অরুণাচল ট্রেক, প্রীতিলতা ঘোষ
তারিখ: ০২.০৫.২০০৯
সুপ্রভাত
প্রথমে গ্রামের ছোট ছোট বাড়ির পাশ দিয়ে যেতে যেতে একটি ঢালু পাহাড় বেয়ে উঠতে হলো। জায়গাটা বেশ খাড়াই ছিল। আস্তে আস্তে উঠতে লাগলাম। পিছন ফিরে দেখছিলাম ড. ঘোষ কোথায় এবং কীভাবে উঠছেন। একটু ভয় ভয় করেই তাকাচ্ছিলাম। দেখলাম উনি সাবধানে উঠছেন।
একসময় আমরা সবাই পৌঁছে গেলাম। গুম্ফা দেখলাম। বুদ্ধের মূর্তির সামনে নত হয়ে প্রণাম করলাম। চারিদিকের সৌন্দর্যে আমরা মুগ্ধ হয়ে ছবি তুলে রাখলাম। উপর থেকে অনেক দূর পর্যন্ত দেখা যাচ্ছিল। নীল আকাশের কোলে পাহাড়, পাহাড়ের কোলে সবুজ বনানী—সকালের সূর্যের আলো পড়ে প্রকৃতিকে মোহময়ী করে তুলেছিল।
আবার পথ চলা শুরু হলো। এবার জঙ্গল ঘন হতে লাগলো। বড় বড় গাছের জঙ্গলে আমরা প্রবেশ করলাম। জঙ্গলের একটি আলাদা গন্ধ আছে—আপনি যদি জঙ্গল ভালোবাসেন, তবে তা অনুভব করতে পারবেন।
নতুন জায়গা দেখা, বুনো ফুল চেনা—এইভাবে আমরা চলতে চলতে মজা করতে করতে গভীর জঙ্গলে ঢুকে পড়লাম। সেখানে বড় বড় গাছ দাঁড়িয়ে আছে। আলো খুব কম, তাই খুব সাবধানে পায়ের দিকে তাকিয়ে হাঁটতে হচ্ছিল। ‘অবতার’ সিনেমায় যেমন গাছ দেখা যায়, তেমনই লাগছিল। দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখতে লাগলাম। বড় বড় গাছ আমি খুব ভালোবাসি—সেই গাছের তলায় বসে, পাশে দাঁড়িয়ে, পড়ে থাকা ডালের উপর বসে গাছকে ছুঁয়ে অনুভব করছিলাম মানুষের প্রতি গাছের কত ভালোবাসা।
আমরা গাছ থেকে কত কিছু পাই—ফার্নিচার, জ্বালানি কাঠ, আঠা। ছোটবেলায় বই-খাতা মলাট দিতে আঠা দরকার হত। তখন রান্নাঘরের পিছনে থাকা জিউলি গাছের ডালে কোপ মেরে আঠা বের করে তা ব্যবহার করতাম। রবার, ধুনো, খেলনা, বাস-লরি-ট্রেনের বডি, বাসনপত্র—কত কিছুই না তৈরি হয়। বড় গাছের গুঁড়ির ছাল কাগজের মতো ব্যবহার হত। সেখানে গাছের ছালে নানা রকম নকশাও দেখেছি। কিছু ছাল সংগ্রহ করে এনেছিলাম।
একটি জায়গা খুব ভয়ঙ্কর ছিল—একটু উপরে উঠতে হবে, এবং সেটা বেশ কঠিন। আমি আমার পোর্টার টিঙ্কুকে বললাম, “আঙ্কেলের কাছে যাও।” সে আবার ফিরে এসে বলল, “আঙ্কেল তোমার কাছেই থাকতে বলেছে।”
একটা ব্যাপার খুব ভালো লেগেছিল—আমাদের সঙ্গে দুজন পর্বতারোহী ছিলেন, যারা অনেক এক্সপেডিশনে গিয়েছেন। তারা সবসময় ড. ঘোষকে সামনে রেখে নিজেদের পিছনে রাখছিলেন। এতে আমি নিশ্চিন্তে হাঁটতে পারছিলাম। আমরা তিনজন—টিঙ্কু, রাকেশ আর আমি—পরপর হাঁটছিলাম।
বড় গাছের জঙ্গল থেকে বেরিয়ে এবার ছোট গাছের জঙ্গলে এলাম। পথের পাশে ঘাসের উপর ছোট ছোট লাল ফুল দেখতে পেলাম। টিঙ্কু বলল এগুলো জংলি স্ট্রবেরি। বলেই খেয়ে দেখাল। আমি খেতে গেলে বলল, “এখন খেও না, খালি পেটে খেতে নেই।” ওদের কথা শুনলাম, কারণ ওরা এখানকার সব জানে। ওরা না থাকলে আমরা পথ খুঁজে পেতাম না।
