবেন পহেলগাঁও। এখানে তাঁবুতে থাকবেন। খাওয়াও মিলবে বিনা পয়সায় । ভোরে বাস ছাড়বে চন্দনবাড়ী পৌঁছে দেবে যেখান থেকে অমরনাথ যাত্রা শুরু হবে ।তাঁবু খরচ সামান্য। চন্দনবাড়ী পৌঁছে লাইন দিতে হবে পরচি ( অমরনাথ যাওয়ার Shrine Board এর স্ট্যম্প মারা কাগজ )হাতে নিয়ে । গেট থেকে বেরিয়ে হেঁটে,ডাণ্ডি অথবা ঘোড়া শরীর বুঝে আপনি বেছে নেবেন আপনার বাহন। এইভাবে আপনি পৌঁছে যাবেন ভবনে ( অমরনাথ গুহায় )।
বিলাসিতা করে আপনি যদি ফ্লাইট এ যান এবং নেমে গাড়ী করে পহেলগাঁও যান তবে যাবার পথে আপনার গাড়ী বহু জায়গায় দাঁড় করিয়ে চেক করবে। একমাত্র সরকারী ব্যবস্থাপনায় এই বাস চেক করে না। আমরাও এই বাসে ই গিয়েছিলাম ।
তাছাড়া এই যাত্রায় অনেক উচ্চতা জনিত সমস্যার হাত থেকে রেহাই পাওয়া যায়। হোটেলে ছিলাম, সরকারী তাঁবুতে থাকিনি । তাঁবু বেশ ভালোই, পর্যাপ্ত পরিমাণে টয়লেট ও জল থাকে। দেরাদুন রাইসের ভাত, রাজমা, পাপড়, আচার, নানা রকমের খাবার, বিস্কুটের প্যাকেট, চানাচুর, সিমুই এর পায়েস, শরবত, নানা রকমের মিষ্টি কি নেই ? অনেক ভাণ্ডারায় পৌঁছতেই পারিনি ভয়ে। জোর করে খাইয়ে দেবে। বিভিন্ন রাজ্যে মানুষ ভাণ্ডারা দিয়েছেন। সত্যি বলতে পশ্চিমবঙ্গের মানুষের কোন ভাণ্ডারা চোখে পড়েনি। অন্য রাজ্যের মানুষ পূণ্যলাভের আশায় ভাণ্ডারা দেন। আমাদের পশ্চিমবঙ্গের মানুষ পূণ্য নিয়েই জন্মেছে মনে হয় ।
নির্ভয়ে কম খরচে অমরনাথে যান । তবে একটা কথা মনে রাখা দরকার, পয়সা থাকলে মানুষ আমেরিকা যেতে পারে কিন্তু স্বাস্থ্য ভাল না থাকলে অমরনাথ যাওয়া সম্ভব নয়। স্বাস্থ্যই সম্পদ , স্বাস্থ্য ভাল রাখুন অমরনাথে পৌঁছে যাবেন ॥

