Screenshot
প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে ভারত-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ককে আরও গভীর করার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করা হয়েছে। বৈঠকে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা, বাণিজ্য, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI), সামুদ্রিক নিরাপত্তা এবং বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠার বিষয়গুলো গুরুত্ব পায়।
প্রধানমন্ত্রী মোদি বলেন, গত কয়েক বছরে দুই দেশের সম্পর্ক নতুন গতি ও শক্তি পেয়েছে। অন্যদিকে ট্রাম্প মন্তব্য করেন, “আমাদের সম্পর্ক এর চেয়ে ঘনিষ্ঠ আর হতে পারে না।”তিনি ভারতকে যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত অংশীদার হিসেবে উল্লেখ করেন।
বৈঠকে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা ছিল অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। দুই নেতা ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে শান্তি, স্থিতিশীলতা এবং নিরাপত্তা বজায় রাখার ওপর জোর দেন। মোদি বলেন, বৈশ্বিক অর্থনীতি সচল রাখতে সমুদ্রপথে অবাধ চলাচল নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং এ বিষয়ে ভারত ও যুক্তরাষ্ট্র একসঙ্গে কাজ চালিয়ে যাবে।
বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে কর্মরত ভারতীয় নাবিকদের বিষয়টিও বৈঠকে উত্থাপন করেন প্রধানমন্ত্রী মোদি। তিনি বলেন, লক্ষাধিক ভারতীয় নাবিক আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশ এবং তাদের নিরাপত্তা ও কল্যাণ নিশ্চিত করা জরুরি।
বৈঠকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং উন্নত প্রযুক্তি খাতেও বিস্তারিত আলোচনা হয়। ট্রাম্প AI-কে ভবিষ্যতের অর্থনৈতিক উন্নয়নের অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে উল্লেখ করেন এবং এই খাতে বিনিয়োগ বৃদ্ধির কথা জানান। উভয় নেতা প্রযুক্তি, উদ্ভাবন, ডিজিটাল রূপান্তর এবং উন্নত উৎপাদন খাতে সহযোগিতা বাড়ানোর বিষয়ে একমত হন।
আন্তর্জাতিক সংঘাত ও শান্তি প্রতিষ্ঠার বিষয়েও আলোচনা হয় বৈঠকে। প্রধানমন্ত্রী মোদি শান্তি ও কূটনৈতিক সমাধানের পক্ষে ভারতের অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করেন এবং বিভিন্ন অঞ্চলে শান্তি প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টাকে স্বাগত জানান।
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ভবিষ্যতে ভারত সফরের আগ্রহ প্রকাশ করেন এবং তাঁর আগের ভারত সফরের স্মৃতি স্মরণ করেন। বৈঠকের শেষে দুই নেতা প্রতিরক্ষা, প্রযুক্তি, বাণিজ্য, সামুদ্রিক নিরাপত্তা এবং বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় যৌথভাবে কাজ করার প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করেন।
তবে বৈঠকের সবচেয়ে আলোচিত মুহূর্ত ছিল প্রধানমন্ত্রী মোদিকে নিয়ে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের নিজের ভঙ্গিতে করা প্রশংসাসূচক মন্তব্য।আলোচকরা বলছেন, মোদিকে নিয়ে ট্রাম্পের প্রশংসার মধ্যে আসলে হতাশার সুর ভেসে ওঠে।প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প প্রধানমন্ত্রী মোদিকে বিশ্বের অন্যতম কঠিন ও দক্ষ আলোচক হিসেবে বর্ণনা করেন। “তিনি অত্যন্ত কঠিন আলোচক। সত্যি বলতে সবচেয়ে কঠিনদের একজন,” বলেন ট্রাম্প।মোদির ব্যক্তিত্ব সম্পর্কে ট্রাম্প বলেন, অনেকেই তাঁকে অত্যন্ত শান্ত, ভদ্র ও নম্র মানুষ হিসেবে দেখেন। কিন্তু দেশের স্বার্থে আলোচনা বা দরকষাকষির ক্ষেত্রে তিনি অত্যন্ত দৃঢ় অবস্থান নেন। ট্রাম্পের ভাষায়, “তিনি দেখতে খুবই ভদ্র ও শান্ত স্বভাবের মানুষ। একজন দেবদূতের মতো মনে হয়। কিন্তু বাস্তবে তিনি অত্যন্ত কঠোর এবং দৃঢ়চেতা। তিনি সবচেয়ে শক্তিশালী আলোচকদের একজন।”