ছোট ছোট পা ফেলে এগোতে লাগলাম। কিছু স্ট্রবেরি পকেটে ভরে নিলাম পরে খাওয়ার জন্য। হাঁটতে হাঁটতে খুব ক্লান্ত লাগছিল। কো-অর্ডিনেটরকে বললাম, “কাল আমি হাঁটব না।”
গ্রামে ঢুকতেই দেখি ছড়িয়ে ছিটিয়ে কয়েকটি বাড়ি। একটি দোতলা বাড়ির সামনে ছোট বাগান। সেখানে এক সুন্দরী বছর কুড়ির মেয়ে উল বুনছিল। তাকে বললাম তাদের বাড়ির টয়লেট ব্যবহার করতে চাই। সে বলল “গন্ধা”। সকাল সাতটা থেকে হাঁটছি—টয়লেটে যেতেই হবে। ওর সঙ্গে উপরে গিয়ে দেখি টয়লেট মোটামুটি ভালো, তবে একটু গন্ধ ছিল। জলও ছিল। এখানে জলের খুব অভাব—অনেক নিচ থেকে জল আনতে হয়।
গ্রামের উপরে গুম্ফা। পিছন ফিরে দেখি গ্রামের মেয়েরা গুম্ফা থেকে নামছে। তাদের ফর্সা গায়ের রং, উজ্জ্বল পোশাক—দেখতে খুব সুন্দর লাগছিল।
আমাদের দলের সবাই এসে গেল। তাঁবু খাটানো ছিল। একটি ছোট কাঠের স্কুলবাড়িতে রান্না হচ্ছিল। থাকার ব্যবস্থা তাঁবুতে। পৌঁছানোর সঙ্গে সঙ্গে প্রবল বৃষ্টি শুরু হলো। মনে হচ্ছিল সব ভাসিয়ে নিয়ে যাবে। তার সঙ্গে প্রচণ্ড ঠান্ডা। আমরা দুজনে তাঁবুর মধ্যে ঢুকে পড়লাম।
হারুদা (কো-অর্ডিনেটর) স্যুপ খেতে ডাকতে এলেন। কিন্তু ঠান্ডায় কষ্ট হচ্ছিল বলে প্রথমে না বললাম। পরে উনি হরলিক্স ও স্যুপ তাঁবুতে এনে দিয়ে বললেন, “খেতেই হবে।” শেষ পর্যন্ত খেলাম। বৃষ্টি কমতেই আমরা বেরিয়ে পড়লাম।
চাঁদের আলোয় আমরা ছয়জন গ্রামে ঘুরতে বেরোলাম। পাহাড়ের মাথায় ছোট্ট একটি রিজ। একটি বাড়ির পাশে দোকানঘরে বসেছিলাম। সেখানে উনুনে মদ তৈরি হচ্ছিল। তারা আমাদের জন্য চা বানিয়ে দিল। খুব ভালো লাগছিল।
খাবার খেয়ে একটু বিশ্রাম নিয়ে শরীর ভালো লাগছিল। পরিবেশটা ছিল একেবারেই অন্যরকম—সঙ্গীরাও ভালো, প্রকৃতি সুন্দর। মন আনন্দে ভরে উঠেছিল।
চা খেয়ে গল্প করে স্কুলবাড়িতে ফিরে এলাম। তখন খাওয়ার সময় হয়ে গেছে। গরম ডাল, বাঁধাকপির তরকারি, ডিমের ডালনা আর রুটি ছিল। খেয়ে তাড়াতাড়ি শুয়ে পড়লাম—ভোরে উঠতে হবে।
ভোরে উঠে টয়লেটে যাওয়ার তাড়া। অনেকেই আছে। টয়লেটগুলো খাদের দিকে ঝুলছিল। ঢুকতে গিয়ে দরজার নিচু ফ্রেমে মাথা ঠুকে গেল। একটু ভয় লাগছিল—যদি পড়ে যাই! তবে কোনো অসুবিধা হয়নি।
সব জায়গাতেই সকালটা খুব সুন্দর। সন্ধ্যায় যা দেখা হয়নি, সকালে তা দেখতে বেরোলাম। দেখি পাশের ঘরে ভেড়ার মাংস কাটা হচ্ছে। আমরা তো নামসু থেকে নিরামিষ খাচ্ছিলাম। মাংস দেখে লোভ হলো। হারুদাকে বললাম। তিনি বললেন পারমিশন নিতে হবে। পারমিশন এল—নিজেদের পয়সায় খেতে পারি। দাম ১০০ টাকা কিলো। আমরা ২ কিলো কিনলাম—আটজন মিলে খাব।
মাংস কিনে জলখাবার খেয়ে পরবর্তী গন্তব্য রঙ্গিয়া পাদুয়ার উদ্দেশ্যে রওনা হওয়ার প্রস্তুতি নিলাম।
ক্রমশ ….

