Site icon Jist Feed

উদিত সূর্যের দেশ অরুণাচল.. প্রথম ভাগ

Arunachal Landscape

নিজস্ব চিত্র

অরুণাচল ট্রেক, প্রীতিলতা ঘোষ
তারিখ: ০২.০৫.২০০৯

পূর্বে মায়ানমার, উত্তরে তিব্বত ও চীন, পশ্চিমে ভুটান—এই তিন দিক জুড়ে অরুণাচলের অবস্থান। চীন থেকে উৎপন্ন ব্রহ্মপুত্র নদ পূর্ব দিক দিয়ে অরুণাচলে প্রবেশ করে উত্তর থেকে দক্ষিণে প্রবাহিত হয়েছে। রাজ্যের প্রায় ৬২ শতাংশ অঞ্চল বনভূমিতে আচ্ছাদিত।

আগে এই অঞ্চলটির নাম ছিল North East Frontier Agency (NEFA)। ১৯৭২ সালের ২০শে জানুয়ারি এর নামকরণ হয় ‘অরুণাচল’। এখানে ভোর ৪টা-৩০ মিনিটেই সূর্য ওঠে, তাই এর নাম ‘অরুণাচল’—উদিত সূর্যের দেশ।

অনেকদিনের স্বপ্ন হঠাৎই বাস্তবে রূপ নিল। National Himalayan Trekking Expedition-এর একটি ট্রেকিং দলে অরুণাচল যাওয়ার সুযোগ এল, আমরাও তাদের সঙ্গে যোগ দিলাম। তাদের সঙ্গে যাওয়ার সুবিধা ছিল—নিজেদের আলাদা করে পারমিশন নিতে হয়নি।

অনলাইনে ফর্ম পূরণ করে মাথাপিছু ৫০০০ টাকা জমা দিয়ে অপেক্ষা করছিলাম। আমাদের আবেদন মঞ্জুর হয়ে গেল। ২রা মে আমরা কাঞ্চনজঙ্ঘা এক্সপ্রেসে রওনা দিলাম।

৩রা মে গুয়াহাটি পৌঁছে স্নান-খাওয়া সেরে আশেপাশের কিছু দর্শনীয় স্থান ঘুরে দেখলাম। আমরা ‘ছয় মাইল’ নামে একটি জায়গায় ছিলাম। বিকেলে ট্রেকিং দলের অন্যান্য সদস্যদের সঙ্গে পরিচয় হল। আমরা ছিলাম মোট ছয়জন। ডাঃ ঘোষ ছিলেন বয়সে সবচেয়ে বড় এবং আমাদের কো-অর্ডিনেটর। তারপর আমার বয়স, তারপর আরও তিনজন। সবচেয়ে ছোট সদস্যটির বয়স ছিল ২৬ বছর—সে ব্যাঙ্গালুরুতে এমবিএ পড়ছিল।

পরদিন সকালের জলখাবার সেরে এক শুভ অনুষ্ঠানের মাধ্যমে আমরা বমডিলার উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করি। পথে ভালুকপঙে দুপুরের খাবার খেয়েছিলাম। ভালুকপঙ আসাম ও অরুণাচলের সীমান্তে অবস্থিত। সেখানে জীয়াভরলী নদী দেখতে গিয়েছিলাম—নামটিই যেন সুরেলা! পাহাড় থেকে নেচে নেমে আসা নদীটি দু’পাশের সবুজ গাছপালার মাঝে আরও সুন্দর হয়ে উঠেছে।

গুয়াহাটি থেকে প্রায় ৩৪২ কিলোমিটার দূরে বমডিলা। সন্ধ্যার একটু আগে আমরা সেখানে পৌঁছাই। খুব সুন্দর একটি হোটেলে আমাদের থাকার ব্যবস্থা হয়েছিল—তিনতারা না চারতারা, ঠিক বুঝিনি, তবে আরামদায়ক ছিল। রাতে খুব ভালো ডিনার করেছিলাম।

পরদিন সকালে জলখাবার খেয়ে আমরা রক ক্লাইম্বিং শেখার জন্য বেরোলাম। আমাদের ফর্মে উল্লেখ ছিল—রক ক্লাইম্বিং, ট্রেকিং, নদী পার হওয়া, এবং জুমারের সাহায্যে এক পাহাড় থেকে আরেক পাহাড়ে যাওয়া—এসবের প্রশিক্ষণ নিতে হবে।

কিছু তরুণ-তরুণী ট্রেনার আমাদের শেখাতে এল। পাহাড়ে চড়ার জায়গায় নিয়ে যাওয়া হল। আমার আগে একটি রক ক্লাইম্বিং কোর্স করা ছিল, তাই ভেবেছিলাম বেশ মজাই হবে। কিন্তু গিয়ে যা দেখলাম, তাতে ভয় পেয়ে গেলাম—একদিকে খাড়া পাহাড়, অন্যদিকে গভীর খাদ, মাঝখানে মাত্র ছয় ইঞ্চি জায়গা! সেই সরু পথ ধরে উঠতে হবে!