মার্কিন প্রেসিডেন্ট আরও বলেন, মোদির এই শান্ত ও বন্ধুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব অনেককে বিভ্রান্ত করে।”অনেকে বলেন তিনি খুবই ভালো মানুষ। আমি বলি, হ্যাঁ তিনি ভালো মানুষ, কিন্তু তিনি অত্যন্ত কঠিন আলোচক। তিনি ভারতীয় জনগণকে ভালোবাসেন, আবার যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গেও গভীর বন্ধুত্বে বিশ্বাস করেন,” বলেন ট্রাম্প।
বিশ্লেষকদের মতে, প্রধানমন্ত্রী মোদিকে নিয়ে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের নিজের ভঙ্গিতে করা প্রশংসাসূচক মন্তব্যগুলি অনেকাংশে ডোনাল্ড ট্রাম্পএর মধ্যে সাম্প্রতিক কালের বিভিন্ন বিষয়ে তৈরি হওয়া হতাশার বহিঃপ্রকাশ। কারণ আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে বিভিন্ন বিষয়ে এবং হাল আমলের বাণিজ্যিক চুক্তি নিয়ে ভারতের জাতীয় স্বার্থে নেওয়া দৃঢ় অবস্থানের জন্যে আমেরিকার গভীর পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হতে পারেনি। এর আগে মোদিকে বন্ধু হিসাবে ব্যাখ্যা করলেও, ইয়েস ম্যান এ পরিণত করা অধরাই থেকে গেছে। সে রাশিয়া ইউক্রেন যুদ্ধ হোক বা ইরান যুদ্ধ হোক। রাশিয়ার সঙ্গে সম্পর্কে ফাটল ধরেনি। অনেক ক্ষেত্রেই ভারত আমেরিকার সঙ্গে সামিল হয়নি। ভারত নিরপেক্ষ অবস্থানে চিরাচরিত ভাবে অনড় থেকেছে। মোদী জমানায় প্রতিটি চুক্তি হয়েছে সমানে সমানে। ভারতের স্বার্থকে জলাঞ্জলি দিয়ে মোদী সরকার কোনো চুক্তির পথে যায়নি। বর্তমানের বাণিজ্য চুক্তিতে ডেয়ারি এবং জেনেটিকালি মডিফাইড শস্য কে ভারত ছাড়পত্র দেয়নি। এতে আমেরিকার বহুজাতিক কোম্পানিদের আশায় এক কথায় জল ঢেলে দিয়েছে ভারত। অতীতের অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে বিটি কটন এর ক্ষতিকারক প্রভাবে কৃষকদের ভয়ঙ্কর সর্বনাশ হয়েছে। দেশীয় প্রজাতির বীজ বিলুপ্ত হয়েছে, আমেরিকার কোম্পানি গুলি সমগ্র বাজারের দখল নিয়ে নিয়েছে। এছাড়াও রয়েছে দেশের মানুষের স্বাস্থ্য হানির আশংকা। বিশেষজ্ঞদের মতে , জেনেটিকালি মডিফাইড শস্য ব্যবহারের অবধারিত দীর্ঘ মেয়াদি ফল হল ক্যান্সারের মতো বিভিন্ন জটিল অসুখ। যার সঙ্গে আবার জড়িয়ে আছে কোটি কোটি ডলারের ওষুধ কোম্পানির স্বার্থ। যে লবিগুলির চাপ কিভাবে ক্ষমতাশালী দেশের রাজনীতি ও সরকারের নীতিনির্ধারণে প্রভাবিত তা আজ সর্বজন বিদিত।
তবে বিশেষজ্ঞ মহলের মতে, ডোনাল্ড ট্রাম্প সাম্রতিক কালে বিভিন্ন ভাবে চাপ দিয়েছে ভারতের ওপরে, এমনকি ট্যারিফ চাপিয়েছে তাই মোদিজিও খুব সতর্ক ভাবে আচরণ করেছেন। এই কারণে ট্রাম্পের সঙ্গে সেই উষ্ণ সম্পর্ক এবারে আর দেখা যায়নি। আর সেই জন্যেই ট্রাম্প পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করার জন্যে বিভিন্ন প্রসঙ্গের অবতারণা করেন। ভারতকে কেউ আক্রমণ করলে ভারতের পাশে দাঁড়াবার কথা বলেছেন। কূটনৈতিক মহল ট্রাম্পের এইসব মুখের কথার গুরুত্ব দিতে নারাজ। সাম্প্রতিক ইরান যুদ্ধে আমেরিকার সঙ্গে চুক্তি বদ্ধ বিভিন্ন দেশকে সাহায্য করতে দেখা যায়নি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই বৈঠক শুধু ভারত-যুক্তরাষ্ট্র কৌশলগত অংশীদারিত্বকেই আরও শক্তিশালী করেনি, বরং মোদি ও ট্রাম্পের ব্যক্তিগত বোঝাপড়া ও রাজনৈতিক সমন্বয়ের পূর্ব এবং বর্তমান অবস্থান স্পষ্টভাবে তুলে ধরেছে।
About The Author
Discover more from Jist Feed
Subscribe to get the latest posts sent to your email.