আমি ঠিক করলাম, উঠব না। কারণ আমি উঠলে ডাঃ ঘোষও উঠবেন—তাঁর যদি কিছু হয়! কিন্তু মণিপুরের ট্রেনাররা যখন এগিয়ে এসে হাত বাড়িয়ে বলল, “ম্যাডাম”, তখন অদ্ভুত এক সাহস পেয়ে গেলাম। শুধুমাত্র পায়ের দিকে তাকিয়ে ধীরে ধীরে উঠে গেলাম। চারপাশে তাকানোর সাহস করিনি—ভয় ছিল মাথা ঘুরে পড়ে যাব।

দুপুরে ফিরে দারুণ লাঞ্চ করলাম। কাছাকাছি দুটি মঠ (মনাস্ট্রি) ঘুরে দেখলাম। তারপর গাড়িতে করে নামসু গ্রামে পৌঁছালাম। একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে আমাদের থাকার ব্যবস্থা হয়েছিল।

সামনে বিশাল মাঠ, দূরে পাহাড়, পাহাড়ের কোলে ছোট ছোট গ্রাম। প্রতিটি বাড়ির ছাদে লাল টিন, চারদিকে সবুজ আর ফুলের সমারোহ। নানা রঙের ফুলে প্রকৃতি যেন অপূর্ব হয়ে উঠেছে। দূরে পাহাড়ের মাথায় একটি গুম্ফা দেখা যাচ্ছিল। সবাই বলল, পরদিন সেখানে যাওয়া হবে। আমি তখনই বলেছিলাম—আমি যাব না! তখন জানতাম না, সেই গুম্ফার পাশ দিয়েই আমাদের ট্রেকিং শুরু হবে।

সন্ধ্যায় আমরা মাঠে বসেছিলাম। চারিদিকে চাঁদের আলো ছড়িয়ে পড়েছিল। আমরা গান ধরেছিলাম—“চাঁদের হাসির বাঁধ ভেঙেছে…”। তারপর রাতে তারকার আলোয় খাওয়া সেরে শুয়ে পড়লাম।

পাশেই গ্রাম। গ্রামের মানুষ সন্ধ্যা হলেই ঘুমিয়ে পড়ে—কারণ সেখানে বিদ্যুৎ নেই। কিন্তু সারারাত আমরা এক অদ্ভুত শব্দ শুনছিলাম—যেন করাত দিয়ে কাঠ কাটা হচ্ছে! আশ্চর্য হয়ে কুকদের জিজ্ঞেস করায় তারা বলল—ওটা ব্যাঙের ডাক। পাহাড়ি ব্যাঙের ডাক নাকি এমনই হয়!

আমাদের সঙ্গে দু’জন কুক ছিল। আমার একজন পোর্টার প্রয়োজন ছিল। বলতেই কুকদের একজন সেই দায়িত্ব নিল। স্কুলঘরে ম্যাট্রেস, স্লিপিং ব্যাগ, বালিশ সবই দেওয়া ছিল।

এপ্রিল মাস থেকেই এই ট্রেক শুরু হয়েছিল। প্রতিদিন ছয়-সাতজনের একটি দল এগিয়ে যেত।

সকালে মুখ ধুতে গিয়ে দেখি, কল খোলা—সারারাত জল পড়েছে। বন্ধ করতে গিয়ে পারলাম না। একজন কুককে বললাম—“কলটা বন্ধ করে দাও, জল নষ্ট হচ্ছে।” সে হেসে বলল—“এটা ঝরনার জল, বন্ধ হবে না।”

এক প্যাকেট ম্যাগি আর চা খেয়ে আমরা ট্রেকিং শুরু করলাম। প্রচুর উদ্যম নিয়ে রওনা দিলাম চাঁদেরের উদ্দেশ্যে—সেই দূরের গুম্ফার দিকে।

ক্রমশ ….

Exit mobile version